Latest News

ভুলে যাওয়া বলিউড নায়িকা ফারহা, ‘আমার তুমি’ গানে রয়ে গেছে তাঁর কোমল মুখ

শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়

‘বলছি তোমার কানে কানে … আমার তুমি।’– লতা মঙ্গেশকরের জনপ্রিয় গানের নায়িকা ছিলেন ফারহা। পুরো নাম ফারহা নাজ হাসমি। প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের নায়িকা তিনি, ‘আমার তুমি’ ছবির। কেবলমাত্র এই একটি বাংলা ছবি করে বিশাল সাফল্য পান তিনি বাংলায় এবং সেই সঙ্গেই বাপ্পি লাহিড়ীর সুরে ‘বলছি তোমার কানেকানে’ আইকনিক লাভ সং হয়ে ওঠে চিরকালের। এই গানটা দিয়েই ফারহা বাঙালিদের বড় আপন।

কিন্তু শুধু বাংলা নয়, ফারহা মূলত বলিউড ইন্ডাস্ট্রির আশি-নব্বই দশকের পর্দা কাঁপানো নায়িকা ছিলেন, তাঁর রূপমাধুরী মাথা ঘুরিয়ে দিয়েছিল তামাম ভারতবাসীর। তবে ফারহার উত্থান যত প্রবল, প্রস্থানও ততটাই আকস্মিক। রেখা, শ্রীদেবী, মাধুরী, ঐশ্বর্য, করিনার মতোই ফারহাও ছিলেন বলিউডের প্রথম সারির নায়িকা। আজ তিনি ভুলতে বসা নাম।

কেন ছাড়লেন অভিনয় জীবন? কেনই বা তিনি এসেছিলেন ফিল্মি জীবনে? এর পেছনেও রয়েছে এক নারীমুক্তির গল্প।

‘মেয়ে হয়েও সবই দিলাম, নাই বা হলাম ছেলে!’  ফারহার মা ছিলেন দুই কন্যা সন্তানের মা। তাই তিনি নির্যাতিতা হতেন স্বামীর দ্বারা। পুরুষ উত্তরাধিকার নেই বংশে, তাই স্ত্রীকে নির্যাতন করতেন তিনি। শেষ অবধি ডিভোর্স নেন ফারহা জননী, দুই কন্যা সমেত। বড় হওয়ার পরে ফারহা চেয়েছিলেন, ছেলের মতোই রোজগার করবেন এবং তিনি সেটা করেও দেখান।

মায়ের সঙ্গে।

তাই যখন হায়দরাবাদে যশ চোপড়ার ছবিতে নবাগতা নায়িকা রূপে তাঁর কাছে ফিল্মের অফার এল, তা তিনি ঝাঁপিয়ে গ্রহণ করেন। ফারহা জননী মেয়েকে সতর্ক করেছিলেন, ‘যা করছো ভেবে করো, পরে যেন আফসোস করতে না হয়।’ ফারহার প্রেরণা ছিলেন মিঠুন চক্রবর্তী, যিনি নিম্নমধ্যবিত্ত বাড়ির ছেলে থেকে ডিস্কো ডান্সার হয়েছিলেন। মাত্র ১৭ বছর বয়সে ফারহাও শুরু করেন তাঁর ফিল্মি কেরিয়ার। ফর্সা গায়ের রং, সুন্দর মুখশ্রীর জোরে সিনেমায় সুযোগ পেতে খুব কাঠখড় পোড়াতে হয়নি।

আটের দশকের শেষে ও নয়ের দশকের শুরুতে ফারহা ছিলেন বলিউডের প্রতিশ্রুতিমান নায়িকাদের মধ্যে অন্যতমা। ১৯৮৫ সালে ফারহার প্রথম ছবি, ‘ফাসলে’ ছিল যশরাজ ব্যানারে। ফারহার বিপরীতে নায়ক ছিলেন অভিনেতা মহেন্দ্র কাপুরের ছেলে রোহন কাপুর। বক্স অফিসে এ ছবি মুখ থুবড়ে পড়লেও বেশ প্রচার পান ফারহা।

ফারহা রাজেশ খান্না, ঋষি কাপুর, বিনোদ খান্না, অনিল কাপুর, সঞ্জয় দত্ত আমির খানের মতো নায়কের নায়িকা ছিলেন। বিনোদ খন্নার নায়িকা রূপে ‘কারনামা’ এবং রাজেশ খন্নার নায়িকা হিসেবে ‘বেগুনাহ’ এবং ‘ওহ ফির আয়েগি’। নয়ের দশকে আমির খানের সঙ্গে দু’টি ছবিতে অভিনয় করেন ফারহা, ‘জওয়ানি জিন্দাবাদ’ এবং ‘ইসি কা নাম জিন্দগি’। কিন্তু দু’টি ছবিই বক্সঅফিসে ব্যর্থ হয়। এর পর ‘খুদা গাওয়া’ ছবিতেও অভিনয় করেন কিছু দৃশ্যে। কিন্তু শেষ অবধি ফারহাকে বাদ দিয়ে নেওয়া হয় শিল্পা শিরোদকরকে।

ছবির ব্যস্ততা আর অনেক টাকা রোজগার– এই ছিল তাঁর ধ্যান জ্ঞান। অন্যদিকে তাঁর বোন টাব্বুও ইতিমধ্যে এসে গেছেন ফিল্ম জগতে। বেশ পরিচিতিও পাচ্ছেন টাব্বু। দিদি ফারহা মাঝেমধ্যেই একা হয়ে পড়তেন এবং তখন তাঁকে মানসিক জোর দিতেন দারা সিং পুত্র  বিন্দু দারা সিংহ। একটা ছবির সেটেই তাঁদের আলাপ।

তাঁদের সম্পর্ক নিয়ে অবশ্য তীব্র আপত্তি ছিল দুই পরিবারেই। ফারহার মা চেয়েছিলেন আরও বিত্তশালী প্রতিভাবান জামাই, যে দারা সিংয়ের মতো পিতার আলোয় পরিচিত নয় এমন। অন্যদিকে, বিন্দুর পরিবার চেয়েছিল ঘরোয়া পুত্রবধূ। তবুও দুই পরিবারের আপত্তি উপেক্ষা করে দু’জনে বিয়ে করেন ১৯৯৬ সালে। পরের বছর তাঁদের একমাত্র সন্তান ফতেহ-র জন্ম। কিন্তু দাম্পত্য জীবনে অসুখী ছিলেন ফারহা। কারণ বিন্দু দারা সিংহের বহুগামী জীবন মানতে পারেননি তিনি, আবার ফারহার ছবি করা নিয়েও আপত্তি ওঠে পরিবারে। শেষমেষ নিজের হাতের শিরা কেটে আত্মহত্যা করতে গেছিলেন ফারহা। ভগবান রক্ষা করেন সেই বার।

প্রথম বিয়েতে পাশে বোন টাব্বু।

কিন্তু বিন্দু-ফারহার সংসার ভাঙল ২০০৩ সালে। যদিও বিবাহ বিচ্ছেদের অনেক আগেই ছেলেকে নিয়ে আলাদা থাকছিলেন তিনি। বিচ্ছেদের কারণ নিয়ে দু’জনের কেউ মুখ খোলেননি। পুত্র ফতেহ-র কাস্টডি পান ফারহা।

বিয়ের পরই ফারহা সিনেমায় কাজ কমিয়ে দিয়েছিলেন। ভেবেছিলেন বিয়ে করে সুখী সংসার করবেন, দেশ-বিদেশ ঘুরে বেড়াবেন। সেই নিশ্চিন্ত অবসর জীবন তাঁকে দিল না। ডির্ভোসের পরে ছবির জগতে যে ফিরবেন, ততদিনে তাঁর শূন্যস্থান পূরণ হয়ে গেছে। বোন টাব্বু আবার তাঁর মতো বাণিজ্যিক ছবি নিয়েই পড়ে থাকেননি। মননশীল ছবিতে নিজের জায়গা করে নিয়েছেন। ডিভোর্সী ফারহার জায়গা মিলল ছোট পর্দায়। টেলিভিশনের কাজ করতে গিয়েই আবার আলাপ অভিনেতা সুমিত সেহগলের সঙ্গে। প্রথম বিয়ে ভেঙে যাওয়ার বছরেই, ২০০৩ সালে সুমিতকে বিয়ে করেন ফারহা। স্বামী সুমিত, পুত্র ফতেহ-কে নিয়ে নতুন করে জীবন শুরু করেন ফারহা।

তবে ফারহার কেরিয়ার পড়ে যাওয়ার আরও একটা কারণ বলে মনে করা হয় তাঁর মেজাজী ব্যবহার। সহ-অভিনেতা, অভিনেত্রীদের প্রতি কটূক্তি বা স্পষ্ট কথা তাঁকে একঘরে করে দিয়েছিল। এমনকি ফারহা এমনও বলেছিলেন, “আমি যদি কোনও পুরুষের শয্যাসঙ্গিনী হয়ে ফিল্মে সুযোগ পেতাম অন্য অনেক নায়িকার মতো, তাহলে আমি বম্বে শহরে রাতের পথবেশ্যার থেকে আলাদা কিছু হতাম না। আমি ফিল্ম জগতে অসফল নই। আমি ফিল্ম আর সংসার দুটোই একসঙ্গে সফলতার সঙ্গে সামলেছি।”

একবার ফারহা শ্যুটিংয়ে চাঙ্কি পান্ডেকে মেরেওছিলেন এবং ইন্টারভিউতে বলেছিলেন, চাঙ্কির ওই পুরুষালি শো অফ পছন্দ করেন না ফারহা। আর একবার একটি প্রেস কনফারেন্সে অনিল কাপুর আর ফারহাকে নিয়ে ছবির প্রমোশান হচ্ছিল। সেখানে ফারহা অনিলকে তীব্র কটুক্তি করেন কারণ অনিল আসন্ন ছবির পরিচালককে প্রভাবিত করছিলেন ফারহার পরিবর্তে মাধুরী দীক্ষিতকে ছবিতে নেওয়ার জন্য। ফারহা বুঝতে পেরে তীব্র প্রতিবাদ করেন। যার ফলে ছবির কাজও কমে যায় ফারহার।

ফারহা তাঁর গুরু যশ চোপড়ার স্ত্রী পামেলা চোপড়াকেও ছাড় দেননি। একবার বাকবিতণ্ডায় পামেলাকে ফারহা কটূক্তি করে বসেন। এ জন্য যশ চোপড়া চিরতরে ফারহাকে তাঁর পছন্দের তালিকা থেকে বাদ দেন এবং যশ চোপড়া ব্যানার থেকেও বাদ পড়ে ফারহার নাম।

ফারহার শেষ ছবি ২০১৫ সালের ‘দো চেহরে’।

একটু ভেবে দেখলে বোঝা যায় ফারহা বলিউডের লবিচক্রর বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলেছিলেন একটা মেয়ে হয়ে, সেজন্যই হয়তো তাঁর বলিউডে টিকে থাকা সম্ভব হল না। আবার বোন টাব্বুর মতো নিজের একটা ঘরানাও তৈরি করতে পারেননি, ছিল না নিজের স্বতন্ত্র। সঙ্গে কাল হল অসুখী দাম্পত্য জীবন। যদিও দ্বিতীয় বিয়েতে সুখী হয়েছেন ফারহা। প্রথম স্বামীর সঙ্গেও বিভিন্ন অনুষ্ঠানে দুজনের সৌজন্য বিনিময়ও হয়েছে।

এ প্রজন্ম ফারহাকে আর মনে রাখেনি, তিনি আজ ভুলতে বসা নায়িকা। কিন্তু একটা বাংলা গান ‘বলছি তোমার কানে কানে’র সুরে আজও বাঙালির মনের কোণে রয়ে গেছে ফারহার সেই অপাপবিদ্ধা মুখ।

You might also like