Latest News

গায়ের রং কালো, সন্ধ্যাকে শুনতে হয়েছিল বহু কটূক্তি, গানের আলো জ্বলল ভুবনজুড়ে

শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়

আশ্বিনের শারদ সাজে সেজে উঠেছে প্রকৃতি। শিউলি ফুলের গন্ধে পুজোর আমেজ চারিদিকে। ১৯৩১ সালের ৪ অক্টোবর এমনই এক আশ্বিন মাসে দক্ষিণ কলকাতার ঢাকুরিয়ার মুখোপাধ্যায় পরিবারে জন্মগ্রহণ করল এক শ্যামলা কন্যা। নরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় ও হেমপ্রভা দেবীর কোলে এল তাঁদের ষষ্ঠ সন্তান। মেয়ের নাম রাখা হল সন্ধ্যা। কে জানত এই নামই একদিন ভারতীয় সংগীত জগতের প্রবাদ প্রতিম নাম হয়ে যাবে।

এই তো আমার প্রথম ফাগুন বেলা…

সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের গান গেয়েই কত বিবাহযোগ্যা মেয়ে পাত্রপক্ষের সামনে পাশ করে গেছে। ‘জানি না ফুরাবে কবে এই পথ চাওয়া’, ‘কে তুমি আমারে ডাকো’– এই গানগুলি পাত্রপক্ষের সামনে মেয়েরা গাইলেই বিয়ের পাকা কথা সেদিনই হয়ে যেত।

এ কথা শুনলে অনেকেই অবাক হবেন, সন্ধ্যার নিজেরও গানে হাতেখড়ি কতকটা বিয়ের সময় পাত্রপক্ষকে খুশি করতে। গায়ের রং কালো, এ মেয়ের বিয়ে হবে কেমন করে! এই ভেবেই সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় গান শেখার অনুমতি পান বাড়ি থেকে। কারণ সে যুগে শ্যামলা মেয়েরা যদি গান জানত তাহলে তাঁদের ‘দাম’ একটু হলেও বাড়ত ‘বিয়ের বাজারে’।

সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় নিজে বলেছেন একাধিক সাক্ষাৎকারে, “যেসব মেয়ের রং ময়লা হতো, গান জানলে তাদের বিয়ে হবে, এই আশায় বাড়ির লোক তাদের গান শেখাতেন। আমার ক্ষেত্রেও খানিকটা তাই। আমার গায়ের রং কালো। হয়তো সেজন্যই আমার গান শেখার ব্যাপারে দাদাদের সায় ছিল।”বেড়ে ওঠার বয়সে কেউই ‘রূপসী’ বলত না সন্ধ্যাকে। কালো মেয়ের কোনও দামই ছিল না প্রায়। বিয়ের অগ্রাধিকারে একদম পেছনেই ছিলেন সন্ধ্যা। কথা শুনতেও হত গায়ের কালো রংয়ের জন্য। এখন যেন মনে হয়, ভাগ্যিস সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের গায়ের রং কালো ছিল! তাই তো তিনি গান শিখলেন, তাই তো এমন অমূল্য সম্পদ পেল গোটা বিশ্ব!

যেন নতুন করে জন্ম হল মোর, শুধু তোমার ছোঁয়া লেগে…

বিয়ের জন্য শিখলেও, গানটা ভালবেসেই গাইতেন সন্ধ্যা। তাঁদের মুখোপাধ্যায় বংশের আদি পুরুষ রামগতি মুখোপাধ্যায়ের বিরাট মাপের সঙ্গীত সাধক ছিলেন। তাঁর পুত্র সারদাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ও বাবার পথেই  উচ্চাঙ্গসঙ্গীত শিল্পী ছিলেন। সারদাপ্রসাদের নাতি নরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়েরও সুন্দর গানের গলা ছিল। অসাধারণ ভক্তিমূলক গান গাইতেন। নরেন্দ্রনাথই হলেন সন্ধ্যার বাবা। তবে রেলের চাকরির ব্যস্ততা আর সংসার সামলাতে তাঁর গান আড়ালেই চলে যায়।

সন্ধ্যার মা হেমপ্রভা দেবীও দুর্দান্ত টপ্পা গাইতেন। এত ভাল সুর খেলত তাঁর কণ্ঠে, যা তুলনাতীত। এ হেন রক্তের উত্তরাধিকারিণী সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় যে গানের সরস্বতী হবেন, সে তো বলার অপেক্ষা রাখে না। তবে রক্তের গুণই সব নয়, দরকার সঠিক সাধনাও। সে সাধনা সন্ধ্যা শিশু বয়স থেকে নবতিপর বয়সেও একই ভাবে চালিয়ে গেছেন সন্ধ্যা। তাঁর কণ্ঠে শেষলগ্নেও জরা স্পর্শ করেনি এতটুকু।

ম্যাট্রিক অবধি পড়েছিলেন সন্ধ্যা, ঢাকুরিয়া বিনোদিনী গার্লস হাইস্কুলে। তার পরে উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের পরিমণ্ডলেই সন্ধ্যার মেয়েবেলা কেটেছিল। প্রথমেই বলতে হয় সন্ধ্যার বড়দা রবীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়ের কথা। যিনি সন্ধ্যার গানে আগ্রহ দেখে বোনকে উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের শ্রেষ্ঠ গুরুদের কাছে নিয়ে যান।

সন্ধ্যার প্রথম শিক্ষাগুরু আচার্য যামিনী গঙ্গোপাধ্যায়। দীর্ঘ ছ’বছর তাঁর কাছে তালিম নেন সন্ধ্যা। এর পর অল্প কিছুদিন পণ্ডিত চিন্ময় লাহিড়ির ছাত্রী ছিলেন সন্ধ্যা। একদিন সন্ধ্যা তাঁর বড়দা রবীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়ের কাছে বড়ে গোলাম আলি খাঁ সাহেবের কাছে গান শেখার ইচ্ছা প্রকাশ করেন।গ্রামাফোনে খাঁ সাহেবের গান শুনে নাবালিকা সন্ধ্যার কানে খেলত শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের সুরমাধুরী।

আরও পড়ুন: দক্ষিণেশ্বর মন্দিরের সিঁড়িতে বসে সন্ধ্যা গাইলেন, এ শুধু গানের দিন…

সেসময় বড়ে গোলাম আলি খাঁ কলকাতায় এলে পরম সংগীতজ্ঞ জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষের ডিকসন লেনের বাড়িতে উঠতেন। সেখানেই বাংলার ছাত্রছাত্রীদের তালিমও দিতেন তিনি। মীরা বন্দ্যোপাধ্যায় (চট্টোপাধ্যায়) ইতিমধ্যেই তাঁর শিষ্যা হয়েছিলেন। সন্ধ্যার বড়দা তাই সোজা চলে গেলেন জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষের বাড়িতে। খুব শীঘ্রই জ্ঞানপ্রকাশ বাবু সন্ধ্যার বড়দাকে জানালেন, খাঁ সাহেব সন্ধ্যাকে তাঁর শিষ্যা করতে সম্মত হয়েছেন।একদম প্রথাগত ভাবেই সন্ধ্যা দীক্ষা নিলেন খাঁ সাহেবের কাছে। ১৯৪৯ সালের এক শীতের সকালের পুণ্য দিনে সমস্ত উপচার সাজিয়ে সন্ধ্যা হাজির হলেন ডিকসন লেনের বাড়িতে। এই প্রথম গ্রামাফোনে শোনা খাঁ সাহেবকে চাক্ষুষ করলেন সন্ধ্যা। সুরমণ্ডল বাজাচ্ছেন খাঁ সাহেব। এরপর বিরাট এক গোল ট্রে-তে নানাবিধ উপকরণ থেকে মোটা লাল সুতো তুলে নিয়ে খাঁ সাহেব বেঁধে দিলেন সন্ধ্যার হাতে। শিষ্যার মুখে দিলেন একটু ছোলা আর গুড়। গান্ডা বাঁধা হল। গুরু-শিষ্যা বাঁধা পড়লেন এক সাঙ্গীতিক বন্ধনে। পিতৃসম গুরুকে সন্ধ্যা ‘বাবা’ বলে ডাকলেন, আর মাতৃসমা গুরুপত্নীকে ‘মা’।

মুখোপাধ্যায় পরিবারের ব্রাহ্মণ কন্যা এক মুসলিম সঙ্গীত সাধককে ‘বাবা’ ডাকলেন। কারণ ধর্ম,বর্ণ সবার উপরে সঙ্গীত সাধনাই বড়। অত বড় দেবতাসম সঙ্গীতসাধকের চরণাশ্রয়া হতে পেরেই সন্ধ্যার জীবন সার্থক। আনুষ্ঠানিক ভাবে খাঁ সাহেবের শিষ্যা হলেন সন্ধ্যা।

বাবা খাঁ সাহেব এবার গান গাইতে বললেন সন্ধ্যাকে। অভয় দিলেন জ্ঞানপ্রকাশ ও গুরু স্বয়ং। সন্ধ্যা গাইলেন জৌনপুরী রাগ। কিছুক্ষণ শোনার পর গুরু সেটিই শেখাতে লাগলেন। শুরু হল কঠিনতর সঙ্গীত শিক্ষা। পাতিয়ালা ঘরানার স্বরক্ষেপন রপ্ত করতে গুরু শিষ্যাকে বলেছিলেন, “এক ভাগ শিখনা তো তিন ভাগ সুননা।” কথাটা কী ভীষণ সত্যি! যা খুব লোকই মানেন। অথচ সে যুগে কী কঠিন সাধনার ভিতর দিয়ে গেছিলেন সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, মাত্র দশ বছর বয়সে! কোনও দিন নাম, খ্যাতি, টাকার পেছনে ছোটেননি, শুধু নিজমনে সঙ্গীত সাধনা করে গেছেন।

তুঁহুঁ মম মন প্রাণ হে, তব মধুপের প্রেম কুসুমে আমার খুজেঁ পাই…

গায়ের রং কালো, রূপেও কোন আকর্ষণ ক্ষমতা নেই, বিয়ের পাত্রী হিসেবে একেবারেই অচল… এমন কথা শুনতে হত যে মেয়েকে, সেই মেয়েই গানকে তাঁর জীবনমন্ত্র বেছে নিলেন। ‘অল বেঙ্গল মিউজিক কম্পিটিশন’-এ সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় সব ধারার সঙ্গীতে প্রথম স্থান অধিকার করলেন। শুধু রবীন্দ্রসঙ্গীতে থার্ড। ছেলে, মেয়ে প্রতিযোগীদের সবার মধ্যে বেস্ট ট্রফি জিতলেন সন্ধ্যা।

পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে অনুরূপা দেবী প্রাইজ দিচ্ছিলেন। বিজয়ী হওয়ার শিল্ড আর সন্ধ্যার রোগা চেহারা দেখে উনি তো ভেবেই অস্থির। বললেন “অতটুকু মেয়ে অত বড় শিল্ড ধরবে কী করে?” সত্যি, বারো বছরের মেয়ের পক্ষে বিশাল শিল্ড। তখন চার জন ভলান্টিয়ার-সহ অনুরূপা দেবী সেই শিল্ড ধরে সন্ধ্যাকে দিলেন। সন্ধ্যা তাঁদের সঙ্গেই শিল্ডটা একটু ছুঁয়ে দিলেন। শ্রোতারা তো মেয়ের গান শুনে তাজ্জব! এ কোন আশ্চর্য কন্যা যে সঙ্গীতের সব ধারার গানে প্রথম!আর এই পুরস্কার লাভ থেকেই খুলে গেল সন্ধ্যার ভাগ্য। রাইচাঁদ বড়ালের কানে এ ঘটনা পৌঁছল। রাইচাঁদ বড়াল বললেন “একটা বাচ্চা মেয়ে এতগুলো প্রাইজ নিয়ে গেল! একদিন ওকে এনে দেখাও।” নিউ থিয়েটার্স স্টুডিওতে রাইবাবুর সঙ্গে দেখা করলেন সন্ধ্যা। সেখানেই উপস্থিত ছিলেন পঙ্কজ কুমার মল্লিক, আলি হোসেন খাঁ সাহেব,সৃজিতনাথ প্রমুখ।

সেই তারকা আড্ডায় গান শোনালেন সন্ধ্যা। গাইলেন খেয়াল, ঠুংরি, ভজন। সবাই মুগ্ধ। ওঁদের সন্ধ্যার গান শুনে এত ভাল লাগল যে সঙ্গেসঙ্গে ‘অঞ্জনগড়’ ছবিতে প্লেব্যাক করার সুযোগ করে দিলেন। ‘অঞ্জনগড়’ ছবিতেই সন্ধ্যার প্রথম প্লে ব্যাক, যার পরিচালক স্বনামধন্য বিমল রায়। শৈলেন রায়ের কথায় ও রাইচাঁদ বড়ালের সুরে ‘গুন গুন গুন মোর গান’। এই ছবি বাংলা ও হিন্দি দু’টো ভাষাতেই তৈরি হয়েছিল। সন্ধ্যাও বাংলা আর হিন্দি– দুই ভাষাতেই গেয়েছিলেন।

প্রথম বেসিক রেকর্ড ১৯৪৫ সালে। গীতিকার ও সুরকার দুই-ই গিরীন চক্রবর্তী। এর পর সঙ্গীত পরিচালক রবীন চট্টোপাধ্যায় সন্ধ্যাকে গাওয়ালেন ‘সমাপিকা’ ছবিতে।সে ছবিতে সন্ধ্যার গান গাওয়ার সময়ে ছবির স্টার নায়িকা সুনন্দা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছিলেন, “তোমরা এটা কী করছ? চোদ্দ-পনেরো বছরের একটা ইমম্যাচিওর্ড মেয়েকে দিয়ে আমার লিপে গান গাওয়াচ্ছো! আমার গলায় মিলবে কী করে?”

সন্ধ্যার গান শোনার পরে অবশ্য সুনন্দা মন্ত্রমুগ্ধ।

নিউ থিয়েটার্স কোম্পানি বন্ধ না হওয়া অবধি নিয়মিত প্লে ব্যাক সিঙ্গার ছিলেন সন্ধ্যা।
লঘু সঙ্গীত আর উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত একই সাথে সমান তালে চালিয়ে যাওয়ার বিরল দক্ষতা তাঁর মতো শিল্পীর পক্ষেই সম্ভব ছিল।

আরও পড়ুন: ডান কানে শুনতে পেতেন না সন্ধ্যা, ১৭ বছরেই কান বিকল, তবু জয় গানের ভুবন

পনেরোয় পা দিতেই ‘গীতশ্রী’ পরীক্ষার প্রথম পুরস্কারটি তাঁর ঝুলিতে। সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের ‘গীতশ্রী’ পরীক্ষার বিচারক ছিলেন আলাউদ্দিন খাঁ সাহেব, রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর,দবীর খাঁ সাহেব। ‘গীতশ্রী’ পরীক্ষায় সন্ধ্যার ধ্রুপদ, খেয়াল, ঠুংরী শুনে আলাউদ্দিন খাঁ আদর করে সন্ধ্যাকে ‘মা’ বলে ডেকেছিলেন। সেসব দিনের স্মৃতি অমূল্য রতনের মতো নিভৃত সঞ্চয় হয়েছিল সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের মনে।

আধুনিক গান, ফিল্মি প্লেব্যাক, বলিউড থেকে টলিউড কিংবা ভজন, খেয়াল, গজল– সব ধারার গানেই তিনি প্রথমা। তবে যখন উচ্চাঙ্গসংগীতের আসরে গাওয়ার থাকত, তার আগে অন্তত পনেরো দিন কোনও লঘুসঙ্গীত গাইতেন না তিনি। এতটাই ছিল তাঁর নিষ্ঠা।

মন যেন গুনগুন করে গো, মন হারানোর এই খেলাতে…

সুচিত্রা-সন্ধ্যা যুগের শুরু ‘অগ্নিপরীক্ষা’ ছবি দিয়ে। যে যুগান্তকারী মিউজিকাল হিট ছবি মেনস্ট্রিম ছবির ভাষাই বদলে দিয়েছিল। আধুনিকতার ছোঁয়া প্রথম লাগল বাণিজ্যিক ছবিতে। যে ছবির যুগের পর যুগ  দর্শক ফুরোবে না। জন্ম হল উত্তম-সুচিত্রা জুটির। লেজেন্ডারি সুরকার অনুপম ঘটকের হাত ধরেই এই জুটির জন্ম।

‘অগ্নিপরীক্ষা’য় ‘গানে মোর কোন ইন্দ্রধনু’ গানটা অনুপম ঘটককে বাদ দিতে বলেছিলেন পরিচালক বিভূতি লাহা। ওই গান নাকি চলবে না। ছবি ফ্লপ হবে। অনুপম ঘটক হাত জোড় করে বলেছিলেন বিভূতি লাহাকে, গানটা রাখতে দিন। যদি তৈরি হওয়ার পরে খারাপ লাগে, তখন না হয় বাদ দেবেন।  তারপরেরটুকু তো ইতিহাস।

এরপর শুরু হল সুচিত্রা সেনের লিপে সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠ যুগ। একের পর এক সুপারহিট ছবি। কোনও নায়িকার লিপে কোনও গায়িকার এত গান কয়েক দশক ধরে হিট, যা আগে ও পরে কখনও ঘটেনি। ‘সাগরিকা’, ‘একটি রাত’, ‘পথে হল দেরি’, ‘বিপাশা’, ‘দেবী চৌধুরাণী’, ‘স্মৃতিটুকু থাক’– অজস্র কালজয়ী হিট, অজস্র কালজয়ী গান। সন্ধ্যার কণ্ঠই যেন হয়ে গেল সুচিত্রা-কণ্ঠ। ‘সপ্তপদী’ ছবিতে ‘এই পথ যদি না শেষ হয়’ গানে সন্ধ্যা গাইলেন ‘তুমিই বলো’। দর্শক ভেবে বসল সুচিত্রা নিজকণ্ঠেই বলেছেন এই আইকনিক কথা।

সন্ধ্যারানি, সুপ্রিয়া দেবী, সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়, অঞ্জনা ভৌমিক, লিলি চক্রবর্তী, অপর্ণা সেন, মহুয়া রায়চৌধুরী, দেবশ্রী রায়– সব নায়িকার লিপেই গেয়েছেন সন্ধ্যা। যেমন একসময় অঞ্জনা ভৌমিক নায়িকার দৌড়ে পিছিয়েই ছিলেন। কিন্তু ‘নায়িকা সংবাদ’ ছবিতে সন্ধ্যা যেই গাইলেন অঞ্জনার লিপে ‘কেন এ হৃদয় চঞ্চল হল’ বা ‘কী মিষ্টি দেখো মিষ্টি’ গান, ওমনি অঞ্জনা প্রথম সারির নায়িকা হয়ে গেলেন। গানদুটিও রেকর্ড হিট। ‘জয় জয়ন্তী’ ও ‘নিশিপদ্ম’ ছবিতে প্লেব্যাকের জন্য সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় জাতীয় পুরস্কারও পান।

কিন্তু সন্ধ্যা কণ্ঠ যেন প্লেব্যাকে সুচিত্রার লিপেই আল্টিমেট হয়ে রইল। সুচিত্রার লিপে ‘সন্ধ্যা দীপের শিখা’ ছবিতে রবীন্দ্রসঙ্গীত ‘ক্ষণে ক্ষণে মনে মনে’ গেয়ে সন্ধ্যা বিএফজেএ পুরস্কারে শ্রেষ্ঠ প্লে ব্যাক গায়িকার পুরস্কার পান।

সন্ধ্যা শুধু বাংলার নয়…

আধুনিক বাংলা গানেও সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের অবদান অনস্বীকার্য। সলিল চৌধুরী, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, সতীনাথ মুখোপাধ্যায়, অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়, কবির সুমনের সুরেও গান গেয়েছেন সন্ধ্যা।

শচীনদেব বর্মন তাঁর ছবিতে গান গাওয়ানোর জন্য সন্ধ্যাকে বম্বে নিয়ে যান। কিন্তু কী অদ্ভুত ব্যাপার, সুরকার অনিল বিশ্বাসের সুরে ‘তারানা’ ছবিতে প্রথম গাইলেন সন্ধ্যা। লতা মঙ্গেশকর আর সন্ধ্যা ডুয়েট— ‘বোল পাপিহে বোল রে/ বোল পাপিহে বোল/ হ্যায় কোন মেরা চিতচোর।’ সেই শুরু লতার সঙ্গে সন্ধ্যার বন্ধুত্ব। বলিউডে শচীন দেব বর্মণ, মদনমোহন, সলিল চৌধুরী, রোশনের সুরে প্লে ব্যাক করেছেন সন্ধ্যা।

তবে বলিউডে কেরিয়ার গড়ার মোহ সন্ধ্যার কোনও দিনই খুব একটা ছিল না। নামের পেছনে ছোটেননি। বাংলাকে ভালবেসে বাংলাতেই আজীবন রয়ে গেছেন। যদিও বিভিন্ন প্রদেশের ভাষায় গান গেয়েছেন তিনি। প্রত্যেক বছর বিভিন্ন রাজ্যের রেডিও কনসার্টে ভজন, গীত, ঠুংরি, গজল, ক্লাসিকাল– সব স্তরে গেয়েছেন। এগুলো তখন আকাশবাণী সম্প্রচার করত। বাংলা, হিন্দি ছাড়াও ওড়িয়া-সহ বহু ফিল্মে সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় গান গেয়েছেন। ওড়িয়া ছবিতে প্লেব্যাক করে তিনি একবার রাষ্ট্রপতি পুরস্কারও পেয়েছিলেন। তার পরে অসমিয়া, গুজরাটি, পাঞ্জাবি, এমনকি জম্মু-কাশ্মীরের ডোগরি ভাষাতেও গান গেয়েছেন। গান গেয়েছেন আফগানিস্তানের পশতু ভাষাতেও। এসব হয়তো সবাই জানেই না! সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের প্রতিভা শুধু বাংলা গানে সীমাবদ্ধ নয়, শুধু যে লঘু সঙ্গীত, তাও নয়।

আমি তোমারে ভালোবেসেছি, চিরসাথী হয়ে এসেছি…

সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় যে এত ধারার গান গেয়ে যেতে পেরেছিলেন তার পেছনে ছিল তাঁর নিজের অধ্যবসায় এবং স্বামীর সাহচর্যও। সন্ধ্যার বেশিরভাগ আধুনিক গান ও ফিল্মি গান লিখেছেন স্বামী শ্যামল গুপ্ত। তিনি বিখ্যাত গীতিকার হয়েও নিজেকে আড়ালেই রাখতেন। সন্ধ্যা গান গাইতে বেরিয়ে গেলে শ্যামলই সংসার আর একমাত্র মেয়েকে সামলেছেন।

বস্তুত, কোনও স্ত্রীর পক্ষেই স্বামীর সাহচর্য ছাড়া দীর্ঘ দশক সংসার বাঁচিয়ে গেয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। সন্ধ্যাকে ভালবেসেই বিয়ে করেন শ্যামল। সন্ধ্যার গায়ের কালো রং তাঁদের প্রেমের বিয়েতে কারণ হয়ে দাঁড়ায়নি। এত বড় শিল্পীর গায়ের রং নিয়ে আজ কোনও কথা বলাই হয়তো জরুরি নয়, কিন্তু এ সমাজে এ কথা মনে রাখা জরুরি, যে সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের মতো প্রতিভাকেও মেয়েবেলায় এই শ্যামলা রঙ নিয়ে কম জ্বলতে হয়নি। কিন্তু যোগ্য জীবনসঙ্গীকে ভগবান সন্ধ্যার জন্য ঠিক করে রেখেছিলেন। সন্ধ্যাকে সবসময়ই প্রেরণা জুগিয়েছেন শ্যামল।প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায়, আলপনা বন্দ্যোপাধ্যায়, আরতি মুখোপাধ্যায়– এমন বহু শিল্পীরই সঙ্গীত কেরিয়ার শেষ হয়ে গেছে বিয়ের পর। কিন্তু সন্ধ্যার জীবনে সেই আঁচ পড়তে দেননি শ্যামলবাবু। শ্যামল-সন্ধ্যা গান ও সংসার দুইই টিকিয়ে মেয়েকে লেডি ব্রেবোর্ন কলেজ পর্যন্তও পৌঁছে দিয়েছেন। সৌমি দীর্ঘকাল সাউথ পয়েন্ট স্কুলের শিক্ষিকা। জামাই সিদ্ধার্থ সেনগুপ্ত। এক নাতি রাহুল।

অনেকেই ভাবেন, গানের জগতে কেন এলেন না সন্ধ্যার মেয়ে সৌমি? সন্ধ্যাকন্যা গান জানেন। একবার মায়ের সঙ্গে ‘তুমি আমার মা’ ডুয়েট গেয়েছিলেন মঞ্চে। সেই সঙ্গীত আসর ইতিহাস। যে গান শ্রাবন্তী মজুমদার ও সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় ডুয়েটে অমর মা-মেয়ের গান।

আসছে শতাব্দীতে আসব ফিরে তোমার খবর নিতে…

নব্বই দশক থেকে সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় নিজেকে অন্তরালে সরিয়ে নেন। পাবলিক ফাংশন একেবারেই বন্ধ করে দেন। কিন্তু কখনও ছাড়েননি সঙ্গীত সাধনা ও চর্চা। রোজ ভোর সাড়ে পাঁচটায় উঠে তানপুরা নিয়ে তিনি গলা সাধতে বসতেনই।

সন্ধ্যা বলতেন, ‘আমি হাঁটতে, চলতে, ফিরতে, শুতে, রাঁধতে, বসতে সবসময়ই গান গাই, তাতে প্র্যাকটিসটাও হয়ে যায়।’  শ্রীরামকৃষ্ণ ও সারদামণির ভক্ত সন্ধ্যা ঠিক তাঁর সবচেয়ে জনপ্রিয় নায়িকা সুচিত্রা সেনের মতোই। প্রতি জন্মাষ্টমীতে গোপাল পুজোর আয়োজন করতেন সন্ধ্যা। বাড়ির ছাদে শ্যামল-সন্ধ্যা যত্নে বানিয়েছিলেন ফুলের বাগান। ফুলের চর্চা ঠিক গানের চর্চার মতোই ভালবেসে করতেন সন্ধ্যা।

নব্বই দশকের শেষে সুমন চট্টোপাধ্যায় ওরফে কবীর সুমনের সুরে আবার গান গাইলেন সন্ধ্যা। গান সুপারহিট। ‘আসছে শতাব্দীতে, আসব ফিরে তোমার খবর নিতে’। জীবনমুখী গানেও নতুন পালক যোগ করলেন সন্ধ্যা।

২০০৩ সালে শেষ বেসিক অ্যালবামে গাইলেন সন্ধ্যা। জটিলেশ্বর মুখোপাধ্যায়, মৃণাল বন্দ্যোপাধ্যায়, সুমন চট্টোপাধ্যায় এবং স্বপন বসুর সুরে আটখানা আধুনিক গান রেকর্ড করলেন। ছ’খানা গান লিখেছিলেন স্বামী শ্যামল গুপ্ত। বাকি দুটো সুমন নিজেই। শেষ যে গান সন্ধ্যা জটিলেশ্বরের সুরে রেকর্ডিং করলেন সে গান আজও সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের অমর অশেষ গান, ‘চারিদিকে শুধু দারুণ শব্দ পৃথিবী চলেছে পুড়ে, ভয় পেয়ে সেই সাদা পায়রাটা গিয়েছে আমার উড়ে…।’ ততদিনে বাইরে আর কোথাও অনুষ্ঠান করেন না তিনি। অবসরপ্রাপ্তা হিসেবে নিজেকে লাইমলাইট থেকে সরিয়ে নিয়েছেন।

কিন্তু ২০০৮-এ ঘটল যুগান্তকারী ঘটনা। সায়েন্স সিটি অডিটোরিয়ামে মান্না দে আর সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় লাইভ গাইবেন। শ্রীকান্ত আচার্য, সতীনাথ মুখোপাধ্যায়-সহ কিছু শিল্পীর বহু অনুরোধে পাবলিক প্রোগামে লাইভ গাইতে রাজি হয়েছিলেন সন্ধ্যা। মান্না-সন্ধ্যা ডুয়েটে ভেসে গেল সেদিনের সুরের আসর। বিশেষ করে ‘মায়াবতী মেঘে এল তন্দ্রা’ গানে তবলার সঙ্গে যে ভাবে বোল তুললেন সন্ধ্যা, মন্ত্রমুগ্ধ করে দিল দর্শকদের। ৭৫ পেরোনো গায়িকার এমন কুহকিনী কণ্ঠ!

২০১০ সালে ক্যান্সারে প্রয়াত হন সন্ধ্যার স্বামী, গীতিকার শ্যামল গুপ্ত। জীবনের একটি চাবি হারিয়ে ফেললেন সন্ধ্যা। গানেই খুঁজে পেলেন আবারও আশ্রয়। এর পরে ২০১৩ সালে মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুরোধে বাংলা সংগীতমেলার উদ্বোধনে গঙ্গাস্তোত্র সহ দু-তিনটে গানের কলি শেষ লাইভ গেয়েছিলেন সন্ধ্যা।

একজন কিংবদন্তী স্টার সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় সারাজীবন বিনয়ী মাটির মানুষ হয়ে থেকেছেন। স্টারসুলভ আত্মঅহমিকা প্রকাশ আজীবন ঘৃণা করতেন। তাই নবতিপর সাধিকা বলতে পারতেন “আমি গায়িকা নই, আজও নিজেকে আমি সংগীতের একজন ছাত্রী বলেই মনে করি। গানের কত কিছু যে শেখা বাকি রয়ে গেল।” তাই সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় কখনও গান শেখাননি স্কুল খুলে।

১৫ ফ্রেব্রুয়ারি ২০২২। নিভল সন্ধ্যাদীপের শিখা। সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের দেহাবসান এক ইন্দ্রপতন। একটা প্রতিষ্ঠান শেষ হয়ে গেল। লতা, আশা-কণ্ঠী শিল্পী যত হয়, সন্ধ্যাকণ্ঠী শিল্পী কিন্তু বেশ বিরল। সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় বেঁচে থাকবেন তাঁর কণ্ঠভরা গানেই। সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় যেন তাঁর গানে গানে বলে গেলেন এই জন্মের সার্থক জীবনের কথাটি…

‘আর জনমে হয় যেন গো
তোমায় ফিরে পাওয়া
যেন শত জনম জেগে থাকে
এই জন্মের চাওয়া…..’

You might also like