Latest News

দেবশ্রী-প্রসেনজিৎ-ঋতুপর্ণা বুঝি ফিরছেন একছবিতে! বক্সঅফিসের ত্রিবেণী তীর্থে অপেক্ষা দর্শকদের

শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়

তিন জনই মহাতারকা। তিন জনই ইন্ডাস্ট্রির বড় নাম। প্রজন্মের পর প্রজন্ম তাঁদের একসাথে দেখতে চায়। আর সেরকমই হটকেক খবরে এখন সরগরম টলিপাড়া। অপারগুণা রহস্যময়ী দেবশ্রী রায়, ইন্ডাস্ট্রি- সম্রাট প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় এবং টলিউডের জীবনপ্রদীপ ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত– ত্রয়ীর একসঙ্গে কাজ করার কথা হয়েছে এক ছবিতে। সেই নিয়েই চলছে জল্পনা-কল্পনা।

যদিও চূড়ান্ত সম্মতি কোনও তরফের থেকেই এখনও কেউ দেননি।

পারেননি ঋতুপর্ণ, পারবেন কি শিবু-নন্দিতা!

এমন হটকেক খবর স্বর্ণযুগে একবারই ঘটেছিল উত্তম কুমার প্রযোজিত ছবি ‘গৃহদাহ’ তে। সুচিত্রা সেন, উত্তম কুমার ও সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়। ওঁরা কেরিয়ারের শুরুতে ‘অন্নপূর্ণার মন্দির’ ছবি একসঙ্গে করলেও ‘গৃহদাহ’তে তিনজনের কেমিস্ট্রি ছিল অনবদ্য, যা বহুদিন পরে একসঙ্গে স্ক্রিনশেয়ারিং এবং তিন কিংবদন্তির পরিণত অভিনয়ে সমৃদ্ধ ছবি। যদিও দেবশ্রী রায়-প্রসেনজিৎ-শতাব্দী রায় ত্রয়ী অভিনীত ‘শ্রদ্ধাঞ্জলি’ ছবি বেশ বড় হিট ছিল। কিন্তু সেটা দেবশ্রীর বহুদিন পর প্রসেনজিতের সঙ্গে ছবি করা ছিল না। তখন তাঁরা এমনিতেই একসঙ্গে কাজ করতেন। ‘শ্রদ্ধাঞ্জলি’ বরং বড় খবর ছিল দেবশ্রী-শতাব্দী একসঙ্গে থাকায়। পরে ‘পূত্রবধূ’ ছবিতেও চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী শতাব্দী-দেবশ্রী একসঙ্গে কাজ করেন।

ঠিক সেই রকম অসম্ভব ঘটনাই সম্ভব হতে পারে যদি সব কিছু ঠিকঠাক থাকে। শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়-নন্দিতা রায় জুটি একমাত্র এই অসম্ভবকে সম্ভব করতেই পারেন, যা পারেননি ঋতুপর্ণ ঘোষ।

উইনডোজ প্রোডাকশানের শিবপ্রসাদ-নন্দিতার সঙ্গেই প্রাথমিক কথা হয়েছে তিন মহাতারকার। প্রসেনজিৎ-ঋতুপর্ণা জুটি একসঙ্গে উইনডোজের ‘প্রাক্তন’ ছবি দিয়েই কামব্যাক করেছিলেন। যে ছবি বক্সঅফিসে ঝড় তোলে এবং তারপর কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘দৃষ্টিকোণ’ ছবিতেও পরিণত অভিনয়ে এই জুটিকে পাই আমরা। কিন্তু অপ্রত্যাশিত নাম একটাই, তিনি দেবশ্রী রায়। এতদিন যিনি নিজেকে সরিয়ে রেখেছেন প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের নামের পাশ থেকে। তাহলে তাঁরই কি মন গলল!

‘চুমকি টলিউডের পরিপূর্ণ অভিনেত্রী! – প্রসেনজিৎ

প্রসেনজিৎ-ঋতুপর্ণা বলছেন, যদি সম্ভব হয় সেটা বাংলা ছবির জন্য সুখবর। প্রসেনজিৎ আগেও বহু সাক্ষাৎকারে দেবশ্রী রায়ের সঙ্গে তাঁর কাজ করতে অসুবিধে নেই জানিয়েছেন। এবং দেবশ্রী সম্পর্কে প্রসেনজিতের একটাই বাক্য বারবার থেকেছে, ‘চুমকি একজন পরিপূর্ণ অভিনেত্রী! কমপ্লিট অ্যাকট্রেস।’

দেবশ্রী-ঋতুপর্ণার প্রতিদ্বন্দ্বিতা দর্শকমনে থাকলেও, দু’জনের সৌজন্য সম্পর্ক কিন্তু ভাল। একে অন্যের কাজ নিয়েও শ্রদ্ধাশীলা। তবে এ ছবিতে দেবশ্রী রায় এখনও হ্যাঁ বলেননি। তিনি এতদিনের কঠিন যাপন থেকে প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে কাজের জন্য হ্যাঁ বলবেন কিনা, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন। দেবশ্রী রায়ের মন পড়া শক্ত। বরাবরই।

স্টারদের চেয়েও বড় চিত্রনাট্য, যা ক্লাসিক বানায় ছবিকে

তবে শুধু স্টার নিয়ে কিন্তু ভাল ছবি হয় না। দরকার ভাল চিত্রনাট্য এবং সুদক্ষ পরিচালনা। তাহলেই অভিনেতা অভিনেত্রীরা তাঁদের সেরাটা দিতে পারেন। এ দিক থেকে এযুগের সেরা পরিচালক জুটি হয়ে উঠেছেন শিবপ্রসাদ-নন্দিতা। তাঁদের ছবিতে যেমন থাকে আবেগ, তেমন থাকে আইকনিক সংলাপ এবং আজকাল একমাত্র তাঁদের ছবি দেখতেই মাল্টিপ্লেক্স, সিঙ্গেল স্ক্রিন থেকে মফস্বলের সব প্রেক্ষাগৃহ হাউসফুল হয়।

তাই ঋতুপর্ণা-প্রসেনজিৎ-দেবশ্রীরা যদি শিবপ্রসাদ-নন্দিতার হাত ধরেই ছবি করেন, সেটা বোঝাই যাচ্ছে বক্সঅফিসের জন্য হতে চলেছে সুখবর। করোনা আবহে সিনেমা ইন্ডাস্ট্রির যে ধুঁকতে থাকা অবস্থা, সেখানে এমন প্রাক্তনদের বাংলা ছবির তাগিদে নতুন ভাবে ফিরে আসা সুসংবাদ তো বটেই।

তিন জনে একসঙ্গে কাজ করবেন কিনা সেটা আপাতত আভাস মাত্র। পাকা কথা এখনও হয়নি। কিন্তু হতে যে পারে, দর্শকদের কাছে সেটাই বিশাল খবর। এ মাসের মধ্যেই যদি ইতিবাচক সিদ্ধান্ত হয়, তা হবে বহুযুগের ওপার হতে পরম প্রাপ্তি।

অতীতে এঁরা একসঙ্গে ছবি করেছেন 

তবে দেবশ্রী-প্রসেনজিৎ-ঋতুপর্ণা একসঙ্গে প্রথম ছবি করছেন, তা কিন্তু নয়। বলা যায়, এটি সম্ভব হলে হবে তাঁদের তৃতীয় ছবি। ডি বিজয় ভাস্কর দক্ষিণী পরিচালকের বাংলা ছবি ‘নাগ পঞ্চমী’তে প্রথম একসঙ্গে কাজ করেন দেবশ্রী-প্রসেনজিৎ-ঋতুপর্ণা। সালটা ছিল ১৯৯২। তখন দেবশ্রী-প্রসেনজিৎ প্রেম থেকে ছবির হাউসফুল রেকর্ড তুঙ্গে আর ঋতুপর্ণা তখন ইন্ডাস্ট্রিতে নিজের মাটি শক্ত করছেন। কিন্তু তিন তারকার প্রথম একসঙ্গে ছবি হিসেবে ‘নাগ পঞ্চমী’কে ধরতে হবে বৈকি।

এর পরে, ১৯৯৬ সালে প্রভাত রায়ের ‘লাঠি’ ছবিতে দর্শকরা পেয়েছিলেন দেবশ্রী-শতাব্দী-ঋতুপর্ণা-প্রসেনজিৎ সবাইকে একসঙ্গে। তার আগেই অবশ্য ভেঙে গেছে দেবশ্রী-প্রসেনজিতের বিয়ে। দেবশ্রী আর প্রসেনজিতের বিপরীতে ছবি সই করছেন না। ‘লাঠি’তে প্রসেনজিৎ বা ঋতুপর্ণার সঙ্গে স্ক্রিন শেয়ার করেননি দেবশ্রী। দেবশ্রীর রোলটা ছিল ফ্ল্যাশব্যাকে ভিক্টর ব্যানার্জীর প্রয়াত স্ত্রীর। কিন্তু দেবশ্রী নামটাই যথেষ্ট। ছোট রোলেও ছবিতে পাওয়ারহাউস হয়ে ছিলেন দেবশ্রী। কবিতা কৃষ্ণমূর্তির আইকনিক গান ‘তোমরা আমার স্বর্গ’-তে দেবশ্রীকে এখনও মনে রেখেছেন অনেকে।

শিবপ্রসাদ-নন্দিতার ছবি আরও পরিণত ও পরিশীলিত হবে বলে আশা করা যায়। এখন ছবির মেকিং অনেক উন্নত, ইন্ডাস্ট্রিরও হয়েছে পরিবর্তন। তাই নতুন ধারার বাংলা ছবিতে এই ত্রয়ী যদি আসেন, তা হবে নতুন ভাবে ফেরা।

ফিরছে নাইন্টিস নস্ট্যালজিয়া, বুম্বা-চুমকির একসঙ্গে পোস্টার

দেবশ্রী-প্রসেনজিৎ-ঋতুপর্ণার একসঙ্গে ছবি শুধু বড় খবর নয়, নাইন্টিজ নস্ট্যালজিয়াও। ফিরে দেখা যাক সেই দিনগুলো।

বিশ্বজিতের পুত্র বুম্বা আর ঝুমকি-চুমকি র জলসা খ্যাত চুমকি রায় ওরফে দেবশ্রী রায়। দুজনের বন্ধুত্ব থেকে ভালবাসা। দেবশ্রী-প্রসেনজিৎ জুটি নিয়ে আলোচনা বেশি হলেও দেবশ্রী রায়-তাপস পাল জুটি ছিল বক্সঅফিসে বেশী সফল জুটি। ‘চোখের আলোয়’ ছবিতে তাপস-দেবশ্রী লিড হিরো-হিরোইন এবং প্রসেনজিৎ সহনায়ক। আবার চিরঞ্জিত-দেবশ্রী জুটিও সফল তখন। কিন্তু বিমল রায়ের ‘সম্রাট ও সুন্দরী’ ছবি দিয়েই দেবশ্রী-প্রসেনজিতের নায়ক-নায়িকা রূপে জয়যাত্রা শুরু। ব্যক্তিগত টানাপোড়েন ও ভুল ছবি চয়নে তাপস পাল কিছুটা পিছিয়ে পড়লেন। আর তখন হিট হতে থাকল দেবশ্রী-প্রসেনজিৎ জুটির একের পর এক ছবি, ‘ঝঙ্কার’, ‘ওরা চারজন’, ‘অহংকার’।

আবার প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের প্রথম পরিচালিত ‘পুরুষোত্তম’ ছবিতেও প্রসেনজিতের নায়িকা হয়ে দেবশ্রী রায় বললেন ‘আজ অন্ধকার যতই হোক দূর হবে, এই বন্ধদ্বার কাঁটাতার চুর হবে।’

এসময় দেবশ্রী শুধু টলিউড সম্রাজ্ঞী নন, পাড়ি দিয়েছেন বলিউডেও। বিআর.চোপড়ার ডাকে ‘মহাভারত’-এর সত্যবতী রূপে দেবশ্রীর রূপে মুগ্ধ হল তামাম ভারত। আবার রাজশ্রী ফিল্মসের নায়িকাও দেবশ্রী। ফের টলিউড প্রত্যাবর্তন কারণ হাতে অজস্র বাংলা ছবি। বাংলায় ফিরেই জামাইবাবু রাম মুখার্জীর ছবি ‘রক্তেলেখা’র ‘কলকাতার রসগোল্লা’ সুপার ডুপার হিট। যে গানের নাচের বিকল্প হয়নি, রিমেক করে কলুষিত করলেও। এখানেই দেবশ্রী রায় ম্যাজিক।

তোমাকে কিছু বলতে চাই…

বুম্বা-চুমকির প্রেম পেল পরিণতি। চটচলদি হঠাৎ সিদ্ধান্তে শুভ পরিণয় সম্পন্ন হল প্রসেনজিৎ-দেবশ্রীর। সেই রাত হয়ে থাকল বাংলা ছবির ইতিহাসে ঐতিহাসিক রাত। বিয়ের পরপরই অপর্ণা সেন-সহ নবাগত পরিচালক ঋতুপর্ণ ঘোষের অনুরোধে নবদম্পতি সাইন করলেন টালিগঞ্জ পাড়ার বাঁকবদল ছবি ‘উনিশে এপ্রিল’। প্রযোজক রেণু রায়ের বাড়িতে অপর্ণা, দেবশ্রী, প্রসেনজিৎকে চিত্রনাট্য শোনালেন ঋতুপর্ণ। শুরু হল ছবির শ্যুটিং।

কিন্তু এই সময়ের থেকেই প্রসেনজিৎ-দেবশ্রীর সম্পর্কে অন্ধকার যুগ শুরু। তা যেন ফুটে উঠল মিঠু-সুদীপের রোম্যান্টিক দৃশ্যেও। দু’জন সুপারস্টারের একসঙ্গে সমতা রেখে সংসার করা সম্ভব হল না। কিন্তু ‘উনিশে এপ্রিল’ ছবির সুপারহিট হলে, ছবি দেখতে আমন্ত্রণ জানাতে তদানীন্তন মুখ্যমন্ত্রীর কাছে গেছিলেন দেবশ্রী-প্রসেনজিৎ। এসেওছিলেন জ্যোতি বসু। এই ছবির সাফল্য আর ওঁদের।

জুটির প্রথম বিবাহবার্ষিকী একসঙ্গে সেবার। তাই প্রথম বিবাহবার্ষিকীতে মাদার হাউসে গিয়ে মাদার টেরেসার আশীর্বাদ নিতেও গেছিলেন দেবশ্রী-প্রসেনজিৎ। সন্ধ্যায় বসল রাতপার্টি। সে রাতে রাজনৈতিক জগত থেকে ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির সব তারা উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু সইল না সুখের সংসার। ভুল বোঝাবুঝি করে থাকার থেকে নিজের মতোই থাকার সিদ্ধান্ত এবং ডিভোর্স। কোর্ট থেকে দু’জনে বেরিয়ে দু’জনার দুটি পথ বেঁকে গেল চিরতরে। সেই পথ এবার কি মিলবে?

দেবশ্রীর ব্যাটন ধরতে চলে এলেন ঋতুপর্ণা

যখন দেবশ্রী সত্যবতী রূপে ‘মহাভারত’ করছেন তখন গোখেল মেমোরিয়াল স্কুলের এক কিশোরী ভূগোল টিউশন ক্লাস বয়কট করছেন সেদিনকার ‘মহাভারত’ এ সম্প্রচারিত দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণ দেখবেন বলে। যিনি পরে হলেন টলিউড ডিভা ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত।

প্রসেনজিতের বিপরীতে দেবশ্রীর ফেলে রাখা ছবিগুলো তখন পরিচালক-প্রযোজকরা সাইন করাচ্ছেন শতাব্দী রায় বা ইন্দ্রাণী হালদারকে দিয়ে। তখন আবার মিস ক্যালকাটা খেতাব জেতা রচনা ব্যানার্জীও নিজের জায়গা দখল করতে মরিয়া। ঠিক এমন সময় কিংবদন্তি অভিনেত্রী অপর্ণা সেনের পুত্রবধূ রূপে টলিউড অভিষেক ঋতুপর্ণা সেনগুপ্তর। প্রসেনজিতের সঙ্গে ছবি না করলেও দেবশ্রী তখন নম্বর ওয়ান। চিরঞ্জিত, তাপস পাল বা সব্যসাচী চক্রবর্তীর সঙ্গে ছবি করছেন।

এদিকে মিঠুন-দেবশ্রীর জুটির জায়গায় তুমুল হিট করল মিঠুন-ঋতুপর্ণার ‘ভাগ্যদেবতা’। দেবশ্রীর জুতোতে পা গলিয়ে, প্রসেনজিতের জুটি হয়ে উঠতে চলেছেন ঋতুপর্ণাও। প্রথম থেকেই বুদ্ধিমতী ঋতুপর্ণা নিজের কেরিয়ার নিয়ে সচেতন। কিন্তু সেখানে দেবশ্রী নিজের মন যা বলেন তাই করেন।

সেই ঋতুপর্ণ ঘোষের হাত ধরেই ঋতুপর্ণা আর ইন্দ্রাণী দুজনে জাতীয় পুরস্কার পেলেন ‘দহন’ করে। ঋতুপর্ণা বাকিদের ছাপিয়ে উঠে এলেন জাতীয় পুরস্কার প্রাপ্তা দেবশ্রী রায়ের আসনেই। আবার ম্যুডি দেবশ্রী এসময়ই কমিয়ে দিয়েছেন ছবি করা। এই সময়েই প্রসেনজিৎ-ঋতুপর্ণার জুটিও বক্সঅফিসে হিট করল।

তবে বাঙালি সংস্কৃতির ছবিতে দক্ষিণী প্রভাব পড়তে শুরু করেছিল এই সময় থেকেই। সে সবের মাঝেই প্রভাত রায় প্রসেনজিৎ-ঋতুপর্ণাকে নিয়ে বানিয়েছেন ‘খেলাঘর’, হরনাথ বানিয়েছেন ‘দায়-দায়িত্ব’ বা ঋতুপর্ণ বানিয়েছেন ‘উৎসব’। কিন্তু দর্শক তবু মিস করত প্রসেনজিৎ-দেবশ্রী জুটিকে।

একসময়ে ভাঙন এল ঋতুপর্ণা-প্রসেনজিৎ জুটিতেও। প্রসেনজিৎ দ্বিতীয় বিবাহ পেরিয়ে তৃতীয় বিবাহের দিকে এগোচ্ছেন। ঠিক ‘উনিশে এপ্রিল’ এর মতোই ‘উৎসব’ যেন হয়ে দাঁড়াল প্রসেনজিৎ-ঋতুপর্ণার জুটির ভাঙনকাল। ভাঙন পেরিয়ে ঋতুপর্ণা অবশ্য খুলে ফেললেন নিজের প্রোডাকশন হাউস, এগিয়ে গেলেন আরও এক পা।

অর্পিতা-দেবশ্রীর স্পিরিট দেখে চমকিত সবাই

প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়-অর্পিতা পালের বিয়ে হল প্রসেনজিতের দ্বিতীয় স্ত্রী অপর্ণার সঙ্গে বিচ্ছেদের ঠিক দু’মাসের মাথায়। তখন অর্পিতার পরিবার মেনে নেয়নি এই বিয়ে। তাই তখন অর্পিতার গায়ে হলুদ হয় প্রসেনজিতের বোন পল্লবীর ড্রয়িংরুমে, পল্লবীর হাতেই। বরযাত্রী নিয়ে প্রসেনজিৎ চলে গেলেন পল্লবীর বাড়ি। সেখানেই হল শুভ পরিণয়। রাতের বেলায় অতিথিদের আনন্দোজ্জ্বল উপস্থিতি ছিল সেখানেও।

কিছু বছর পরে বিয়ে করলেন অভিষেক চট্টোপাধ্যায়। সেই বিয়ের বরকর্তা প্রসেনজিৎ আর সব দায়িত্ব নিলেন অর্পিতা চট্যোপাধ্যায়। অভিষেকের বিয়ের রিসেপশনে আমন্ত্রিত ছিলেন দেবশ্রী রায়। সেদিন ঘটে গেল বড় খবর। অর্পিতাই দেবশ্রী রায়ের হাত ধরে নিয়ে এলেন তাঁকে বর-কনের কাছে। অর্পিতা-দেবশ্রীর স্পিরিট দেখে চমকিত হল প্রেস মিডিয়া থেকে অতিথি অভ্যাগত।

দেবশ্রী রায় কি একা?

এ প্রশ্নে মিডিয়া তাঁকে জর্জরিত করে ফেলায় তিনি মিডিয়া এড়িয়ে চলেন। দেবশ্রী রায় পরচর্চার থেকে বড়চর্চা বেশী করেন। তাই তিনি একা স্টেটাসে থাকলেও কিন্তু একাকীত্বে ভোগেন না। একলাযাপন করাও একটা সাধনা। ভাই-বোনদের নিয়ে জড়িয়ে থাকেন চুমকি। আগেই বলেছি তাঁর মন পড়তে পারা যায় না। এতই গভীর তাঁর আদর্শ, তিনি প্রিয় পোষ্যর প্রয়াণে বরং বেশি একা হয়ে পড়েন। আবার লকডাউনে প্রচার ব্যতীত দুশো সারমেয়র অন্ন জোগানো অন্নপূর্ণা দেবশ্রী। তিনি মিডিয়াকে পরোয়া করেন না।

দুই চুমকি কতটা প্রতিদ্বন্দ্বী?

প্রসেনজিৎ-ঋতুপর্ণা যখন ছবি করছেন না তখন দেবশ্রী-ঋতুপর্ণা সম্পর্ক কেমন ছিল? উল্লেখ্য, ঋতুপর্ণার ঘরোয়া নামও চুমকি। ডাক নামে খুব মিল দুই নায়িকার। প্রসেনজিতের সঙ্গে দেবশ্রী ও ঋতুপর্ণা ছবি করেন না তখন। সে সময়, ২০০৪ সালে সুশান্ত সাহার ‘সাগর কিনারে’ ছবিতে দুই নায়িকার রোলে স্ক্রিন শেয়ার করলেন ঋতুপর্ণা ও দেবশ্রী। হয়তো প্রসেনজিৎকেই নায়ক রূপে ভাবা হয়েছিল, কিন্তু দুই নায়িকার কেউই তখন প্রসেনজিতের বিপরীতে কাজ করতে রাজি নন। তাই বাংলাদেশ থেকে আনা হল নায়ক ফিরদৌসকে।

‘সাগর কিনারে’ বাণিজ্যিক ঘরানার ডান্স বেসড ছবি ছিল। এই ছবিতেই দেবশ্রী-ঋতুপর্ণার যৌথ ডান্স ‘মাঝেমাঝে জীবনটা হয়ে যায় কবিতা’ আইকনিক হয়ে রইল বাংলা ছবির ইতিহাসে। কিন্তু ছবির চিত্রনাট্য দুর্বল, তাই ছবিটা মনে রাখার মতো হলনা। কিন্তু দুজন স্ক্রিনশেয়ার করলেন, যা ঐতিহাসিক। এমন ডান্স সিকোয়েন্স আসন্ন ছবিতে থাকলেও বাজিমাৎ করবেন দুই নৃত্যপটীয়সী।

ঋতুপর্ণ চাইলেন ফিরুক বুম্বা-ঋতু

ঋতুপর্ণ ঘোষ ফেরাতে চেয়েছিলেন ঋতুপর্ণা-প্রসেনজিৎ জুটিকে, তাঁর ‘দোসর’ ছবিতে। প্রফেশানাল দিক ভেবে প্রসেনজিৎ রাজি থাকলেও সেদিন ঋতুপর্ণ ঘোষের মতো পরিচালকের অফার ফিরিয়ে দেন ঋতুপর্ণা। মতান্তর থেকে মনান্তর এতটাই ছিল দুজনের। ঋতুপর্ণার জুতোতে পা গলালেন অপর্ণা কন্যা কঙ্কনা। কঙ্কনা অসাধারণ অভিনয় করেছেন, তবে প্রসেনজিৎ-ঋতুপর্ণা কেমিস্ট্রি আলাদাই ছিল।

তবে যা পারলেন না ঋতু, তাই পারলেন শিবপ্রসাদ-নন্দিতা। ‘প্রাক্তন’ ছবি দিয়ে ফিরল আবার ঋতুপর্ণা-প্রসেনজিৎ জুটি। শোনা যায় ‘প্রাক্তন’-এর অফারও দেবশ্রীকে দিয়েছিলেন শিবপ্রসাদ। কিন্তু সেটা রটনা না ঘটনা তার সত্যতা কোনও দিনই বলেননি শিবপ্রসাদ বা দেবশ্রী।

সব পথ এসে মিলে গেল শেষে…

আজ বহু রটনা জল্পনা পেরিয়ে পরিচালকদ্বয়ের একপ্রস্থ প্রাথমিক কথা হয়েছে এই ত্রয়ীর সঙ্গে। দেবশ্রী রায় শুধু অভিনেত্রী নন, তিনি বিধায়ক। তাই ছবির বাইরেও তাঁর নানা কাজ। সামনে বিধানসভা নির্বাচন। তাই দেবশ্রী কতটা সময় দিতে পারবেন সেটা দেবশ্রীই জানাবেন। সবচেয়ে বড় কথা, প্রসেনজিতের বিপরীতে দেবশ্রীর অভিনয়ের থেকেও জরুরি হল, দেবশ্রীর কাছে তাঁর নিজের চরিত্রটি কেমন লেগেছে? চরিত্র আর চিত্রনাট্য পছন্দ হলেই দেবশ্রী হ্যাঁ বলবেন এই ছবিতে।

আবার বহুমাস সিঙ্গাপুরে কাটিয়ে সদ্য কলকাতা ফিরেছেন ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত। তিনিও খুশী প্রসেনজিৎ-দেবশ্রীর সঙ্গে কাজ করার জন্য। কিন্তু ফাইনাল হ্যাঁ তিনিও বলেননি। প্রসেনজিৎ বাংলা ছবির স্বার্থে সবসময় এগিয়েই থাকেন শুভ উদ্যোগে।

বক্সঅফিসের জন্য যেমনি এই ত্রয়ী সুপারহিট তেমনি এঁরা বহু ক্লাসিক ছবিতেও কাজ করেছেন। তাই ওঁদের তিন জনের জন্যই এমন চরিত্র ও চিত্রনাট্য হোক যা বাংলা ছবিতে আইকনিক ও কাল্ট হয়ে থাকবে।

তাপস পালের শেষকৃত্য,পারলৌকিক কাজ থেকে নিয়মভঙ্গে একসঙ্গেই উপস্থিত ছিলেন দেবশ্রী-শতাব্দী। যাঁদের প্রতিদ্বন্দ্বী বলে ভাবেন দর্শকরা, অথচ পেশাদারিত্বের জায়গায় তাঁরা সবসময়ই সৌজন্য বজায় রাখেন। সেদিন তাপস-জায়া নন্দিনীর কাছের বন্ধু ছিলেন দেবশ্রী-শতাব্দীই। এও তো কম প্রাপ্তি নয়!

প্রসেনজিৎ-ঋতুপর্ণা জুটি যেমন কামব্যাকের পর চূড়ান্ত সফল আজ, তেমনি প্রসেনজিৎ-দেবশ্রী জুটি যদি ফেরে, তার চেয়ে সুখকর কিছু হয় না বাঙালি দর্শক মহলে। রুপোলি পর্দার মানভঞ্জনে আনন্দাশ্রু আসুক দর্শকদের চোখে।

You might also like