Latest News

বম্বে থেকে এল কালা, শট দিল ইচ্ছেমতো! মন্দারের হায়েস্ট পেইড ‘অ্যাক্টর’

শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়

“পিত্তি দিয়ে গাঁথব মালা, পচা রজনীগন্ধার
মিলব যেদিন চারজনেতে আমি, পেদো, কালা, মন্দার৷”

এই সংলাপ বলার পরে গেইলপুরের ডাইনি মজনু বুড়ি মাটিতে পড়ে থাকা এক মাছের শরীরে গেঁথে ফেলল বঁড়শি। তার পরেই উৎকট ভঙ্গিতে নাচতে শুরু করল ডাইনি বুড়ির ছেলে পেদো। ‘মন্দার’ ওয়েবসিরিজের শুরুর এই দৃশ্য দেখেই একটু নড়ে বসতে হয়। বুঝে ফেলা যায়, আর পাঁচটা বাংলা গল্পকথার মতো নয় এই কাহিনি।

‘মন্দার’ পরিচালক অনির্বাণ ভট্টাচার্য উইলিয়ম শেক্সপিয়রের ‘ম্যাকবেথ’-এর নির্যাস এনে ফেলেছেন কাল্পনিক জায়গা গেইলপুরের নিম্নবিত্ত উপকূলবর্তী মানুষদের জীবনকাব্যে। এ ছবিতে সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম সবকিছুর দুর্দান্ত ব্যবহার দর্শকদের বেশ ভাবায়।

তাই ডাবলু ভাইয়ের স্ত্রী থেকে থেকে শুরু করে ডাইনি বুড়ির পোষ্য বিড়াল  এমনকি বুড়ির মাছ গাঁথার বঁড়শিটা পর্যন্ত সিরিজটিতে নিজেদের মেলে ধরার সুযোগ পেয়েছে। মন্দারের শ্রেষ্ঠ প্রাপ্তি বলা যায় ম্যাকবেথের তিন ডাইনির বঙ্গ-রূপ। তিন ডাইনি হয়ে গেছে মা মজনু বুড়ি, ছেলে পেদো এবং পোষ্য বিড়াল কালা।

মজনু বুড়ির চরিত্রটি যে পুরুষ অভিনেতা সজল মণ্ডল করেছেন এমন দাপটের সঙ্গে, সেটাই এখনও বিশ্বাস করতে পারছেন না অনেকে। তাঁর দুর্দান্ত প্রস্থেটিক মেক আপ করেছেন সোমনাথ কুন্ডু ও তাঁর সহকারীরা। সজলের ডাইনি বুড়িকে দেখে এমন অভিনেতাকে প্রণাম জানিয়েছেন দর্শকরা। অন্যদিকে হাড়গিলে দ্বিতীয় ডাইনি পেদো চরিত্রে সুদীপ ধাড়া যেন বিবেক হয়ে এসে দাঁড়াচ্ছে মন্দারের সামনে বারবার।

মজনু-পেদো দুই ডাইনি ছাড়াও তৃতীয় ডাইনি কালা-ও কিন্তু সকলের মন জয় করেছে। যে একটা বিড়াল। উইলিয়ম শেক্সপিয়রের একটা চরিত্র যে বিড়াল হতে পারে এইভাবে তা করে দেখালেন অনির্বাণ ভট্টাচার্য।

বম্বে থেকে এল কালা 

মন্দারের একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র ‘কালা’ বিড়াল। ছবিতে সেও আরেক ডাইনি। একটি প্রাণী যে এভাবে কোনও ছবিতে বা ওয়েবসিরিজে এতটা দুরন্ত হয়ে উঠতে পারে, তা বিগত কয়েক দশকে দেখা যায়নি। ছবি জুড়েই রয়েছে এই কালো বিড়ালটি। পরিচালক অনির্বাণ এমন একটি চরিত্র সৃষ্টি করার পর অনেক খুঁজে সন্ধান পান এই বিড়ালটির।

তবে এই বিড়ালের খোঁজ সারা বাংলায় পাওয়া যায়নি। একেবারে মুম্বই থেকে এসেছে এই কালো বিড়ালটি। তবে এ বিড়াল যে সে বিড়াল নয়। বলিউডের হিন্দি ছবিতে বেশ অনেকগুলো কাজ আগেই করেছে সে। তার নাম ‘কালি’।

ক্যামেরাফ্রেন্ডলি কালার পারিশ্রমিক বাকিদের থেকে অনেক বেশি

কালা বিশেষভাবে প্রশিক্ষণ পাওয়া বিড়াল। সে এতটাই প্রশিক্ষিত, যে কিনা ভীষণ কঠিন দৃশ্যও ঠিকমতো উতরে দিতে পারে! এই কারণেই বম্বের এই কালি বিড়ালকে আনা হয়। মন্দারের নায়ক নায়িকা বা বাকি দুই ডাইনির থেকে কালির পারিশ্রমিক ছিল অনেক বেশি। শুনতে আশ্চর্য লাগলেও এটাই বাস্তব।

তবে এমনি এমনি এত চড়া পারিশ্রমিক নয় তার। বিড়ালটি আগে অনেক ছবি, ওয়েবসিরিজ, সিরিয়ালে অভিনয় করেছে। তাই সে বেশ ক্যামেরা ফ্রেন্ডলি। এমনকি বিড়ালের শ্যুটিং দেখতে স্থানীয় লোকজন ভিড় করলেও তার তাতে কিছু এসে যায় না। সে খুব একটা ভয় পায় না লোকজনকে, কাউকে আক্রমণ করে কামড়ে-আঁচড়ে দেওয়াও তার স্বভাব নয়। সারা শ্যুটিং পর্বে সে দিব্যি ইউনিটের সকলের কোলে কোলে ঘুরে বেড়াত। সাড়াও দিত কালি ডাকে। আবার রাতে খাঁচার মধ্যে ঘুমোত আরাম করে।

মন্দারমণি ও তাজপুরে মোট ন’দিন হয়েছিল ছবির শ্যুটিং। সবদিনই কালি হাজির ছিল শ্যুটিং স্পটে। সঙ্গে ছিল তার একজন ট্রেনার। পরিচালক অনির্বাণ কেমন দৃশ্য চাইছেন বিড়ালটাকে দিয়ে করাতে, সেটা বুঝিয়ে দিতেন ওই ট্রেনারকে। তারপর ট্রেনার বিড়ালকে বুঝিয়ে সেটা করাতেন। ট্রেনারের নির্দেশ ছাড়া অবশ্য বিড়ালটি কোনও টেকই প্রায় দিত না।

কালিকে দিয়ে এইসব কঠিন দৃশ্যে অভিনয় করানোর কিছু সুচারু পদ্ধতিও ছিল। কালি ক্যাটস ফুড খেতে খুব পছন্দ করে। তাই ট্রেনার সঙ্গে নিয়েই ঘুরতেন ওই খাবার। ওয়েবসিরিজে যে বিভিন্ন কাজ করতে দেখা যাচ্ছে কালাকে, সেটা তাকে খাবারের লোভ দেখিয়েই করানো হয়েছিল। যে শটই সে দিত, অথবা এগোনো ও পিছোনোর কোনও শট থাকলে, ক্যাটস ফুড দিয়েই সিনটা টেক করা হত। চকলেট কালারের ট্যাবলেটের মতো দেখতে এই ক্যাটস ফুড কালির জন্য যেমন লোভনীয়, তেমনই এরকম রেডিমেড ফুড আউটডোর শ্যুটিংয়ে সঙ্গে নেওয়াও সুবিধে।

তবে বিড়াল হলে কী হবে, কালির মুড না হলে সে কোনও কাজই করবে না। শট দিতে বেশ দেরি করত সে। দরকারমতো তাকে দিয়ে কাজটা করিয়ে নেওয়ার জন্য ইউনিটের সব অভিনেতা টেকনিশিয়ানকেই অপেক্ষা করতে হত।  শেষ দৃশ্যে যেখানে বিড়ালটা মন্দারের গায়ের উপর দিয়ে আসছে, সেটাও করানো হয়েছে সাত-আটটা টেকে।

অনির্বাণদা বিড়ালটা গ্রাফিক্সে হবে তো!

মন্দারে ডাইনি বুড়ির ছেলে, হাড়গিলে চেহারার পেদোকে দেখে সবাই ভয় পেয়ে গেছে। তার নোনা জলে কাঁকড়া ধরা বা বিড়াল কোলে নিয়ে বসে থাকা দেখে অনেকর গা শিউরেও উঠছে। তবে সেই পেদো নিজে কিন্তু বাস্তবে বিড়াল বা কাঁকড়া ধরতে খুব ভয় পায়!

‘অনির্বাণদা বিড়ালটা গ্রাফিক্সে হবে তো!’ এই কথাটাই বারবার সুদীপ ধাড়া জিজ্ঞেস করতেন ছবি শুরুর আগে। লাঠি দিয়ে টায়ার ঘোরাতে পারা আর সাঁতার কাটার গুণাবলে পেদো চরিত্রে সিলেক্ট হন সুদীপ, সঙ্গে অবশ্যই ছিল চার বছর বয়স থেকে নাটকের তালিম। কিন্তু বিডন স্ট্রিটের ছেলের ছিল বিড়ালে ভীষণ ভয়। আর শহুরে ছেলে হওয়ায় কাঁকড়া ধরার অভিজ্ঞতাও নেই।

চিত্রনাট্য হাতে পাওয়ার সঙ্গে-সঙ্গে সুদীপ পড়ে দেখেছিলেন, তাঁর সঙ্গে রয়েছে একটা বিড়াল। আজকাল বেশিরভাগ ছবিতেই যেমন গ্রাফিক্সের সাহায্যে পশু-প্রাণী দেখানো হয়, সেটাই হবে বলে সুদীপ ভেবেছিলেন। অনির্বাণও সুদীপকে আগে থেকে কিছু বলেননি।

বিড়ালে খুব ভয় পেদো সুদীপের!

কিন্তু শ্যুটিং স্পটে গিয়ে সুদীপের চক্ষু চড়কগাছ! বললেন, “স্পটে গিয়ে দেখি বম্বে থেকে এসছে কালো বিড়াল। আমি তো বিড়ালের থেকে শতহাত দূরে। সেই আমাকেই শট দেওয়ার আগে অনির্বাণদা বলল, ‘তুই কালিকে কোলে করে আগে সারাদিন ঘোর, ওকে কোলে নিয়ে সারাদিন বসে থাক। তাহলে তোর ভয় কেটে যাবে।’

কিন্তু আমি সে কথা শুনব কী, ভয়েই অস্থির। আমি একবারেই কালি বিড়ালকে নিয়ে শট দিয়েছিলাম। বিড়াল কোলে করে বসে থাকার যে দৃশ্যটা আমার আছে, সেটা। কোনও রকমে বিড়ালটাকে কোলে নিয়েই ছেড়ে দিই। এই নিয়ে অনির্বাণদা আমায় বেশ একটু বকাবকিও করল, বলল, ‘তোকে বললাম বিড়ালটাকে কোলে নিয়ে আগে থেকে অভ্যেস করতে, তুই শুনলি না। এখন ভয় পাচ্ছিস!’যাই হোক, ওই বিড়াল কোলে নেওয়া আমার কাছে খুব ভয়ের ব্যাপার ছিল। ভাল ভাবে শটটা যে উতরে দিতে পেরেছি, সেটাই যথেষ্ট। এই একই জিনিস আমার কাঁকড়া ধরা নিয়েও হয়েছিল। সাগরের নোনা জল থেকে কাঁকড়া তুলে আনলাম এই প্রথম। সবটাই অনির্বাণদা সাহস আর ভরসা দিয়েছিল বলে সম্ভব হল।

তবে কালা খুব ঠান্ডা বেড়াল। আমাদের একটা দৃশ্য ছিল, আমায় কোলে নিয়ে বসে আছে মজনু ডাইনি আর কালা বিড়ালের গায়েও হাত বোলাচ্ছে সে। ওই দৃশ্যটা রাতে টেক হয়েছিল, ভীষণ ঠান্ডায়। যেহেতু সামনেটায় আগুন জ্বলছিল, শট নেওয়ার সময়ে তাই বিড়ালটা খুব আরাম করেই বসেছিল। আর যেটা বুঝতে পারেননি দর্শকরা, সেটা হল, বিড়ালটার পায়ে একটা দড়ি বাঁধা ছিল। তাই ওকে সহজে শট দেওয়ানো সম্ভব হয়েছিল।”

ডাইনি মা ছেলের কালা বেড়াল নিয়ে মজা

ডাইনি মজনু বুড়ির চরিত্রে অভিনয় করা সজল মণ্ডল বললেন “আমি যেহেতু সুন্দরবনের ছেলে, বাঘ দেখে অভ্যস্ত, তাই বাঘের মাসি বিড়ালকে হ্যান্ডেল করতে খুব একটা ভয় পাইনি। ছোট থেকেই বিড়াল-কুকুর সামলাতে আমি অভ্যস্ত। কিন্তু সুদীপ যেহেতু শহরে বেড়ে উঠেছে ওর পক্ষে বিড়াল সামলানো মুশকিল ছিল।

সে যাই হোক, আমার আর সুদীপের মধ্যে খুনসুটি চলতেই থাকত। একটা মজার ঘটনা বলি। সুদীপ যে সিনে বিড়ালটাকে কোলে নিয়ে বসবে, তাতে বিড়ালকে একটা টেকনিকে ধরতে হয়। সুদীপ যেহেতু কিচ্ছু জানে না, তাই বিড়ালের হাত-পাগুলো সুদীপের উরুতে গিয়ে পড়ছে আর ও ভয় পেয়ে ডায়লগ বলতে পারছে না।

ল্যাপেল মাইকে ব্যাপারটা শ্যুট হচ্ছিল, যা সবাই শুনতে পাবে না। আমি তাই আমার আর সুদীপের পার্সোনাল স্পেস বানিয়ে সুদীপকে গাল দিচ্ছিলাম, ‘একটা বিড়াল হ্যান্ডেল করতে পারিস না কী করে করবি অভিনয়!’সুদীপ বলছে, ‘না সজলদা, হচ্ছে না। একে কোলে নিয়ে আমার কেমন যেন করছে!’ এবার আমি তো জানি না, আমার বকাবকিগুলো কানে মাইক দিয়ে অনির্বাণরা ওদিকে শুনছে। ইউনিটের বাকিরা বলছে, ‘শোন শোন, পচাদা (সজলের ডাক নাম) কী বলছে!’ আমি তো ভেবেছি ব্যক্তিগত ভাবে বলছি, কিন্তু সেটা তখন সবাই শুনে ফেলেছে!

অনির্বাণ অবশ্য ব্যাপারটা খুব মজা করে নিয়েছিল। দেবেশ রায়চৌধুরী, অনির্বান, সুমনা মুখার্জী, দেবাশিস, সোহিনী– আমরা সবাই যেহেতু থিয়েটার করে এসেছি আগে, তাই শ্যুটিংয়ের দিনগুলো বেশ সেকেন্ড ফ্যামিলির মতোই কেটে গেছিল মজা করে।”

সত্যিই তাই। তিন ডাইনি মজনু, পেদো, কালার মধ্যে ওই শ্যুটিংয়ের সময়েই এত ভাল বন্ডিং গড়ে ওঠে যে ক্যামেরার প্রতিটা শটে সেটা প্রকাশ পায়।

তবে কালা বিড়ালের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শটটা বেশ কঠিন ছিল। সেটা ছিল মন্দারের শেষদিকের একটা দৃশ্য, যখন মন্দার আর লাইলির ঘরের জানলায় গিয়ে বিড়ালটা উঁকি মারবে। ওই শট নিয়ে বেশ বেগ পেতে হলেও শেষ অবধি একটা দারুণ শট দেয় কালা।

“কালা, এই কালা, চল ঘর চো”… মজনু ডাইনির কালাকে ডাকা সংলাপ আর এক অব্যর্থ আবহ সঙ্গীতে যেন ‘মন্দার’-এর সার্থক সমাপ্তি হয়।

পেদো সুদীপ আর মজনু সজল, মন্দারের নক্ষত্র তাঁরা, বাংলা অভিনয়ের সম্পদ

You might also like