Latest News

‘অন্তরালে’ সিরিয়ালে জনপ্রিয় হয় পরমব্রত-শ্রাবন্তী, ফিল্মেও জুটি হবার কথা ছিল অনেক আগেই

শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়

তখনও কলকাতা দূরদর্শনের সিরিয়াল ভীষণভাবে জনপ্রিয় ছিল সারা বাংলায়। কর্মব্যস্ত দিনের রাঁধাবাড়া সেরে দুপুরের আহারাদি করে মা পিসিরা বসতেন টেলিভিশনের সামনে। দুপুর সাড়ে তিনটে। কলকাতা দূরদর্শনের পর্দায় জনপ্রিয় মেগা সিরিয়াল ‘অন্তরালে’। রূপঙ্কর বাগচীর কণ্ঠে বেজে উঠত ‘অন্তরালে’র শীর্ষসঙ্গীত। এই সিরিয়াল দেখতেই সবাই আকুল হয়ে থাকতেন সারাটা দিন।
তখনও টালিগঞ্জ পাড়া অনেকবেশি বাঙালি। পরিচালকদের কাজে স্বাধীনতা ছিল, তাই সিরিয়ালের গল্পগুলো গড়ে উঠত মধ্যবিত্ত বাঙালিদের গল্প নিয়ে। ঠিক যেমন ‘অন্তরালে’ সিরিয়ালের চিত্রনাট্য। চিত্রনাট্য লিখেছিলেন অরূপশঙ্কর মৈত্র। ‘অন্তরালে’র পরিচালক অনিমেষ ভট্টাচার্য, যিনি বাবলুদা নামেই ইন্ডাস্ট্রিতে বিখ্যাত।
ছোট ছোট সুখ দুঃখের গল্পে অভিনয় যেন বড় বেশি বাস্তব করে তুলতেন কলাকুশলীরা।

পরিচালক অনিমেষ ভট্টাচার্য ও কলাকুশলীরা

যদিও এই ‘অন্তরালে’ সিরিয়ালেও ছিল পরকীয়া গল্পের ছায়া। কিন্তু সেটা খুব সুচারুভাবে পরিবেশন করেছিলেন পরিচালক। যা বাজার চলতি করতে টেনে নামাননি। এখনকার মেগাতে যেটা হামেশাই হয়ে থাকে।

এখনকার বিগ বাজেট সিরিয়াল সেট তখন ছিলনা। সালটা ২০০১-০২। ইন্দ্রপুরী স্টুডিওতে শ্যুটিংয়ের সেট পড়েছিল ‘অন্তরালে’ সিরিয়ালের। মধ্যবিত্ত বাড়ির গল্প তাই সেটও খুব সাধারণ। কিন্তু তার মধ্যেই থাকত অসাধারণত্বের ছোঁওয়া। তখনও ছিল স্টার প্লাস বা জি টিভিতে একতা কাপুরের গ্ল্যামারাস হিন্দি সিরিয়ালের হাতছানি। তবু তারই মধ্যে বাংলা সিরিয়ালে মৌলিক কাজ হয় ‘অন্তরালে’। ঠিক তার আগেই আবার হত ‘পৌষ ফাগুণের পালা’।

‘অন্তরালে’ জনপ্রিয়তার নিরিখে এতটাই উঠেছিল যে সে বছর ‘আনন্দলোক পুরস্কার’এ সেরা সিরিয়াল হিসেবে পুরস্কৃত হয় ‘অন্তরালে’। স্বীকৃতি পেয়েছিলেন অভিনেতা অঅভিনেত্রীরাও।
আবার এই ‘অন্তরাল’ সিরিয়াল দিয়েই দুই নবীন প্রতিভা দর্শকমনে জায়গা করে নেয়। এই নবীন জুটি তখন বাংলার ঘরে ঘরে নতুন প্রজন্মের কাছে আইকনিক জুটি। তাঁরা হলেন পরমব্রত চট্টোপাধ্যায় এবং শ্রাবন্তী চট্টোপাধ্যায়। পরম-শ্রাবন্তী জুটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে এই ‘অন্তরালে’ সিরিয়ালের মাধ্যমে। কিন্তু ‘অন্তরালে’তে লিড রোলে নায়ক চরিত্রে ছিলেন শঙ্কর চক্রবর্তী। যার চরিত্রের নাম তপোব্রত বাগচী বা তপু। তাঁর স্ত্রীর রোলে লকেট চট্টোপাধ্যায় চরিত্রের নাম ইন্দ্রাণী। লকেটও তখন নতুন, নায়িকা স্বীকৃতি পেয়েছিলেন ‘অন্তরাল’ করেই। আরেকটি দ্বিতীয় নারীর লিড চরিত্রে চৈতী ঘোষাল, চরিত্রের নাম তনিমা। তনিমার সঙ্গে তপব্রতর পরকীয়া ঘিরেই গল্প।

তপোব্রত চরিত্রে শঙ্কর চক্রবর্তী

চৈতি ঘোষাল ‘অন্তরালে’ করার সময়ই গৌতম ঘোষের ‘আবার অরণ্যে’ ছবির শ্যুটিং করছিলেন। যে ছবিতে নায়িকা ছিলেন বলিউডের টাবু। মজার ব্যাপার হল নর্থ বেঙ্গলে টাবুর পাশাপাশি চৈতির অটোগ্রাফ নিতেও ভিড় জমে গেছিল। কারণ ‘অন্তরালে’ সিরিয়ালে চৈতি ঘোষালের জনপ্রিয়তা। যদিও একইসঙ্গে চলছিল জি বাংলাতে ‘এক আকাশের নীচে’, যাতে বাড়ির বড় বৌ চৈতি। টাবুর থেকেও লোকে বেশি চিনেছিল চৈতিকে। শঙ্কর চক্রবর্তীও যেখানেই যেতেন জনতার ভিড় তাঁকে ছেঁকে ধরত।এছাড়াও অভিনয় করেছিলেন রমা গুহ, রীতা কয়রাল ও সুজিত বন্দ্যোপাধ্যায়। রীতা-সুজিত হয়েছিলেন তপোব্রতর দিদি-জামাইবাবু। যে দিদি-জামাইবাবুর যুগলবন্দি অভিনয় ভীষণভাবে আদৃত হয়েছিল দর্শক মহলে। আজ রীতা কয়রাল-সুজিত ব্যানার্জী দুজনেই প্রয়াত। এমন দুজন বলিষ্ঠ শিল্পীর চলে যাওয়া ইন্ডাস্ট্রির ক্ষতি বৈকি। চন্দন সেন, ছবি তালুকদার, সুনীল মুখোপাধ্যায় খুব ভালো অভিনয় করেছিলেন।

অন্তরালে’র সেটে রীতা কয়রাল, পরিচালক অনিমেষ ভট্টাচার্য ও সুজিত ব্যানার্জী

আরও একটি তিন মেয়ে ও বাবা মায়ের পরিবার ছিল সিরিয়ালে। তিন মেয়ে হন শর্বরী মুখোপাধ্যায়, পুষ্পিতা মুখোপাধ্যায় ও অরুণিমা ঘোষ।

পুস্পিতা মুখোপাধ্যায়

এছাড়াও চৈতির বান্ধবী জবালার চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন সোমা চক্রবর্তী। সেখানেও একজন সিঙ্গেল ওম্যানের গল্প দেখিয়েছিলেন পরিচালক। যিনি তাঁর ছেলেকে বোর্ডিং-এ রেখে মানুষ করেছেন। প্রথম যৌবনে সে ফিরছে মায়ের কাছে, সেই ছেলেই হলেন পরমব্রত। অন্যদিকে চৈতির মিষ্টি মেয়ে স্কুল গার্ল। যে চরিত্রে শ্রাবন্তী। একসময় তনিমা-জবালা দুই বান্ধবীর ছেলেমেয়ে পরস্পরের প্রেমে পড়ে এবং তাঁদের মন বিনিময়। এইসময় দর্শকেরা পরম-শ্রাবন্তীকে দেখতেই বসে থাকত। দুজনেই ওঁরা তখন প্রায় নবাগত, দুই নবীন প্রতিভাকে এই সিরিয়ালই স্টার বানিয়ে দেয়।

নবাগতা ‘শ্রাবন্তী’

‘অন্তরালে’ পরিচালক অনিমেষ ভট্টাচার্য জানালেন কীভাবে তিনি দুই নবীন প্রতিভাকে জুটি বানালেন। অনিমেষ ভট্টাচার্য খুব অসুস্থ, শয্যাশায়ী তবুও তিনি সোনালি দিনের গল্প বলতে বলতে স্মৃতিমেদুর হয়ে পড়লেন।
তিনি বললেন “পরমব্রতকে নিয়েছিলাম জি-তে ইন্দ্রনীল গোস্বামীর একটা কাজে দেখে। বাচ্চা ছেলে দেখে পছন্দ হল তখন পরমকে নিয়েছিলাম। আর তখন শ্রাবন্তী একেবারেই বাচ্চা, স্কুলে পড়ে, আগে কয়েকটা শিশুশিল্পীর অভিনয় করেছিল। তখন ভাবলাম এই দুটো বাচ্চা ছেলেমেয়েকে নিলে খুব ভালো জুটি হয়। চৈতির (ঘোষাল) মেয়ের রোলে নিলাম শ্রাবন্তীকে আর সোমার (চক্রবর্তী) ছেলের রোলে নিলাম পরমকে। ভীষণভাবে দর্শকের পছন্দ হল এই নতুন জুটি।

বাবা মায়ের সঙ্গে ছোট্ট পরম

সেইসময় চন্দন মুখোপাধ্যায় বলে একজন পরিচালক ছিলেন অনেক ছবি করেছিলেন তিনি আমাদের ‘অন্তরালে’র ফ্লোরে এসে পরম-শ্রাবন্তীকে দেখে বলেছিলেন এই নতুন জুটিটাকে নিয়ে তিনি একটা ছবি করবেন।
যেটা আমার প্রাপ্তি যে আমি প্রতিভা চিনতে ভুল করিনি।
এমনকি তিনি চিত্রনাট্য লিখেও ফেলেন সেই ছবির ওঁদের জুটিকে ভেবে। কিন্তু চন্দনবাবু মারা গেলেন।
তাই পরম-শ্রাবন্তী জুটি ফিল্মে আর তৈরি হলনা। তাহলে হয়তো নতুন একটা অধ্যায় তৈরি হত। পরে ওঁরা দুজনেই স্টার হল। শ্রাবন্তী ‘অন্তরাল’ করেই ‘চ্যাম্পিয়ন’ ছবির অফার পেল জিতের নায়িকারূপে। পরম পরিচালকও হয়েছে কিন্তু আমি যে জুটিটা তৈরি করেছিলাম সেই জুটির ফিল্ম করার ক্ষমতা জনপ্রিয়তা সবই ছিল। বাসু চট্টোপাধ্যায়ও ‘অন্তরালে’তে ওঁদের জুটির কাজ দেখে প্রশংসা করে গেছিলেন।
পরমব্রতকে আমি পরবর্তীকালে আমার ‘সোনার বাংলা’ সিরিয়ালেও নিয়েছিলাম সিরাজের রোলে। আমি যেটা বলতাম ওরা সেটা ফুটিয়ে তুলত ঐ বয়সেই। তাই ওঁরা আজ এত বড় হতে পেরেছে।”

‘সোনার বাংলা’র সেটে রমাপ্রসাদ বণিক, অরুণ ব্যানার্জী, রূপা গাঙ্গুলী ও অনিমেষ ভট্টাচার্য

আরও জানালেন অনিমেষ ভট্টাচার্য “আমি চেয়েছিলাম মানুষের কাছে আইডেন্টিফাই হোক একেকটা কারেক্টর। সেজন্য আজও পুস্পিতা মুখার্জী, লকেট চ্যাটার্জীদের ‘অন্তরালে’র অভিনয় লোকে মনে রেখেছে। ওরা তখন নতুন। রাজেশ শর্মা ছিলেন বোম্বের ডনের চরিত্রে, যার সঙ্গে নবাগতা নায়িকা হতে চাওয়া পুষ্পিতার একটা সম্পর্ক দেখাই। রীতা সুজিতদা চলে গেছেন কিন্তু ওঁদের জুটি তৈরি করেছিল ‘অন্তরালে’।
সমস্ত সিরিয়ালের শট, ফিল্ম শটে ক্যামেরা করেছিলাম। যেটা আজকালকার সিরিয়ালে দেখিনা।
দূরদর্শনের ‘গান শুধু গান’ শো থেকে রূপঙ্কর বেরিয়েছে তখন, ওকে দিয়েই গাওয়াই ‘অন্তরালে’র শীর্ষসঙ্গীত। ভীষণ জনপ্রিয় হয়েছিল।
এই সিরিয়াল করে যতটা চেয়েছিলাম মানুষের কাছে পৌঁছনোর তার বেশি আমি পেয়েছি। এটাই আমার পুরস্কার। তখন তো মোবাইলের প্রভাব এত ছিলনা। যোধপুর পার্ক পোস্টঅফিসে বস্তা বস্তা দর্শকদের চিঠি আসত ‘অন্তরালে’ সিরিয়ালের ফিডব্যাক।
আজ আমি শয্যাশায়ী দুরারোগ্য ব্যাধিতে কিন্তু মানুষ যে কুড়ি বছর পরও ‘অন্তরালে’ মনে রেখেছেন সেটাই প্রাপ্তি।”

‘অন্তরালে’তে পরিচালকের নাম যেত শৈবাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের কিন্তু সবটাই সামলেছিলেন এপিসোড ডিরেক্টর অনিমেষ ভট্টাচার্য। আজ অনিমেষ ভট্টাচার্য অসুস্থ, দুরারোগ্য ব্যাধিতে শয্যাশায়ী, তবু মনের জোরে লড়ে যাচ্ছেন জীবন-যুদ্ধের লড়াই। এই স্টারমেকার পরিচালক যেসব স্টারদের বানিয়েছিলেন তাঁরা আজ কেউ সুপারস্টার নায়ক-নায়িকা বা পরিচালক কেউ বা রাজনৈতিক নেত্রী। তাঁরা কি একবার সমব্যথী হবেন এই পরিচালকের প্রতি। গুরুকে গুরুদক্ষিণা দেবার সুযোগ নিশ্চয়ই অবহেলা করবেন না আজকের স্টারেরা।

বিশেষ ধন্যবাদ – পুষ্পিতা মুখোপাধ্যায়

You might also like