Latest News

দেব-প্রসেনজিতের সেয়ানে সেয়ানে টক্কর, আলোলিকা ইশা

শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়

ছবি – কাছের মানুষ
পরিচালনা – পথিকৃৎ বসু
অভিনয় – প্রসেনজিৎ, দেব, ইশা, তুলিকা বসু

জীবন হতাশায় ডুবে গেলে, দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে, সব আশা হারিয়ে ফেললে আত্মহত্যাই কী শেষ পথ? হয়তো না। কখনও কখনও আত্মহত্যার মুখ থেকে কোন জীবন দেবতা এসে বাঁচিয়ে দিলে খুঁজে পাওয়া যায় বাঁচার নতুন সংজ্ঞা।

প্রসেনজিৎ চট্যোপাধ্যায় (Prasenjit Chatterjee) ও দেব (Dev) অভিনীত ‘কাছের মানুষ’ (Kacher Manush) ছবিটি মানুষের জীবনকে নতুন ভাবে চিনতে সাহায্য করে। ছবির দুই মুখ্য চরিত্র কুন্তল (দেব) ও সুদর্শন (প্রসেনজিৎ) দুই ব্যক্তির জীবনের টানাপোড়েনকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে ছবির চিত্রনাট্য। দুজনেই জীবনে বারবার ব্যর্থ পথিক। আত্মহত্যা করতে গিয়েই দুই ব্যক্তির পরিচয়। সুদর্শন এলআইসি এজেন্ট। তাঁরা দু’জনে সিদ্ধান্তে আসে কুন্তলের নামে জীবন বিমা করাবে সুদর্শন এবং তারপর কুন্তল আত্মহত্যা করবে। বিমা কোম্পানির কাছ থেকে সুদর্শন যে টাকা পাবে, তা দিয়ে সুদর্শন নিজের অসুস্থ বোন আলোর চিকিৎসা করাবে এবং কুন্তলের মৃত্যুর পর তাঁর পক্ষাঘাতগ্রস্থ মা’কে দেখবে সুদর্শন।

রাজেন তরফদার পরিচালিত শক্তিপদ রাজগুরুর কাহিনি অবলম্বনে ‘জীবন কাহিনি’ ছবির নির্যাস নিয়ে পথিকৃৎ বসু তৈরি করেছেন ‘কাছের মানুষ’ ছবি। সেখানেও ছিল তিনটি মূল চরিত্র, বিকাশ রায়, তাঁর মেয়ে সন্ধ্যা রায় ও অনুপকুমার। আর ‘কাছের মানুষ’ ছবিতে প্রসেনজিতের বোন দেখানো হয়েছে ইশা সাহাকে। তবে পুরনো ছবির সঙ্গে ফ্রেম টু ফ্রেম একই গতে চলেছে নতুন ছবিটি তা কিন্তু একেবারেই নয়। যারা ‘জীবন কাহিনি’ ছবিটি দেখেননি তাঁদের নতুন ধারার ছবি লাগবে ‘কাছের মানুষ’। আর যারা রাজেন তরফদারের ছবিটি দেখেছেন তাঁদের ‘কাছের মানুষ’ নতুন ভাবে ভাল লাগবে। শেষ দিকে গল্পে দারুণ চমক দিয়েছেন পরিচালক পথিকৃৎ। কথায় আছে দু’জন সুপারস্টার একসাথে অভিনয় করলে একজন আরেকজনকে অভিনয়ে খেয়ে ফেলেন। কিংবা একজন স্টারকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু ‘কাছের মানুষ’ ছবিতে দেব ও প্রসেনজিৎ দু’জনেই সেয়ানে সেয়ানে টক্কর দিয়েছেন।

‘কাছের মানুষ’ ছবির বাকি গল্প বলে দিলে ছবি দেখার চমক হারাবেন দর্শকরা তাই গল্পটি কীভাবে এগিয়েছে তা বড় পর্দাতেই দেখুন পুজোর সময়ে। পুজোর ছবি মানেই স্টারডমের ছটা। কিন্তু দুজন তাবড় স্টার প্রসেনজিৎ ও দেব একসঙ্গে এক ছবিতে থেকেও গ্ল্যামারের রঙে ভাসেনি এ ছবি। বরং দুই তারকাকে বাস্তবের মাটিতে নামিয়ে এনেছেন পরিচালক।

অভিনয় প্রসঙ্গে, প্রসেনজিৎ চট্যোপাধ্যায় এ ছবিতে তথাকথিত হিরো একেবারেই নন। বরং পরিস্থিতির চাপে তিনি ভিলেন। কিন্তু চরিত্রটি অ্যান্টি হিরোর। যে সুদর্শন চরিত্রটি কুন্তল রূপী দেবকে মেরে ফেলার জন্য নানা রকম ছক কষছে। কখনও গ্যাসের পাইপ কেটে রাখছে কখনও বা মাথার উপর ছাদ ভাঙা ইঁট ফেলে দিচ্ছে কিংবা চলন্ত বাস থেকে ঠেলে ফেলে দিচ্ছে। এমন একটি নিষ্ঠুর চরিত্র সুদর্শনকে দেখে দর্শক মনে ঘৃণার সৃষ্টি হয়। আর এই ঘৃণাটাই প্রসেনজিতের পুরস্কার। তিনি হিরো রূপে জনপ্রিয় হয়েও এমন একটি অন্যধারার চরিত্র করার সাহস নিয়েছেন। কিন্তু সুদর্শনের জন্য মায়াও হয় যখন অসুস্থ বোনের জন্য দাদার আকুলতা তাঁর মুখে ফুটে ওঠে। কমেডি অভিনয়ের অংশ গুলিতে বা বডি ল্যাঙ্গোয়েজে কিছু ক্ষেত্রে ব্যাগ হাতে প্রসেনজিৎ যেন ‘জীবন কাহিনি’র বিকাশ রায়কে অনুসরণ করেছেন। তবে নিজের অভিনয়ের মুন্সিয়ানাও রেখেছেন তিনি।

Kacher Manush

কুন্তল চরিত্রে দেব অতুলনীয়। দেব ঠিক প্রসেনজিতের মতোই তাঁর প্রতিটি ছবিতে চমক রাখতে পছন্দ করেন এবং নিজেকে ভেঙেচুড়ে দর্শকের সামনে হাজির করেন। দেব স্টারডম আর এমপি তকমা ছেড়ে ‘কাছের মানুষ’ ছবিতে একটি বেকার ছেলের যন্ত্রণা ফুটিয়ে তুলতে সক্ষম হয়েছেন। শুধু তাই নয় যে জানে তাঁর সামনেও মৃত্যু পেছনেও মৃত্যু। তাঁর মাঝে থেকে সে বাঁচার জয়গান গায়। এত ন্যাচারাল অ্যাক্টিং এ সত্যি তাক লাগিয়ে দিয়েছেন দেব। দেবের প্রথম অন্যধারার ছবি ‘বুনো হাঁস’, যাতেও একটি সাধারণ ছেলের রোলে অভিনয় করেন দেব। তারপর ‘সাঁঝবাতি’ হয়ে ‘কাছের মানুষ’। দেব যেন আরো পরিণত।

দেব-প্রসেনজিৎ অভিনয়ে দু’জন দু’জনকে এক চুল জায়গা ছাড়েননি। চার দশকের সুপারহিট নায়ক প্রসেনজিতের সঙ্গে সমান তালে অভিনয় করে গেলেন দেব। দুজন দুজনের পরিপূরক যেন হয়ে উঠেছেন। সত্যি বলতে হয় দুজন দুজনের কাছের মানুষ হয়ে উঠেছেন। আরেকটি দৃশ্যে কথা না বললেই নয় জীবন-মৃত্যুর শিরে-সংক্রান্তিতে দাঁড়িয়ে প্রসেনজিৎ ও দেবের অ্যাকশন দৃশ্য দুর্দান্ত ও নজরকাড়া। ভীষণ স্মার্ট উপস্থাপন করা হয়েছে দৃশ্যগুলি, যা দেখে গায়ে কাঁটা দেয়।

Kacher Manush

দেব-ইশা সাহা প্রথম জুটি বেঁধেছিলেন ‘গোলন্দাজ’ ছবিতে। এবার ‘কাছের মানুষ’ ছবিতে সত্যি-সত্যি কাছের মানুষ হয়ে উঠেছেন দেব-ইশা। এই জুটি অনেক বেশী সপ্রতিভ লাগল এই ছবিতে। দেব-প্রসেনজিতের কঠিন জীবন-মৃত্যুর লড়াইয়ের মাঝে ইশা যেন একটি নিষ্পাপ ফুলের মতো। নাম আলো। যে আলোর মতোই কুন্তলের জীবনে এসে আলোর পথ দেখায়। আলোই হয়ে ওঠে কুন্তল-সুদর্শনের সম্পর্কের সেতুবন্ধ। দেব-ইশা জুটি ভবিষ্যতের একটি সফল জুটি হতে পারে এ ছবিতে তাঁরা প্রমাণ করলেন। মননশীল ছবির নায়িকা ইশা আর বানিজ্যিক ছবির নায়ক দেবও যে জুটি হতে পারেন ‘কাছের মানুষ’ তাঁর নজির তৈরী করল। বেশ ফ্রেশ লেগেছে এই জুটি। কলকাতা শহরের আনাচে-কানাচে তাঁদের আলাপ-প্রেমালাপ চোখেমনে আরাম দেয়।

Kacher Manush

ছবির প্রথমার্ধ কিছুটা হলেও ধীর গতির কিন্তু বিরতির পর দ্বিতীয়ার্ধ অনেক বেশি চমকদার ও গতিশীল। ছবির শেষ অংশে বড় চমক রঞ্জিত মল্লিক। রঞ্জিত মল্লিকের উপস্থিতি আর সংলাপ বলা দর্শকদের মন ভরাবেই। রঞ্জিত মল্লিক,প্রসেনজিৎ ও দেব তিন প্রজন্মের সুপারস্টার হিরোকে এক দৃশ্যে আনল ‘কাছের মানুষ’। পক্ষাঘাতগ্রস্থ কুন্তলের মায়ের চরিত্রে তুলিকা বসুর নির্বাক অভিনয় অসামান্য। সুস্মিতা চট্টোপাধ্যায়ের ছোট্ট উপস্থিতি সপ্রতিভ ও দরকারি।

‘কাছের মানুষ’ ছবির সঙ্গীত পরিচালক নীলায়ন চট্টোপাধ্যায় সঙ্গীতের সব কটি ধারার স্বাদ এনেছেন এই ছবিতেই। তিনি কিশোর ছেলে প্রাঞ্জল বিশ্বাসকে দিয়ে গাইয়েছেন ছবির সবথেকে জনপ্রিয় গান ‘টাকা লাগে’। যা বেশ সফল ও সাহসী পদক্ষেপ। মন কাড়ে ঊষা উত্থুপের কন্ঠে ‘চুম্বক মন’। সোনু নিগমের কন্ঠে ‘মুক্তি দাও’ গানটিও মন আকুল করে। আবার পার্বতী বাউল গেয়েছেন নিজের ঘরানায় ‘কে বলে মানুষ মরে’। তবুও ‘কাছের মানুষ’ এর গান অতীতের ‘জীবন কাহিনি’ ছবির গানকে অতিক্রম করতে পারলনা। মধুরা পালিতের সিনেমাটোগ্রাফি অসাধারণ যা ছবিটার থেকে চোখ সরাতে দেয়না।

‘কাছের মানুষ’ এ প্রাপ্তি প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়, দেব অধিকারী ও ইশা সাহার অসাধারণ অভিনয় ও মন কাড়া গল্প বলা। পুজো মানেই শুধু হুল্লোড়-নাচগান নয়, পুজো মানে সত্যিকারের কাছের মানুষদের চিনে নেওয়া, পাশে থাকা। ‘কাছের মানুষ’ সেই গল্পই বলে।

ট্রিংকাসে অনেকদিন পর ঊষা, দেবের সঙ্গে সে কী নাচ দিদির! দেখুন ভিডিও

You might also like