Latest News

‘জয়জয়ন্তী’র সেই ছোট্ট লিলিই সুজয়প্রসাদের মা, চলে গেলেন সিনেমার ৫০তম বছরে

শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়

ছোটবেলায় ‘ছুটি-ছুটি’তে দেখা লিলি (lily), ডলি, ইমলি, বাপ্পা, খোকনদের মনে পড়ে? চেনা চেনা লাগছে নামগুলো?

১৯৭১ সালে মুক্তি পেয়েছিল ছোটদের আইকনিক ছবি ‘জয়-জয়ন্তী’ (joyjoyonti)। যে ছবির বয়স আজ পঞ্চাশ বছর। সুবর্ণ জয়ন্তী পার করেও দর্শকদের কাছে উত্তম-অপর্ণা অভিনীত ‘জয় জয়ন্তী’ ছবি নিয়ে ভাল লাগা  এতটুকু ম্লান হয়নি। ছবিতে উত্তমকুমারের ছিল এক গুচ্ছ ভাগ্নে-ভাগ্নী। বাপ-মা মরা দুরন্ত বিচ্ছু ভাগ্নে-ভাগ্নী লিলি, ডলি, ইমলি, বাপ্পা, খোকনদের দেখভাল করতে হাজির হয়েছিলেন গভর্নেস জয়ন্তী ওরফে অপর্ণা সেন। তিনিই স্নেহ, ভালবাসা না পাওয়া বাচ্চাগুলোর মা হয়ে উঠেছিলেন।

‘আমরা তো আর ছোট নেই, আর ছোট নেই,
যেখানেই থাকি সেখানেই ভাল থাকব…’

এই লিলি, ডলি, ইমলি, বাপ্পা, খোকনরা বড়বেলায় কেমন হল সে খোঁজ আর সেভাবে রাখা হয়নি বাঙালির। কিন্তু উত্তম কুমারের বড় ভাগ্নী লিলির কথা বললে আজ অনেকেই চিনতে পারবেন। সে ছিল ওই সিনেমার বাচ্চা গ্যাংয়ের ক্যাপ্টেন। তখন সে কৈশোরে। তারপর কেটে গেছে পঞ্চাশটা বসন্ত। কী অদ্ভুত সমাপতন, ‘জয় জয়ন্তী’ ছবির পঞ্চাশ বছরেই ২০২১ সালের হেমন্তেই চলে গেলেন লিলি অর্থাৎ সুচেতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বিয়ের পরে তিনি হন সুচেতা চট্টোপাধ্যায়। তাঁর আরও এক পরিচয়, তিনি অভিনেতা, বাচিকশিল্পী ও পরিচালক সুজয়প্রসাদ চট্টোপাধ্যায়ের মা।

সুচেতা চট্টোপাধ্যায়ের প্রয়াণ যতই দুঃখের হোক, তবু তাঁকে বিষাদপ্রতিমা রূপে মানায় না। তিনি যে আদতে বাঙালির ঘরে ঘরে ফোটা প্রাণচঞ্চল লিলি ফুল! ছোটবেলার নস্ট্যালজিয়া ‘আমাদের ছুটি ছুটি চল নেবো লুটি ওই আনন্দ ঝরনা’। আজ শিশু দিবসে সেই লিলি সুচেতারই খোঁজ, তাঁর সুযোগ্য পুত্র সুজয়প্রসাদের মাধ্যমে।

সুচেতা দেবী তো বাংলা ছায়াছবির একটি অংশ। এককালের অভিনেত্রী, নামকরা কত সব ছবি করেছেন, তাই না?

শিশু দিবসে মায়ের সিনেমা-জীবন নিয়ে প্রতিবেদনের ভাবনা অভিনব। তবে মা নিজের ফিল্ম জীবন নিয়ে আলোচনা করতেন না। মা চাইতেন না তাঁর ফিল্ম জীবন নিয়ে সেভাবে চর্চা হোক। কারণ তিনি আদ্যোপান্ত একজন প্রাইভেট পার্সন ছিলেন এবং আড়ালে থাকতেই পছন্দ করতেন। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর ইচ্ছেটাকে আমি মর্যাদা দিতে যাই।

মায়ের হাই ডায়াবেটিস ছিল বহুদিন। শেষে হার্ট ফেল করে মারা গেলেন, হঠাৎই। মায়ের মৃত্যু যেমন অপূরণীয় শূন্যতা, তেমন এটাও ঠিক মায়ের মৃত্যু অনেক ক্ষেত্রে আমায় উত্তরণের পথ চেনালো। অনেক মানুষকে নতুন করে চেনালো। তবে আমার কোনও ক্ষোভ নেই। আমি আমার মতো করেই মায়ের জীবনটা উদযাপন করব। আমার মাকে অগণিত মানুষ ভালবাসতেন। যারা চিনতেন মাকে তাঁরা মাকে ভালবেসেছিলেন। সেটা আমি টের পেয়েছি মায়ের মৃত্যুর পরও। যারা চিনতেন না তাঁরাও ভালবাসতেন মায়ের জীবনদর্শনটাকে।

তাই কি সকলে জানলই না ‘জয় জয়ন্তী’তে উত্তমকুমারের সেই মিষ্টি ভাগ্নী লিলি আসলে সুজয়প্রসাদের মা?

মাকে নিয়ে পাবলিসিটি করতে আমি কোনও দিনই চাইনি। মাও কখনও চাননি। তাই কেউ জানে না। কিন্তু এ নিয়ে আমাদের কোনও আক্ষেপ ছিল না, নেই। ‘পাবলিসিটি’ কথাটাও খুব গুরুত্বপূর্ণ। যাঁদের বাবা, মা, ঠাকুরদা, দাদু, ঠাকুমা, দিদিমা বিনোদন জগতে থাকেন তাঁরা সেই নাম পুঁজি করে নিজের প্রচার করে থাকেন। কিন্তু আমি কখনও মায়ের নাম বিক্রি করিনি। এখানেই প্রথম কথা বলছি মায়ের অভিনেত্রী সত্ত্বা নিয়ে।

তাছাড়া মা তো সে অর্থে পাবলিক ফিগার ছিলেন না। আমার মা সুচেতা বন্দ্যোপাধ্যায় যে দুটো ছবি করেছেন, সেই দুটো কাল্ট ছবিই অত্যন্ত জনপ্রিয়। ‘বনপলাশীর পদাবলী’ এবং ‘জয় জয়ন্তী’। এছাড়াও সৌমিত্র-তনুজা অভিনীত ‘অপর্ণা’ ছবিতে সুচেতা বন্দ্যোপাধ্যায় গুরুত্বপূর্ণ অতিথি শিল্পীর ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন। আরেকটা ছবি রিলিজ করেছিল কিনা জানি না, ছবির নাম ‘প্রতিদান’ (সাদা কালো)। মা সেই ছবিতে নায়িকার ভূমিকায়। মায়ের বিপরীতে নায়ক ছিলেন পার্থ মুখোপাধ্যায়।

এত বড় বড় ছবিতে কাজ করে, উত্তমকুমারের সাথে কাজ করে, সুচেতা দেবীকে পরে আর ফিল্ম জগতে আমরা পেলাম না কেন?

বিয়ের পর মা ফিল্ম জগতকে বিদায় জানান। আমার বাবার নাম তারাপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়। কর্পোরেট সেক্টরে চাকরি করতেন। বিয়ের পরেও আমাদের বাড়িতে এসে পরিচালক ইন্দর সেন মাকে ছবি করার অফার দিয়েছেন, কিন্তু মা করেননি। শ্বশুরবাড়ি থেকে মাকে ছবি করতে দেয়নি সেটা বলব না। মা নিজেই দাঁড়ি টানতে জানতেন। মাকে বম্বে থেকে ‘ইশক্ পর জোর নেহি’ ছবির জন্যও অফার করা হয়েছিল। মা বম্বের ছবির অফার ফিরিয়ে দিয়েছিলেন।

সত্যজিতের ‘লুক’ যতই অবিকল হোক, জিতুর পাখির চোখ অভিনয়ই

নিজেকে জাহির করা মায়ের রক্তে ছিল না, আমাদের যা করতে হয় মাঝেমধ্যেই জনসংযোগ বজায় রাখার জন্য। মা কখনই তা করেননি। মাকে একবার-দুবার আমি জিজ্ঞেস করেছি ‘তুমি আর সিনেমা করলে না কেন?’ তখন মা বলেছেন, ‘আমার আর ইচ্ছে করল না। আমি চেয়েছি সংসার করতে, তোমাকে মানুষ করতে, কাজ করতে নিজের মতো।’আমার মা কিন্তু নিজের বুটিক করেছেন সেই তখন, যখন কলকাতায় ডিজাইনার পোশাকের চিহ্নমাত্র ছিল না। ‘সিরাজ’ রেস্টুরেন্টের ওপরে মা আর কৃষ্ণা মাসি দুজনে মিলে চালাতেন বুটিক।

উত্তম কুমারের সঙ্গে স্ক্রিন-শেয়ার আবার উত্তমকুমারের পরিচালনায় কাজ করেছেন সুচেতা দেবী। মায়ের থেকে শুনেছেন উত্তমকুমারের গল্প?

মা ভীষণ প্রাইভেট পার্সন ছিলেন। উনি পছন্দ করতেন না প্রকাশ্যে এসব বলা নিজ প্রচার করা। উত্তমকুমারের সঙ্গে কাজ করলে সবাই বলেন কিন্তু আমার মাম সেটা কখনো প্রকাশ্যে আনেননি। এমনকি অপর্ণা সেন বা অন্য সহ-অভিনেতাদের সঙ্গেও কখনও কোনও অনুষ্ঠানে দেখা হলে কথা বলতেন কেবল, এটুকুই।

অপর্ণা সেন ওঁর পরিচালিত কোন ছবিতে সুচেতা দেবীকে অভিনয় করার অফার দেননি কখনও?

না না, উনি কখনওই অফার দেননি মাকে। রিনাদি নিজে থেকে কোনও যোগাযোগ করতেন না, মা-ও কোনও যোগাযোগ করতেন না। কোনও বাড়াবাড়ি ছিল না মায়ের। আমিও মায়ের নাম করে কখনও কোনও পরিচালকের কাছে যাইনি।

সুজয়প্রসাদ যখন বিনোদন ক্ষেত্রে ফিল্ম জগতে এলেন তখন সুচেতা দেবী কী বলেছিলেন?

মা আমার অভিনয় জগতে আসা একদম পছন্দ করতেন না। কিন্তু পরে মেনে নিয়েছিলেন। সন্তান যে শিল্প বেছে খুশি থাকছে, মা সেটাই চেয়েছিলেন পরে। সেই দ্বন্দ্বটা আমার নিজের ক্ষেত্রেও হয়েছিল। আমি অভিনয় জগতে আসার আগেই সবার কাছে পরিচিত, সে বাচিকশিল্প হোক বা অন্য সব কাজ দিয়ে।

‘সুজয়প্রসাদ কেন এত মেয়েলি!’ এটা নিয়ে আপনার মা কী জবাব দিতেন অন্যদের?

মায়ের সঙ্গে এই নিয়ে কোনও দিনই আমার আলোচনা হত না। আমি তাঁর সন্তান, আমি যেমন আমি তেমন। আমার মা আমাকে সম্মান করতেন এবং আমি আমার মাকে সম্মান করতাম। সমাজের কথায় কিছুই যায় আসে না আজ আর। আমি আমার লড়াই লড়েছি। প্রত্যেককে নিজের লড়াই লড়তে হবে। আমি অনেকের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করেছি আমার অজান্তেই। আজ অনেক মানুষ আমার দিকে ফিরে চায় সাহস কুড়োনোর জন্য। আমি তাদের আলো দিয়ে চলেছি। নারীসুলভ বা পুরুষসুলভ বলে কিছু হয় না, মানুষ মানুষ হয়।

আপনার পরিচালনা করা প্রথম ছবি ‘হোম’ শর্ট ফিল্ম। সেটা নিয়ে একটু বলুন?

অরুন্ধতী সুব্রহ্মণ্যমের কবিতার নির্যাস নিয়ে তৈরি করেছি এই শর্ট ফিল্ম ‘হোম’। কবিতাটির দৃশ্যায়ন শুধু নয়, উত্তরণও বটে এই ছবি। কবিতাটা যেখানে শেষ হয়, ছবিটা সেখানে শুরু হয়। লিঙ্গ বৈষম্য, পিতৃতন্ত্রের কথা, নারীর যৌন অধিকার, মানবতার কথা, নিজের শিকড় খুঁজে পাবার অভিলাষ, এই সবকিছু এই ছবির পরতে পরতে আছে। ‘হোম’ সাদা কালো ছবি, নন-ন্যারেটিভ নির্বাক ছবি। ছবিটি এখন বিভিন্ন ফিল্ম ফেস্টিভালে যাবে। তারপর আমার দুই প্রযোজক বন্ধু দীপক বাজাজ ও অরিত্র সেনের সহায়তায় ওটিটি প্ল্যাটফর্মে হয়তো দেখানো সম্ভব।ছবিতে অভিনয় করেছেন সোহাগ সেন, অপরাজিতা আঢ্য, সোহিনী সরকার, সুদীপা বসু, বিদীপ্তা চক্রবর্তী, চান্দ্রেয়ী ঘোষ প্রমুখ। একটা ছবি কখনও পরিচালকের একার হয় না। এটা আমাদের টিম-ওয়ার্ক। ওয়ার্কশপ করেছেন, অভিনয়ও করেছেন সোহাগ সেন। ক্যামেরার কাজ করেছেন মধুরা পালিত। আমার দীর্ঘদিনের বন্ধু ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত আমাদের পোস্টার টিজার লঞ্চ করে প্রেজেন্ট করেছেন।

সিরিয়ালে সুজয়প্রসাদকে আর দেখা যাচ্ছে না কেন? ‘ত্রিনয়নী’র নেগেটিভ চরিত্র তো বেশ জনপ্রিয় হয়েছিল!

ডাকছে না তাই। ডাকলে তো যাব! সম্প্রতি স্টার জলসায় ‘তিতলি’ সিরিয়ালে অভিনয় শেষ করলাম। আবার কেউ ডাকলে করব। আগে আক্ষেপ ছিল, এখন আর আক্ষেপ করি না। কারণ আমি জানি আমার যেটুকু পাওয়ার আমি পাব। আমি কোনও গোষ্ঠীতে পড়ি না। গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের বাইরে থেকে যেটুকু কাজ আসার, নিশ্চয়ই আসবে।পলিটিক্স হয়েছে আমার সঙ্গে। যেমন সব সিরিয়ালের কাস্টরা দাদাগিরি, দিদি নম্বর ওয়ানে যায়, আমাকে কখনও ডাকেনি। ‘ত্রিনয়নী’ সিরিয়ালে আমার নেগেটিভ শেডের রোল ভীষণ জনপ্রিয় হয়, কিন্তু বাকিদের রিয়্যালিটি শোয়ে ডাকলেও আমি বাদ।
আমাকে কোনও টেলিভিশন চ্যানেল প্রোমোট করেনি।

পুরস্কার প্রাপ্তিতেও কি আক্ষেপ রয়েছে অভিনয় জীবনে?

‘ত্রিনয়নী’ সিরিয়ালে আমার নেগেটিভ শেডের চরিত্র মানুষ এত নিল কিন্তু চ্যানেলের পুরস্কার পাইনি। তাতে কী অসুবিধে! এখনও লোক আমায় ডেকে বলে ‘ত্রিনয়নী’তে আপনার অভিনয় আমরা ভুলতে পারি না। বাংলাদেশের একজন উচ্চশিক্ষিত বিদুষী হিউম্যান রাইটস লইয়ার মহিলা একটা ককটেল পার্টিতে আমায় বলেছিলেন “আমরা ‘ত্রিনয়নী’ দেখি আপনার জন্য, আপনি কখন আসবেন পর্দায় আমরা অপেক্ষা করি।” কী বিরাট প্রাপ্তি বলো তো!তার পর এক বন্ধুর বাড়ি গেছি, সেই বাড়ির পরিচারিকা মেয়েটিকে যখন বললাম  যে জল দাও, খাব। সে তখন আমাকে বলল অল্প ধমকে, “দিচ্ছি বাপু দাঁড়াও! খালি তো সংসারে অশান্তি লাগাও! এই তো তোমার কাজ।” তো এগুলোই তো পুরস্কার। নাই বা পেলাম বিশেষ কোনও চ্যানেলের বিশেষ কোনও পুরস্কার!

পড়ুন দ্য ওয়ালের সাহিত্য পত্রিকা ‘সুখপাঠ’

You might also like