Latest News

দাম্পত্যে দূরত্ব থাক, সোহাগ-শাসন যেন কম না পড়ে! শেখাচ্ছেন রজত জয়ন্তী ছুঁইছুঁই ঋতুপর্ণা-সঞ্জয়

সোমা লাহিড়ী

এই তো সেদিন দ্য ওয়ালের ফোটো শ্যুটে এসে ঋতুপর্ণা বলল,’ একটু পরে আমার মেয়ে আসবে দিদি। আসলে সারাবছর তো আমাকে কলকাতা সিঙ্গাপুর মুম্বই ট্রাভেল করতে হয়। যখন অন্য শহরে থাকি আমাকে গজু (রিসোনা ) মিস করে।এখন গজু বাবার কাছে থাকে। সিঙ্গাপুরে। ওখানেই স্কুলে ভর্তি হয়েছে। এখানে ভেকেশনে আসে। আমিও আমার শিডিউল ভাগ করে নিয়েছি। কিছুদিন সিঙ্গাপুর, কিছুদিন কলকাতা মুম্বই। মেয়ের পরীক্ষার সময়গুলোতে সিঙ্গাপুরে থাকি। তবে কলকাতায় এলে আমাকে ছাড়তে চায় না মেয়েটা।যেখানে সুযোগ থাকে ওকে নিয়েই যাই।’

আমি যেন হাতে চাঁদ পেলাম

আমি বললাম,’ খুব ভাল। তাহলে মেয়ের জন্য একটা ছোট্ট শাড়ি আনাই। দু’জনে একসঙ্গে ফ্যাশনের একটা ছবি হয়ে যাবে।’ মুচকি হেসে ঋতু বলল, ‘বলে দেখো। গজু তুলতে চাইবে না।’ আমি ভাবলাম, খুব লাজুক হয়তো, তাই ছবি তুলতে চায় না। আমাদের সঙ্গে একটু ভাব হয়ে গেলে নিশ্চয়ই তুলবে।

Image - দাম্পত্যে দূরত্ব থাক, সোহাগ-শাসন যেন কম না পড়ে! শেখাচ্ছেন রজত জয়ন্তী ছুঁইছুঁই ঋতুপর্ণা-সঞ্জয়

রিসোনা যখন এল, তখন ঋতুর মেকআপ রেডি। ও এসেই মেকআপ আর্টিস্ট কৌশিকের কাছে আবদার করল, ‘আমাকে ব্লাশার লাগিয়ে দাও।’ সুযোগ পেয়েছি ভেবে আমি বললাম, ‘রিসোনা সাজুগুজু করে নাও। মায়ের সঙ্গে ফোটোশ্যুট করতে হবে তো।’ সঙ্গে সঙ্গে উত্তর, ‘না, আমি ছবি তুলব না। ফোটোশ্যুট করব না।’ বললাম, ‘তোমার জন্য খুব সুন্দর একটা শাড়ি অর্ডার করেছি। মায়ের শাড়ির সঙ্গে ম্যাচ করে।’

বিয়ের রাতে

ঘাড় ঘুরিয়ে সপাট জবাব, ‘না না, বাবা রাগ করবে। বাবা বলেছে, মায়ের ছবি তুলতে। কিন্তু মায়ের সঙ্গে ছবি তোলা বারণ।নো ফোটোশ্যুট।’ ঋতু তাকাল আমার দিকে। বুঝলাম। লক্ষ করলাম, ঋতুর প্রত্যেকটা আউটফিটের ছবি তুলছে রিসোনা। একেবারে ফোটোগ্রাফারের পাশে দাঁড়িয়ে।

Image - দাম্পত্যে দূরত্ব থাক, সোহাগ-শাসন যেন কম না পড়ে! শেখাচ্ছেন রজত জয়ন্তী ছুঁইছুঁই ঋতুপর্ণা-সঞ্জয়
গত মাসে ফ্যামিলি ট্যুর

শ্যুটের মাঝে ভিডিও কলে দু’জনে

কিছুক্ষণ পরেই ভিডিও কল এল ঋতুর ফোনে। লাজুক হেসে আমার দিকে তাকিয়ে ঋতু বলল, ‘সঞ্জয়। একটু কথা বলে নিই?’

দূর থেকে দেখছিলাম ওঁদের কথোপকথন। রিসোনাও যোগ দিয়েছিল। তিন জনে মিনিট দশেক কথা চলল। দ্য ওয়ালের জন্য পুজোর শ্যুট করছে, সেটাও বলল ঋতু। কথা শেষ করে বলল, ‘কাল আমার ছেলে আসছে কলকাতায়। অলরেডি সিঙ্গাপুরে পৌঁছে গেছে। ও আমেরিকায় পড়ছে। এখন ভেকেশন তাই আসছে।’

সিঙ্গাপুরের টেরেসে সন্ধের জলসা

জিজ্ঞেস করলাম, ‘সঞ্জয়ও আসছে?’

‘না গো। ও এখন পারবে না। এই তো এক মাস আগেই আমরা ছেলের কাছে গেছিলাম। আমেরিকার কয়েকটা শহরে আমার নাচের শো ছিল। কাজও হল, ফ্যামিলি ট্রিপও হল। এখন আর ওর পক্ষে কাজ ফেলে আসা সম্ভব নয়। দেখি এবার পুজোয় যদি আসে। অনেক বছর কলকাতায় একসঙ্গে সবাই পুজোয় থাকিনি। আমার মা, শাশুড়ি মা দু’জনেই খুব চাইছেন। ওঁদেরও তো বয়েস হয়েছে। যতটা পারি ওঁদের ইচ্ছে পূরণের চেষ্টা করি আমরা।’ 

এবার ঋতুপর্ণার জন্মদিন লন্ডনে, সারপ্রাইজ দিলেন সঞ্জয়

Image - দাম্পত্যে দূরত্ব থাক, সোহাগ-শাসন যেন কম না পড়ে! শেখাচ্ছেন রজত জয়ন্তী ছুঁইছুঁই ঋতুপর্ণা-সঞ্জয়
সিঙ্গাপুরের রান্নাঘরে

শাশুড়ি মায়ের সঙ্গে ঋতুর মধুর সম্পর্ক

সঞ্জয়ের মাকে কখনও শাশুড়ি মা বলে মনে হয়নি ঋতুপর্ণার। বিয়ের কিছুদিন পর থেকেই সঞ্জয় সিঙ্গাপুরে। সঞ্জয় কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার। বিজনেস সেটআপ সিঙ্গাপুরে। প্রথম থেকেই ঋতুপর্ণা কিন্তু শ্বশুর বাড়িতেই থেকেছেন শাশুড়ি মায়ের সঙ্গে। উনি ডাক্তার, গাইনোকলজিস্ট। নিজের পেশা সামলেও বাড়ি এবং বৌমার দেখভাল করতেন।

সেই সময় ঋতু কেরিয়ারের মধ্যগগনে। অসম্ভব ব্যস্ত শিডিউল। এর মধ্যেই ছেলে হল ঋতুর। নাতির পুরো দায়িত্ব নিয়েছিলেন ঠাকুমা। তাই নিশ্চিন্তে আউটডোরে চলে যেতে পেরেছে ঋতু। চুটিয়ে কাজ করেছে শান্তিতে। মেয়ে হওয়ার পরে বেশ কয়েকবার ঋতুর শ্বশুরবাড়িতেই ফোটো শ্যুট করেছি। দেখেছি, উনি ঋতুর প্রতিটা খুঁটিনাটি ব্যপারেও কতটা খেয়াল রাখেন।

লক ডাউনে লুডো

মনে পড়ছে, একবার শ্য্যুটে একটা শাড়ির সঙ্গে গয়না কিছুতেই ম্যাচ করছিল না। উনি আলমারি খুলে নিজের একটা সোনার নেকলেস বের করে দিয়েছিলেন। আর একবার ওর বাড়িতেই আমাদের ফোটোশ্য্যুট হচ্ছে। ঋতু একটু অসুস্থ বোধ করছিল, শ্বাসের সমস্যা হচ্ছিল। ডাক্তার মানুষ ঠিক বুঝতে পেরেছিলেন। কিছুক্ষণের জন্য কাজ বন্ধ রাখতে বলেছিলেন। আর ঋতুকে কী বকুনি। ওষুধ খাইয়ে আধঘণ্টা রেস্ট নিতে পাঠালেন। তখন কে বলবে, ঋতু টলিউডের এক নম্বর নায়িকা, মায়ের কথা লক্ষ্মী মেয়ের মতো শুনল সে। মনে আছে, এক ঘণ্টা পরে আবার কাজ শুরু করেছিলাম আমরা।

Image - দাম্পত্যে দূরত্ব থাক, সোহাগ-শাসন যেন কম না পড়ে! শেখাচ্ছেন রজত জয়ন্তী ছুঁইছুঁই ঋতুপর্ণা-সঞ্জয়
ছেলেমেয়ে তখন ছোট

আন্ডারস্ট্যান্ডিং সন্তান মানুষ করার ক্ষেত্রেও

অঙ্কন যখন উঁচুক্লাসে উঠল তখন সঞ্জয় ছেলেকে সিঙ্গাপুরে নিজের কাছে নিয়ে গেল।এখানে সেন্ট জেভিয়ার্স স্কুলে পড়ত অঙ্কন। পড়াশোনায় ভালই ছিল। মেয়ে হওয়ার পর দু’জনকে চোখে চোখে রাখা সঞ্জয়ের মায়ের পক্ষে সম্ভব হচ্ছিল না। তাই ছেলেকে সিঙ্গাপুরে নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত। আবার মেয়ে একটু বড় হতেই ওকেও সিঙ্গাপুরে স্কুলে ভর্তি করেছে সঞ্জয়।

সিঙ্গাপুরের বাড়িতে

এসবের মাধ্যমেই ঋতুকে নিজের মতো করে কাজ করার সুযোগ দিয়েছে সঞ্জয়। একজন শিল্পীর কাছে এটা দারুণ পাওয়া। সব স্বামী-শ্বশুরবাড়ি এই সুযোগ দেয় না। অভিনেত্রী ঋতুপর্ণাকে সম্মান করে সঞ্জয়। তাই ঋতুপর্ণা আজ ঋতুপর্ণা হয়েছে। একথা মানে ঋতু নিজেও। বলে, ‘আসলে সঞ্জয় শুধু ব্যবসায়ী নয়, শিল্পীও। খুব ভাল সরোদ বাজায়। নিজে শিল্পী, তাই শিল্পের মর্যাদা দেয় সব সময়। সিঙ্গাপুরে যখন থাকি, প্রায়ই সন্ধেবেলা আমাদের টেরেসে গানবাজনার আসর বসে।গজুর নাচও বাদ যায় না।’

শুধু সোহাগ নয়, শাসনের বাঁধনও মজবুত

একটু আনমনা স্বভাব ঋতুর, একটু যেন ভুলোমনাও। দূর থেকে তাকে সামলে রাখা সহজ নয়। ওদিকে ছেলে-মেয়েও বড় হচ্ছে, তাদেরও শাসনে রাখা দরকার। তাই শুধু আদরে বা ভালবাসায় নয়, সঞ্জয় রীতিমতো চোখে চোখে রাখে প্রত্যেককে। আর তার ব্যক্তিত্ব এমনই, যে সকলে তার কথার মান্যতা দেয়।

Image - দাম্পত্যে দূরত্ব থাক, সোহাগ-শাসন যেন কম না পড়ে! শেখাচ্ছেন রজত জয়ন্তী ছুঁইছুঁই ঋতুপর্ণা-সঞ্জয়

সেই জন্যই মায়ের সঙ্গে ফোটোশ্যুট করতে রাজি করা যায় না রিসোনাকে। ঋতুও সঞ্জয়ের সঙ্গে পরামর্শ করেই সব কাজ করে। দুজনের সম্পর্কের মাঝে আসে না সেলেব্রিটি ইগো। পরস্পরের প্রতি বিশ্বাস আর আস্থাই তাদের দূর-দাম্পত্য টিকে থাকার চাবিকাঠি বলে মনে করে ঋতু।

‘তোমাদের এই দূরত্ব-দাম্পত্য তো রজত জয়ন্তীর পথে,’– বলতেই তৃপ্তির হাসি নায়িকার ঠোঁটে। ‘ডিসেম্বরে তেইশ পূর্ণ হয়ে চব্বিশে পড়বে বিয়ে। তোমাদের শুভেচ্ছা সঙ্গে থাকলে পেরিয়ে যাব আরও অনেকটা পথ।’ 

বাড়িতে পুজোর আয়োজনে

ঘুমের মধ্যে আজও আসেন বাবা, শাসন করেন, ভালবাসেন: ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত

You might also like