Latest News

‘মেরা নাম জোকার’, পঞ্চাশ বছর পরও এক জোকারের ব্যর্থ প্রেমকাহিনি আজও অমর

শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়

একসময় শীত আসা মানেই ছিল সার্কাস দেখতে যাবার উন্মাদনা। যে সার্কাস আজকাল হারিয়েছে তার জৌলুস। সেভাবে সার্কাস আগের মতো হতে দেওয়া হয় না আজ আর। বাঘ সিংহ নিয়ে খেলা দেখানো নিষিদ্ধ জারি হবার পর তো আরোই সার্কাস উঠে গেছে।
কিন্তু আমরা ভুলতে পারিনি সেই সার্কাসের নুন, ম্যাটিনি, ইভনিং শো’এর দিনগুলো। সেই সব ঝলমলে সার্কাসের তাঁবু আর জোকারদের রঙমাখা হাসিমুখগুলো। অথচ এই হাসির মধ্যেই লুকিয়ে আছে কত দুঃখ। জোকারদের দুঃখ দেখলেও লোকরা হাসে। তাঁরা যে জোকার।

এমনই এক জোকারের বুকভরা ভালোবাসার ছবি মুক্তি পেয়েছিল আজ থেকে পঞ্চাশ বছর আগে আজকের দিনে ১৮ ডিসেম্বর ১৯৭০ … রাজ কাপুরের ক্লাসিক ছবি ‘মেরা নাম জোকার’।

শহরে সার্কাস এসেছে। বিশেষ আকর্ষণ বিখ্যাত জোকার রাজুর খেলা। সেদিন তিনজন বিশেষ নারী শিক্ষিকা ম্যারী, সুন্দরী রুশী তরুণী মারিনা এবং চিত্র তারকা মিনাকে সার্কাসে তাঁর শেষ খেলা দেখতে আমন্ত্রণ জানিয়েছে রাজু জোকার। সার্কাসের মধ্যেই খেলায় দেখানো হবে জোকার রাজুর হার্ট অপারেশন। অন্যান্য জোকারেরা রাজুর সার্জারি করে রাজুর হার্ট বার করে আনে। তাঁরা জানায় এই হৃদয় একদিন বড় হতে হতে সারা পৃথিবী ছেয়ে ফেলবে। এই আনন্দে রাজু হৃদয়টাকে আকাশে ছুঁড়ে দেয়। টুকরো টুকরো হয়ে ভেঙে পড়ে রাজুর হৃদয়। এরপরে তিন পর্বে রাজুর তিন প্রেম কাহিনি দেখানো হয়।

কিশোর রাজু প্রেমে পড়েছিল যৌবন সরসী শিক্ষিকা ম্যারীর। সেই প্রথম ভালোবাসা পূর্ণতা পায়নি। কিশোর রাজুর অবদমিত যৌনতার পরশ এই ছবিকে সাবালক ছবির তালিকাভুক্ত আজও করে। কিন্তু রাজ কাপুর সবার জন্য ছবি বানান। তাই একটি কিশোরের মনস্তত্ব বোঝাতে এমন সাহসী দৃশ্য নিজের ছেলে কিশোর ঋষি কাপুরকে দিয়েই করান রাজ কাপুর। নাবালক রাজুর রোলে ঋষি ও পরিণত রাজুর রোলে রাজ। পিতাপুত্রর অসাধারণ যুগলবন্দী। তারপর সার্কাসে ঢুকে রাজু প্রেমে পড়ে রুশ প্রেমিকা মারিনার। সেই প্রেমও পরিণতি পায়না।
তৃতীয় প্রেম চিত্রতারকা মীনা। সেই প্রেমও অসম্পূর্ণ। এই তিন প্রেমে ব্যর্থ প্রেমিক রাজুর সার্কাসের পটভূমিকায় আত্মজীবনীকেন্দ্রিক ছবি ‘মেরা নাম জোকার’।
অভিনয়ে, রাজ কাপুর, ঋষি কাপুর ,সিমি, রেসিনা রেবিনকিনা, পদ্মিনী, অচলা সচদেব, মনোজ কুমার, দারা সিং, রাজেন্দ্র কুমার, ওমপ্রকাশ ও ধর্মেন্দ্র।

আসুন জেনে নেওয়া যাক, ‘মেরা নাম জোকার’ ছবি নিয়ে কিছু অজানা তথ্য-

* ১৯৬৪ সাল থেকে ছয় বছর ধরে ‘মেরা নাম জোকার’ নির্মাণ চলে।

* ছবির কাহিনীকার কে.এ.আব্বাস। কিন্তু প্রথম পর্বের গল্প যেটি ঋষি-সিমির গল্প সেটি লেখেন মনোজ কুমার। মনোজ বলেছিলেন ‘আমার নামও চাইনা, এই চিত্রনাট্য আমি কর্মযোগী ও গ্রেটেস্ট শো ম্যান রাজ কাপুরকে উৎসর্গ করলাম।’

* ভারতীয় দীর্ঘতম ছবির তালিকায় ‘মেরা নাম জোকার’ প্রথম সারির বলা চলে। ছবির সময় ছিল চার ঘণ্টা চার মিনিট। তাই দুটি বিরতি দেওয়া হত প্রেক্ষাগৃহে। এর আগেও রাজ কাপুর দুটি বিরতি দেওয়া ছবি বানান ‘সঙ্গম’। কিন্তু দৈর্ঘ্যে ‘মেরা নাম জোকার’ এর একটু বেশী ছিল।
দুটি বিরতি ছবি সেইসময়ে বেশ একটা নতুনত্ব ব্যাপার ছিল। কিন্তু ‘সঙ্গম’ যতটা সুপারহিট করে ‘মেরা নাম জোকার’  তার ধারেকাছেও হিট করেনি বক্সঅফিসে ১৯৭০ সালে। তাই ছবির দৈর্ঘ্য কমিয়ে একটি বিরতি দেওয়া ছবি এডিডেট করে ১৯৮০ সালে ফের রিলিজ করে ‘মেরা নাম জোকার’ , তখন আগের থেকে বেশি চলেছিল ছবিটি।

* ছবির গান কিন্তু ক্লাসিক হিটে প্রথম। শঙ্কর জয়কিষেনের সুরেসুরে মন মাতিয়েছিলেন মুকেশ, মহঃ রফি, মান্না দে ও আশা ভোঁসলে। সবচেয়ে চমকপ্রদ বিষয় যেখানে রাজের কোন ছবি লতা মঙ্গেশকরের গান ছাড়া পরিপূর্ণ হত না, সেখানে ‘মেরা নাম জোকার’ ছবিতে লতাকে দিয়ে একটি গানও গাওয়াননি রাজ কাপুর। তখন বিবাদ চলছিল লতা আর রাজ কাপুরের।

* সবাই বলেন ঋষি কাপুরের প্রথম ছবি ‘মেরা নাম জোকার’। কিন্তু এটি ঋষির দ্বিতীয় ছবি। প্রথম শিশু বয়সে ‘শ্রী ৪২০’ ছবিতে ঋষি অভিনয় করেন। রাজ কাপুর নার্গিসের ‘প্যায়ার হুয়া’ বৃষ্টি স্নাত গানে নার্গিস যখন গেয়ে ওঠেন ‘তুমিও থাকবে না, আমিও থাকবনা, রয়ে যাবে আমাদের ভালোবাসার নিশানা’… তখন রেনকোট পড়ে দেখা যাবে রাজ কাপুরের তিন সন্তান রনধীর কাপুর, ঋতু কাপুর ও ঋষি কাপুরকে।

* তবে ‘মেরা নাম জোকার’ বক্সঅফিসে সাড়া না ফেললেও ঋষির ক্যারিয়ারে উল্লেখযোগ্য তো বটেই। এই ছবি করে শিশুশিল্পীর জাতীয় পুরস্কার জিতে নেন ঋষি কাপুর। সাহসী দৃশ্যেও ঋষি তাক লাগিয়ে দেন তামাম ভারতবাসীকে।

* বরাবরই কলকাতাকে ভালোবাসতেন কাপুর পরিবার। ঋষির বড় রোলে প্রথম ছবি ‘মেরা নাম জোকার’ এর প্রিমিয়ার হয়েছিল কলকাতার ‘লোটাস’ সিনেমাহলে। সেখানেই বাবা রাজ কাপুরের হাত ধরে ঋষির প্রথম কলকাতায় আসা। ছবির প্রিমিয়ারে আসেন উত্তম কুমার ও সুপ্রিয়া দেবী। কলকাতায় এসে সাড়া ফেলে দেন রুশ অভিনেত্রী রেসিনা রেবিনকিনা।
জাতীয় পুরস্কার পাবার আগে কলকাতা থেকে বিএফজেএ পুরস্কার পেয়েছিলেন ঋষি। সুপ্রিয়া দেবীর ফ্যান ছিলেন ঋষি। সুপ্রিয়াকে হলি অভিনেত্রীর স্থানে বসান ঋষি। বেশ কয়েকবার ঋষি গেছেন উত্তম-সুপ্রিয়ার ময়রা স্ট্রিটের বাড়িতে।

* সত্যজিৎ রায়ও এসেছিলেন প্রিমিয়ারে। রাজ কাপুর কিশোর ঋষিকে বলেছিলেন ‘প্রণাম কর, ইনি আমাদের সকলের গুরু।’
চিন্টু ওরফে ঋষি প্রণাম করেন এবং চকোলেট বয় চিন্টুকে আশীর্বাদ করেন সত্যজিৎ রায়।

*’মেরা নাম জোকার’ রুশ ভাষায় ডাবড করে রাশিয়ায় মুক্তি পায় এবং বেশ জনপ্রিয় হয়। কারণ রুশ অভিনেত্রী রেসিনা রেবিনকিনা ছিলেন এই ছবিতে। যদিও রাশিয়ায় রেসিনা রেবিনকিনার আসল নাম লোকে জানতই না। সিনেমার ম্যারী নামই তাঁর আসল নাম ভাবত লোকে। রাজ কাপুরের আজও রয়েছে প্রচুর রুশ ভক্ত।

* ছবিতে দেখানো হয় রাজুর সার্কাস পার্টির নাম ‘জেমিনি সার্কাস’। বাস্তবেও বিখ্যাত সার্কাস শো হাউস ছিল জেমিনি সার্কাস প্রোডাকশান।

রাজ কাপুর এই ছবি করতে গিয়ে বিশাল বাজেটের জন্য ঋণগ্রস্থ হয়ে পড়েন। বন্ধক পড়ে যায় তাঁর ‘আর কে স্টুডিও’। ছবিও বিশাল ভাবে ফ্লপ করে। কিন্তু ছবিটি উচ্চ প্রশংসিত হয়। রাজ পরের ছবি বানান খুব অল্প বাজেটে, হিট হবে না জেনেই। ছেলে ঋষি আর ডিম্পল কাপাডিয়াকে নিয়ে। কিন্তু এই ছবি বিশাল হিট করে। যা অনেকটাই ঋণমুক্ত করে রাজকে।
নব্বই দশকে ‘মেরা নাম জোকার’ ‘কাল্ট ছবি’র সম্মান পায়।

রাজ কাপুর তাঁর পরিচালিত,অভিনীত ছবি ‘মেরা নাম জোকার’ এর ফ্লপ হওয়া নিয়ে বলেছিলেন ‘ মা তাঁর সাত সন্তানের জন্ম দেয় কিন্তু সাত সন্তানের ভাগ্যনির্ধারণ মায়ের হাতে থাকেনা। মানুষের জীবনের মতো ছবির হিট ফ্লপও তাই। কিছু ছবি সুপারহিট হয়, কিছু ছবি এগোতে পারেনা। আমাদের কোন সন্তান জীবনে উন্নতি করে এগিয়ে যায়, কেউ এগোতে পারেনা। কিন্তু এই এগোতে না পারা সন্তানই বাবা মায়ের কাছে রয়ে যায়। অনেক উন্নতি করা ছেলেমেয়েরা সঙ্গে থাকেনা। সেই রকম আমার দুটো ছবি ‘মেরা নাম জোকার’ আর ‘একদিন রাত্রে’/ ‘জাগতে রাহো’ দর্শক নেয়নি। সত্তর সালের দর্শক সময়ের থেকে এগিয়ে থাকা ‘মেরা নাম জোকার’ ছবির মানেই বুঝতে পারেনি তাই ছবি ফ্লপ করে। কিন্তু আমার সবচেয়ে কাছের ছবি সেরা সৃষ্টি ‘মেরা নাম জোকার’।

You might also like