Latest News

‘কৃষ্ণ’ চরিত্রের ছায়াতেই আটকে রইলেন নীতিশ ভরদ্বাজ, বলিউড ছবি থেকে দাম্পত্য জীবন ব্যর্থ সবেতেই

শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়

আশির দশকের শেষভাগে প্রতি রোববারে রাস্তাঘাট ফাঁক হয়ে যেত বি আর চোপড়ার ‘মহাভারত’ সিরিয়াল দেখার উন্মাদনায়। এর আগে ঠিক একই ঘটনা ঘটেছিল যখন রামানন্দ সাগরের ‘রামায়ণ’ সম্প্রচারিত হত। ‘মহাভারত’-এর সেট ও পরিচালনা ছিল আরও বেশি উন্নত, গ্ল্যামারাস। তখন তো শুধু একটাই চ্যানেল দূরদর্শন। বেশিরভাগ জনের বাড়িতেই সাদা-কালো টিভি। তবু রোববারের অবসর শুরু হত ‘মহাভারত’ সিরিয়াল দিয়ে। আদতে বম্বের সিরিয়ালটা ছিল কালার। যাদের কালার টিভি ছিল রঙিনেই উপভোগ করতেন। বি আর চোপড়ার ‘মহাভারত’ সিরিয়ালে প্রতিটি চরিত্র যেন ‘মহাভারত’ মহাকাব্যের পাতা থেকে উঠে এসেছিল। ভীষ্ম, অর্জুন, দ্রৌপদী, দুর্যোধন, শকুনি, কর্ণ বা কৃষ্ণ প্রতিটি চরিত্র আজও মানুষের মনে গেঁথে রয়েছে। সবাই তখন প্রায় নবাগত, কিন্তু ‘মহাভারত’ করে তাঁরা আজীবন পৌরাণিক স্টার চরিত্র হয়ে রইলেন। তেমনই একটি চরিত্র শ্রীকৃষ্ণ। কৃষ্ণের ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন নীতিশ ভরদ্বাজ। চার দশক পার করে এখন কেমন আছেন আমাদের প্রিয় কৃষ্ণ ঠাকুর? নীতিশ ভরদ্বাজের জন্ম বম্বেতে ১৯৬৩ সালের ২ জুন, রবিবার। ব্রাহ্মণ ভরদ্বাজ পরিবার ছিল উচ্চশিক্ষিত। নীতিশের বাবা ছিলেন বোম্বে হাইকোর্টের বিশিষ্ট আইনজীবি ও তৎকালীন নামী রাজনৈতিক নেতা। অন্যদিকে নীতিশের মা ছিলেন কলেজের অধ্যাপিকা। বোঝাই যাচ্ছে কতটা উচ্চশিক্ষিত পরিমণ্ডলে তাঁর বড় হয়ে ওঠা। ছোটোবেলা থেকেই মা ছোট্ট নীতিশকে বেদ, গীতা, উপনিষদ, মহাভারত, রামায়ণের সব পৌরাণিক গল্প শোনাতেন। সেই থেকেই নীতিশের মধ্যে আধ্যাত্মিক চেতনা জাগ্রত হয়। কিন্তু তখন কে জানত এই ছেলেই একদিন জগতের পুরুষোত্তম শ্রীকৃষ্ণ রূপে জনগনমন অধিনায়ক হবেন।তবে কৈশোর থেকেই নীতিশ ভরদ্বাজের মনে অভিনেতা হওয়ার ইচ্ছে ছিল। ‘শোলে’ ছবি দেখে তাঁর অভিনেতা হওয়ার শখ আরও বেড়ে যায়। আজও কিন্তু নীতিশ ভরদ্বাজের প্রিয় গান ‘শোলে’র ‘মেহেবুবা মেহেবুবা’। কৃষ্ণ ভক্তিরসের বিপরীত পছন্দ। আসলে তখন তো তিনি ব্যক্তি নীতিশ।বাড়ির লোক চাইত নীতিশ ভরদ্বাজ ডাক্তার হোক। হ্যাঁ ডাক্তার তিনি হয়েছিলেন, তবে মানুষের নয়। পশুচিকিৎসক হিসেবে বম্বে ভেটেরিনারি কলেজ থেকে ডাক্তারি পাশ করেন নীতিশ ভরদ্বাজ। ঘোড়া তাঁর বিশেষ পছন্দের প্রাণী হওয়ায় ‘বোম্বে রেসকোর্স’-এ চাকরিও করেন বেশ কিছুকাল। কিন্তু ঐ যে অভিনয়ের নেশা মনে রয়ে গেছিল। তাই চাকরিতে তাঁর মন টিকলনা। চাকরি করতে করতেই মারাঠি নাট্যগোষ্ঠীতে যোগ দিলেন অভিনয় শিখতে। কিছু সময়ের মধ্যেই হয়ে উঠলেন নাট্যদলের সহপরিচালক। তখন চাকরিতে দিলেন ইস্তফা এবং পেশাদার রঙ্গমঞ্চে অভিনয় করতেন। কিন্তু তাঁর এক বন্ধু তাঁকে বললেন মারাঠি থিয়েটারে অভিনয় করে গেলে বলিউড ছবিতে সুযোগ কোনওদিনই আসবেনা। সেই বন্ধুর পরামর্শ মতো যোগ দিলেন হিন্দি থিয়েটারে। রবি বাসওয়ানির হাত ধরে হিন্দি থিয়েটার জগতে আসেন। দীনেশ ঠাকুরের থিয়েটার গ্রুপে যুক্ত হন।
নীতিশ ভরদ্বাজের পরিচালিত ‘চক্রব্যুহ’ নাটক বেশ জনপ্রিয় হয়েছিল এবং এই নাটকেই প্রথম তিনি কৃষ্ণরূপে অভিনয় করেন।কলেজ জীবনে নীতিশ স্টুডিওতে ঘুরে বেড়াতেন। একবার ‘পেইন্টারবাবু’ ছবির শুটিং দেখতে গিয়ে মীনাক্ষী শেষাদ্রির অভিনয় দেখেছিলেন। পরে মীনাক্ষীর সঙ্গে অভিনয় করেছিলেন ‘নাচে নাগিন গলি গলি’ ছবিতে। বোম্বাই দূরদর্শনে সংবাদ পাঠক ও ঘোষক রূপেও কাজ করেন।

আবার ফেরত আসি তাঁর ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে। বি. আর. চোপড়ার ‘মহাভারত’ সিরিয়ালে বিদুর চরিত্রের জন্য প্রথমে অডিশন দিতে আসেন ২৩ বছরের নীতিশ। কিন্তু ঐ চরিত্রের জন্য দরকার ছিল একজন মধ্যবয়সী অভিনেতার। তিনি ছিলেন খুবই অল্পবয়সী। তাই বাতিল হয়ে যান। পরে তাঁকে নকুল ও সহদেবের চরিত্রে নেওয়ার কথা ভাবা হয়। কিন্তু তিনি নিজেই এই চরিত্রে অভিনয় করতে অস্বীকার করেন। এরপর শ্রীকৃষ্ণের চরিত্রের জন্য মনোনীত করা হলেও নীতিশ প্রথমে রাজি হননি। কারণ এই চরিত্রটি মহাভারতের মেরুদণ্ড-স্বরূপ। সুতরাং কৃষ্ণের চরিত্রে একজন পরিণত অভিনেতার প্রয়োজন বলে মনে হয়েছিল তাঁর। নীতিশ তাঁর মাকে বলেন ফোন এলে ‘না’ বলে দিতে চোপড়াদের। পরিচালক রবি চোপড়া আগেও নীতিশের সঙ্গে ফিলিপস ট্রানজিস্টার, অলউইন ঘড়ির (গোবিন্দার সঙ্গে) বিজ্ঞাপনে কাজ করেছেন। সুতরাং রবি এবং গুফি পেইন্টাল (শকুনি চরিত্রের অভিনেতা) থিয়েটার জগতে নীতিশকে অভিনেতা হিসেবে জানতেন। কিন্তু সংলাপলেখক রাহি মাসুম রেজা এবং চিত্রনাট্যকার নরেন্দ্র শর্মা শ্রীকৃষ্ণ চরিত্রটি যেভাবে লিখেছিলেন, তাতে ওদের দু’জনের মতে শ্রীকৃষ্ণ হিসেবে নীতিশ ছিলেন একেবারেই বেমানান। তবু পছন্দসই কাউকে না পেয়ে রবি চোপড়া নীতিশকে আবারও কৃষ্ণের চরিত্রে অডিশন দিতে বলেন। কারণ সেদিন নীতিশ একটা ফিল্মের ডাবিং করতে স্টুডিওতে গেছিলেন। দ্বিতীয়বার সিলেক্টেড হন নীতিশ। বি. আর. চোপড়া ডেকে বললেন, “বেটা, তোমার চরিত্রটা মহাভারতের অবলম্বন। তুমি ফেল করলে, আমিও ফেল করব।”প্রথম পর্ব টেলিকাস্ট হওয়ার পর আবারও ডাকলেন বি. আর. চোপড়া। নীতিশকে বললেন, “বেটা বহুৎ ফোন আয়ে হ্যায় ঔর নেগেটিভ বোল রহে হ্যায়। ইয়ে কৃষ্ণা তো ফেল হো গ্যায়া।”
আটটি পর্ব টেলিকাস্ট হওয়ার পরেও দর্শক কৃষ্ণকে পছন্দ করেননি। কিন্তু সুভদ্রা-হরণ পর্ব টেলিকাস্ট হওয়ার পর থেকেই দর্শক নোটিশ করতে শুরু করেন কৃষ্ণবেশী নীতিশকে। সেই পর্বে কৃষ্ণ অর্জুনকে সাহায্য করেছিলেন বোন সুভদ্রাকে হরণ করতে। বাকিটা ইতিহাস..!‘কৃষ্ণ’ নীতিশ যেখানেই যেতেন, আট থেকে আশি তাঁর পা ছুঁয়ে প্রণাম করতেন। এরপর থেকে বিশ্বব্যাপী বাস্তব জগতের ‘শ্রীকৃষ্ণ’ হয়ে গেলেন নীতিশ ভরদ্বাজ। তাঁর মুখের মিষ্টি হাসিতে প্রসন্ন হত দর্শকমন।
১৯৮৮ সালের ২ অক্টোবর শুরু হয় মহাভারত। দেড় বছরের বেশি সময় চলা এই পৌরাণিক ধারাবাহিক শেষ হয় ১৯৯০ সালের ২৪ জুন। প্রতি রোববার করে হত। পরবর্তীকালে বারবার রিপিট টেলিকাস্ট হয়েছে ‘মহাভারত’। তখনও একইভাবে অটুট জনপ্রিয়তা। সম্প্রতি লকডাউনেও যখন মহাভারত সম্প্রচার হয় তার জনপ্রিয়তা অতিক্রম করে হালের সব আধুনিক মহাভারত সিরিয়ালকে। বিশেষত ‘দ্রৌপদী’ রূপা গঙ্গোপাধ্যায় ও ‘কৃষ্ণ’ নীতিশ ভরদ্বাজের বন্ডিং দর্শকের বেশি ভালো লাগত। আজও মানুষ এক উদ্দীপনা নিয়ে হাতজোড় করে দেখে দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণ দৃশ্যে ত্রাতা কৃষ্ণের আবির্ভাব-দৃশ্য।শ্রীকৃষ্ণর চরিত্রে তাঁর জনপ্রিয়তা এতটাই বেড়ে যায় যে এক বিখ্যাত ভজন-গায়িকা নীতিশের প্রেমে পড়ে যান। তিনি বিয়েও করতে চেয়েছিলেন নীতিশকে। সে সম্পর্ক বাস্তবায়িত হয়নি। এমনিতেও ঐ গায়িকা অন্যের বাগদত্তা ছিলেন, তবুও তিনি নীতিশকে ভালোবাসেন।

মহাভারতের পর বেশ কিছু ছবি ও সিরিয়ালে কাজ করেছেন নীতিশ। বিষ্ণুপুরাণ, রামায়ণ (সীতার চরিত্রে ছিলেন স্মৃতি ইরানি), কিন্তু সব সিরিয়াল বা ছবিই ফ্লপ। এরপর বাবার ডাকে লন্ডন চলে গেলেন। সেখানে রেডিওতে রামায়ণ পাঠ, ইংলিশ থিয়েটারে কাজ করলেন। চার বছর লন্ডনে কাটিয়ে ১৯৯৫ সালে দেশে ফিরে বিজেপিতে যোগ দিলেন। ৯৬-এর লোকসভা নির্বাচনে জামশেদপুর থেকে ভোটে জিতলেন। ২০০৭ সালে রাজনৈতিক জীবন আর ভালো না লাগায় রাজনীতি থেকে বিদায় নিলেন। তাঁর কথায়, “রাজনীতি শুধুই শক্তির খেলা। সব দলই সমান। তারা নিজেদের মতাদর্শ জনগণের ওপর চাপিয়ে দেয়। রাজনীতিতে আমার কিছু করার নেই। নিজের আত্মা, বিবেককে বেচতে হয়। শুধু নিজের পাপ বাড়ানো। আমি সেটা পারবনা।”

দ্রৌপদী রূপার সঙ্গে নীতিশ

বৈবাহিক জীবনে দুবার বিবাহ-বন্ধনে আবদ্ধ হন নীতিশ ভরদ্বাজ। ক্যারিয়ারের মধ্যগগনে বিয়ে করেন ফেমিনার এডিটর বিমলা পাতিলের কন্যা মনীষা পাতিলকে ১৯৯১ সালে। কিন্তু বিয়ের পর নীতিশের ক্যারিয়ার সে অর্থে এগোয়নি। জনপ্রিয়তা মুদ্রার উল্টো পীঠও থাকে। ধর্মীয় চরিত্র বা কৃষ্ণের বাইরে কেউ তাঁকে কোনও ভালো রোলে অফার দেয়নি। কৃষ্ণের আইডেন্টিটি থেকে আজীবন বেরতে পারেননি তিনি। দর্শকও তাঁকে দেবতার আসনে বসিয়ে দিয়েছিল। যার ফলে ফিল্মি হিরোর নাচাগানায় তাকে নেয়নি দর্শক। অনেক ফিল্মে কাজ করে মুক্তির পথ খুঁজলেও আটকে রইলেন কৃষ্ণতেই। এভাবে নীতিশ ভরদ্বাজ ব্যক্তি মানুষটা ক্রমশ ক্ষয়িষ্ণু হয়ে যাচ্ছিলেন। স্ত্রী ও বেকার স্বামীর সঙ্গে থাকতে চাইলেন না। তাঁদের এক ছেলে ও এক মেয়ে থাকা সত্ত্বেও বিবাহবিচ্ছেদ হয়ে যায়। সন্তানদের নিয়ে চলে যান স্ত্রী। মনীষা এখন লন্ডননিবাসী।

এরপর ছোটবেলার বান্ধবী এবং আইএএস অফিসার স্মিতা গেট-কে বিয়ে করেন ২০০৯ সালে। যমজ কন্যা দেবযানী ও শিবরঞ্জনী তাঁদের। কিন্তু দ্বিতীয় বিয়েও সুখের হয়নি। আইনত বিচ্ছেদ না হলেও সন্তানদের নিয়ে সেপারেশানে থাকেন স্মিতা।

স্ত্রীর সঙ্গে নীতিশ

সআজ একাকী জীবন কাটাচ্ছেন আমাদের ভালোবাসার কৃষ্ণ। পুরাণেও তো কৃষ্ণর সখী কম ছিলনা, কিন্তু কৃষ্ণ সংসার জীবনে কতটা সুখ পেয়েছেন। রাধা ও কৃষ্ণের পরকীয়া ভালোবাসাই ছিল।তবে বর্তমানে পার্শ্বচরিত্রে ‘মহেঞ্জোদাড়ো’ ছবিতে কাজ করেছেন। তাঁর লুক দেখে চিনতেই পারেনি প্রথমে লোকে এই আমাদের ‘কৃষ্ণ’। ‘কেদারনাথ’ ছবিতেও সারা আলি খান এবং সুশান্ত সিং রাজপুতের সঙ্গে কাজ করেছেন। তাঁর লেখা ও পরিচালিত মারাঠি ছবি ‘পিতৃঋণ’ বেশ প্রশংসিত হয়েছে। আরও কিছু মারাঠি ও হিন্দি প্রোজেক্টে কাজ চলছে।

একাকী জীবনেও তিনি নিজের মতো করে সময় কাটান। পুণের কাছেই নিজের একটি অরগ্যানিক ফার্ম আছে তাঁর। সেখানে তিনি রাসায়নিক-বর্জিত সবজি ও ফলের চাষ করেন। সেখানেই ভবিষ্যতে থাকতে চান।
নিরামিষভোজী নীতিশ ভরদ্বাজ অবসর সময়ে ধ্যান ও যোগ্যাভাস করেন, গান শোনেন, বইপত্র পড়েন ও বেড়াতে ভালোবাসেন।
তিনি সিগারেট ও মদ ছুঁয়েও দেখেননি কখনও।

You might also like