Latest News

Pallavi Dey: গ্ল্যামার জগতের তারাখসা! খ্যাতি, টাকা, পার্টির আগে চাই সংযম

শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়

ফুটফুটে মেয়ে ঝরে গেল অকালেই। টলিপাড়াতে শোকের ছায়া। ‘আমি সিরাজের বেগম’ খ্যাত ছোট পর্দার অভিনেত্রী পল্লবী দের (Pallavi Dey) রহস্যজনক মৃত্যু নিয়ে চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে চারদিকে। আত্মহনন না খুন তাই নিয়েও চলছে জোর চর্চা। মৃত্যুর আড়াল থেকে বেরিয়ে আসছে নানা স্ক্যান্ডেল। নানা মুণির নানা মত। এক যুবকের সঙ্গে লিভ-ইন সম্পর্কে ছিলেন অভিনেত্রী। সেই প্রেমিক সন্দেহের তালিকায়।

তবে এ ঘটনা প্রশ্ন তোলে, এমনটা কি গ্ল্যামার জগতে নতুন? তা তো নয়। প্রতি বছরই বলি থেকে টলি, এমন চাঞ্চল্যকর খবর আসে। যেন মনে হয়, অল্পবয়সে ছেলেমেয়েদের জীবনের গাড়ি এতটাই বেলাগাম হয়ে পড়ছে, যে তা দ্রুত ছিটকে যাচ্ছে লাইন থেকে। শেষ হয়ে যাচ্ছে যাত্রা।

পল্লবীকে (Pallavi Dey) নিয়ে আজকের উত্তাল নেটপাড়া স্তিমিত হয়ে যাবে কয়েক দিন পরেই। ফুরিয়ে যাবে আলোচনা। মৃত্যুর কিনারা হবে কিনা তা অবশ্য নিশ্চিত নয়। হালের সুশান্ত সিং রাজপুত থেকে সেই মহুয়া রায়চৌধুরী– কিনারাহীন মৃত্যুর তালিকা বড় ছোট নয়। সম্পর্কের টানাপড়েন থেকে আর্থিক নিরাপত্তাহীনতা– কত কারণই না জ্বলজ্বল করছে এ তালিকার পিছনে।

সে যাই হোক, খুন না আত্মহত্যা, তার কারণ কী– সে সব বিচার তো আইন করবে। কিন্তু অকালে একটা প্রাণ তো ঝরেই গেল, যার কোনও পরিপূরক হয় না। পরিবারের ক্ষতয় কোনও মলম হয় না। কিন্তু একইসঙ্গে, পল্লবী দের মৃত্যু প্রদীপের নীচের ঘন অন্ধকারের একটা কালো দাগ মাত্র। এর গভীরতা অনেক বেশি।

অনেক ক্ষেত্রেই টেলিভিশন সিরিয়ালগুলোয় জনপ্রিয় হয়ে ওঠা মুখেদের মধ্যে একটা কমন বিষয় থাকে। নিম্নবিত্ত পরিবার থেকে কিংবা মফস্বল থেকে আসা তরতাজা ছেলেমেয়েরা সুযোগ পায় আলোর মুখ দেখার। এ আলোর ঝলকানি বড়ই বেশি। আজ থেকে ক’বছর আগে, নয়ের দশকেও সিরিয়াল দুনিয়ায় এত খ্যাতি, এত প্রচার, সর্বোপরি এত অর্থাগম ছিল না। প্রথম সিরিয়ালেই বড় হোর্ডিয়ে মুখ দেখানোর সুযোগ জুটত না প্রায় কারও ভাগ্যেই।

এখন সেই চিত্রটাই একেবারেই বদলে গেছে। এখন টলিপাড়ায় সিরিয়াল সংখ্যা অনেক বেশি। অভিনেতা-অভিনেত্রীর সংখ্যাও বেশি সেইমতোই। আর সেই সংখ্যায় ভাল অভিনয় জানা শিল্পীরাই যে প্রাধান্য পাচ্ছেন তা নয়। জিমচর্চিত সুঠাম চেহারাও সেখানে অতি জরুরি। আর তার পাশাপাশিই অনিবার্যভাবে যেন এসে যাচ্ছে. ওয়েস্টার্ন কালচারে মেতে ওঠা, স্টেটাস মেনটেন করার মতো নানা দিক। অনেকেই বলছেন, কাজের মানের থেকে দেখনদারি অনেক বেশি। আর এই দেখনদারির ফাঁপা জৌলুসে খুব সাধারণ পরিবার থেকে উঠে আসা ছেলেমেয়েরা এক সিরিয়ালেই যেন হয়ে উঠছে জনপ্রিয় ‘তারকা’।

হবে নাই বা কেন। প্রতি মাসেই অজস্র চ্যানেলে আসছে নতুন নতুন সিরিয়াল। প্রায় সব সিরিয়ালেই নতুন মুখ নায়ক-নায়িকা। এতে যেমন ভাল আছে, তেমন খারাপও আছে। একটি নতুন ছেলে বা মেয়ে একটি সিরিয়ালে চান্স পেয়ে অভিনয় করে জনপ্রিয় মুখ হয়ে উঠল। যাকে এক বছর আগেও কেউ ফিরে দেখত না, সে-ই হয়ে উঠল দর্শকদের নয়নের মণি। যশ, খ্যাতি, অর্থ বাড়লে লাগল, ইন্সটা, ফেসবুক, টুইটারের ফলোয়ারের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গেই। তাকে ঘিরে সেলফির ভিড় ক্রমে ঘন হয়। সোশ্যাল মিডিয়া জুড়ে তারই মুখ ভাসে। সেই সঙ্গেই দামী গাড়ি থেকে আকাশচুম্বী ফ্ল্যাট– সবই আসতে থাকে হাতের নাগালে।

কিন্তু সিরিয়াল শেষ হলে? সিরিয়াল শেষ হলে ‘নতুন মুখ’ও যে পুরোনো। পরবর্তী সিরিয়ালে তো তাঁকে আর নায়ক বা নায়িকা করা হয় না। কারণ তখন আরও একগুচ্ছ নতুন মুখ চলে এসেছে নতুন সিরিয়ালে লিড রোল করতে। তাই সদ্য ফুরোনো সিরিয়ালের মতো স্বপ্নও যেন ফুরিয়ে যায় ঝপ করে। কারণ ফের কোথাও লিড রোল পেতে গেলে করতে হয় দীর্ঘ অপেক্ষা। তার আগে হয়তো চরিত্রাভিনেতার রোলে কাজ করতে হয় বাড়ি-গাড়ির ইমএমআই মেটাতে। অনেকে বহু বছর বসে থেকেও পায় না সেই আগের মতো লিড রোল বা বড় প্রচার। স্টারডমের দেওয়াল ক্ষইতে থাকে। ধুঁকতে থাকে জীবন-যৌবনও।

ইদানীং তাই অনেক উঠতি অভিনেতা-অভিনেত্রীই নিরাপত্তা বাড়াতে সিরিয়াল করার পাশাপাশি রেস্টুরেন্ট বা ক্যাফের ব্যবসার দিকেও ঝুঁকছেন। কিন্তু সেখানেও দরকার নিষ্ঠা, পরিশ্রম, ধৈর্য।

এখানেই শেষ নয়, ইন্ডাস্ট্রিতে এসেই সম্পর্কের ফাঁদে পড়ছে ছেলেমেয়েরা। তারা অনেক বেশি সাহসি, অনেক বেশি এগিয়ে সময়ের থেকে, অনেক বেশি স্বাধীন, অনেক বেশি আত্মনির্ভর। তাই হয়তো কোনও অভিনেতার রহস্যমৃত্যুর খবর এলেই শুরু হয়ে যায় তাঁর ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে কাটাছেঁড়া!

কিন্তু তার পরেও প্রশ্ন থেকে যায় আরও বড়। আত্মহত্যা তো একদিনে হয় না। তার জমি তৈরি হয় আরও কিছু দিন ধরে। সেই দিনগুলো যখন কাটাচ্ছিল ছেলেটি বা মেয়েটি, মানসিক টানাপড়েনের মাঝেই হাসি মুখে বাঁচছিল, তখন এই সমালোচকদের ভিড় কোথায় ছিল? কেউ কি ছিল না বাঁচার সাহস দেওয়ার মতো? বাবা-মাও কি আরেকটু যত্ন, ভরসা জোগাতে পারলেন না? সাবধান হতে পারলেন না কাছের মানুষগুলো?

নিম্নবিত্ত পরিবার থেকে উঠে আসা অভিনেতা বা অভিনেত্রীর জীবনে যখন টাকার আনাগোনা সহজ হয়ে যায়, তখন তাদের জীবনযাপনও অবধারিত ভাবেই অনিয়ন্ত্রিত হয়। বাবা-মারাও তখন কি আগের মতো শাসন করেন, তাকি সোনার ডিম পাড়া হাঁসের মতোই যত্নের হয়ে ওঠে সন্তান, সে কথাও জানার দরকার আছে। কারণ একটা সিরিয়াল করেই যেমন খুব সহজে মফস্বলের দু’কামরা ছেড়ে শহরের অভিজাত ফ্ল্যাটে উঠে আসা যায়, তেমনই নেশা করা থেকে বহুগামী সম্পর্কে জড়িয়ে পড়বার প্রবণতাও বাড়তে থাকে। রাতপার্টি, লং ড্রাইভ, সঙ্গীর সঙ্গে অভিজাত বারে ডিনার– সব চলে। শুধু বাদ পড়ে যায় সংযম।

আসলে একের পর এক ঘটনা বুঝিয়ে দেয়, স্টার হওয়া যতটা কঠিন, তার থেকেও অনেক বেশি কঠিন স্টারডম বজায় রেখে চলা। বিলাসবহুল ফ্ল্যাট, গাড়ি থেকে সম্পর্কের দোলাচল দীর্ঘদিন বজায় রাখা যাবে তো, প্রতিটা পা ফেলার আগে তা ভেবে নেওয়া জরুরি। চাহিদার পরে চাহিদার পাহাড় জমতে জমতে যেন সে পাহাড়ের তলায় দমবন্ধ না হয়ে আসে, তাও নিজেকেই বুঝে নিতে হবে।

অভিজ্ঞরা বলেন, গ্ল্যামার জগতে চলা হল সুতোর ওপর দিয়ে চলা। একটু পা ফসকে গেলেই পড়বে গিয়ে নীচে। তাই ফ্ল্যাশলাইটের ঝলকানি, ফ্রন্টপেজের ছবি, ফ্যান ফলোয়ারদের উন্মাদনা, খ্যাতির অহংকারে যেন মনোযোগ নষ্ট না হয়, তা খুব জরুরি। জরুরি, ভেসে না গিয়ে নিজের ধার ও ভারকে ধরে রাখা। পরিবারের মানুষরাও যেম গ্ল্যামার জগতে থাকা সন্তানদের এই দ্বন্দ্বকে বুঝতে পারেন। সন্তান যতই দ্রুত যতই টাকা আয় করে যতই স্বাচ্ছন্দ্য এনে দিক সংসারে, ধৈর্য আর সংযমের পাঠ যেন বাবা-মা তাঁকে দিতে ভুলে না যান।

এর পরে পড়ে থাকে লিভ ইন। লিভ-ইন সম্পর্ক তো টলিপাড়ায় নতুন নয়। বহু নায়ক নায়িকাই করেছেন, করছেন। পরে সেই সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে কেউ বা অন্য সঙ্গী নির্বাচন করেছেন, কেউ বিয়ে করে থিতু হয়েছেন। কিন্তু লিভ-ইন সম্পর্কের সুখ-অসুখ নিয়ে কি তেমন করে কথা হয়েছে? সম্পর্কে অসুখী হয়ে পড়া নিয়ে কতটা সচেতন সকলে? লিভ-ইনে থাকা নিয়ে যতটা চর্চা হয়, ততটা কি সম্পর্কে থাকা মানুষগুলোর মনের অবস্থা নিয়ে কথা হয়!

তাই জীবনের অনিয়ন্ত্রিত লাগাম নিজেকেই টানতে হয় এ জগতে। খুব কম সময়ে সাফল্যের মগডালে ওঠার কোনও ফরমুলা হয় না। তাই ফাঁদ দেখলেই সরে আসা ভাল। কারণ তার পরিণতি অনেক সময়েই ভয়ানক হয়ে ওঠে। ফলে শত বিতর্ক সরিয়ে রেখে, হাজার প্রশ্ন পিছনে ফেলে রেখে এথা মনে করে নেওয়ার সময় এসেছে, গ্ল্যামার দুনিয়ায় সুদীর্ঘ পথে টিকে থাকতে প্রাথমিক ও অন্যতম জরুরি বিষয় হল সংযম।

সাগ্নিককে ২২ লাখের গাড়ি দিয়েছিলেন পল্লবী! মেয়ের টাকাতেই মোবাইল-ল্যাপটপ, দাবি বাবার

You might also like