Latest News

সৌমিত্রদা থিয়েটারে আমার সঙ্গে কাজ করতে চান, শুনে ভয় পেয়েছিলাম

সুমন মুখোপাধ্যায়

তাঁর কাজ শুরুই হচ্ছে সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে। শিশির কুমার ভাদুড়ির নির্দেশনাতেও কাজ করেছেন তিনি। সেই সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় (Soumitra Chatterjee) থিয়েটারে আমার নির্দেশনায় কাজ করতে চান! অবাক হয়েছিলাম। একই সঙ্গে ভয়ও পেয়েছিলাম।

২০০৯-১০ সাল। মিনার্ভা রেপার্টারি কোম্পানি তখন শুরু হয়েছে। বাংলা থিয়েটার জগতের প্রায় সবাই তার সঙ্গে যুক্ত। সবার ইচ্ছে এমন কোনও একটা প্রযোজনা দিয়ে এই রেপার্টারির কাজ শুরু করার যাতে প্রথমেই একটা হইচই পড়ে যায়। সেই কারণেই সৌমিত্রদার সঙ্গে অভিনয়ের জন্য যোগাযোগ করা হয়। তিনি জানান, অল্প বয়সে হ্যামলেটের চরিত্রে তাঁর খুব অভিনয় করার ইচ্ছে ছিল। কিন্তু সেই সময় তাঁর যা বয়স তাতে সেটা আর সেটা সম্ভব নয়। তার বদলে রাজা লিয়র অভিনয় করতে চান তিনি। সেই সময়েই তিনি একটা শর্ত দেন। এই নাটকের নির্দেশনা দিতে হবে সুমন মুখোপাধ্যায়কে। অর্থাৎ আমায়।

এটা আমার জন্য একটা বিরাট প্রাপ্তি। অমন প্রবাদপ্রতিম একজন অভিনেতা। নিজেও একজন নাট্য নির্দেশক। আমি তাঁর থেকে বয়সে অভিজ্ঞতায় অনেক ছোট। একটু ভয়ও করেছিল।

অথচ কাজ করতে গিয়ে বুঝলাম কী অসম্ভব ডেডিকেশন। একই সঙ্গে কী অসম্ভব বিনয়। বারবার জিজ্ঞাসা করতেন, ‘আমি পারব তো? শেক্সপিয়রের নাটক, তার সংলাপ তো নিজের মতো করে বানিয়ে বলা যাবে না।’

রিহার্সাল যখন থাকত না, তখন আমি দলের ছেলেদের ওঁর কাছে পাঠিয়ে দিতাম। উনি তাঁদের সঙ্গে বারবার সংলাপ বলা প্র্যাকটিস করতেন।

মজার কথা হল লিয়রের প্রায় সব সংলাপই সৌমিত্রদার নিজের লেখা। আসলে সুনীল কুমার চট্টোপাধ্যায়ের করা শেক্সপিয়রের কিং লিয়রের বাংলা অনুবাদটা আমরা ব্যবহার করেছিলাম। কিন্তু প্রযোজনার স্বার্থে সেই অনুবাদের অনেক কিছুই বদলাতে হয়েছিল। দেবাশিস মজুমদার, সৌমিত্রদা আর আমি মিলে স্ক্রিপ্টটাকে প্রায় ঢেলে সাজিয়েছিলাম। সেই সময় লিয়রের নিজের মুখে সংলাপগুলো সৌমিত্রদা প্রায় নিজেই লিখেছিলেন। ওঁর বাংলা ভাষার দক্ষতা যে কী অসাধারণ আমি সেই সময়েই বুঝতে পারি।

অভিনেতা হিসেবেও ওঁর যে কী অসামান্য অভিনিবেশ, তাও একদম সামনে থেকে দেখেছিলাম। সেটা যে কোনও শিল্পীর কাছেই একদম শেখার মতো জিনিস। চরিত্রটাকে বুঝতে কতটা গভীরে যেতে হয়, কতটা জানতে হয় একজন অভিনেতাকে, চরিত্রের কতটা ভেতরে প্রবেশ করতে হয়।

থার্ড চয়েজ হিসেবে কোনিতে কাজ করেছিলেন সৌমিত্রদা

স্ক্রিপ্টের যে ওয়ার্কিং কপি ওঁর কাছে ছিল, সেটা যদি কেউ দেখে তাহলে বুঝতে পারবে। সংলাপের পাশাপাশি রাজা লিয়রের চরিত্রটা বুঝতে উনি ছবি আঁকতে শুরু করলেন। লিয়রের মুখের বিভিন্ন অভিব্যক্তি, বিভিন্ন ভঙ্গিমা, উনি নিজে স্কেচ করেছিলেন।

পিটার ব্রুকের লেখা পড়েছিলাম, ওঁর কিংবদন্তি ব্রিটিশ অভিনেতা জন গিলগিডকে নিয়ে কাজ করার অভিজ্ঞতার কথা। পিটার ব্রুক ভয় পেয়েছিলেন প্রথমে। জন গিলগিড আদৌ ওঁর কথা শুনবেন তো। কিন্তু পরে বুঝেছিলেন, আসলে ওই মাপের শিল্পীরা ওইসব ছোটখাটো বিষয় নিয়ে মাথাই ঘামায় না। তাঁর যখন বয়সে অনেক ছোট কোনও নির্দেশকের সঙ্গেও কাজ করতে রাজি হন, তখন তাঁদের কাজ করতে গিয়ে কোনও কুণ্ঠা থাকে না।

সেই সময় আমি আর সৌমিত্রদা এক সঙ্গে রিহার্সালের যেতাম। দু’জনেই দক্ষিণ কলকাতায় থাকি। রিহার্সাল হত উত্তরে। সেই সময় গাড়িতে বসে ওঁর সঙ্গে অনেক গল্প হত। ওঁর স্মৃতিশক্তি অসম্ভব ভালো। সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে কাজ করার অনেক অভিজ্ঞতার কথা বলতেন। শিশির কুমার ভাদুড়ির মুখ থেকে শোনা অনেক গল্পের কথা বলতেন। শিশির ভাদুড়ির সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের সম্পর্কের গল্প শোনাতেন।

সত্যজিতের সেটে কাজ করেছেন। পাশাপাশি অন্য মূলধারার ছবিতেও কাজ করতে হয়েছে। সেই সব ছবিতে স্বাভাবিক ভাবেই সত্যজিতের মতো নির্দেশকের মেধার বিচ্ছুরণ ছিল না। সৌমিত্রদা প্রথমদিকে রেগে যেতেন। উনি আমাকে গল্প করেছিলেন, যে রবি ঘোষ ওঁকে এই নিয়ে অনেক বুঝিয়েছিলেন। পেশাদার ভাবে কাজ করতে গেলে এমন অনেকের সঙ্গে কাজ করতে হবে, যাঁদের কাজের পদ্ধতি, মেধা-মননের সঙ্গে নিজেকে মেলানো যাবে না।

সেই সময় বুঝতে পেরেছিলাম, থিয়েটার নিয়ে ওঁর একটা আলাদা প্যাশন ছিল। উনি আক্ষেপ করতেন, ‘সবাই শুধু আমার সিনেমা নিয়ে কথা বলে, কিন্তু আমার থিয়েটারের কাজকর্ম নিয়ে তেমন ভাবে কথা হয় না।’

সৌমিত্রদা আসলে পেশাদার থিয়েটারে কাজ করেছেন। যেটাকে আমরা বলতাম উত্তর কলকাতার থিয়েটার। উনি যেই সময় কাজ করছেন, তখন পেশাদার থিয়েটারের খুব খারাপ অবস্থা। কাজের মান খুব নেমে গিয়েছে। সেইখানে উনি প্রায় একা হাতে অন্যরকম কাজ করার চেষ্টা করেছেন। অসম্ভব দক্ষতার সঙ্গে করেছেন। ‘নামজীবন’-এর মতো নাটক করেছেন। ইউরোপের ক্লাসিক নাটক করেছেন। ফরাসি নাট্যকার জাঁ আঁনুইয়ের নাটক করেছেন। এবং সেই নাটকগুলোকে যে ভাবে উনি বাংলায় অ্যাডপ্ট করেছেন তাতে সেগুলোকে আর বিদেশি নাটক বলে মনেই হত না। আমার মনে হয় অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের যে ভাবে বিদেশি নাটক বাংলার প্রেক্ষাপটে সহজাত ভাবে অ্যাডপ্ট করে নেওয়ার দক্ষতা ছিল, সেটা তাঁর পরে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের মধ্যেই সব থেকে বেশি ছিল।

এই অ্যাডপটেশনের দক্ষতা একজন শিল্পীর তখনই থাকে যখন সে ভীষণ গভীর ভাবে তাঁর দেশ, মাটি, সংস্কৃতিকে চেনে।

সৌমিত্রদাকে নিয়ে চলচ্চিত্রেও কাজ করার ইচ্ছে ছিল। কিন্তু আমি যে ক’টা সিনেমা করেছি তার মধ্যে ওঁর মতো কোনও চরিত্র ছিল না। তবে আমি গ্লোবাল ওয়ার্মিং নিয়ে একটা তথ্যচিত্র করেছিলাম। সেটায় সৌমিত্রদা অ্যাঙ্করিং করেছিলেন। সেটাই ওঁর সঙ্গে ক্যামেরা নিয়ে আমার একমাত্র কাজ।

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় এক মুহূর্ত চুপ করে বসে থাকতে পারতেন না। সারাক্ষণ কাজ করে যেতেন। এমনকী এই কোভিড পরিস্থিতির মধ্যেও শ্যুটিং করে গিয়েছেন। কবিতা লিখেছেন, এক্ষণের মতো একটা পত্রিকার সম্পাদনা করতেন, নানা বিষয়ে বিস্তৃত পড়াশুনো ছিল। শেষ জীবনে ছবি আঁকা শুরু করেছিলেন। উনি আসলে শুধু অভিনেতা ছিলেন না। উনি ছিলেন বাংলা সাংস্কৃতিক জগতের বহুমুখী প্রতিভাদের অন্যতম। একজন প্রকৃত সাংস্কৃতিক আইকন।

(সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে লেখা)

পড়ুন দ্য ওয়ালের সাহিত্য পত্রিকা ‘সুখপাঠ’

You might also like