Latest News

প্রয়াত নার্গিসের জন্য ‘রকি’র প্রিমিয়ারে আসন ফাঁকা ছিল সঞ্জয় দত্ত ও সুনীল দত্তর মাঝখানে

শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়

‘রকি’ ছবি দিয়ে তাঁদের ছেলে সঞ্জয় দত্তকে বলিউডে লঞ্চ করেছিলেন নার্গিস দত্ত এবং সুনীল দত্ত। ‘রকি’ নবাগত সঞ্জয়ের ডেবিউ ছবি আজ চল্লিশ বছর পূর্ণ করল। ১৯৮১ এর ৮ই মে মুক্তি পায় সুনীল দত্ত পরিচালিত ‘রকি’। কিন্তু এই চল্লিশ বছরের সফর জুড়ে রয়েছে এক মেলানকলি সুর।

‘রকি’ সঞ্জয় দত্ত অভিনীত প্রথম ছবি নয়। সঞ্জয়কে হিরো বানাতেই হবে এই স্বপ্ন দত্ত-দম্পতি দেখেছিলেন অনেক বছর আগেই। তখন সুনীল দত্ত মধ্যগগনে। বিয়ে করেছেন স্বপ্নসুন্দরী নার্গিসকে। জন্মেছে ছেলে সঞ্জয়। কিছুদিন পর ‘রেশমা অউর শেরা’ নামে ছবি বানালেন সুনীল দত্ত, তিনিই নায়ক, তিনিই পরিচালক। এই ছবির আরেক ঘটনা ছবিতে সুনীল দত্তের ভাইয়ের নির্বাক ভূমিকায় অভিনয় করেন অমিতাভ বচ্চন। যে অমিতাভের পুরুষালি কণ্ঠ আইকনিক, সেই কণ্ঠ চরিত্র অনুযায়ী বেমানান লেগেছিল সুনীল দত্তের। তাই ছবিতে অমিতাভকে সংলাপহীন করে দেন তিনি। সুনীল দত্ত তখন মধ্যগগনে, আর অমিতাভ নতুন। প্রযোজক সুনীল দত্তের বিরুদ্ধে মুখ খুলতে পারেননি অমিতাভ।

ছবিতে মান্না দে’র কণ্ঠে বিখ্যাত কাওয়ালি গান ছিল ‘জালিম তেরি শরাব মে’। গানের দৃশ্যায়নে দরকার হয় দুই শিশু শিল্পীর। সুনীল এবং নার্গিস সিদ্ধান্ত নেন, তাঁদের ছেলেকে পর্দায় আনবেন। মিনিট ছয়েকের গানে সঞ্জয় দত্ত নামের শিশুর অপাপবিদ্ধ হাসি সে দিন মন ভরিয়ে দেয় দর্শকের।

বাবা-মা ঠিক করলেন সঞ্জয় বড় হলে ওঁকে নায়ক বানাবেন তাঁরা। যেমন ভাবা তেমনই কাজ। সঞ্জয়ের তখন বাইশ বছর পূর্ণ হবে। সুনীল দত্ত আর নার্গিস আশির দশকেই ভেবে ফেললেন সঞ্জয়কে নায়ক হিসেবে লঞ্চ করে পিতামাতার ধারা বজায় রাখবেন। শুরু হল সুনীল দত্তের পরিচালনায় ‘রকি’ ছবির শ্যুটিং।

ছবির মহরৎ হল মেহবুব স্টুডিওতে। হাজির ছিলেন নার্গিস সুনীল দুজনেই।

কিন্তু স্বপ্নযাত্রার শুরুতেই বাঁধা এল সঞ্জয়ের জীবনে। শ্যুটিং-এর কিছুদিনের মধ্যেই নার্গিস অসুস্থ হয়ে পড়লেন। অগ্ন্যাশয় ক্যানসার ধরা পড়ল। নার্গিসকে ঘিরেই সুনীল সঞ্জয়ের সব কিছু। বিশাল আঘাত হানল পিতা-পুত্র দুজনের জীবনেই এই নির্মম সত্য। চিকিৎসা করাতে স্ত্রীকে নিয়ে আমেরিকা পাড়ি দিলেন সুনীল। আমেরিকা থেকে বম্বে এসে সুনীল দত্তের পক্ষে ‘রকি’র শ্যুটিং করা অসম্ভব। ভেবেছিলেন বন্ধ করে দেবেন শ্যুটিং। কিন্তু নার্গিসের শেষ ইচ্ছে ছেলের সফলতা দেখা, তাহলে যে পূরণ হবেনা। তাই অনেক ভেবে অভিন্ন-হৃদয় বন্ধু রাজ খোসলাকে ছবির ক্লাইম্যাক্স শ্যুট ও সম্পাদনার দায়িত্ব দিলেন সুনীল। রাজ এক কথাতেই রাজি হয়ে গেলেন। কিন্তু পরিচালক হিসেবে সুনীল দত্তের নামই থাকল। সঞ্জয় ছাড়াও ছবিতে ছিলেন টিনা মুনিম আম্বানি, রাখী, রিনা রায়, আমজাদ খান, অরুণা ইরানি প্রমুখ।

১৯৮১ সাল ৮ মে, মুক্তি পেল নার্গিস-সুনীলের স্বপ্নের ছবি ‘রকি’, যাতে ডেবিউ করলেন সঞ্জয় দত্ত।

কিন্তু ছবি মুক্তির তিনদিন আগেই ভেঙে খানখান হয়ে গেছে দত্ত পরিবারের সব স্বপ্ন। ‘রকি’ মুক্তির তিন দিন আগে জীবনাবসান হল বলিউড ডিভা নার্গিসের। ঝরে গেল নার্গিস ফুল। সঞ্জয়ের সারাজীবন আফসোস রয়ে গেল তাঁর মা ছেলের ছবির প্রিমিয়ারে হাজির থাকতে পারলেন না। তাই ‘রকি’ প্রিমিয়ারে সুনীল দত্ত আর সঞ্জয় দত্ত, তাঁদের দুজনের সিটের মাঝে একটা সিট ফাঁকা রেখে দিলেন। কার জন্য সেই সিট? বাস্তবে কেউ এসে বসবেনা সেই আসনে। কিন্তু পরাবাস্তবে সেই আসনে বসেছিলেন নার্গিস। হয়তো নার্গিস স্বামী-ছেলের সঙ্গেই বসে দেখেছিলেন ছেলের হিরো রূপে প্রথম ডেবিউ ছবি। সঞ্জয় তাঁর নতুন জীবনের শুরুটাই উপভোগ করতে পারলেন না। সান্ত্বনা একটাই, ছবির রাশ প্রিন্ট দেখে যেতে পেরেছিলেন নার্গিস।

প্রিমিয়ারের আলো ঝলসানো রাতের তিনদিন আগেই বিদায় নিয়েছেন নার্গিস। ছেলের সঙ্গে বসে ছেলের ছবি দেখা হল না নার্গিসের। সেই ধাক্কা সঞ্জয়কেও নিয়ে গিয়ে ফেলল জীবনের অন্য এক মোড়ে। যে মোড়ের মাথায় তিনি আসক্ত হয়ে পড়লেন নেশার। ‘রকি’ সুপারহিট। আর ডি বর্মণের সুরে গান সুপারহিট।

একদিকে দত্ত পরিবারের বাংলোয় প্রযোজকদের ভিড়। সকলের হাতে সঞ্জয়ের জন্য ছবির প্রস্তাব। অন্য ঘরে তখন সম্পূর্ণ নেশায় অচেতন সঞ্জয়। মা-হীন জীবন যেন মরুভূমি। হতাশ সুনীল কিছু দিনের মধ্যেই সিদ্ধান্ত নিলেন, ছেলেকে বিদেশে পাঠাবেন চিকিৎসা করাতে। বলিউডের আকাশে জ্বলে ওঠা নক্ষত্র আপাতত বিদায় নিল ধূমকেতু হয়ে।

সঞ্জয় দত্তকে ভিলেন যতই ভাবুক সমাজ। তাঁর মনের ভিতরে কি তোলপাড় চলেছিল তা পড়েনি সমাজ। ভালোবাসার কাঙাল ছিল সঞ্জয়। আর সেখানেই পেয়েছেন বারবার আঘাত। তাঁর জীবনের প্রিয় নারীদের কেড়ে নিয়ে গেছে মারণ রোগ ক্যানসার।

১৯৮৫ সালে অনেকটা সুস্থ হয়ে আবার বলিউডে প্রত্যাবর্তন সঞ্জয়ের। প্রেমে পড়লেন অভিনেত্রী রিচা শর্মার। বিয়ে সেরে ফেললেন দুজনেই চটজলদি। মেয়েও হল। কিন্তু সুখ সইল না। সেই ক্যানসার এবারও ভিলেন।
বিয়ের দু’বছরের মধ্যেই ক্যানসারেই বিদায় রিচার। আঘাতে জর্জরিত সঞ্জয়।

কিন্তু সঞ্জয় যে ফাইটার। ‘৯০-‘৯১ সালে তিনি ফিরলেন ‘থানেদার’ রূপে ‘সাজন’ হয়ে ‘সড়ক’-এ। নব্বইয়ে আবার বলিউডের এক নম্বর হিরো তিনি। সঞ্জয় দত্তর নিস্পাপ রূপ বদলে গেছে ততদিনে বিশাল দেহসৌষ্ঠব আর বড় চুলের পাগল করা লুকে। সঞ্জয়ের আলিঙ্গনে আসতে যে কোন মেয়েই পাগল। নায়িকারা সঞ্জয়ে ফিদা।

বলিউডের এক নম্বর সুন্দরী নায়িকা পড়লেন সঞ্জয়ের প্রেমে। তিনি আর কেউ নন মাধুরী দীক্ষিত। ভেঙেও গেল সে প্রেম। ঐসময়ই বেআইনি ভাবে বন্দুক রাখার অপরাধে টাডা-য় আটক হলেন সঞ্জয়। ও দিকে জেলে তিনি, এ দিকে পর্দা কাঁপিয়ে দিচ্ছে তাঁর ‘খলনায়ক আর সমাজ কাঁপিয়ে দিচ্ছে ‘চোলিকে পিছে ক্যায়া হে’। কিন্তু সমাজবিরোধী তকমা গায়ে লেগে যাওয়া প্রেমিকের সঙ্গে থাকলে ক্যারিয়ার থাকবেনা ভেবে সরে গেলেন মাধুরী। আবার প্রেমে আঘাত।
ছাড়াও পেলেন এবং শাপমুক্তিও ঘটল ‘মুন্নাভাই এমবিবিএস’ রূপে। বিয়েও সেরেছেন মান্যতা দত্তর সঙ্গে। দুই সন্তানের বাবাও হয়েছেন।

কিন্তু এবার সঞ্জয়কেই আঘাত করল ফুসফুস ক্যানসার। যে ক্যানসার কেড়ে নেয় তাঁর মাকে, তাঁর প্রথম স্ত্রীকে- সেই ক্যানসার বাসা বেঁধেছে তাঁর শরীরেও। আমেরিকায় চিকিৎসা করে সুস্থ হবেন সঞ্জয় প্রার্থনা করি।

কিন্তু এক মারণ রোগের বিরুদ্ধে যে সারা জীবন লড়াই করে গেলেন এক ফাইটার তাঁর মনের খবর ক’জন রাখল?

You might also like