Latest News

শাশুড়ি-বৌমার ছক ভাঙা গল্পে জমে গেল পরমব্রত-শুভশ্রী-অনসূয়ার ‘বৌদি ক্যান্টিন’

শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়

ছবি :বৌদি ক্যান্টিন
অভিনয়- অনসূয়া মজুমদার, পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়, শুভশ্রী গঙ্গোপাধ্যায়, সোহম চক্রবর্তী
পরিচালনা- পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়

পুজোয় মুক্তি পেল বেশ কয়েকটি নতুন বাংলা ছবি (movie)। যার মধ্যে আছে এমন কিছু ছবি যেগুলোর খুব বড় মাপের প্রোমোশন বা প্রচার হয়নি। অথচ ছবিগুলোতে রয়েছে শুভ বার্তা। পরমব্রত চট্টোপাধ্যায় (Parambrata Chatterjee) পরিচালিত ‘বৌদি ক্যান্টিন’ (Boudi Canteen) ঠিক তেমন ছবি। ছক ভাঙা গল্প বলেই মন জয় করে নিলেন পরমব্রত।

ছবির নাম ‘বৌদি ক্যান্টিন’ শুনলে মনে হয় হালকা গোত্রের কমেডি ছবি এটি। কিন্তু যত ছবি এগোতে থাকে বোঝা যায় অত সহজ বিষয়ে ছবি ভাবেননি পরমব্রত। বরং ছবির পরতে পরতে জড়িয়ে গভীর মনস্তত্ত্ব। যা সমাজের ঠিক করে দেওয়া নিয়ম, তা আপনার মননের সঙ্গে মিলতে নাও পারে। তবু আমাদের মেনে নিতে হয় বাঁধাধরা নিয়ম। এই নিয়মের বাইরে গিয়ে ভাবতে যারা পারে তাঁদের স্বপ্ন নিয়েই ‘বৌদি ক্যান্টিন’-এর গল্প।

নিয়মের বাইরে গিয়ে ভাবা বলতে বোঝায় যা চিরাচরিত তার বাইরে গিয়ে বিপ্লব ঘটানো। কিন্তু যদি চিরাচরিত ভাবনা দিয়েই বিপ্লব ঘটানো যায়! ‘বৌদি ক্যান্টিন’ ছবির নায়িকা পৌলমী সেরকম। অ্যাকাউন্টেন্সি অনার্স নিয়ে পড়লেও, ছোটদের স্কুলে পড়ালেও তাঁর আসল ভালবাসার জায়গা রান্নাঘর। কোন রান্নায় কী টুকটাক পরিবর্তন এনে নতুনত্ব আনা যায় তাই তাঁর আবিস্কার। ইউটিউবেও সে ভাল ভাল রান্নার রেসিপি দেখে। যেসব বাঙালি রান্না ভুলতে বসেছেন আজকালকার মেয়ে বউরা, সেসব রান্নার জাদুকর পৌলমী। যখন মেয়েরা রান্নাঘরের ধোঁওয়া, গরম ঘাম থেকে বেরিয়ে বাইরের জগতে নানা কাজে স্বনির্ভর হয়ে উঠছে তখন এমন গল্প কী কোনও শুভ বার্তা দেয় এ যুগে দাঁড়িয়ে? অবশ্যই দেয়। অন্য পথে হেঁটেই দর্শকের মন জয় করেছেন পরিচালক পরমব্রত।

আজকাল নব্বই শতাংশ মহিলা রান্না করা মানেই বোঝেন অহেতুক পরিশ্রম। ঠিক সেরকম একটি চরিত্রও রয়েছে ছবিতে পৌলমীর শাশুড়ি। যে কিনা ভীষণ নিজের ক্লাস স্টেটাস বজায় রেখে চলেন। কথায় কথায় বুঝিয়ে দেন তিনি মেয়েদের স্বনির্ভর হওয়া পছন্দ করেন বাইরের জগতে থেকে। তাই তিনি পুত্রবধূকে বলেন কেন সবসময় রান্নাঘরে সময় নষ্ট করছ? তোমার বাবা মা কী এইজন্য পড়াশুনো শিখিয়েছিলেন?

আপাত অর্থে দেখলে মনে হয় এই শাশুড়ি চরিত্রটির মতো শাশুড়ি কেন সব সংসারে হয়না। যিনি বউমাকে বাইরের জগতে ডানা মেলতে দেন। কিন্তু সাদা চোখে সবসময় সব সঠিক দেখা যায়না। সেই বিরল জায়গায় ঘা মেরেছেন পরমব্রত।

আর বড় যত্ন নিয়ে পরমব্রত গড়েছেন নিজের চরিত্রটি। সৌরিশ, যে এই শাশুড়ি-বৌ এর মাঝে দু’জনের সহাবস্থান বজায় রেখে চলে। যে মা’কে লুকিয়ে স্ত্রীর জন্য নিয়ে আসে রান্নার ডেলিভারি ব্যবসা করার অফার। আবার মায়ের এনজিওতে এই ছেলেই ইএমআই দিয়ে উপহার দেয় অ্যাম্বুলেন্স। যে সৌরিশ একটি পত্রিকার মহিলাদের পাতার সম্পাদক। মেয়েদের সাজগোজ, খুঁটিনাটি তাঁর ছোট থেকেই ভাল লাগত। মায়ের শাড়ি সেই ছোটবেলায় বেছে দিত। কিন্তু সমাজ তাকে শেখাল, মা তাকে শেখাল ছেলে মানেই কঠিন শক্ত। যে পড়ে গেলেও মেয়েদের মতো কাঁদেনা। এই সমাজের খোপে মানিয়ে নিতে নিতেও সৌরিশ ফেলতে পারলনা তাঁর আসল ভালবাসা। তাই সে পত্রিকার মহিলা পাতাতেই জীবনের রসদ খুঁজে পায়। কিন্তু এই সৌরিশের পৌরুষ স্বত্ত্বা জেগে ওঠে যখন তাঁর চাকরি চলে যায়। রোজগেরে স্ত্রী আর তাঁর রান্নার ব্যবসার অংশীদার বাবলুদাকে নিয়ে সৌরিশ পসেসিভ হয়ে পড়ে। কিন্তু সহজ সরল পৌলমী বাবলুদাকে বলে দেয় তাঁদের মধ্যে আছে নির্ভরতা আর শুধুই বন্ধুত্ব। নেই কোন কাম নেই কোন প্রেম। পৌলমীর সবটুকু জুড়ে শুধু তাঁর বর। কিন্তু এখানেই এই গল্প শেষ নয়, এক ছকভাঙা গল্প রয়েছে বৌমা-শাশুড়ির। যে গল্পের শেষটা বড় মধুর। মনে শুভ বার্তা রেখে যায়।

পরিচালক পরমব্রত চট্টোপাধ্যায় খুব কঠিন কথা সহজ করে বলেছেন ‘বৌদি ক্যান্টিন’ ছবিতে। এধরণের গল্প নিয়ে ছবি বানাতে গিয়ে সাম্প্রতিক কালের বহু পরিচালকই সিরিয়াল বানিয়ে ফেলেন। কিন্তু পরমব্রত যেন একটা নিটোল ছবিই বানিয়েছেন। মেদহীন ঝকঝকে ছবি, আবেগের অহেতুক বাহুল্য নেই অথচ ছবি যত এগোতে থাকে ততই ভাল লাগতে থাকে।

Boudi Canteen, movie

অভিনয়তেও পরমব্রত চট্টোপাধ্যায় বাজিমাৎ করেছেন। এক নরম মনের পুরুষের চরিত্র একেবারেই যে হাজব্যান্ড ম্যাটেরিয়াল। চাকরি চলে যাবার টানাপোড়েন থেকে সংসারের প্রতি দায় দায়িত্ব সবটুকু নিয়ে পরমব্রতর পরিণত অভিনয়।

শুভশ্রী গঙ্গোপাধ্যায় যতই সময় এগোচ্ছে নিজেকে আরও পরিণত করছেন। ‘বৌদি ক্যান্টিন’-এর প্রাণপ্রতিমা শুভশ্রী। বৌদি নামের যে কত মহিমা তাঁর চরিত্রটি বলে দেয়। যে যুগে বৌদি শব্দটিকে যৌন দেবী বানানোর খেলায় মেতেছে টলিউড ইন্ডাস্ট্রি সেখানে পরমব্রত ‘বৌদি ক্যান্টিন’ গড়ে তুলে কী মর্মস্পর্শী বার্তা দিলেন এই পুজোতে। ছবি যত এগোতে থাকে শুভশ্রীর পৌলমী চরিত্রটি আমাদের মনে জায়গা করে নেয়। শুভশ্রী যেন পৌলমী চরিত্রে নিজেকে নতুন করে গড়েছেন। তাঁকে দেখতেও যত সুন্দর লেগেছে অভিনয়ও ততটাই মুগ্ধ করেছে। শুভশ্রী ফুরিয়ে যাবার মেয়ে নন আবারও বোঝালেন।

যে অভিনেত্রীর কথা না বললেই নয়, তিনি অনসূয়া মজুমদার। ছবির শুরুতে মনে হবে শাশুড়ি কত মুক্তমনা। কিন্তু এক খোপে সব সংসারের গল্প ফেলা যায়না। তাই আবার শাশুড়ি চরিত্রটি চরম নেগেটিভও মনে হবে। যখন নিজের জীবনের গোড়ার কথা বলতে শাশুড়ি ছেলে-বৌমাকে বস্তি অঞ্চলে নিয়ে যান সেই দৃশ্যে অনসূয়া মজুমদারের অভিনয় দর্শকদের নাড়িয়ে দেয়। আর এইখানেই মন জয় করে নেন অনসূয়া। মেদহীন অভিনয়ে বাজিমাত করলেন তিনি।

সোহম চক্রবর্তী ‘বৌদি ক্যান্টিন’ এর অংশীদার বাবলুদার চরিত্রে ভাল কিন্তু তাঁর অভিনয় প্রতিভা অনেকটাই হ্রাস পেয়েছে বোঝা গেল। বড় বেশি স্থবির সোহমের অভিব্যক্তি। পরমব্রত চেষ্টা করেছেন সোহমকে উপযুক্ত ব্যবহার করতে কিন্তু সোহম যেন নিজের একশো শতাংশ দিতে পারলেননা। ছোট ভাইয়ের চরিত্রে পুষণ দাশগুপ্ত সপ্রতিভ। বাবার চরিত্রে অরুণ বন্দ্যোপাধ্যায় যথাযথ।

এ ছবির গল্পের বুনোন অসাধারণ কিন্তু গান এ ছবির কিছুটা হলেও দুর্বল। নতুন ভাবনায় গানের প্রয়োগ দেখতে মন্দ লাগেনি। কিন্তু মনে রয়ে যায়না ছবির গান।

ছবির সংলাপে লিঙ্গ বৈষম্য থেকে প্রান্তিকতা কোনও কিছুই বাদ যাইনি। বাদ যায়নি রান্নাপুজোতে মনসা পুজোর ভাবার্থ। কিন্তু সবরকম বিষয় রেখেও ছবির সংলাপ অগোছালো হয়নি। বরং দরকারি। অসম্ভব ভাল সংলাপ লিখেছেন সম্রাজ্ঞী বন্দ্যোপাধ্যায়। গল্পকার অরিত্র সেনের এমন একটি গল্পের নির্মেদ সার্থক চিত্রায়ন করলেন পরমব্রত।

ছবি দেখা শেষে সিনেমাহলে দেখলাম বয়স্কদের সঙ্গে নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েরাও তৃপ্তির হাসি হাসলেন। শুধু মহিলাদের জন্য এই ছবি নয়। এ ছবি সবার ভাল লাগার। প্রচারের অভাবে ছবিটি হয়তো সেই মাত্রায় দর্শকের কাছে পৌঁছচ্ছেনা বা নাম শুনে অনেকেই ভাবছেন কমেডি হালকা চালের ছবি। কিন্তু ছবি দেখতে গিয়ে এই ভাবনা গুলোই বদলে যাবে।

যে রান্নাঘরে পুরুষতান্ত্রিক সমাজ মেয়েদের আটকে রাখত সেই হেঁশেলই হতে পারে মেয়ে-বৌদের শক্তিপীঠ।

দেব-প্রসেনজিতের সেয়ানে সেয়ানে টক্কর, আলোলিকা ইশা

You might also like