Latest News

প্রসেনজিতের অন্নপ্রাশনে পাত পেড়ে খেয়েছিলেন ছবি বিশ্বাস

শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়

প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়, আজ তাঁর বয়সের ষাটটি বসন্ত পূর্ণ করলেন (Prosenjit Chatterjee Birthday)। কিন্তু বয়স তাঁর কাছে একটি সংখ্যা মাত্র। তিনি মনে শরীরে আজও তরুণ। প্রৌঢ়ত্বের ছাপ যাঁর চেহারায় পড়েনি, বৃদ্ধকাল তাঁর শরীরে থাবা বসাতে ভয় পায়। স্বমহিমায় ষাটেও প্রসেনজিৎ স্থির যৌবনের অধিকারী। নায়ক প্রসেনজিৎ নক্ষত্র। তাঁর যৌবন চিরশাশ্বত।

Subhodeep Banerjee

উত্তমকুমারের পরে টানা প্রায় ৪০ বছর কোনও ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে নায়ক হয়ে থাকার এমন অনন্য রেকর্ড প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের মতো আর কেউ গড়তে পারেননি। প্রসেনজিতের সঙ্গে দৌড় শুরু করা চিরঞ্জিত, তাপস পাল, অভিষেক চট্টোপাধ্যায়রা অনেক আগেই সরে গিয়েছিলেন চরিত্রাভিনয়ে। কিন্তু বাংলা ছবির বর্তমানদের সঙ্গে সমানে টক্কর নিচ্ছেন টলিউডের চিরঅক্ষয় বুম্বাদা।

মহানায়কের প্রয়াণের পরে ১৯৮৩-তে ‘দু’টি পাতা’য় নায়ক হিসেবে আবির্ভাবের পর থেকে চার দশক ধরে প্রসেনজিতের সাম্রাজ্য বিস্তৃত।

তবে প্রসেনজিতের প্রথম অভিনয় বাবা বিশ্বজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে ‘ছোট্ট জিজ্ঞাসা’ ছবিতে। যে ছবি দিয়েই প্রসেনজিতের ফিল্ম জীবন শুরু। এই ছবির জন্য বিশ্বজিৎ বিএফজেএ পুরস্কারও পেয়েছিলেন।

পরত পরতে জীবনের ওঠাপড়া সামলে তিনি আজও শ্রেষ্ঠ নায়কের সিংহাসনে আসীন। জিৎ, দেব-রা এসেও টলাতে পারেননি প্রসেনজিতের সাম্রাজ্য। টালিগঞ্জ পাড়া কীভাবে টলিউড হয়ে গেল সেই পটপরিবর্তনের সাক্ষী প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়।

প্রসেনজিৎ হলেন স্টারকিড। স্টার হিরো বিশ্বজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের (Biswajit Chatterjee) পুত্র প্রসেনজিৎ। কিন্তু নিজের লড়াই তিনি নিজেই লড়েছেন। স্টারের ছেলে হবার দৌলতে জন্ম থেকেই টালিগঞ্জ পাড়ার ঘরের ছেলে প্রসেনজিৎ। তাই বলে তাঁর পথ কম কিছু কন্টকাতীর্ণ ছিল না। লড়াই করেই তিনি জিতেছেন স্বমহিমায়। আজ তিনি ষাট পেরলেন। কিন্ত ষাট বছর আগে ছোট্ট বুম্বা উত্তম জ্যাঠু, সৌমিত্র জ্যাঠুদের কোলে চড়ে বড় হয়েছেন। যাঁরা আমাদের কাছে মহানায়ক উত্তমকুমার বা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, তাঁদের সন্তানের মতো হলেন প্রসেনজিৎ।

Image - প্রসেনজিতের অন্নপ্রাশনে পাত পেড়ে খেয়েছিলেন ছবি বিশ্বাস

জানতে ইচ্ছে হয় আজ থেকে ষাট বছর আগে কেমন ভাবে হয়েছিল প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের অন্নপ্রাশনের অনুষ্ঠান! কারা কারা এসছিলেন বুম্বার মুখেভাতে?

বিশ্বজিৎ স্টার বিশ্বজিৎ হবার অনেক আগেই তাঁর সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল রত্নার। বিয়ের পর যিনি হলেন রত্না চট্যোপাধ্যায়। প্রথম পুত্র প্রসেনজিৎ। পরে হল মেয়ে পল্লবী। বুম্বা আর মাকু। যদিও এই সংসার থেকে বেরিয়ে বিশ্বজিৎ দ্বিতীয় বিবাহ করেন পরে ডক্টরেট ইরা চট্টোপাধ্যায়কে। ওঁদের এক মেয়ে প্রিমা।

১৯৬২ সাল। প্রসেনজিতের অন্নপ্রাশন জাঁকজমক করেই করেছিলেন বাবা বিশ্বজিৎ। শুধু তাই নয় বিশ্বজিতের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে অতিথি আপ্যায়ণ থেকে পরিবেশনের দায়িত্বে ছিলেন সৌমিত্র চট্যোপাধ্যায়, অনুপ কুমাররা। হাজির ছিলেন উত্তমকুমার। সঙ্গে উত্তমের ছোট ভাই তরুণ কুমার যিনি আবার বিশ্বজিতের পরম বন্ধু। নায়িকাদের মধ্যেও হাজির ছিলেন সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়, মাধবী মুখোপাধ্যায় থেকে সন্ধ্যা রায় সবাই। বিশ্বজিতের পাশে সন্ধ্যা রায় সাথে প্রসেনজিৎ কে কোলে নিয়ে সৌমিত্র এমন ছবিও পাওয়া যায়।

তবে প্রসেনজিতের মুখেভাতের অনুষ্ঠানে সবচেয়ে বড় আকর্ষণ ছিলেন লেজেন্ডারি অভিনেতা ছবি বিশ্বাস (Chobi Biswas)। না এখনকার মতো কর্পোরেট পার্টি ঢঙে হয়নি প্রসেনজিতের মুখেভাতের অনুষ্ঠান। একেবারে ষাটের দশকের নিতান্ত বাঙালি বাড়ির অনুষ্ঠান। ছিল না কোনও আতিশয্য কিন্তু ছিল আন্তরিকতা। ছোট্ট বুম্বার অন্নপ্রাশনে পাত পেড়ে নেমন্তন্ন খেয়েছিলেন ছবি বিশ্বাস। সেই কাঠের টেবিল চেয়ার, কলা পাতায় খাবার পরিবেশন আর মাটির ভাঁড়। বাঙালি বাড়ির হারিয়ে যাওয়া নেমতন্ন বাড়ি।

ছবি বিশ্বাসের মতো মহান লেজেন্ড মানুষটি খেয়ে গেছেন শিশু বুম্বার অনুষ্ঠানে। আসলে তখনকার শিল্পীরা একটা দ্বিতীয় পরিবারের মতো ছিলেন। একে ওপরের সুখ-দুঃখের খোঁজ খবর রাখতেন। শ্রদ্ধা থেকে আন্তরিকতায় অটুট থাকত সম্পর্ক।

Image - প্রসেনজিতের অন্নপ্রাশনে পাত পেড়ে খেয়েছিলেন ছবি বিশ্বাস

ছবি বিশ্বাস স্নেহের চোখে দেখতেন বিশ্বজিতকে। কেননা থিয়েটার জগত থেকে ফিল্ম দুনিয়া, ছবি বিশ্বাসের সঙ্গেই বিশ্বজিতের অনেক দিনের সম্পর্ক।

পরিচালক সুধীর মুখোপাধ্যায়ের দুটি সুপারহিট ছবিতে অভিনয় করে বিশ্বজিৎ উত্তমকুমারের পরের নাম হয়ে ওঠেন। দুটি ছবি ছিল ‘শেষ পর্যন্ত’ আর ‘দাদাঠাকুর’। দুটি ছবিতেই ছবি বিশ্বাসের সঙ্গে অভিনয় করার সুযোগ ঘটে বিশ্বজিতের। গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে তরুণ কুমারও ছিলেন ছবিগুলিতে।

ছবি বিশ্বাস নিজের পুত্রের চোখে দেখতেন বিশ্বজিতকে। ছোট্ট একটা ঘটনা বললেই বুঝতে পারবেন তখনকার দিনের সম্পর্ক কতটা মধুর ছিল।

ছবি বিশ্বাস নিজে অভিনয় করে বিশ্বজিৎকে দেখিয়ে দিতেন সিনেমা-অ্যাক্টিংয়ের নানা টেকনিক ডায়লগ ডেলিভারি,পজ, টাইমিং, ক্যামেরা ফেসিং, প্রেফারেন্স কীভাবে নিতে হয়।

‘দাদা ঠাকুর’ ছবির আউটডোর শুটিং ভাগলপুরে। গঙ্গায় ঝাঁপ দেবার একটা সিন‌ ছিল বিশ্বজিতের। যতক্ষণ না সিনটা টেক করা হয় ছবি বিশ্বাস ঠায় দাঁড়িয়েছিলেন। যেন পিতার আকুলতা।

Image - প্রসেনজিতের অন্নপ্রাশনে পাত পেড়ে খেয়েছিলেন ছবি বিশ্বাস

ছবি বিশ্বাসের হাঁপানি ছিল। সারারাত ঘুমোতে পারতেন না। জেগে থাকতেন। একটা ঘরে ওঁর পাশে মশারি টাঙিয়ে বিশ্বজিৎ আর তরুণ কুমার শুয়েছিলেন রাতে। পরের দিন সকালে ঘুম ভাঙলে তরুণকুমার বিশ্বজিৎকে বললেন, ‘জানিস বিশু, ছবিদা না কাল‌ রাতে তোর পা ধরে মশারির ভেতর ঢুকিয়ে দিয়েছে, যাতে তোর পায়ে মশা না কামড়ায়।’ বিশ্বজিৎ তো শুনে অবাক। বিশ্বমাপের একজন লেজেন্ডারি অভিনেতার এ কী দয়া! কী মায়া! কী স্নেহ!

তাই বিশ্বজিতের ছেলে প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়কেও নাতির স্নেহে ভালবেসেছিলেন ছবি বিশ্বাস।

দুঃখের বিষয় ১৯৬২ সালেই গাড়ি দুর্ঘটনায় মাত্র ,৬২ বছর বয়সে প্রয়াত হন মহান অভিনেতা ছবি বিশ্বাস।

ধূসর ছবির মাঝেই এসব অমলিন স্মৃতি আজ বন্দি। স্মৃতিটুকু থাক।

উত্তমকুমার-আশা পারেখ জুটির ‘ঝংকার’, যা হতে পারত মহানায়কের প্রথম বলিউড ছবি

You might also like