Latest News

প্রয়াত হলেন সুচিত্রা সেনের পাবনার বাড়ি উদ্ধারের কারিগর

শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়

মমতাজের তাজমহলের মতো সুচিত্রা সেনের স্মৃতি নিয়ে পাবনার হেমসাগর লেনে দাঁড়িয়ে আছে সুচিত্রা সেনের পৈতৃক ভিটে। দর্শনার্থী উপচে পড়ছে। কেন পড়বে না? দীর্ঘ দিন বেদখল ছিল যে। জামাত গোষ্ঠী সেখানে জমিয়ে আসর বসিয়েছিল। চলেছিল সুচিত্রাকে মুছে দিয়ে নিজেদের জাহির করার ব্যস্ততা। রুখে দাঁড়ালেন স্থানীয় মানুষ ও পাবনা জেলা পরিষদের তৎকালীন প্রশাসক এম সাইদুল হক চুন্নু। সুচিত্রার বাড়ির হারানো সুর ফেরালেন তাঁরাই।সুচিত্রা সেন আমাদের গর্ব। যার মেয়েবেলা কেটেছে অধুনা বাংলাদেশের পাবনায়। বিয়ের পর রমা ওরফে সুচিত্রা চলে আসেন কলকাতায় এবং তারপর তিনি হয়ে ওঠেন রুপোলি পর্দার গ্ল্যামার-কুইন নায়িকা। কিন্তু কলকাতাতে সুচিত্রা সেনের কোনওকিছুই সংরক্ষণ হয়নি। অথচ পাবনায় সুচিত্রা সেনের আদি বাড়ি সংরক্ষণ করে প্রদর্শনীশালা করা হয়েছে। যেটা করা খুব কঠিন কাজ ছিল। কারণ সুচিত্রা সেনের ফেলে আসা পাবনার ভিটে অধিগ্রহণ করে রেখেছিল ধর্মান্ধ জামাত গোষ্ঠী। জামাত গোষ্ঠীর হাত থেকে সুচিত্রার জন্মভিটে উদ্ধার করেছিলেন পাবনা জেলা পরিষদের তৎকালীন প্রশাসক এম সাইদুল হক চুন্নু। আজ ভোররাতে প্রয়াত হলেন  এম সাইদুল হক চুন্নু। কোভিড আর ডেঙ্গুর সঙ্গে লড়াই করে নিভল তাঁর জীবনবাতি। কিডনির অসুখেও তিনি ভুগছিলেন দীর্ঘদিন।

এম সাইদুল হক চুন্নু

বর্তমানে তিনি ছিলেন পাবনা জেলা পরিষদের প্রাক্তন প্রশাসক, জেলা আওয়ামী লিগের প্রাক্তন সিনিয়র সহসভাপতি ও সুচিত্রা সেন স্মৃতি সংরক্ষণ পরিষদের সভাপতি। জীবনের শেষদিন অবধি তিনি সুচিত্রা সেন স্মৃতি সংরক্ষণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে বিভিন্ন কাজ করে গেছেন এবং দুই বাংলার মানুষের কাছে ফিরিয়ে দিয়েছেন মহানায়িকার জন্মভিটে।

দেশভাগের আগে সুচিত্রা সেনের পাবনার বাড়ির আদিরূপ

১৯৩১ সালের ৬ এপ্রিল পাবনার এই ভিটেতেই সুচিত্রা সেনের জন্ম। অন্য মতে পাটনায় মামারবাড়িতে জন্মেছিলেন তিনি।
পাবনা শহরের পৌর এলাকার গোপালপুরের হেমসাগর লেনের এই বাড়িতেই কেটেছে সুচিত্রার শিশুবেলা থেকে কিশোরীবেলা। তাঁদের আদি বাড়ি যশোহর মতান্তরে এও শোনা যায়। তবে সুচিত্রার বাবা কর্মসূত্রে থাকতেন পাবনায়। এই বাড়ি তাঁর হাতেই গড়া। মধ্যবিত্তের ভিটে, তাই নেই শৈল্পিক আড়ম্বর কিন্তু আছে মহানায়িকার স্পর্শ। সেখানেই সুচিত্রা ও তাঁর ভাইবোনদের বড় হওয়া।সুচিত্রার মা ইন্দিরা দাশগুপ্ত। চার ভাই ও পাঁচ বোনের মধ্যে সুচিত্রা ছিলেন পঞ্চম। আসল নাম রমা। বাড়ির ডাকনাম কৃষ্ণা। চলচ্চিত্র জগতে এসে নাম হল সুচিত্রা। যে নাম হয়ে গেল ইতিহাস। স্কুলে ভর্তির সময় রমা নাম দেওয়া হয় তাঁর। পাবনার মহাকালী পাঠশালায় প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে সুচিত্রা দশম শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশুনা করেন পাবনা গার্লস স্কুলে। যে স্কুল এখন পাবনার বড় হাইস্কুল।

এই স্কুলে পড়েছেন সুচিত্রা

ক্লাস সেভেন থেকেই রমার ছিল সিনেমা দেখার নেশা। সুযোগ পেলেই বোনেরা বান্ধবীরা ছুটতেন পাবনার ‘অরোরা’ সিনেমা হলে। একবার ক্লাসে কিশোরী রমা বলেওছিলেন “দেখিস পৃথিবীতে আমি অমর কীর্তি রেখে যাব।”

বালিকা সুচিত্রা পরিবারের সাথে পাবনায়

এরপর দেশভাগ, হিন্দু-মুসলিম রক্তাক্ত দাঙ্গার মাঝে করুণাময় দাশগুপ্ত পাবনায় থাকা সংগত মনে করলেননা। পরিবার নিয়ে চলে এলেন শান্তিনিকেতনে আত্মীয়দের কাছে। শান্তিনিকেতন থেকেই সুচিত্রার বিয়ের সম্বন্ধ এগোয়। মাত্র ১৬ বছর বয়সে রমার বিয়ে হয়ে যায় কলকাতার বিশিষ্ট শিল্পপতি আদিনাথ সেনের পুত্র দিবানাথ সেনের সঙ্গে। সুচিত্রা গেছিলেন গায়িকা হিসেবে অডিশন দিতে, কিন্তু সুযোগ এল নায়িকা হবার। প্রথম দিকে ছবির জগতে নামতে চাননি তাই ফিল্মের অফার ছেড়েও দেন। কিন্তু স্বামী দিবানাথের ব্যবসায় মন্দা আসার কারণেই রমার চলচ্চিত্রে আসা। তারপর রমা থেকে হয়ে ওঠা সিলভার স্ক্রিনের নয়নমণি সুচিত্রা সেন।সুচিত্রার সাথে সাথে তার ভাইবোনদেরও আর কখনও পাবনায় ফেরা হয়নি। দেশভাগের ফলে যাবার সুযোগও ছিলনা। পাবনা সম্পর্কে উদাসীনই হয়ে গেছিলেন সুচিত্রা। ঐ প্রসঙ্গ এড়িয়েও যেতেন। যেহেতু দেশের মাটি ছেড়ে চলে আসার স্মৃতি কষ্টকর ছিল।
কলকাতায় স্থানান্তর হবার পর পাবনার পৈতৃক বাড়িটি এক কথায় পরিত্যক্ত অবস্থায় ছিল। তবে ১৯৮৭ সালের দিকে এই বাড়িতে একটি স্কুল চালু করা হয়। এ সময় বাড়িটির অনেক মূল্যবান ফলগাছ ফুলগাছ কেটে বাড়ির সবুজ বেষ্টনী উজার করে দেয় দখলকারীরা। বাড়িটির স্থাপত্যশৈলির মূল কাঠামো পরিবর্তন করে ছাদের অধিকাংশ ভেঙে ফেলে টিনের চালা দিয়ে তাদের প্রয়োজনমত ঘর তৈরি করা হয়।
কিন্তু ব্যাপারটা বেশিদিন এগোয়না।পরবর্তীতে বাড়িটি ধর্মান্ধ জামাত গোষ্ঠী দখল করে নেয়। তখন সুচিত্রার বাড়ি হয়ে ওঠে সন্ত্রাসের আঁতুড়ঘর।
কিন্তু পাবনাবাসীরা হলেন অসম্ভব সুচিত্রা ভক্ত। এমনও অনেক মানুষ ছিলেন, আজও আছেন যারা সুচিত্রা বা তাঁর ভাইবোনদের পাবনা স্কুলের সহপাঠী, খেলার সাথী বা প্রতিবেশী। এই সুচিত্রা সেনের পৈতৃক ভিটে উদ্ধার ও সংস্কারে যিনি প্রধান ভূমিকা নেন তিনি সাইদুল হক চুন্নু।সাইদুল হক চুন্নু পাবনা জেলা পরিষদের প্রথম প্রশাসক ছিলেন। জেলা আওয়ামী লিগের সিনিয়র সহ-সভাপতি হিসেবে দুর্দিনে দলে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছিলেন। সুচিত্রা সেন স্মৃতি সংরক্ষণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি জীবনের শেষদিন অবধি। এছাড়াও জেলার শিল্প-সাংস্কৃতিক অঙ্গনে নানাভাবে জড়িত ছিলেন তিনি।
তাঁর সঙ্গে ছিলেন পরিষদের সচিব রামদুলাল ভৌমিক। স্থানীয় সমাজকর্মী এবং সংস্কৃতিমনা মানুষদের অ্যান্দোলনের ফলে ২০০৪ সালের দিকে বাড়িটি জামাত-দখলমুক্ত হয়। এই লড়াইটা খুব সহজ ছিলনা। একের পর এক বাধা, মৃত্যুভয় উপেক্ষা করে সাইদুল হক চুন্নু, রামদুলাল ভৌমিক ও স্থানীয় মানুষরা লড়েছিলেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও শেষ অবধি সহায়তা করেন তাঁদের।
সেই থেকে বাড়িটির দেখাশোনার দায়িত্ব পালন করে আসছেন পাবনা জেলা পরিষদ ও সাইদুল হক চুন্নু। কিন্তু ফের আবার জামাত গোষ্ঠী দখল করবার চেষ্টা করে এবং আইনি জটিলতায় বাড়ি দখলমুক্ত করা যায়না।
স্থানীয় বিভিন্ন সংগঠন ও বিশিষ্ট ব্যক্তিরা সুচিত্রা সেনের বাড়ি দখলমুক্ত করে সংগ্রহশালা কিংবা সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান করার জন্য ২০০৮ সালে থেকে আন্দোলন শুরু করেন। দীর্ঘকাল হাইকোর্টের রায় ঘিরে শুনানি চলে। সুচিত্রা সেন জীবদ্দশায় তাঁর পৈতৃক ভিটে দখলমুক্ত হয়েছে দেখে যেতে পারেননি। কিন্তু তারপরই কেটে যায় সব জটিলতা। জিতে যান পাবনা জেলা পরিষদের তৎকালীন প্রশাসক এম সাইদুল হক চুন্নু ও স্থানীয় জনসাধারণ।২০১৪-র ১৬ জুলাই সুচিত্রার বাড়িতে সংগ্রহশালা নির্মাণের আদেশ দেয় হাইকোর্ট। প্রশাসনিক জটিলতায় কাটিয়ে এগোয় কাজ। বন্ধ হয় সমাজবিরোধীদের দৌরাত্ম্য। আজ সুচিত্রার পৈতৃক ভিটেতে সুচিত্রার ছবি সব দেওয়ালে। কলকাতা থেকে তাঁর ব্যবহৃত সামগ্রী আনার চেষ্টা হচ্ছে। সুচিত্রার পিসতুতো ভাইবোন থেকে কলকাতার বহু সুচিত্রা-ভক্ত ঘুরেও গেছেন এই পৈতৃক ভিটে। দীর্ঘকাল বাংলাদেশ ছাড়া নায়িকা ‘বেদের মেয়ে জোসনা’ অঞ্জু ঘোষ বাংলাদেশ ফিরেই প্রথম যান পাবনায় সুচিত্রা সেনের বাড়ি। বাড়ির লাগোয়া বাগানে বসানো হয়েছে সুচিত্রার প্রস্তর মূর্তি। টিকিট কেটে এই বাড়ি দর্শনে ঢুকতে হয়।

বেদের মেয়ে জোসনা খ্যাত অঞ্জু ঘোষ মহানায়িকার বাড়িতে

এখানেই শেষ নয়, সাইদুল হক চুন্নু ও সুচিত্রা সেন স্মৃতি সংরক্ষণ পরিষদের কামাল সিদ্দিকীর উদ্যোগে প্রতি বছর বিশাল সমারোহে পালিত হয় সুচিত্রা সেনের জন্মদিন ও মৃত্যুদিন। দিনভোর বাজে সুচিত্রার ছবির নানা গান। মহানায়িকার জন্মদিনে কেক কেটে, সুচিত্রার ছবির রেট্রোস্পেকটিভ দেখানো হয়। যে আয়োজনের ছিটেফোঁটাও করা হয়না কলকাতায়। কলকাতার প্রশাসন মুখেই নিয়েছিল উদ্যোগ, কাজে আর এগোয়নি। কিন্তু পাবনাবাসী করে দেখাল।যদিও কলকাতায় বালিগঞ্জ সার্কুলার রোডে সুচিত্রার প্রাসাদসম বাড়িটি সুচিত্রা নিজেই বিক্রি করে দেন এবং সেখানেই হয়েছে বেদান্ত আবাসন। সেখানেই শেষ জীবনে থাকতেন সুচিত্রা সেন। মায়ের ফ্ল্যাটটিকে মায়ের ছবি দিয়ে সাজিয়েছেন মেয়ে মুনমুন সেন। কিন্তু সেটা কোনওভাবেই জনসাধারণের জন্য নয়। কলকাতার চেয়ে বহুগুণে বেশি আয়োজন হয় প্রতিবার পাবনায়। শুধু তাই নয় সুচিত্রা সেনের পৈতৃক ভিটে এখন পাবনার দ্রষ্টব্য স্থান হয়ে উঠেছে।
আজকাল পশ্চিমবঙ্গ থেকে বহু মানুষ বহু সুচিত্রা ভক্ত পাবনা যাচ্ছেন সুচিত্রা সেনের আদি বাড়ি ছুঁয়ে দেখতে।এইসবের পেছনে যার কৃতিত্ব তিনি সাইদুল হক চুন্নু, দীর্ঘ রোগভোগের পর আজ ভোরে চলে গেলেন পরলোকে। তবে তিনি তাঁর এতদিনের স্বপ্নের সার্থক রূপ দেখে যেতে পেরেছেন। সাইদুল হক চুন্নু পাবনাবাসীর কাছে দেবতা। তাঁকে শেষ বিদায় জানাল পাবনাবাসী চোখের জলে।

অনেকেই বলবেন, একসময় ভিটেমাটি-ছাড়া করে এখন সুচিত্রা সেন সেলেব্রিটি বলেই তাঁকে নিয়ে নতুন ব্যবসা ফেঁদেছেন এরা। কিন্তু না, যে বাড়িতে সুচিত্রা সেন প্রথম আলো দেখেন সেই জন্মভিটে উদ্ধারে জড়িয়ে থাকে অনেক স্বপ্ন। কিছু ধর্মান্ধ দাঙ্গাবাজদের সামনে রেখে সমগ্র পাবনাবাসীকে বিচার করা উচিৎ না। এই বাড়ি উদ্ধারে হিন্দু-মুসলিম এক হয়ে লড়েছেন তাঁরা দীর্ঘদশক। যেখানে কলকাতায় আঁতেল ফিল্মবোদ্ধারা উত্তম-সুচিত্রা মেনস্ট্রিম হিরো-হিরোইন বলে খাটো করতেই ব্যস্ত, কোনও ইতিহাস সংরক্ষণ নেই, সেখানে পাবনাবাসী সুচিত্রা সেনকে এতটা সম্মান দিয়েছেন। তাঁর জন্মভিটেকে বাঁচিয়ে রেখেছে সমারোহে। যা সত্যি কুর্নিশযোগ্য।

You might also like