Latest News

ধ্বংসস্তূপের ভিতর ধ্বংসস্তূপের অজানা কাহিনি: ‘আন্ডার দ্য বম্বস’

হিন্দোল ভট্টাচার্য

‘আন্ডার দ্য বম্বস’। গল্পটা একজন লেবানিজ মহিলার। যিনি থাকেন দুবাইয়ে। বেশ বড়লোক। কিন্তু তাঁর ছেলে থাকে লেবাননে তাঁর বোনের কাছে। এ পর্যন্ত ঠিকই ছিল। কিন্তু সময় এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতি সম্ভবত এমন স্থিতাবস্থা চায় না। ২০০৬ সালে শুরু হয় লেবাননের যুদ্ধ। তখন উদ্বিগ্ন জাইনা অর্থাৎ সেই লেবানিজ মহিলা তুরস্ক হয়ে বেইরুটে যান। সেখান থেকে একটি লেবানিজ ক্রিশ্চিয়ান ট্যাক্সিড্রাইভার টনিকে কোনওক্রমে রাজি করান দক্ষিণ লেবাননে যাওয়ার জন্য। কারণ সেখানেই আছে তার ছেলে করিম এবং বোন মাহা।

আসল ছবিটা শুরু এখান থেকেই, কারণ এখানেই আমরা মুখোমুখি হই আরও ভয়ংকর সব সত্যের। যুদ্ধের ভয়ংকর বাস্তবতা দর্শক হিসেবে আমাদের রক্তের মধ্যেও ঢুকে পড়ে। আমরা বুঝতে পারি, এ ছবির গল্প আসলে এক ছদ্মবেশ মাত্র। কারণ জাইনা, মাহা বা করিমের গল্প সে সময়ের লেবাননের যে কারোও হতে পারে। এই যে খোঁজ শুরু হয় একজন মাতৃহৃদয়ের, তাও দেশ-কালের সীমানা মানে না। টনির সঙ্গে একটা সূক্ষ্ম মানবিক সম্পর্ক তৈরি হয়ে যায় জাইনার। আর সে মানবিক সম্পর্ক একে অপরের কাছে নিজেদের গোপন সত্যগুলি তুলে ধরে এক মর্মান্তিক দুঃখ ও বিষাদের আবহে। লেবাননের রাস্তায় ঘুরতে ঘুরতে হারিয়ে যান জাইনা এবং টনি। একপ্রকার যেন জেদি হয়ে ওঠেন দুজনেই। করিম এবং মাহাকে খুঁজে বেড়ান সমস্ত ধ্বংসস্তূপে। ধ্বংসস্তূপের যে একপ্রকার গল্প থাকে, তা যেন আমাদের মনে বারবার আঘাত দিয়ে যায়। হতে পারে মৃতরা মৃত, হতে পারে, এক সুবিশাল ধ্বংসস্তূপে মৃতদের কোনও আলাদা পরিচয় নেই, কিন্তু তাঁদেরও হয়তো কেউ কেউ খুঁজে বেড়াচ্ছেন। তাঁদের গল্প শেষ হয়নি। কারণ তাঁদের কী হল, কোথায় হারিয়ে গেলেন তাঁরা— এ সম্পর্কে কেউ কিছুই জানে না। চোখের সামনে শুধু দিগন্ত জুড়ে পড়ে আছে ধ্বংসস্তূপ।যেকোনও ধ্বংসস্তূপ আসলে প্রচুর সম্ভাব্য কাহিনির হারিয়ে যাওয়া খাতা। লেবাননের আকাশে বাতাসে যখন মিসাইলের উন্মাদনা, তখন সন্তানের খোঁজে এক মা এবং মানবিকতার খোঁজে একজন ট্যাক্সি ড্রাইভার খুঁজে চলেন করিমকে। স্পষ্ট করে না বলে দিলেও বোঝাই যায়, যে করিম এবং মাহা দুজনেই কোনও না কোনও ধ্বংসস্তূপে হারিয়ে গেছে। এ কথাও উঠে আসে এ ছবিতে, বেঁচে থাকা যে কোনও শিশুই তো করিম হতে পারে জাইনার নিজের। কারণ যেখানে মৃতদের কোনও পরিচয় নেই, সেখানে জীবিতরা যে কেউ, তাদেরও নিজস্ব কোনও পরিচয় নেই।
এ প্রসঙ্গে মনে পড়ে যায় লেবাননের কবি মহম্মদ নাসিরুদ্দিনের কবিতা।

যুদ্ধ
মহম্মদ নাসিরুদ্দিন

জানলার শার্শির পিছনে
মুখে চেরিফল নিয়ে
আমি ভাঁজ করে রাখি নিজেকে
অয়েস্টার-এর মতো
আর আমার ভয় দূর হয়ে যায়।

যে শিস দিতে দিতে যাচ্ছে সে বাতাস।
এটা জেনে রাখা ভালো
কখন উড়ে যেতে হবে
আর কখন বিদ্ধ করতে হবে কাউকে।

মৃত্যু চলে যায়।
পিছনে পড়ে থাকে ফটোগ্রাফ।
পিকাসো সময়কে থামিয়ে দেন
নেগেটিভগুলো পেরেকের মতো
স্থির করে রেখে, চলে যায়।

ফিলিপ আরাক্তিংগি পরিচালিত ২০০৭ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত এই ছবি। গুরুত্বপূর্ণ শুধু এই কারণেই নয়, যে লেবাননের যুদ্ধের ঠিক এক বছরের মধ্যে এই ছবিটি করা হয়েছে। এই কারণেও অনেকটা, যে, খানিক ডকুমেন্টারির আদলে এই ছবিতে আমরা দেখতে পেয়েছি লেবাননের সাধারণ মানুষের যন্ত্রণা।যুদ্ধ যারা করে, তাদের কাছে মানুষের কোনও অস্তিত্ব নেই আলাদা করে। রাস্তার মধ্যে বিরাটাকার গর্তের মতোই মানুষ অন্ধকারে মিশে গেছে এ ছবিতে। অন্ধকারের মধ্যে দিয়ে ভেসে আসা গুঞ্জনের মতোই আমরা টের পাচ্ছি করিম, মাহা এবং জাইনের গল্প। কারণ আমাদের তো এই সব গল্প শুনতে দেওয়া হয় না। এই সব গল্প বোমার আওয়াজের মধ্যে হারিয়ে যায়। মিসাইল যখন শিস দিয়ে উড়তে উড়তে আঘাত করে, তখন তার শব্দের মধ্যে হারিয়ে যায় যুদ্ধবিধ্বস্ত মানুষের কষ্টের গল্প।
জাইনা, করিম, মাহা এবং টনি, লেবানন এবং আধুনিক পৃথিবীর মায়ামমতাহীন এক বিশ্বের ছবি ‘আন্ডার দ্য বম্বস’। এটা দেখার পর চোখ দিয়ে জলও বেরোয় না।

 

হিন্দোল ভট্টাচার্য কবি, ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক। ‘জগৎগৌরী কাব্য’-এর জন্য পেয়েছেন বীরেন্দ্র পুরস্কার (২০০৯) এবং ‘যে গান রাতের’ কাব্যগ্রন্থের জন্য পেয়েছেন বাংলা অকাদেমী পুরস্কার (২০১৮)

You might also like