Latest News

প্রয়াত যাত্রাসম্রাট ত্রিদিব ঘোষ, মঞ্চের ভিলেন থেকে পর্দার বৃহন্নলা মা! যেন একটা যুগের যবনিকা পতন

শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়

ঘুরন্ত মঞ্চ, জাপানি কায়দায় আলো, চমকে ওঠার মতো বেল পড়া, চড়াসুরের আবহ, মুড়ির দানা ফেলে বৃষ্টি, রংচঙে সাজপোশাক সে যেন এক ফ্যান্টাসির জগৎ। সে জগতে প্রবেশ করার জন্য পল্লিবধূরা সাত-তাড়াতাড়ি সেরে নিতেন রাতের রান্না। তোরঙ্গে রাখা নতুন কাপড় গায়ে দিয়ে, মাথায় ঘোমটা টেনে যেতেন দল বেঁধে। মাঠে পাতা চটের উপর আগে থেকেই জায়গা রাখত ঘরের ছেলেছোকরার দল। সঙ্গে বড়জোর বড় ঘটি বা বোতলে করে একটু খাবার জল, খুঁটে বাঁধা খুচরো পয়সা। মাঠের ধারের চিনেবাদাম, লেবুলজেন্স, কাঠিভাজার পসরা আছে যে!

খুব বেশি দিন নয়, দু-এক দশক আগেও এ ছবি পরিচিত ছিল গ্রামবাংলায়। রোমাঞ্চকর সব নামের যাত্রাপালার বড় বড় পোস্টার পড়ত এলাকাজুড়ে। সেইসঙ্গে যাত্রা আর্টিস্টদের রোমাঞ্চকর ছবি। ব্যস, ঘরেঘরে সেই বার্তা রটি যেত ক্রমে। শুধু গ্রামবাংলা কেন, মফস্বলও পিছিয়ে ছিল না যাত্রার কদর করায়।

সময় বদলেছে। চিনেবাদাম, জলের বোতলের বদলে হাতে উঠেছে কোল্ডড্রিঙ্কস আর পপকর্ন। ঠান্ডা হলে বসে নিস্তব্ধ আবহে পর্দায় সিনেমা দেখার দর্শক হয়েছে ভূরিভূরি। কিন্তু তা শহরকেন্দ্রিক, এবং একশ্রেণির দর্শকের কাছে। একটা বড় শ্রেণি কিন্তু এখনও যাত্রাপ্রেমী। কবে কোথায় কোন পালা বাঁধা হয়েছে, খবর রাখেন তাঁরা। প্রত্যন্ত গ্রাম বাংলার মাঠঘাট থেকে বাগবাজার মঞ্চ, সবখানেই পৌঁছে যান তাঁরা। যাত্রাপালায় যদিও এখন ফিল্মের আর্টিস্টদের প্রবেশ ঘটেছে, কিন্তু কিছু প্রকৃত যাত্রাশিল্পীর জনপ্রিয়তা কোনও দিনও পড়েনি। তাঁদের নামে যাত্রায় টাকা লগ্নি হতো, এখনও হয়। এখনও তাঁরা হাউসফুল মেশিন।

এমনই এক মানুষ ছিলেন ত্রিদিব ঘোষ। আজ নয়, বহু বছর ধরে তাঁর গম্ভীর কণ্ঠ গমগম করত মঞ্চ থেকে গ্রাম-প্রান্তর। তিনি যাত্রাসম্রাট। নটসম্রাট উপাধিও রয়েছে তাঁর। সোমবার ভোর রাতে যাদবপুরে নিজের বাড়িতে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেলেন ত্রিদিব ঘোষ। বয়স হয়েছিল ৬৮ বছর।

শহরাঞ্চলের এলিট ক্লাসও ছিল যেমন তাঁর ভক্ত, তেমনই গ্রামেও তাঁর নামে হাজার হাজার লোক মাঠ ভরাত। সম্প্রতি করোনা ও লকডাউনের কারণে ইতিহাসে এই প্রথম রথযাত্রায় সুনসান ছিল যাত্রাপাড়া। তার ওপর ত্রিদিব ঘোষের আকস্মিক প্রয়াণ যেন যাত্রাশিল্পীদের মাথা থেকে বটগাছ সরে যাওয়ার মতো। রথযাত্রায় যেখানে বিভিন্ন এলাকার দেওয়াল ও সংবাদপত্রের পাতা ছেয়ে থাকত যাত্রার বিজ্ঞাপনে, সেখানে এবার শুধুই শূন্যতা। সেই শূন্যতাতেই যেন আরও বেশি করে বাজল যাত্রাসম্রাটের এই চলে যাওয়া।

অনেকেরই মনে পড়ে যাচ্ছে, পোস্টারে সেই বড় করে ছারা খলনায়ক-রূপী ত্রিদিব ঘোষের মুখের ছবি। আবার গিরীশ ঘোষের চরিত্রাভিনেতা রূপেও তিনি ছিলেন জনপ্রিয়। আবার বেশ কিছু ফিল্মেও কাজ করেছেন একটা সময়ে।

ছোটবেলা থেকেই ত্রিদিবের আবৃত্তি করার শখ ছিল। আবৃত্তি থেকে অভিনয়ের শখ। সেই শখ থেকেই সাতের দশক থেকে কলকাতায় থিয়েটার পাড়ায় যাতায়াত শুরু করলেন ত্রিদিব। সুদর্শন চেহারা, সুগভীর কণ্ঠস্বর। পথ খুঁজে পেতে দেরি হয়নি। জহর রায়ের সঙ্গে আলাপ হল ত্রিদিবের। জহর রায়ের সৌজন্যেই রঙমহলে ‘প্রজাপতি বন্ধন’ নাটকে অভিনয় করার সুযোগ পেলেন ত্রিদিব। পরে নাটকের জগতে অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্নেহধন্য হন তিনি।

১৯৭৫ সালে চিত্ররঞ্জন অপেরাতে প্রথম যাত্রা-জীবন শুরু করেন ত্রিদিব ঘোষ। তপোবন নাট্য কোম্পানির দুলাল চট্টোপাধ্যায় তাঁকে প্রথম যাত্রায় নিয়ে আসেন। প্রথম পালা “মহিষাসুর বধ”, চরিত্রের নাম রক্তাসুর। রক্তাসুরের অভিনয় করে ত্রিদিব ঘোষ বিশাল নাম পান। কিন্তু ভিলেন রূপেই খ্যাতি দিয়ে শুরু হয় পথচলা।

তপোবন নাট্য কোম্পানির পরে একে একে ভারতী অপেরা, অগ্রগামী, লোকনাট্য, গণবানী, নটরাজ অপেরার হয়ে কাজ করেছেন ত্রিদিব। সব জায়গাতেই দাপুটে ভিলেনের চরিত্রে তাঁকে দেখা যেত সব থেকে বেশি।


একসময়ে নট্ট কোম্পানির ‘মানুষ অমানুষ’ যাত্রা তাকে তুমুল খ্যাতি দেয়। তবে জনমনে বেশি প্রভাব ফেলে ভারতী অপেরার “মা বিক্রির মামলা” পালার চরিত্র। তখন যাত্রালক্ষী হিসেবে মঞ্চ কাঁপাচ্ছেন বীণা দাশগুপ্ত। ত্রিদিবের দাপটে তাঁর আলো যেন কিছুটা ম্লান হয়ে যায়। শোনা যায়, এই নিয়ে একটু মন কষাকষিও হয় তাঁদের। পরে আবার সব মিটেও যায়।


ত্রিদিব ঘোষের যাত্রাপালাগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল আজকের মীরজাফর, হাটে বাজারে, ভগবানের ছদ্মবেশে, সম্রাট ঔরঙ্গজেব, নরকের হেডমাস্টার, কসাইখানার কাণ্ডারী, শকুনির পাশা, শকুনির পাতা মরণ ফাঁদ, কালাচাঁদের কবলে মধু বালা, নটি বিনোদিনী, কাল কেউটের ছোবল, লাল মাকড়সার জাল, নিশুতি রাতে হায়নার কান্না, সমাজ শত্রু গণক ঠাকুর, বুনো ওল বাঘা তেঁতুল প্রভৃতি।

তাঁর উল্লেখযোগ্য কাজ ‘উলঙ্গ সম্রাট’ যাত্রাপালায়। এটাই তাঁর শেষ কাজ যতদূর জানা যায়। এর পরে কায়িক পরিশ্রমে আর পেরে উঠতেন না।

ত্রিদিব ঘোষ পরিচালিত ‘নটি বিনোদিনী’ যাত্রাপালা বিশাল সাফল্য লাভ করে। যেটা তাঁর পরিচালনায় আইকনিক। এই যাত্রায় বিনোদিনীর নামভূমিকায় তাপসী রায়চৌধুরী অপূর্ব এবং গিরিশ ঘোষ রূপে ত্রিদিব ঘোষের অভিনয়ের দাপট নজর কেড়েছিল। সমালোচক মহলেও যথেষ্ট আলোচিত এই যাত্রাপালা।


৪৫ বছরের যাত্রা জীবনে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের বহু পুরস্কার ও সম্মানে ভূষিত হয়েছিলেন। অভিনয়ের পাশাপাশি যুক্ত ছিলেন অপেরা পালার চিত্রনাট্য পরিচালনার কাজে। যাত্রা আর্টিস্ট ইউনিয়ান, সংগ্রামী যাত্রা প্রহরীর অভিভাবক হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন ত্রিদিব ঘোষ। যাত্রাপালার পরিচিত মুখ কাকলি-অনল জুটি, মিতালী চক্রবর্তী– সকলের শ্রদ্ধেয় ছিলেন পিতৃসম ত্রিদিব ঘোষ।

তবে ত্রিদিব ঘোষের প্রতিভা শুধুমাত্র যাত্রাশিল্পেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। তিনি অভিনয় করেছেন বেশ কয়েকটি সুপারহিট বাংলা ছবিতেও। আশ্রয়, শ্বশুরবাড়ি জিন্দাবাদ, আত্মীয় স্বজন ইত্যাদি ছবিতে দেখা যায় তাঁকে। ছোট পর্দাতেও কাজ করেছেন, জি বাংলার ধারাবাহিক বাক্স বদলে অভিনয় করেছিলেন তিনি।

ইদানীং তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের নিয়ে অনেক কাজ হয়। তাঁদের কথা উঠে আসে সিনেমার পর্দায়, সিরিয়ালের স্লটে। কিন্তু ইতিহাস বলে, এই ধারা শুরু হয়েছিল যাত্রাসম্রাট ত্রিদিব ঘোষের চরিত্রাভিনয় দিয়েই। হরনাথ চক্রবর্তীর ‘আশ্রয়’ ছবিতে তৃতীয় লিঙ্গের এক মায়ের ভূমিকায় দুর্দান্ত অভিনয় করেন ত্রিদিব।

প্রসেনজিৎ-ঋতুপর্ণার ছবি ‘আশ্রয়’-এ ঋতুপর্ণা ছিলেন তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের গোষ্ঠীর দ্বারা পালিত এক কন্যা। এই ছবিতে দেখানো হয়েছিল, আমরা যাঁদের ‘হিজড়ে’ বলে দাগিয়ে দিয়েছি, তাঁদের মাতৃত্ববোধ কী অপূর্ব ও গভীর! কুড়িয়ে পাওয়া মেয়েকে তাঁরা লেখাপড়া শিখিয়ে, স্কুল কলেজ পাশ করিয়ে, চাকরি করতে পাঠান। ভাল ঘরের খেলোয়াড় ছেলে প্রসেনজিতের সঙ্গে বিয়েও দেন। প্রসেনজিতের মায়ের ভূমিকায় লাবণী সরকারকে দেখা গেছিল সারা পরিবার-সমাজের বিরুদ্ধে গিয়ে ছেলের সঙ্গে এক বৃহন্নলার সন্তানের বিয়ে দেন।


২০০০ সালের এই সিনেমা সে সময়ে রীতিমতো বিপ্লব ছিল। তখনও সাধারণ মানুষ লিঙ্গসচেতনতা বিষয়টি আলাদা করে বুঝতেন না এখনকার মতো। তৃতীয় লিঙ্গের মানুষরা এতটা মূলস্রোতে আসতে পারেননি। প্রান্তিক হয়েই থাকতেন। সেই সময়ে একটা কমার্শিয়াল ছবিতে এই ভাবনার প্রকাশ খুব সহজ ছিল না। তৃতীয় লিঙ্গের সেই মায়ের ভূমিকায় অভিনয় করেন ত্রিদিব ঘোষ।

সবথেকে বড় ব্যাপার, যে ত্রিদিব ঘোষ ভিলেন রূপে ভয়ানক পৌরুষে মঞ্চ কাঁপিয়েছেন সদর্পে, তিনিই আবার স্নেহময়ী হয়ে অন্য মায়ের ভূমিকায় পর্দা মাতালেন একই দক্ষতায়। বড় অভিনেতা বলেই এটা সম্ভব।

ত্রিদিব ঘোষ শেষ দিকে বালিগঞ্জ রেনবো নামে এক গ্রুপ থিয়েটারের দলও খোলেন। তবে সেটাও বেশিদিন চালাতে পারেননি, অসুস্থতার কারণেও। ভাল কোনও প্রোডাকশন হয়ে ওঠেনি। এর মধ্যে বড় আঘাত আসে, ছেলে অরিদীপ্ত ঘোষের অকালমৃত্যু। কিডনির অসুখ প্রাণ কেড়ে নেয় একমাত্র সন্তানের। এর পরেই ত্রিদিবের শরীর আরও ভেঙে যায়। চূড়ান্ত মানসিক কষ্টের ছাপ পড়ে শরীরেও।

ত্রিদিব ঘোষের প্রয়াণ যাত্রা জগতের অপূরণীয় ক্ষতি। একটা যুগের যবনিকা পাত হল এই মৃত্যুতে।

You might also like