Latest News

টাকার জন্য নয়, বাংলাকে ভালবেসে বাংলা ছবি করেছিলেন দিলীপ কুমার

শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়

দিলীপ কুমার ভারতবর্ষের একমাত্র সুপারস্টার, যিনি একসঙ্গে কখনও দুটো ছবিতে শ্যুট করেননি। যখন তিনি বলিউডের অদ্বিতীয় মেগাস্টার তখনও তাঁর এ নিয়মের ব্যতিক্রম হয়নি। যে কাজটা করছেন সেটাতেই সম্পূর্ণ মনোনিবেশ করতেন।

দিলীপ কুমারের আসল নাম মহম্মদ ইউসুফ খান। দেবিকা রানির পরামর্শে নাম বদল করে ইউসুফ হন দিলীপ কুমার। তখন ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে নাম বদল ছিল স্বাভাবিক ঘটনা। ছোট, ক্যাচি নাম জনপ্রিয়তার চাবিকাঠি মনে করা হত। কোথায় হয়তো নামে কুমার যোগ থাকলে হিন্দু-মুসলিম বিভাজন দূর করা যাবে তাঁর পরিচয়ে সেইসময় ভাবা হয়েছিল। আরও এক কারণে দিলীপ কুমার হয়ে যান তিনি, বাবার থেকে নিজের ফিল্ম পরিচয় লুকোতে। কারণ দিলীপ কুমারের বাবা চাননি ছেলে ফিল্ম লাইনে আসুক।

যদি মহম্মদ ইউসুফ খান তাঁর নাম থাকত তাহলে বলিউডে ফিরোজ-শাহরুখ-আমির-সলমন খান পরম্পরায় দিলীপ কুমারই হতেন প্রথম খান পদবীর সুপারস্টার।

দিলীপ কুমার মধ্যগগনে থাকাকালীন বাংলাকে ভালবেসে দুটি বাংলা ছবিও করেছিলেন। ‘পাড়ি’ এবং ‘সাগিনা মাহাতো’। দুটি ছবি অরিজিনালি বাংলা ছবি। পরে হিন্দিতে ডাবড হয়।  ‘সাগিনা মাহাতো’ যদিও হিন্দির জন্য নতুন করে শ্যুট হয়েছিল।


গৌরকিশোর ঘোষের ‘সাগিনা মাহাতো’ গল্পটি নিয়ে ছবি করার কথা অনেকদিনই ভেবেছিলেন তপন সিনহা। কিন্তু শ্রমিক আন্দোলন সহ রাজনৈতিক ছবি সে অর্থে করার সাহস পাচ্ছিলেন না তিনি সেই সময় দাঁড়িয়ে। হেমেন গঙ্গোপাধ্যায়, যিনি তপন সিনহার ‘ক্ষুধিত পাষাণ’ ছবির প্রযোজক, তিনি অনেকদিন ধরেই বসেছিলেন। তাঁর ইচ্ছে তপন সিনহা বাদে কারও সঙ্গেই ছবি করবেন না। তপন সিনহা হেমেন বাবুর কাছেই সাগিনা করার কথাটা পাড়লেন। কথা প্রসঙ্গে বোঝা গেল, সাগিনা করার জন্য অবাঙালি নায়ক চাই। হেমেনবাবু দিলীপ কুমারের নাম সাজেস্ট করলেন।


দিলীপ কুমার তখন মাদ্রাজে শ্যুটিং করছেন। সবে বিয়ে করেছেন সায়রা বানুকে। তপন সিনহাকে সাদর সম্ভাষণ জানালেন দিলীপ কুমার। তপন সিনহা সংক্ষেপে ‘সাগিনা মাহাতো’র গল্পটা ইংরাজিতে লিখে দিলেন এবং বললেন “তুমি যত বড় স্টার, তোমায় অত টাকা দিতে পারব না।”

দিলীপ কুমার বললেন “আমি কি টাকার জন্য বাংলা ছবি করতে যাচ্ছি?”

সত্যজিৎ, দিলীপ, তপন।

শুরু হল, ‘সাগিনা মাহাতো’র শ্যুটিং। বাংলা ছবিতে অভিনয় করবেন দিলীপ কুমার ও সায়রা বানু দুজনেই, এ খবরে সাজো সাজো রব উঠল বাংলায়। বম্বের দুই সুপারস্টার এবার বাংলা ছবিতে। সঙ্গে অনিল চট্টোপাধ্যায়, চিন্ময় রায়, সুমিতা সান্যাল, অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ। হিন্দিতে সুমিতা সান্যালের রোলটা করেছিলেন অপর্ণা সেন।


তিনধারিয়া রেলওয়ে কারখানা, গয়াবাড়িতে থাকার ব্যবস্থা হল। শ্রীমতী ইলা রায়চৌধুরীর ছেলেরা তাঁদের বাড়িটা ছেড়ে দিলেন দিলীপ কুমার, সায়রা বানু ও তাঁর মা নাসিম বানু ওখানেই থাকলেন।

শ্যুটিং অসম্ভব জমে গেল। তপন সিনহার বাঙালি ইউনিটের সঙ্গে কাজ করেও তৃপ্ত হলেন দিলীপ কুমার। অন্যদিকে সায়রা বানু ভেবেছিলেন, ছবিতে তাঁর বরের চরিত্র করবেন হয়তো উত্তম বা সৌমিত্র। কিন্তু সায়রা দেখলেন তাঁর সামনে এসে দাঁড়ালেন রোগা পাতলা চিন্ময় রায়। সায়রার তো ভিরমি খাবার যোগাড়। যদিও পরে একসঙ্গে রীতিমতো নাচ করেছিলেন সায়রা ও চিন্ময়।

কিন্তু ছবির শ্যুটিং শেষ হলেও রাজনৈতিক বাধা আসতে শুরু করল। রীতিমতো হুমকি। ছবির সেন্সর করার পর শোনা গেল, ‘সাগিনা মাহাতো’ রিলিজ করতে দেওয়া হবে না। সিনেমাহলের সামনে পিকেটিং করা হবে। প্রযোজক হেমেন গাঙ্গুলির মুখ চেয়ে স্পেশাল শোয়ের ব্যবস্থা করলেন তপন সিনহা। আমন্ত্রিত অতিথিদের মধ্যে ছিলেন সেসব রাজনৈতিক দলের লোকরাও। অদ্ভুত ভাবে ছবি দেখে তাঁরাই বললেন “চমৎকার ছবি! আপনি ট্রেড ইউনিয়ন মুভমেন্টের ভন্ডামির মুখোশ খুলে দিয়েছেন। ছবি রিলিজ করুন। তারপর যা হয় দেখা যাবে। আমরা আপনার সঙ্গে আছি।”


১৯৭০ সালে ছবি রিলিজ হতেই সুপার ডুপার হিট। একে দিলীপ কুমার-সায়রা বানু বাংলা ছবিতে, তার ওপর তপন সিনহার ছবি। ছবির গানও অসম্ভব হিট। আরতি মুখোপাধ্যায় আর অনুপ ঘোষালের ‘ছোটি সি পঞ্ছি’ ডুয়েট মন মাতাল সবার। দর্শকের ভালবাসায় মুছে গেল সব বিতর্ক।

তবে সেসময়ের কমিউনিস্টরা ‘সাগিনা মাহাতো’ ছবিটাকে বাঁকা চোখে দেখেছিলেন। অন্তত তপন সিনহা তাই জানিয়েছিলেন। অথচ ‘সাগিনা মাহাতো’ মস্কো ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে অ্যাফ্রো-এশিয়ান অ্যাওয়ার্ড পেয়েছিল।

‘সাগিনা মাহাতো’ কলকাতায় সুবর্ণ জয়ন্তী সপ্তাহও হিট করে। দিলীপ কুমার সেরা অভিনেতার পুরস্কার পান বিএফজেএ-তে। অনিল চট্টোপাধ্যায় সেরা সহ-অভিনেতার বিএফজেএ পুরস্কার পান।

এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য, দিলীপ কুমার একদিন শ্যুটিং শেষে তপন সিনহাকে বলেন “আরও ঘন্টা চারেক কাজ করলে অসুবিধে হবে? সকালের সিনটায় আমি ভাল অভিনয় করিনি, যদি রিটেক করেন।”

অনিল চ্যাটার্জী-সহ সকলকে নিজে অনুরোধ করে রাত দশটা অবধি সেই দৃশ্যে অভিনয় করেন দিলীপ কুমার। সবটাই বিনা পারিশ্রমিকে।

তবে দিলীপ কুমারের বাংলা ছবিতে অভিষেক ১৯৬৬ সালে, ‘পাড়ি’ ছবি দিয়ে।
‘কপালকুন্ডলা’, ‘হানাবাড়ি’, ‘মরণের পরে’ ছবির নায়িকা প্রণতি ঘোষকে মনে পড়ে! তিনি নায়ক অভি ভট্টাচার্যকে বিয়ে করে বম্বে পাড়ি দেন। বহুদিন পর প্রণতি ভট্টাচার্য কলকাতা ফিরে বাংলা ছবি ‘পাড়ি’ প্রযোজনা করেন।

সত্যজিৎ রায়, অভি ভট্টাচার্য, দিলীপ কুমার ও বিশ্বজিৎ।

নায়ক হিসেবে নেন বম্বের ধর্মেন্দ্রকে। এটাই ধর্মেন্দ্রর প্রথম বাংলা ছবি। প্রণতি নিজেই নায়িকা। আর একটি বিশেষ অতিথি শিল্পীর ছোট্ট চরিত্রে অভিনয় করেন দিলীপ কুমার। ‘পাড়ি’ জরাসন্ধর কাহিনি। জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায়ের পরিচালনা। সলিল চৌধুরীর সুরারোপিত ছবিটি বেশ হিট করেছিল রিলিজের পর।


এই ছবিটিই একই চরিত্রচিত্রণে হিন্দিতে ডাবড করে রিমেক হয় ‘আনোখা মিলন’ নামে। ধর্মেন্দ্র ও দিলীপ কুমার এক ছবিতে থাকায় ছবিটি আলোচিত ছবি ছিল।

দুটো বাংলা ছবিই দিলীপ কুমার করেছেন বাংলাকে ভালোবেসে, যা সব বাঙালি মনে রাখবে চিরদিন। বিশেষত সাগিনার অপাপবিদ্ধতা ভোলা যায় না।

You might also like