Latest News

দ্বিজেনদা পদ্মভূষণ আর সন্ধ্যাদি পদ্মশ্রী! দ্বিজেনদা কি বেশি বড় শিল্পী! বিস্ফোরক আরতি

শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়

ঠাকুরঘরে সন্ধ্যাবেলা মঙ্গল আরতি যেমন চারিদিক পবিত্র করে তোলে, ঠিক তেমনই বাংলা গানে সন্ধ্যা-আরতি জুটির মুগ্ধতা। সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় ও আরতি মুখোপাধ্যায় (Sandhya Mukherjee and Arati Mukherjee)। একই পদবী হলেও তাঁরা রক্তের সম্পর্কে আত্মীয়া নন। তবে সঙ্গীতের সম্পর্ক তাঁদের। যা আত্মীয়ের থেকেও অনেক বড়। বাংলা গানের দুই কিংবদন্তী গায়িকা। বাংলা ছবি যাদের প্লেব্যাকে ঋদ্ধ। দুজন দুজনের বোন আর দিদি। কখনও বা তাঁরা মা মেয়ে।

সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের স্মৃতিচারণায় অকপট আরতি মুখোপাধ্যায়। এ শুধু স্মৃতিচারণা নয়। আরতি শুধু শোকাহত নন, স্পষ্ট জবাবে প্রতিবাদী আরতি। বিচার চাইলেন আরতি।

বাংলার কোহিনুর, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের প্রয়াণ তো আপনার দিদিকে হারানো। তবু কিছু যদি বলেন এই ঐতিহাসিক দিনে?

সন্ধ্যাদি শেষ পুরস্কারের অপমানটা আর নিতে পারলেন না। আমি তো খুব কষ্ট পেয়েছি সন্ধ্যাদিকে এই শেষ বয়সে একটা পদ্মশ্রী ছুড়ে দেওয়াতে। স্মৃতিচারণা করার আগে আমার খুব রাগ হচ্ছে এই সরকারের উপর। ‘কোহিনুর’ সন্ধ্যাদি কী তাঁর কাজের সঠিক মূল্য পেলেন?

তবু পুরনো দিনের কথা তো মনে আসেই। মুম্বই থেকে কলকাতা গেলে সন্ধ্যাদির বাড়ি যেতাম। কলকাতা যাওয়া, সন্ধ্যাদির বাড়ি যাওয়া এগুলো আমার বাপের বাড়ি যাবার মতো। সন্ধ্যাদির বাড়ি ভীষণ পরিষ্কার। ঠাকুরঘরে গেলে মনটা পবিত্র হয়ে যেত। সন্ধ্যাদির বর শ্যামলদার লেখা কথাতেও আমি গান গেয়েছি। ‘জয় জয়ন্তী’ ছবির কথা মনে পড়ছে। রাশভারী মানুষ হলেও খুব ভালো মনের ছিলেন। শেষবার সন্ধ্যাদির বাড়ি গিয়েছিলাম মিষ্টি-ফুল হাতে নিয়ে। ফুল খুব ভালবাসতেন সন্ধ্যাদি। তার পর আর দেখা হয়নি। ফোনে নিয়মিত কথা হত আমাদের।

মনে পড়ছে, একবার আমি সপরিবারে কুন্নুর বেড়াতে গিয়েছি। সকলে সকালবেলা মন্দির দর্শনে গিয়েছে। আমি যাইনি। রেওয়াজ করছি। হঠাৎ সন্ধ্যাদির ফোন, ‘কী করছিস?’ বললাম কুন্নুর আসার কথা। সবাই মন্দির গিয়েছে, আমি রেওয়াজ করছি। শুনে সন্ধ্যাদি বললেন, ‘কী রেওয়াজ শুনি?’ বললাম, ‘রাগেশ্বরী রাগ’। গেয়ে শোনালাম। উনিও একটা শোনালেন। তারপর বললেন, ‘যা, মন্দির ঘুরে আয়।’একদম মায়ের মতো! সন্ধ্যাদি সবসময়  মাফলার ব্যবহার করতেন। আমি ফোনে একটু কাশছি শুনলেই সন্ধ্যাদি গলা ভাল রাখার সব টোটকা বলতেন।

লতা মঙ্গেশকরের সঙ্গে সন্ধ্যা মুখার্জি

আপনারা একসঙ্গে গান করেছেন তো বেশ কিছু?

অনেক ছবিতেই আমরা একসঙ্গে কাজ করেছি। ‘সুজাতা’ ছবিতে আমাদের একটা ডুয়েট ছিল নচিকেতা ঘোষের সুরে। ‘যদি চাঁদ আর সূর্য একই সাথে ওঠে।’ আমি অপর্ণা সেনের লিপে, সন্ধ্যাদি সুমিত্রা মুখোপাধ্যায়ের লিপে। ঐ ছবিটা আজকাল আর পাই না। সে সময় সুপারহিট করেছিল। ‘হংসরাজ’ ছবিতে আমার সব গান হিট থাকলেও, সন্ধ্যাদির সঙ্গে ছিল একটা ডুয়েট। শশীমুখী আর হংসরাজের তর্জার লড়াই। ‘নমো মাতা সরস্বতী’। তরুণ মজুমদারের ‘ফুলেশ্বরী’তে গেয়েছিলাম আমি আর সন্ধ্যদি ‘হায় হায় হায় কী হবে উপায়, কলি কালে রাধা আবার বৃন্দাবনে যায়’। হেমন্তদার সুর ছিল।

সন্ধ্যাদি শুধু আমার দিদি নয়, মা। আমরা যখন জন্মাইনি তখন থেকে উনি গান করছেন। আমাদের মায়েরা গান করতেন সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, উৎপলা সেনদের সঙ্গে। তখন তাঁরা আস্তে আস্তে বড় হয়ে উঠছেন। উৎপলা সেন যতদিন বেঁচে ছিলেন ওঁর সঙ্গেও আমার খুব ভাল সম্পর্ক ছিল। সেইসব দিন আর এইসব দিন, ভাবলে আমার মনে হয় দুনিয়াটা এ কী হল! সন্ধ্যাদিকে এই বয়সে এসে পুরস্কার দেওয়া নিয়ে যা নাটক হল, আমার এত কষ্ট লেগেছে। এসব পুরস্কার দেয় কেন! যেখানে কোনও সঠিক বিচার নেই, সেখানে এই নাটক, এই প্রহসনের দরকারটা কী!আপনিও নিজেও তো আপনার গুণের কদর পাননি। সঠিক পুরস্কার, সম্মান পাননি?

নাহ, আমি আমার জন্য বলছি না। মুম্বই বসেই দেখছি কলকাতায় কী নাটক চলছে! সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়কে একটা পদ্মশ্রী দিচ্ছে! ছিঃ ছিঃ ছিঃ। ন্যূনতম একটা পদ্মবিভূষণ দাও তাঁকে!

দাদাসাহেব ফালকেও তো দেয়নি সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়কে?

না, সেটাও দেয়নি। সংগীত-নাটক অ্যাকাডেমি পুরস্কারও কি সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় ডির্জাভ করেন না? হৈমন্তী শুক্লা কী এমন ক্লাসিক্যাল গান গাইল যে তাঁকে ‘সংগীত নাটক অ্যাকাডেমি’ দিয়ে দিল! হৈমন্তীকে কী করে দেয়? ভারতবর্ষের ক’টা লোক ওকে চেনে? আমি বা সন্ধ্যাদি যেভাবে একের পর এক বাংলা ছবিতে নায়িকাদের লিপে প্লে ব্যাক করেছি, হৈমন্তী শুক্লার সে লেভেলে কটা গান হিট বলুন তো! সন্ধ্যাদিকে সংগীত নাটক অ্যাকাডেমি দেওয়ার কথা মনে পড়ল না হৈমন্তীর আগে!

আমার হিটের নিরিখেও কি হৈমন্তী শুক্লা আসেন? আমি ওঁর মতো প্রচারে থাকি না তাই পুরস্কার পাব না। চাইও না। সন্ধ্যাদিও তাই পাননি। আজকাল নিজের প্রচার নিজেকে করতে হবে যা যুগ পড়েছে।

সন্ধ্যাদি একজন স্টার শিল্পী, যেমন ছিলেন হেমন্তদা। তাঁর সঙ্গে বাকিদের এক আসনে বসাবে! দ্বিজেন মুখার্জী কি সন্ধ্যা মুখার্জীর থেকেও বড় শিল্পী? উনি যা পুরস্কার অর্থ পেয়েছেন কয়েক বছরের মধ্যে, অন্য কোনও শিল্পী পাননি। এসব নিয়ে একটা কথাও কোথাও লেখা হয়েছে? আমি এমনি এমনি প্রতিবাদ করছি না। জাস্টিস চাইছি।

হেমন্ত, সন্ধ্যা, আরতি

দ্বিজেন মুখোপাধ্যায়কে নিয়ে আপনার কী বক্তব্য?

দ্বিজেনদা যা গাইতেন, উনি ওঁর মতো গেয়েছেন। তাঁর শিল্পীসত্তা নিয়ে আমার কিছু বলার নেই। কিন্তু সন্ধ্যাদি কি তাঁর থেকে ছোট শিল্পী? এটা আমার প্রশ্ন। এই এতদিনে সন্ধ্যাদি প্রচারে। অনেকেই শুনে অবাক হচ্ছেন। আমি তাঁদের বলছি, আপনারা জানেন না দ্বিজেনদা পুরস্কার-সহ কত টাকা পেয়েছেন। সেখানে সন্ধ্যাদি ক’টাকা পেয়েছেন! সন্ধ্যাদি একজন স্টার। তখনও, এখনও। দ্বিজেন, হৈমন্তীরা কি স্টার?

দ্বিজেন মুখোপাধ্যায়কে যখন পদ্মভূষণ দিয়েছে তখনই বুঝলাম এই সরকারের যা হওয়ার হয়ে গেছে। আমি কি সাধে চেঁচাচ্ছি! এক বছরে ২৩ লাখ টাকার পুরস্কার দিয়েছে দ্বিজেন মুখোপাধ্যায়কে। বম্বে বসে সব খবরই পাই।

সংগীত নাটক অ্যাকাডেমিও উনি পেয়েছেন। এদিকে সন্ধ্যাদি পদ্মশ্রী। কে বড় শিল্পী, কার কত গান, সেটা ইতিহাসে লেখা আছে। যাকে দিচ্ছেন তাঁর কাজটা দেখে পুরস্কার দিন। যেমন বাংলায় তেমন রাষ্ট্রে, সব বড় বড় লোক বসে আছে। যে শিল্পীরা স্টেজে স্টেজে সব জড়ো হচ্ছে তারাই সব পুরস্কার পাচ্ছেন। ওই কটি লোককে নিয়েই ঘুরছে। যে যা কর্ম করেছে, সঙ্গীত জগতে তার পরিবর্তে সেই মাপের পুরস্কার দিক! সেসব জানেও না, দেখেও না।

আপনিও তো এসব পুরস্কার পাবার যোগ্য? আরতি মুখোপাধ্যায় কি আর দুটো হবে?

আমি চাই না এসব পুরস্কার। এসব নাটক, এসব প্রহসন। অনেকেই বলছেন, আরতি মুখার্জী তো আজকাল গান করেন না। আমি যা গান গেয়েছি গেয়ে দেখাক না! ওই মাপের হিট করে দেখাক? এত শিল্পী তো আছেন! অলকা, ঊষা, অনুরাধা– আমার একটা গান গেয়ে দেখাক! আমাকে বা আশা ভোঁসলেকে দিয়ে যে ধরনের গান বাংলায় বা হিন্দিতে করানো হয়েছে সেগুলো এঁরা গেয়ে দেখাক। অলকা ইয়াগনিক আর সন্ধ্যা মুখার্জি এক হয়ে গেল? ঊষা উত্থুপ আর সন্ধ্যা মুখার্জি এক হয়ে গেল? আমার বক্তব্য এটাই। ওই সব অ্যাওয়ার্ড আমার দরকার নেই। কিন্তু সঠিক লোকরা সঠিক সম্মান পাচ্ছেন না।ছেলেখেলা চলছে পুরস্কার নিয়ে।

একটা গল্প বলি শুনুন এই পুরস্কার দেওয়া নিয়ে!

হ্যাঁ বলুন…

বড়ে গোলাম আলি খাঁ’কে ভারত সরকার থেকে পুরস্কার দিচ্ছে। সর্বোচ্চ সম্মান। গভর্নর হাউস থেকে লোক গেছে চিঠি নিয়ে বড়ে গোলাম আলি খাঁর বাড়িতে। কিন্তু সেই সরকারের তরফের লোক ভয়ে বড়ে গোলাম আলি খাঁর ঘরে ঢুকতে পারছেন না। তখন মুনাওয়ার আলি খাঁ ওঁকে বলছেন “বাবা আপনাকে সরকারের তরফ থেকে পুরস্কার দিতে চায়।”

বড়ে গোলাম আলি খাঁ তখন একটু তাকিয়ে দেখে বললেন “আমাকে সম্মান দেবে? তাহলে নিশ্চয়ই আমার গান শুনেছে!”

এবার যে সরকারের তরফ থেকে চিঠি নিয়ে গেছেন সে তো ভয়ে ঘেমেটেমে অস্থির।
তার ওপর বড়ে গোলাম আলি খাঁ সেই লোকটিকে জিজ্ঞেস করে বসলেন “সরকার যে আমাকে সর্বোচ্চ পুরস্কার দেবেন, সরকারের আমার গানের কোন রাগটা ভাল লেগেছে?”

বুঝুন এবার! কেদার ভাল লেগেছে, না ইমন ভাল লেগেছে? না অন্য কোনও রাগ? চিঠিবাহক তো ভাবছেন, এবার আমায় ছেড়ে দে মা, আমি চলে যাই। সে তো উত্তর দিতেই পারল না। কোনওক্রমে পালিয়ে বাঁচে। চিন্তা করুন এত বড় আর্টিস্ট সে এভাবে যাচাই করছেন।

কারা পুরস্কারের প্রাপক নির্বাচন করেন! আগের থেকে এখনকার হাল আরওই খারাপ।

বড়ে গোলাম আলির সঙ্গে শিষ্যা সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়

তখন সুচিত্রা সেনের লিপে মানেই সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় গাইবেন। যখন আপনার সেই সুযোগ এল কেমন লেগেছিল?

আগে পরে বলে কিছু নেই। আমি আমার জায়গায় দাঁড়িয়ে। সন্ধ্যাদি তাঁর জায়গায় দাঁড়িয়ে। সন্ধ্যাদি আমার থেকে সিনিয়র। সুচিত্রা সেন কেন, কোনও নায়িকার লিপে গান গাইব বলে আমি আর সন্ধ্যাদি লড়াই করিনি। সে প্রশ্নই ওঠে না। বম্বেতে আবার সেটারই চল। একজনই আবদার করে সব প্রোডিউসার ডিরেক্টরদের থেকে গান নিতেন। এসবের অনেক শিকার হয়েছি। বাদ দিন, তিনিও প্রয়াত। বললেও অন্ধ ভক্তরা মানবে না। সুচিত্রা সেনের লিপে গেয়েছিলাম একদম ওঁর কেরিয়ারের শেষের দিকে। ‘ফরিয়াদ’ আর ‘হার মানা হার’ ছবিতে। হ্যাঁ গানগুলো খুব হিট করেছিল। সেটাও প্রাপ্তি বটেই।

সন্ধ্যাদিকে নিয়ে সব শেষে কী বলবেন?

 আমরা কী আর করতে পারলাম ওঁর জন্যে বলুন! কী ভীষণ সাধনা করে উনি বড় শিল্পী, সঙ্গীত সাধিকা হয়েছিলেন। আমি সন্ধ্যাদির মেয়েকে অনেক স্নেহ, ভালবাসা জানাই। রোজই মনে হত, সন্ধ্যাদি কেমন আছেন! আজ সবটাই শেষ হয়ে গেল! অনেক সত্যি কথা বলে ফেললাম, জানি না ক’জন মানবেন। তবু সত্যি বলার ক্ষমতা আমি রাখি। রাখব।

(আরতি মুখোপাধ্যায় যা যা বলেছেন, তা ওঁর ব্যক্তিগত মত। দ্য ওয়াল সে মত প্রকাশ করেছে মাত্র। কোনও শিল্পীকে অবমাননা করার উদ্দেশ্য দ্য ওয়ালের নেই।)

স্বামী-সন্তানের মুখ চেয়ে গানের কেরিয়ারে আপস আরতির, কিংবদন্তীর উত্তরণ ও অন্তরাল

You might also like