Latest News

Dharmajuddho Review: রাজ ফিরলেন স্বমহিমায়, ধর্মের দ্বন্দ্বে জীবনের গল্প শুনলেন আমজনতা

প্রসূন চন্দ

৪৬-এর দাঙ্গা কিংবা দেশভাগ, স্বাধীনতার পরেও এই দেশে ধর্মকে সামনে রেখে হানাহানির ঘটনা কম ঘটেনি। হিন্দু-মুসলিমে বিভেদ ঘটিয়ে রাজনৈতিক ফায়দা তোলার নজিরও ভারতবর্ষে কম নেই! কিন্তু দেখা গেছে, সবক্ষেত্রেই এই ঘটনাগুলির শেষে করুণ পরিণতির মুখোমুখি হয়েছেন একমাত্র সাধারণ মানুষ। আর সিংহাসনে বসে ‘যুদ্ধ’ দেখে আনন্দে মেতেছেন প্রশাসকরা। বাস্তব সেই প্রেক্ষাপটের জ্বলন্ত আঁচই পাওয়া গেল রাজ চক্রবর্তীর (Raj Chakraborty) ‘ধর্মযুদ্ধ’তে (Dharmajuddho)।

কিন্তু ট্রেলারে সাধারণ মানুষকে ‘ধর্মযুদ্ধ’ যতটা ট্রিগার করেছিল, সিনেমায় সেই প্রভাব কতটা ধরে রাখতে পারলেন পরিচালক? ভারতের মতো ‘সেক্যুলার’ দেশে ধর্মনিরপেক্ষতার বুলি আউড়ে আদৌ কি কোনও লাভের লাভ হয়? রাখিবন্ধনের দিন মুক্তি পাওয়া সেই বহুপ্রতীক্ষিত ছবি দেখতে দেখতে এই ধরনের প্রশ্ন মাথার মধ্যে বারবার ঘুরপাক খাবে।

Dharmajuddho Review

ছবির গল্পে দেখা যাবে, এই ধর্ম নিয়ে হানাহানি, যুদ্ধের শিকার বাংলার প্রান্তিক গ্রামের চার চরিত্র- শবনম, মুন্নি, জব্বর ও রাঘব। গ্রামে হঠাৎই ঘটে যাওয়া এক অস্থির রাজনৈতিক পরিস্থিতির শিকার এঁরা সবাই। ধমকিয়ে চমকিয়ে মুন্নির স্বামীকে দিয়ে গ্রামের মসজিদে হিন্দু পতাকা লাগান এক রাজনৈতিক দলের নেতারা। সেই দলের নেতাকর্মীরা কথায় কথায় ‘হর হর মহাদেব’ স্লোগানও তোলেন।

অন্যদিকে আরেকপক্ষ ‘আল্লাহ আকবর’ নাড়া তুলে আজানের সময় শঙ্খ বাজানো বন্ধ করতে চায়। হিন্দুর ছেলের সঙ্গে তাদের ঘরের মেয়ের ভালবাসা আটকাতে খুন করতেও হাত কাঁপে না। একদিন এই দুই পক্ষের আস্ফালনের ফলস্বরূপ শান্ত, নির্লিপ্ত গ্রামে জ্বলতে শুরু করে যুদ্ধের আগুন। ফেজটুপি, টিকিধারীদের রোষানলে পড়ে একসময় চারজনই আশ্রয় নেন সেই গ্রামেরই এক বৃদ্ধার বাড়িতে। তাঁর নিজস্ব কোনও নাম নেই। তিনি কারও আম্মি, কারও আবার মা।

১ ঘণ্টা ৫১ মিনিটের ছবিতে দাঙ্গাবিধ্বস্ত গ্রামের একটি রাতের গল্প তুলে ধরেছেন পরিচালক। মাঝে মাঝে এসেছে চার চরিত্রের ফ্ল্যাশব্যাকে ঘটে যাওয়া কিছু ঘটনা- যা ধর্ম নিয়ে এই যুদ্ধের আগুনে ঘিয়ের কাজ করেছে। কিন্তু একটা কথা বলতেই হয়, দু’বছর আগে মুক্তি পাওয়া ছবিটির ট্রেলার দর্শকদের আগ্রহ যতটা বাড়িয়েছিল, সেই তুলনায় গোটা সিনেমা প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ। গত কয়েক বছরে দেশে ঘটে যাওয়া একাধিক ঘটনার টুকরো টুকরো কোলাজ ছড়িয়ে আছে এই ছবিতে। কিন্তু এত স্বল্পদৈর্ঘ্যের ছবিতে সবকিছু টেনে আনতে গিয়েই বোধহয় কখনও কখনও খেই হারিয়েছে চিত্রনাট্য।

তবে সেই খামতি অবশ্য সুদে আসলে পুষিয়ে দিয়েছে অভিনয়। প্রধান চরিত্রে অভিনয় করা মোট পাঁচজন অভিনেতাই যখন একসঙ্গে স্ক্রিনে আসছেন, তখন যেন মনে হচ্ছে– ‘এ বলে আমায় দেখ তো ও বলে আমায় দেখ’। আম্মি চরিত্রে প্রয়াত অভিনেতা স্বাতীলেখা সেনগুপ্ত যেন ধর্মনিরপেক্ষ দেশমাতৃকা। যিনি হিন্দু-মুসলিম বিচার করেন না। বিশ্বাস করেন মানবতায়। তাঁর কাছে হিন্দু ঘরের বৌ মুন্নি যতটা আপন, মুসলিম কসাই জব্বরও ততটাই নিজের। শবনম চরিত্রে পার্নোর যেন বাংলা ছবিতে নবজন্ম হল ‘ধর্মযুদ্ধ’-এর হাত ধরে। নাহলে যে অঞ্জন দত্তের ‘রঞ্জনা’ প্রায় হারিয়েই যাচ্ছিলেন ইন্ডাস্ট্রি থেকে। শুভশ্রী বেশকিছু বছর ধরেই অন্যধারার সিনেমায় মন দিয়েছেন, সেখানে যে তিনি সিংহভাগই সফল, তা কেরিয়ারের দিকে চোখ রাখলেই বোঝা যাবে। ‘পরিণীতা’, ‘হাবজি গাবজি’তে তাঁর অভিনয় ছিল নজরকাড়া। এখানেও হতাশ করেননি তিনি। তবে খুবই ছোট ছবি হওয়ায় তিনি সময়ও পেলেন কম। ঋত্বিক চক্রবর্তীর অভিনয় নিয়ে নতুন করে কিছু বলার জায়গা নেই। তিনি বরাবরের মতোই এবারেও দুর্ধর্ষ। প্রথমার্ধের একদম শেষে তাঁর এন্ট্রি এবং গীতার শ্লোক গায়ে কাঁটা দিতে বাধ্য করবে। তবে এই ছবির সারপ্রাইজ প্যাকেজ বোধহয় সোহম। রাজনীতি করতে করতে সিনেমা থেকে তিনি একপ্রকার ব্রাত্যই হয়ে যাচ্ছিলেন। ভাগ্যিস ফিরিয়ে আনলেন রাজ! জব্বর চরিত্রের ওই নৃশংসতা ফুটিয়ে তোলা হয়ত একমাত্র সোহমের পক্ষেই সম্ভব ছিল।

Dharmajuddho Review

অন্যদিকে, স্বল্প উপস্থিতিতে নজর কেড়েছেন রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্তও। তবে বাকি দুই চরিত্রে সপ্তর্ষি মৌলিক ও কৌশিক রায়ের বিশেষ কিছু করার ছিল না। করতেও পারেননি। ফ্ল্যাশব্যাকে উঠে আসা দুটি গান- ‘তুমি যদি চাও’ এবং ‘তুঝ সঙ্গ বাঁধি ডোর’ শুনতে ভালই লাগবে। তবে কাহিনির কিছু কিছু জায়গায় তাল কেটেছে ইন্দ্রদীপ দাশগুপ্তের আবহ সঙ্গীত। সেদিকে নজর না দেওয়ায়, শেষ অবধি সাসপেন্স ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়েছে ছবিটি। তবে বাস্তব প্রেক্ষাপটকে রাজ যেভাবে সাহসিকতার সঙ্গে বড়পর্দায় তুলে ধরেছেন, তার জন্য তাঁর বাহবা প্রাপ্য।

Dharmajuddho Review

সাম্প্রদায়িক হানাহানির ফল যে কতটা মারাত্মক হতে পারে, তার জ্বলন্ত দলিল হয়ে থাকল ‘ধর্মযুদ্ধ’। তবে প্রেক্ষাগৃহে গিয়ে এই ছবি দেখার পরেও সভ্যসমাজের বিবেক জাগ্রত হবে কি? বলবে সময়।

‘ভটভটি’ চড়ে আসবে ‘লক্ষ্মী ছেলে’! ‘বিসমিল্লা’-র সানাই কি থামাবে ‘ধর্মযুদ্ধ’, জানাবে ‘ব্যোমকেশ’

You might also like