Latest News

মাতাল ঋত্বিক ঘটক বিড়ির ধোঁয়া ছাড়লেন দেবকী বসুর মুখে! তার পর…

শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়

বাংলার সর্বশ্রেষ্ঠ পরিচালকদের তালিকায় সবার আগে নাম আসে সত্যজিৎ রায়, মৃণাল সেন, ঋত্বিক ঘটকের (ritwik ghatak)। অন্তত সাধারণ বাঙালিরা তেমনটাই বলেন। কিন্তু বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাস বলছে, সর্বকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ পরিচালক, লেখক, অভিনেতা ছিলেন আচার্য দেবকী কুমার বসু। এ দেশের সিনেমায় শব্দ এবং সঙ্গীত ব্যবহারের পথিকৃৎ তিনি। সারা বিশ্বের কাছে শ্রদ্ধার নাম দেবকী বোস।

প্রথমে ধীরেন্দ্রনাথ গাঙ্গুলীর ব্রিটিশ ডমিনিয়ন ফিল্মসের অধীনে কাজ শুরু করেছিলেন তিনি, পরে প্রমথেশ বড়ুয়ার ‘বড়ুয়া ফিল্মস’ এবং সবশেষে ১৯৩২ সালে ‘নিউ থিয়েটার্স’-এ যোগ দেন তিনি। ১৯৪৫ সালে খোলেন নিজের প্রযোজনা সংস্থা, ‘দেবকী প্রোডাকশন্স’।এই দেবকী বসুর সামনেই একবার নিজের ঔদ্ধত্য প্রকাশ করে অপমান করেছিলেন ঋত্বিক ঘটক! এ ঘটনা হয়তো আজ চাপা পড়ে গেছে সত্যজিৎ-মৃণাল-ঋত্বিক জয়গানে। কিন্তু অনেকেই জানেন না, এই একটি ঘটনাতেই ঋত্বিকের বোধদয় হয়েছিল দেবকী বসু সম্পর্কে।

দেবকী বোসকে আচার্যও বলা হত, কারণ তিনি ছিলেন একজন দার্শনিক, একজন শিক্ষক। তাঁর কাছে কানন দেবী, ছায়া দেবী, উত্তম কুমার, সুচিত্রা সেন, অনুভা গুপ্ত, সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়রা ছাত্রছাত্রীর মতোই অভিনয় শিক্ষা নিতেন। এমনকি বেতের বাড়িও খেয়েছেন এসব শিল্পীরা! দেবকী বোস বেতের বাড়ি মারছেন মানে সেটা আশীর্বাদসম। অভিনয়শিক্ষার শ্রেষ্ঠ স্কুলিং ছিল এমনটাই।শুধু তাই নয়, তিনি বহু অভিনেতা-অভিনেত্রীর ব্যক্তিগত জীবনকেও সুন্দর করে গুছিয়ে দিতেন। তিনি মনে করতেন, জীবনটাও একটা চিত্রনাট্য, সেটা সুন্দর করে গড়ে তোলা একটা আর্ট। বিশেষ করে গ্ল্যামার জগতে থাকা শিল্পীদের এই আর্ট শেখা খুব দরকার। কেউ কেউ ওঁর কাছে শিখতে পারত, কেউ পারত না। তবে বিশেষ করে পেরেছিলেন সুচিত্রা সেন, যিনি পরবর্তী কালে চলচ্চিত্র জীবন থেকে সরে গেছিলেন অন্তরাল জীবনে। তিনি ‘ভগবান শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য’ করার সময়ে দেবকী বসুর কাছে বৈষ্ণব দর্শন জীবনে যে ভাবে উপলব্ধি করেছিলেন, তা কল্পনাতীত। নইলে কী অমন অভিনয় করা যায়!

দেবকী বসু, উত্তমকুমার ও কানন দেবী।

দেবকী বসু পরিচালিত  ছবিগুলি হল চণ্ডীদাস, সীতা, বিদ্যাপতি, কবি, ভগবান শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য, মীরা বাঈ, সোনার সংসার, নর্তকী, মেঘদূত, অলকানন্দা, রত্নদীপ, চিরকুমার সভা, নবজন্ম, সাগর সঙ্গমে প্রভৃতি। প্রতিটি ছবিই যেন ভারতীয় চলচ্চিত্রের এক একটি বাঁকবদল। এসব ছবি তৈরির পদ্ধতি আলোচিত ছিল সারা বিশ্বে।দেবকী বসুর ‘চণ্ডীদাস’, ছবি সমাজে বার্তা দিল, ‘সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপর নাই।’ সেইযুগে কোটি কোটি টাকার ব্যবসা করেছিল এই ছিল। এই ছবির দৌলতে ‘নিউ থিয়েটার্স’ পাকাপাকি ভাবে দাঁড়িয়ে গেল।

‘সীতা’ ছবির শ্যুটে।

তাঁর নির্মিত ছবি বক্সঅফিসে ব্যবসাও দিত আবার সমাজকে জীবনের মন্ত্রও শেখাত। বম্বে ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি বলেছিল, দেবকী বসুই প্রথম ভারতীয় চলচ্চিত্রের প্রথম ব্যক্তি, যিনি প্রথম ফিল্মে প্লে ব্যাক শুরু করেন, চিত্রনাট্য লেখায় নবজাগরণ আনেন। তার আগে ফিল্মের স্ক্রিপ্টগুলো বেশ নাটুকে হত। আবার দেবকী বসু বাষট্টি বছর বয়সে খ্যাতি ও গ্ল্যামারের মোহময় জগতকে বিদায় জানিয়ে চলে গেলেন সত্যের সন্ধানে, আধ্যাত্মিক পথে। বৈষ্ণব চর্চা শুরু করলেন। ঠিক যেন তাঁর জীবনরেখাই নিজের জীবনে আত্মস্থ করেন মহানায়িকা সুচিত্রা সেন। আসলে এঁরা থামতে জানতেন। তাই এঁদের লঘুমানের চলচ্চিত্র নেই।

উত্তম-সুচিত্রার সঙ্গে গুরু দেবকী বসু।

দেবকী কুমার বসুর পুত্র দেবকুমার বসু, মণিপুর ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির পথিকৃৎ ও জাতীয় পুরস্কার প্রাপ্ত পরিচালক জানালেন, “বাংলা চলচ্চিত্রের আদিপুরুষ হলেন দেবকী কুমার বসু, নীতিন বোস, প্রমথেশ বড়ুয়ারা। কিন্তু ফিল্ম ইন্টেলেকচুয়ালরা শুধুই বলে থাকেন সত্যজিৎ-মৃণাল-ঋত্বিকই কেবল বাংলা ছবির শ্রেষ্ঠ পরিচালক। সে বলুক, সেটা আনন্দেরও। আমিও গর্বিত সত্যজিৎ রায়, মৃণাল সেন, ঋত্বিক ঘটকের জন্য। কিন্তু আদি চলচ্চিত্রের আদি পুরুষকে কীভাবে সকলে ভুলে যায়! শুধু বাংলা ছবিতে নয়, ভারতীয় চলচ্চিত্রেও দেবকী বসুর অবদানের কথা প্রশংসা করে লিখে গেছেন স্বয়ং সত্যজিৎ রায়।”

কিন্তু ঋত্বিক ঘটকের সঙ্গে দেবকী বোসের কী ঘটনা ঘটেছিল!

দেবকুমার বসু।

সেই ঐতিহাসিক ঘটনা শোনালেন দেবকী বসু পুত্র দেবকুমার বসু। ৮৮ বছর বয়সি পুত্র বললেন, “একবার টালিগঞ্জ পাড়ার পরিচালকদের একটা সভা হচ্ছে। দেবকী বোস সেখানে সভাপতি। সেখানে বাবা মানুষের কথা বলছেন। সেখানেই দাঁড়িয়ে বাবার কথা শুনছিলেন তরুণ ঋত্বিক ঘটক। ঋত্বিক ঘটক কিছু বলার জন্যে হাত তুললেন। দেবকী বোস বললেন, ‘আপনি কিছু বলবেন? এগিয়ে আসুন।’ ঋত্বিক বললেন ‘আপনি তো মানুষের অনেক কথাই বলছেন, কিন্তু আড্ডা ছাড়া কি সিনেমা হয়?’ দেবকী বোস ঋত্বিককে বললেন, ‘সুস্থ আড্ডা ছাড়া সিনেমা হয় না।’আরও একদিন চূড়ান্ত মদ্যপ হয়ে ঋত্বিক ঘটক এসছেন স্টুডিও পাড়ায়। তখনই গেট দিয়ে ঢুকছে দেবকী বোসের গাড়ি। সেখানে উপস্থিত অজয় কর, অরবিন্দ মুখোপাধ্যায়, কচি মিত্ররা। তাঁরা ঋত্বিককে বলছেন, ‘কী রে তুই এমন অবস্থায় দেবকী বোসের গাড়ির সামনে দেখিয়ে দেখিয়ে বিড়ি খাচ্ছিস! সরে যা সরে যা!’ দেবকী বোসের গাড়ি ঢুকে গেল, কিন্তু মদ্যপ ঋত্বিক ঠোঁট থেকে বিড়ি নামালেন না। অন্যদিকে সেই দৃশ্য দেখে বাকিরা থরথর করে কাঁপছেন। যাঁকে সবাই আচার্য মানে, যে দেবকী বোসের ব্যক্তিত্বকে সবাই শ্রদ্ধা করে, ভয় পায়, তাঁর সামনে ঋত্বিক বেহেড মাতাল হয়ে এই ঘটনা ঘটাল! গেলগেল রব উঠল। এর পরে দেবকী বোস গাড়ি থেকে নামতেই ঋত্বিক অপ্রতিরোধ্য ভাবে তাঁকে বললেন, ‘আরে মশাই আপনারা কী সব ছবি বানান!’ দেবকী বোস শান্ত অথচ কঠোর ভাবে জুনিয়র ঋত্বিক ঘটককে বললেন, ‘আপনি প্রকৃতস্থ নন, আপনি এখন অসুস্থ। আপনার বিশ্রামের প্রয়োজন।’

পেদো সুদীপ আর মজনু সজল, মন্দারের নক্ষত্র তাঁরা, বাংলা অভিনয়ের সম্পদ

এ কথা শুনে দেবকী বোসের মুখের ওপর বিড়ির ধোঁয়া ছাড়লেন ঋত্বিক। দেবকী বোস ধীরেধীরে ওঁর রুমে চলে গেলেন। সবাই তখন ঋত্বিককে এক হাত নেন অন্যরা। মদ্যপ ঋত্বিক বলেছিলেন, ‘আমি তো বিড়ি খাচ্ছি, আমি তো ওঁর সামনে সিগারেট খাইনি।’পরের দিন, মদ না খেয়ে সুস্থ হয়ে ঋত্বিক এসছেন আবার। তখন ওঁকে আমাদের ঢুলু বাবু অর্থাৎ পরিচালক অরবিন্দ মুখোপাধ্যায় বলছেন, ‘তুই করেছিস কী, দেবকী বোসের সামনে বিড়ি খেয়ে ধোঁয়া ছেড়েছিস! যা গিয়ে ক্ষমা চেয়ে আয়।’ তখন ঋত্বিক বলছেন, ‘মাতাল অবস্থায় আমি তাই করেছি নাকি! কে আমায় নিয়ে যাবে দেবকী বোসের বাড়ি!’ অরবিন্দ বাবু বললেন ‘আমি তোকে নিয়ে যাব।’

এটা সোমবারের ছিল ঘটনা।

পরের দিন, মঙ্গলবার ঢুলুবাবু ঋত্বিক ঘটককে নিয়ে আমাদের বাড়ি এলেন। আমাদের দোতলায় বাবার ঘরে যাওয়ার বিরাট পাথরের সিঁড়ি ছিল, সেই সিঁড়ি দিয়ে উঠে গেলেন। আমাদের বাড়ির প্রথা ছিল যে কেউ এলেই জল-মিষ্টি দেওয়া। তাই দিয়ে গেল বয়-রা। ঋত্বিক বললেন, ‘এত খাবার দিচ্ছে আগে, আমাকে মারবে নাকি!’ অরিবন্দ বললেন, ‘চুপ করে বোস!’

দেবকী বসু ও ভারতী দেবী।

তারপর ঘরে এলেন দেবকী বোস। ঋত্বিক-অরবিন্দ উঠে দাঁড়ালেন। ঋত্বিক হাতজোড় করে কাঁচুমাচু মুখে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলেন। দেবকী বোস একটা কথাই বললেন, ‘আজ মঙ্গলবার, আজ মঙ্গলের কথা হোক।’ তার পর আকাশের রঙ নিয়ে দেবকী বোস দার্শনিক কথাবার্তা বললেন।  ঋত্বিক হাঁ করে শুনলেন। ঋত্বিকের তো অগাধ পাণ্ডিত্য ছিল, কিন্তু নেশা করে নিজেকে নষ্ট করে ফেলেছিলেন। তারপর দেবকী বোস চলে গেলেন। সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে ঋত্বিক অরবিন্দকে বললেন, ‘শালা, দেবকী বোসের কী জ্ঞান রে!’ এই ভাবেই শেষ হয়েছিল তিক্ততা।”দেবকুমারবাবু বলছিলেন, এই ঘটনা বাংলা ছবির ইতিহাস কেউ লেখেননি এতদিন। কারণ লিখলে বিতর্ক হবে, অনেককে নিয়ে অনেক উচ্চ ধারণা ভেঙে যাবে। কিন্তু এটাও বাংলা ছবিরই ইতিহাস, এমনটাও ঘটিয়েছিলেন ‘শ্রেষ্ঠ পরিচালকের’ তকমা আদায় করে নেওয়া ঋত্বিক ঘটক।

পড়ুন দ্য ওয়ালের সাহিত্য পত্রিকা ‘সুখপাঠ’

You might also like