Latest News

সাধের অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ‘ওঁরা’, তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের মূলস্রোতে আনল ‘খড়কুটো’

শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়

অর্ধনারীশ্বর, শিব ও পার্বতীর সম্মিলিত রূপ। বহু প্রাচীন বনেদি পরিবারে এই অর্ধনারীশ্বর মূর্তি পূজিত হতেও দেখা যায়। মহাভারতেও রয়েছে এমন নারী-পুরুষের মিশ্রণ চরিত্র, যাদের আমরা আজকাল বলি তৃতীয় লিঙ্গ। মহাভারতের এইরকম একটি চরিত্র শিখণ্ডী। আবার অপ্সরা ঊর্বশীর প্রেমপ্রস্তাব অর্জুন প্রত্যাখান করলে অর্জুন ঊর্বশীর অভিশাপে তৃতীয় লিঙ্গে পরিণত হন। কৃষ্ণ অর্জুনকে বলেন যে, পাণ্ডবদের অজ্ঞাতবাসের ক্ষেত্রে এই অভিশাপ ফলপ্রসূ হবে। অর্জুন বৃহন্নলা নাম গ্রহণ করেন এবং নারীর পোশাক পরিধান করেন। এরপর তিনি বিরাট রাজার রাজ্যে প্রবেশ করেন, রাজকন্যা উত্তরা ও তাঁর সহচরীদের সংগীত ও নৃত্যকলার শিক্ষাদান শুরু করেন। হিন্দুশাস্ত্র ‘ইলার কাহিনি’তে ইলা ছিলেন এক রাজা। তিনি শিব ও পার্বতীর অভিশাপে এক মাস পুরুষ রূপে এবং পরবর্তী এক মাস নারী রূপে দেহধারণ করতেন।

বহুচারা মাতা হলেন হিজড়া বা তৃতীয় লিঙ্গ মানুষদের দেবী। যে দেবী অপ্রচলিত অনেকেরই অজানা। তিনি একটি মোরগের পিঠে বসে থাকেন এবং হাতে ধরে থাকেন একটি তরবারি, ত্রিশূল ও একটি বই।
হিজড়ারা সমাজের অঙ্গ অথচ তাঁরা প্রান্তিক, অস্পৃশ্য, অচ্ছুত হয়েই রয়ে গেছেন সমাজে। তাঁদের ঘিরে মানুষের অদম্য কৌতূহল। এই কৌতূহল হয়তো আরও ওঁদের আমরা ঘেন্নার চোখে দেখি বলেই। কিন্তু ওঁরা তো কোনও বাবা-মায়ের সন্তান। সমাজের চলে আসা নিয়মে হিজড়া সন্তানরা অনেকসময় জায়গা পায়না নিজের বাড়িতে। তাঁরা যাবে কোথায়?

বহুচারা দেবী

মূলধারার সমস্ত উৎসবে অনুষ্ঠানে আমরা হিজড়াদের অশুভ বলে সরিয়ে রাখি চিরকাল। জন্মলগ্ন থেকেই যাদের সমাজ ঘৃণার চোখে দেখে তাঁদের বেঁচে থাকাটাই তো অভিশপ্ত। সরকারের তরফ থেকেও হয়নি মানুষগুলোর জন্য সে অর্থে কাজের ব্যবস্থা। তাই তাঁদের এই বাচ্চ-নাচানো পেশা বা ট্রাফিক সিগনালে রমরমা।

‘না মাসি, আজ পয়সা নেবনা। ভাবলাম পাশের দোকানে চা হচ্ছে তোমায় চা খাওয়াই’। একটি বিজ্ঞাপনে সম্প্রতি এভাবেই হিজড়াদের নতুন রূপে দেখানো হচ্ছে। যা সত্যি কুর্নিশযোগ্য।

জি বাংলার ‘ফিরকি’ সিরিয়ালে তৃতীয় লিঙ্গ মায়ের গল্প ছিল। যদিও চিত্রনাট্য মূল গল্প থেকে সরে যায়। তারপর ছোটপর্দায় আর সেভাবে পাওয়া যায়নি এই প্লট।

সম্প্রতি স্টার জলসার জনপ্রিয় মেগা ‘খড়কুটো’তে তৃতীয় লিঙ্গর মানুষদের বিশেষ অতিথির সম্মান দেওয়া হল এবং হিজড়াদের নিয়ে ভাবা হল একটি আস্ত প্লট। শুধু তাই নয়, হিজড়া বোনেরা অভিনয়ও করলেন এই সিরিয়ালে স্বনামধন্য সব অভিনেতা অভিনেত্রীদের সঙ্গে।‘খড়কুটো’ সিরিয়াল জনপ্রিয় হয়েছে একটা পরিবারের মজার মজার কাণ্ডর দৌলতে। যা সচরাচর ঘটেনা সেটাই ঘটে এই পরিবারে। তাঁদের বাড়ির নতুন বৌমা গুনগুন আরও বিখ্যাত তাঁর বেফাঁস কথার জন্য। যার জন্য বর সৌজন্যর কাছে গুনগুন বকাও খায়। আবার তাঁর বেফাঁস কাণ্ডর জন্য পরিবারে অনেক নতুন কিছু ভালোমন্দ কাণ্ডকারখানাও ঘটে। ঠিক যেমন এই কাণ্ডটাও ঘটিয়েছে গুনগুন।বাড়িতে গুনগুনের বড় জা মিষ্টির সাধ। সেখানে স্বভাবতই আত্মীয় কুটুম্বরা এসেছেন। কিন্তু মিষ্টির সাধের অনুষ্ঠানে রাস্তায় আলাপ হওয়া হিজড়াদেরও নেমন্তন্ন করে এসেছে গুনগুন আর পটকা। বিশেষ অতিথি তাঁরাই। যাদের গুনগুন নিজের বন্ধু বলেই পরিচয় দিয়েছে।সৌজন্য সহ পরিবারের সবাই চমকিত। সব সদস্যরা হিজড়া মাসিদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করলেও গুনগুনের ব্লিতফেরত ডাক্তার মা শিল্পী দেবী নিমন্ত্রিত হিজড়াদের ভীষণভাবে অপমান করেন। যা দেখে দর্শকরাও চটেছেন।
কিন্তু দর্শকরা
উচ্ছসিত এমন একটি প্লট ‘খড়কুটো’ সিরিয়ালে দেখে। যেখানে তৃতীয় লিঙ্গর মানুষরাই বিশেষ অতিথি। যুগ যুগ ধরে হয়ে আসা ‘ওরা আমরা’ বিভেদ নেই। হিজরারা টাকার চাহিদার থেকে ভালোবাসাকেই বড় করে দেখছে। এই প্রথম কোনও শুভ অনুষ্ঠানে হিজড়াদের নেমতন্ন করে সম্মানিত করল বাংলা সিরিয়াল।

‘খড়কুটো’ সিরিয়ালের পরিচালক, চিত্রনাট্যকার ও সমগ্র টিমকে এই অভিনব ভাবনার জন্য অভিনন্দন জানাচ্ছেন দর্শকেরা।
বাংলার দর্শকও কিন্তু অনেক মুক্তমনা হতে পেরেছে, তাই তাঁরা সিরিয়ালে হিজড়াদের মনের কষ্ট শুনে খুব ব্যথিত।
যখন হিজড়ারা বলেন “আমাদের তো সন্তানধারণের ক্ষমতা নেই। তাই আমরা যখন বাচ্চা নাচিয়ে আবার মায়ের কোলে ফিরিয়ে দিই তখন বাচ্চাদের আশীর্বাদই করি।” দর্শকদের চোখের জল বাঁধ মানছেনা এই সংলাপে।যদিও সাধের অনুষ্ঠানে হিজড়া আগমন বাঙালি সমাজে খুব একটা দেখা যায়না। হিন্দি ছবির প্লটে ঘটে। কিন্তু সেখানে তাঁরা কমেডিয়ান জোকার হিসেবে ব্যবহৃত হন। বাস্তবে বাচ্চা হবার পরই হিজড়ারা আসেন। টাকা চেয়ে যা দরদাম কলহ হয়ে থাকে সেটা যদি আমরা দুপক্ষই একটু সহনশীল হই, ওঁদের সম্মান দেখাই, তাহলে কিন্তু গুনগুনের মতো ওঁদেরকে আমরা বন্ধু করতেই পারি। কেন সরে যান বাসের সিট থেকে আপনার পাশে হিজড়া বসলে? এই যে অশিক্ষা এখান থেকেই তৈরি হয় বিবাদ, বিভেদ।
সাধের অনুষ্ঠানে সিরিয়ালে তৃতীয় লিঙ্গ মানুষের নিমন্ত্রণ করে একটা নতুন শিক্ষা দিল ‘খড়কুটো’ যে ‘সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই।’

আরো বড় চমক, যখন হিজড়া বোনরা গুনগুনকে জিজ্ঞেস করে তাঁর বাচ্চা কবে হবে? গুনগুন সৌজন্যর দিকে দেখিয়ে বলে ‘ও জানে।’ এই দৃশ্যে আরও মজা পান দর্শকেরা।

এই প্লট সিরিয়ালে সম্প্রচারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ‘খড়কুটো’র টিআরপি সব সিরিয়ালকে ছাড়িয়ে শীর্ষে। এখনকার দর্শকরা যে অনেক বেশি মুক্তমনা, এ ঘটনা তারই প্রমাণ দেয়। সমাজেও এবার আসুন ‘ওরা আমরা’ ছেড়ে বন্ধু হয়ে পাশাপাশি থাকি।

You might also like