Latest News

দক্ষিণেশ্বর মন্দিরের সিঁড়িতে বসে সন্ধ্যা গাইলেন, এ শুধু গানের দিন…

শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়

সুচিত্রা সেন-সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় জুটি চিরভাস্বর বাঙালির হৃদয়ে। বাংলা চলচ্চিত্রের গানে আজও এই জুটির গানগুলি চিরকাল থাকবে প্রথমসারিতে। প্রতিটি গানের দৃশ্যায়v বাঙালির মনে গেঁথে আছে। ‘গানে মোর কোন ইন্দ্রধনু’, ‘আমি স্বপ্নে তোমায় দেখেছি’, ‘জানিনা ফুরাবে কবে’, ‘ঘুম ঘুম চাঁদ’– অজস্র গানে আজও শ্রোতারা নস্ট্যালজিক হয়ে থাকেন।

কিন্তু এসব কালজয়ী গান তৈরির পেছনেও অনেক ঐতিহাসিক গল্প আছে, যেগুলো খুব একটা জনসমক্ষে আসেনি। আমবাঙালি সেসবের নাগাল পায় না। ব্যক্তিগত গল্প অথচ সেগুলি মণিমুক্তময়। কী ভাবে তৈরি করেছিলেন সুরকার-গীতিকাররা এইসব স্বর্ণযুগের গান? কেমন করে গান রেকর্ড করতেন সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়?

‘অগ্নিপরীক্ষা’ ছবির গান তৈরির গল্প এমনটাই। কালজয়ী গান, ‘কে তুমি আমারে ডাকো’র সুরকার অনুপম ঘটক ও গীতিকার গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার। যখন এই গানটি রেকর্ড করছেন সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, তখন সেখানে বসে শুনছিলেন উত্তমকুমার ও পরিচালক নীরেন লাহিড়ী। কী ভীষণ ভাবাবেগের গান!

উত্তমকুমার এ গানের শ্যুটিংয়ের জন্য সেটে চলে গেলেন। রেকর্ডিং শেষ হতে সন্ধ্যা নিজে যখন গানটা কেমন গাইলেন শুনছেন, তখন নীরেন বাবু সন্ধ্যাকে বললেন, “সন্ধ্যা, তোমার এই গানটা শুনে উত্তমের চোখে জল এসে গিয়েছিল।”

আর গান রেকর্ডিং হয়ে যাওয়ার পরে তো নায়িকার উপর দায়িত্ব বর্তায় গানটাকে নিজের মুখের কথা হিসেবে রুপোলি পর্দায় মেলে ধরা। এখানেই সুচিত্রা সেন পরিপূরক হয়ে উঠেছেন সন্ধ্যার। ‘অগ্নিপরীক্ষা’ রিলিজ হতেই সুপারডুপার হিট। যে ছবি আজকে দেখে নবীন পরিচালকরা বাণিজ্যিক ছবি বানাতে কী কী উপাদান লাগে, তার পাঠ নিতে পারেন।

কয়েক বছর পর তৈরি করার কথা হল উত্তম-সুচিত্রার ‘পথে হল দেরি’। যেটি ছিল প্রথম রঙিন বাংলা ছবি। যদিও সেই প্রিন্ট অনেকাংশেই লুপ্ত। এই ছবির গান নিয়েও ঘটেছিল এক ঐতিহাসিক ঘটনা। অগ্রদূত-এর ছবি, রবীন চট্টোপাধ্যায় সুরকার, গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার লিখলেন গানের কথা। তখন রবীন চট্টোপাধ্যায়ের সুরে সবে সন্ধ্যা ‘পথে হল দেরি’র গান রেকর্ডিং করেছেন। খবর হয়ে গেল, দারুণ ব্যাপার করেছেন গায়িকা। গান তখনও রিলিজ করেনি।

আরও পড়ুন: ডান কানে শুনতে পেতেন না সন্ধ্যা, ১৭ বছরেই কান বিকল, তবু জয় গানের ভুবন

ক’দিন পরে দক্ষিণেশ্বরে মায়ের মন্দিরের কাছে ইস্টার্ন টকিজে সন্ধ্যা গেছেন নচিকেতা ঘোষের সুরে অন্য গান রেকর্ডিং-এ। কাজের পর নচিকেতা ঘোষ সন্ধ্যাকে বললেন চলুন দক্ষিণেশ্বরে মা ভবতারিণীর দর্শন করে আসি। সঙ্গে ছিলেন গীতিকার গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার।

তখন বেশ রাত হয়ে গেছে। তবু যাওয়া হল। মন্দির চত্বর ফাঁকা। মাতৃদর্শনের পর ওঁরা মন্দিরের সিঁড়িতে গিয়ে বসলেন। নচিকেতা ঘোষ সন্ধ্যাকে অনুরোধ করলেন, কোনও একটা নতুন গান শোনানোর জন্য। জ্যোৎস্নার আলোয় গঙ্গার হাওয়ার মধ্যে সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় ধরে নিলেন, ‘এ শুধু গানের দিন এ লগন গান শোনাবার’। গান শেষ হতেই নচিবাবু বলে উঠলেন, “এ গান হিট হতে বাধ্য।”

তাই হল। সন্ধ্যা-সুচিত্রা জুটির সিগনেচার গান হয়ে রইল ‘পথে হল দেরি’র  ‘এ শুধু গানের দিন’। বাংলা ছবিতে প্রথম রঙিন দৃশ্যায়নে সন্ধ্যার গান, গেভ কালারে গান সুপারহিট। সুচিত্রা সেন একুশটা শাড়ি পাল্টেছিলেন এই ছবিতে। সেই শাড়ি সে বার পুজোয় মার্কেটে হিট। আল্টিমেট রোম্যান্টিক গানে স্থান করে নিল ‘এ শুধু গানের দিন।’

আরও পড়ুন: গায়ের রং কালো, সন্ধ্যাকে শুনতে হয়েছিল বহু কটূক্তি, গানের আলো জ্বলল ভুবনজুড়ে

You might also like