Latest News

‘জীবনানন্দ’ হয়ে ফিরছেন ব্রাত্য, সমাজের উপেক্ষা, সম্পর্কের টানাপড়েন, কবির জীবনকথা বললেন সায়ন্তন

দ্য ওয়াল ব্যুরো: জীবনানন্দ দাস বাংলা কাব্যে আধুনিকতার পথিকৃৎদের মধ্যে অন্যতম। বিংশ শতাব্দীর অন্যতম প্রধান আধুনিক ভারতীয় তথা বাঙালি কবি, লেখক, প্রাবন্ধিক জীবনানন্দ দাসকে (Jibanananda Das) নিয়ে বাংলা চলচ্চিত্রে এই প্রথম শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন করছেন পরিচালক সায়ন্তন মুখোপাধ্যায় এবং প্রযোজক পবন কানোডিয়া। বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির বড় জায়গা জুড়ে রয়েছেন জীবনানন্দ দাস। এভিএ ফিল্মস প্রযোজিত ২৪ জুন জীবনানন্দ দাসের বায়োপিক ঝরা পালক ছবি মুক্তি পাবে। ইতিপূর্বে কলকাতা ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে ছবির স্ক্রিনিং হয়েছে। উপস্থিত বিদ্বজনেরা ছবির ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। সাহিত্য-সংস্কৃতি মহলের বিশিষ্টজনেরা এই ছবিকে ঘিরে রীতিমতো উচ্ছ্বসিত। নিজের লেখা চিত্রনাট্য ও সংলাপ নিয়ে সায়ন্তন মুখোপাধ্যায় ছবিটি পরিচালনা করেছেন। ঝরা পালক প্যারিসে বিশেষ স্ক্রিনিং হবে। ছবি মুক্তির আগে পরিচালক সায়ন্তন মুখোপাধ্যায় দ্য ওয়াল-কে এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকার দিলেন। একান্ত কথোপকথনে চৈতালি দত্ত।

Image - 'জীবনানন্দ' হয়ে ফিরছেন ব্রাত্য, সমাজের উপেক্ষা, সম্পর্কের টানাপড়েন, কবির জীবনকথা বললেন সায়ন্তন
প্রযোজক পরিচালক ও ব্রাত্য বসু

কবি জীবনানন্দ দাসের (Jibanananda Das) বায়োপিক ‘ঝরা পালক’ ছবি তৈরি করার পেছনে একজন পরিচালক হিসেবে আপনি কী ধরনের চিন্তাভাবনা বা তাগিদ অনুভব করেছিলেন?

সায়ন্তন: আমি তখন ক্লাস সেভেনের ছাত্র। জন্মদিনে আমার বাবা কবি জীবনানন্দ দাসের কাব্যগ্রন্থ ‘সাতটি তারার তিমির’ উপহার দেন। সেই থেকে যেভাবে আমি জীবনানন্দ দাসের প্রতি আচ্ছন্ন হলাম, আজও আমার সেই আচ্ছন্নতা কাটেনি সেটা বলাই বাহুল্য। জীবনানন্দের শুধু কবিতা নয় কাব্য এবং গদ্য সাহিত্যে তাঁর জীবনবোধ ও শিল্পবোধ আমাকে ভীষণ ভাবে প্রভাবিত করে। আমার সব সময় মনে হয়েছে জীবনানন্দ দাস তাঁর সময়ের অনেক আগের একজন কবি। তিনি একটু সময়ের আগে চলে এসেছিলেন। তাই তিনি উপেক্ষিত। শুধু তাই নয় সেই সময়ের শিল্প- সমালোচকদের দ্বারা তিনি জঘন্যতম ভাবে সমালোচিত। তার কারণ আধুনিক সভ্যতার সংকট দুটো বিশ্বযুদ্ধ জীবনানন্দ দেখেছিলেন । সেই সময় বিশ্বযুদ্ধের পর সমগ্র পৃথিবীতে সামাজিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে অন্ধকার নেমে এসেছিল।

এত রক্ত, এত ক্লান্তি, এত গ্লানি, এত মানুষের ভোগান্তি, এত স্বৈরাচার তার প্রতিবাদ স্বরুপ রাষ্ট্রের যে ভণ্ডামি এবং কুৎসিত চেহারা তা কবিতা, ছবির মাধ্যমে অন্ধকার থেকে সত্যকে বের করার করে আনার প্রয়াস করেছিল গোটা বিশ্ব। কিন্তু ভারতবর্ষে তখনও অবধি সেরকম কোনও আন্দোলন দেখা যায়নি। তখন এখানে রবীন্দ্র প্রভাবে বাংলা সাহিত্য আচ্ছন্ন । সেই সময়ের কবি যাঁরা ছিলেন বুদ্ধদেব বসু , প্রেমেন্দ্র মিত্র ,সুধীন্দ্র নাথ দত্ত, অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত, সঞ্জয় ভট্টাচার্য প্রমুখ এঁরা কল্লোল নামে সাহিত্য পত্রিকা মুভমেন্ট করেছিলেন। তাঁরা একজন যথার্থ নায়ক খুঁজছিলেন। তখন নায়ক হিসেবে জীবনানন্দ দাসকে তাঁরা খুঁজে পান। সেই সময় অন্ধকারের কবি, অশ্লীল কবি, দুর্বোধ্য কবি ইত্যাদি নানাভাবে এবং বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় ক্রমাগত সজনীকান্ত দাস তাঁর ‘শনিবারের চিঠি’ পত্রিকাতে জীবনানন্দ দাসকে আক্রমণ করে চলেছেন । কিন্তু জীবনানন্দ দাস এমন একজন কবি যিনি বলেছিলেন,’ পৃথিবীর গভীর গভীরতর অসুখ আজ’..। আমার সব দিক বিচার করে মনে হয়েছে সভ্যতা কি সবসময় রক্তই দেখতে চায়? তাই এখনও জীবনানন্দকে আমার প্রাসঙ্গিক বলেই মনে হয়। ১২৫ বছর হয়ে গেল তিনি মারা গেছেন। আমার ব্যক্তিগত ধারণা এত বছর পরও এই সময়ের অন্ধকারের ভেতর থেকে সত্যকে খুঁড়ে বের করতে গেলে একমাত্র জীবনানন্দের পক্ষেই তা সম্ভব ছিল। আমার চিরকালের নায়ক জীবনানন্দ দাস। তিনি যে শুধু একজন কবি বা সাহিত্যিক তা নন। ভারতবর্ষ তথা এশিয়ার প্রথম রকস্টার। পৃথিবীর প্রাতিষ্ঠানিকের যে নগ্নতা তার ভেতরে যে চূড়ান্ত মিথ্যে লুকিয়ে আছে পুরোটাই মুখোশ ছাড়া আর কিছুই নয় সেটাকে টেনে ছিঁড়ে অন্ধকার থেকে সত্যকে বার করার সাহস দেখিয়ে গেছেন জীবনানন্দ দাস।

শুধুমাত্র শিল্পের স্বার্থে। নাম যশ অর্থ খ্যাতির জন্য নয়। শিল্পের সবচেয়ে বড় অনুসন্ধান হল সত্য। শিল্প তো সত্যকেই অনুসন্ধান করে। আর সেই সত্যান্বেষণ জীবনানন্দ (Jibanananda Das) করে গেছেন তাঁর শিল্প এবং জীবন দিয়ে। এই কারণেই জীবনানন্দ দাসকে নিয়ে ছবি করার তাগিদ অনুভব করেছিলাম । আমার এই স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করেন প্রযোজক পবন কানোডিয়া।

Image - 'জীবনানন্দ' হয়ে ফিরছেন ব্রাত্য, সমাজের উপেক্ষা, সম্পর্কের টানাপড়েন, কবির জীবনকথা বললেন সায়ন্তন

কবি জীবনানন্দ দাসকে নিয়ে বায়োপিক অথচ সেখানে প্রযোজক একজন অবাঙালি এই সমন্বয় সত্যি ব্যতিক্রমী –

সায়ন্তন : ( মুখের কথা কেড়ে) ওরকম একজন প্রগতিশীল কবিকে নিয়ে ছবি করার জন্য যখন কোনও বাঙালি প্রযোজক এগিয়ে এলেন না, তখন পবন কানোডিয়া এই ছবিটি করতে আগ্রহী হন। তাঁর কাছে আমি সত্যি চির কৃতজ্ঞ । জন্মসূত্রে অবাঙালি হলেও উনি মননে একজন বাঙালি। নিজে একজন কবি । রীতিমতো তিনি হিন্দি এবং উর্দুতে কবিতা চর্চা করেন। উনি নিজে একজন কবি হিসাবে জীবনানন্দ দাসকে কাব্যিক ট্রিবিউট জানাচ্ছেন বলা যেতে পারে। এটাই দুঃখের বিষয় জীবনানন্দ দাসের মতো এরকম একজন কিংবদন্তী কবিকে নিয়ে ছবি তৈরি করার জন্য কোনও বাঙালি প্রযোজক আমি পেলাম না ।

রবীন্দ্র ও নজরুল পরবর্তী বাংলা সাহিত্যে কবি জীবনানন্দ দাসকে প্রধান কবি বলে মনে করা হয়-

সায়ন্তন : (কথা শেষ না হতেই) একদম ঠিক। নজরুলের থেকেও আমার ব্যক্তিগত মতামত ভারতবর্ষের এখনও শ্রেষ্ঠতম কবি জীবনানন্দ দাস। এটা কিন্তু আমি রবি ঠাকুরকে মাথায় রেখেই বলছি। রবি ঠাকুরের পরবর্তী সময়ে সমগ্র পৃথিবীতে নজরুলের থেকেও বেশি জীবনানন্দ দাসকে নিয়ে আলোচিত হয়। আমার মতে সেক্ষেত্রে এভাবে আসা উচিত ছিল রবীন্দ্র জীবনানন্দ-নজরুল।

Image - 'জীবনানন্দ' হয়ে ফিরছেন ব্রাত্য, সমাজের উপেক্ষা, সম্পর্কের টানাপড়েন, কবির জীবনকথা বললেন সায়ন্তন

ছবিতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং নজরুল ইসলামের মতো প্রবাদপ্রতিম সাহিত্যিকদের কোনও উল্লেখ রয়েছে কি ?

সায়ন্তন : অবশ্যই আছে। অত্যন্ত প্রকট ভাবে নেই । শৈল্পিক ভাবেই তাঁরা আছেন। তবে তা জানতে হলে দর্শকদের ছবিটি দেখতে হবে। যে সময়ের কথা ছবিতে উল্লেখ রয়েছে সেখানে রবীন্দ্র-নজরুল তো থাকবেনই । এছাড়াও কল্লোল গোষ্ঠীর থেকেই জীবনানন্দ দাসের উত্থান । ফলে স্বাভাবিকভাবে বুদ্ধদেব বসু, প্রেমেন্দ্র মিত্র ,সুধীন্দ্রনাথ দত্ত প্রমুখ কবিদের উল্লেখ রয়েছে।

ঝরা পালক ছবির নামকরণের কারণ কী?

সায়ন্তন: আসলে ঝরা পালক ছবির নামকরণ করেছেন অভিনেতা, নাট্য নির্দেশক তথা নাট্যব্যক্তিত্ব ব্রাত্য বসু। যাকে এই ছবিতে জীবনানন্দের ভূমিকায় অভিনয় করতে দেখা যাবে। প্রথমেই ছবির নামকরণ মাল্যবান বা পলাতক এই ধরনের চিন্তাভাবনা করেছিলাম। যেহেতু জীবনানন্দ দাসকে ‘জীবন পলাতক কবি’ বলা হত। ছবির নামকরণ ‘ঝরা পালক’ করার জন্য ব্রাত্য বসু আমাকে উপদেশ দেন।
যখন চিত্রনাট্য লেখা হয় সেই প্রথম দিন থেকে আজ পর্যন্ত এই ছবিকে ব্রাত্য বসু পরম মমতায় স্নেহে আদরে শাসনে আগলে রেখেছেন। আসলে ছবির মূল অনুপ্রেরণা জীবনানন্দ দাসের (Jibanananda Das) উপন্যাস ‘মাল্যবান’। এটি আত্মজীবনীমূলক জীবনানন্দের একটি উপন্যাস। যেখানে তিনি তাঁর নিজের শিল্পবোধ, জীবনবোধ তথা বৈবাহিক জীবনের কথা উল্লেখ করেছেন। এমনকি তাঁর বৈবাহিক জীবনের বহু স্তরীয় যে আলো অন্ধকার টানাপোড়েন দিক রয়েছে তার কথাও পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে উনি মেলে ধরেছেন।

Image - 'জীবনানন্দ' হয়ে ফিরছেন ব্রাত্য, সমাজের উপেক্ষা, সম্পর্কের টানাপড়েন, কবির জীবনকথা বললেন সায়ন্তন

এমন একজন লেখক যিনি নিজের জীবন বলিদান করেন। মাল্যবান উপন্যাস কবি তাঁর জীবদ্দশায় প্রকাশ করেননি। উনি তাঁর স্ত্রী লাবণ্যপ্রভা দাসকে বলে গেছিলেন, এই উপন্যাস যেন কোনওদিনও ছাপার অক্ষরে প্রকাশিত না হয়। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর পর লাবণ্য প্রভা দাস এই আত্মজীবনীমূলক উপন্যাস প্রকাশিত করেন, যাতে তিনি অসম্ভব সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছিলেন। কারণ তিনি জানতেন বাঙালি পাঠকের কাছে লেখাটা পৌঁছালেই তাঁর দিকে প্রথম কাদা ছোড়াছুড়ি হবে এবং তাঁকেই কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হবে। তথাপি তিনি সাহিত্যের স্বার্থে এই উপন্যাসকে প্রকাশ্যে এনেছিলেন। আর এই উপন্যাস ছবি করতে আমাকে সাহায্য করেছে। যা আমি অনুসরণ করেছি। তবে বক্স অফিসের কথা মাথায় না রেখে পুরোপুরি জীবনানন্দের কথা ভেবে ছবির চরিত্রায়ণের জন্য শিল্পীদের নির্বাচন করেছি।

প্রসঙ্গত বলা দরকার তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ঝরা পালক। জীবনানন্দ নিজে কতটা আত্মবিশ্লেষক ছিলেন তা সত্যি ভাবা যায় না। জীবনের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ঝরা পালক হিসেবে নিজেকে বিচার করছেন। কারণ যে শিল্প ভাবনা এবং চেতনা সর্বোপরি যে দর্শন নিয়ে তিনি কাজ করতে যাচ্ছেন সেটা কোনওদিনই মানুষ বুঝবেন না তা তিনি প্রথম থেকেই জানতেন। তিনি ছিলেন পুরোপুরি শিল্পের জন্য নিয়োজিত একজন প্রাণ। অর্থ,যশ ,খ্যাতি থেকে নিজেকে যিনি প্রথম থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছিলেন। ঝরে যাওয়া পালককে মানুষ পা দিয়ে পিষ্ট করে চলে যাবে জেনেও তিনি কাব্যগ্রন্থের নাম রেখেছিলেন ঝরা পালক। একজন কবি সাহিত্যিক শিল্পী যিনি নিজের জীবনকে শিল্পের স্বার্থে উৎসর্গ করেছেন। প্রবাদপ্রতিম কবি সাহিত্যিক উপন্যাসিক প্রাবন্ধিক এই কিংবদন্তি ব্যক্তিত্ব কে তাই ঝরাপালক নাম দিয়ে আমরা তাঁকে শ্রদ্ধার্ঘ্য জানাচ্ছি।

Image - 'জীবনানন্দ' হয়ে ফিরছেন ব্রাত্য, সমাজের উপেক্ষা, সম্পর্কের টানাপড়েন, কবির জীবনকথা বললেন সায়ন্তন

ছবিতে কোন সময় তুলে ধরা হয়েছে ?

সায়ন্তন: তাঁর জীবনীকাল ১৮৯৯-১৯৫৪। ছবিতে এই সময়টা তো রয়েছেই। এর সঙ্গে রয়েছে তাঁর কাব্য জগৎ। কবি জীবনে সে অর্থে কিন্তু কোনও ড্রামা থাকে না। যদিও কবির অসুখি দাম্পত্য জীবন ছিল । সেটা আমরা সকলেই জানি। স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের টানাপড়েন, মনের অমিল যথেষ্ট ছিল। মাল্যবানের সূত্রে সেটাই এই ছবির প্রধান উপজীব্য। পাশাপাশি কবির কাব্য ও শিল্প জগতে তাঁর যে ফ্যান্টাসি, ম্যাজিক এবং স্বপ্ন বাস্তব, সংগ্রাম সেটাও ছবিতে ধরা পড়েছে । এছাড়াও সাম্প্রতিক সময়কে দুটো চরিত্রের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে। সেটি হল সোমেন পালিত এবং সুরঞ্জনা।

জীবনানন্দ দাসের লেখা কবিতা ‘জুহু ‘ সেখানে একজন নাগরিক আইকন প্রোটাগনিস্ট সোমেন পালিত। যার সঙ্গে প্রেমিকা সুরঞ্জনার বিচ্ছেদ হয়। এই বিচ্ছেদের পর সুরঞ্জনা জীবনানন্দ দাসের বায়োপিক তৈরি করছেন যার নাম ঝরা পালক। এইভাবেই ছবির শুরু। আসলে এই সময় জীবনানন্দ দাস ও লাবণ্য প্রভা দাসের জন্ম যদি হত তবে কেমন হত? জীবনানন্দের মতো কবি আধুনিক থেকে আধুনিকতর পৃথিবীর যে কোনও সময় জন্মগ্রহণ যদি করতেন আমার মতে তিনি এই ভাবে উপেক্ষিত হতেন। ছবিতে তিনটি সময় আছে। এই সময় দাঁড়িয়ে জীবনানন্দ দাস কতটা প্রাসঙ্গিক সেটাও ছবিতে রয়েছে। তাঁর যে কাব্য সত্তা এবং কাব্য জগৎ সেটাকে অর্থাৎ কবিতাকে সিনেমায় প্রতিস্থাপন করা ছিল খুবই দুরূহ ব্যাপার। সেই প্রচেষ্টায় কতটা সফল হয়েছিল তা ছবি দেখে দর্শক বলবেন।

জীবনানন্দ দাশের স্ত্রী লাবণ্যপ্রভা দাসকে ছবিতে কীভাবে পোর্ট্রেট করা হয়েছে?

সায়ন্তন: মাল্যবান উপন্যাস পড়ার পর থেকে পাঠকদের মনে কবি এবং তাঁর স্ত্রীর সম্পর্ক নিয়ে একটা মিথ আছে যে জীবনানন্দের জীবনে লাবণ্যপ্রভা কবিকে অসম্ভব বঞ্চনা এবং অত্যাচারের মধ্যে দিয়ে নিয়ে গেছেন।কবির জীবন কে তাঁর স্ত্রী অতিষ্ঠ করে তুলেছিল। আর কবির জীবনে এই ট্রাজেডির পেছনে স্ত্রীর একটা বড় ভূমিকা রয়েছে। জীবনানন্দের অন্তরের উদারতাকে তাঁর স্ত্রী কখনও বুঝতে পারেন নি। মাল্যবান পড়ার সময় এবং রিসার্চের জন্য জীবনানন্দের গহীনে যত প্রবেশ করেছি ততই মনে হয়েছে মানুষের ধারণা পুরোটাই ভ্রান্ত ।

Image - 'জীবনানন্দ' হয়ে ফিরছেন ব্রাত্য, সমাজের উপেক্ষা, সম্পর্কের টানাপড়েন, কবির জীবনকথা বললেন সায়ন্তন

কবি জীবনে লাবণ্যপ্রভার ভূমিকা ছিল খুবই শৈল্পিক। কবির কাছে তার স্ত্রী কখনও প্রেমিকা, কখনও সঞ্চালক, কখনও পদ্য, কখনও সঙ্গীত,কখনও বনলতা সেন, কখনও মা মনসা। মায়ের পরে কবির জীবনের সবচেয়ে বেশি প্রভাব ছিল তাঁর স্ত্রী লাবণ্যপ্রভা দাসের। সারা জীবন লাবণ্যপ্রভা দাস কবি প্রতিভাকে নিষ্ঠাভরে আগলে রেখেছিলেন। এই সম্পর্কটা অত্যন্ত কাব্যিক। সম্পর্কের মধ্যে একদিকে ছিল নিভৃতি, অন্যদিকে অসম্ভব উগ্রতা ছিল।। এই চরিত্রে অভিনয় করেছেন জয়া এহসান। আপামর বাঙালির কাছে লাবণ্যপ্রভা একজন ভিলেন।

বাবা-মা এবং বোন সুচরিতার একটা বড় ভূমিকা কবির জীবনে রয়েছে সেটা ছবিতে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে কি?

সায়ন্তন: অবশ্যই ছবিতে আছে।

Image - 'জীবনানন্দ' হয়ে ফিরছেন ব্রাত্য, সমাজের উপেক্ষা, সম্পর্কের টানাপড়েন, কবির জীবনকথা বললেন সায়ন্তন

ঝরা পালক ছবির প্রধান উপজীব্য কী?

সায়ন্তন : এককথায় বলতে গেলে এটি কবির জীবনবোধ এবং শিল্পবোধ দ্বারা অনুপ্রাণিত একটি ছবি।

ব্রাত্য বসু কে জীবনানন্দ দাশের চরিত্রে নির্বাচনের পেছনে কী কারণ ছিল?

সায়ন্তন :জীবনানন্দ দাশের সঙ্গে ব্রাত্য বসুর চেহারায় অদ্ভুত মিল আছে। সেটা তো একটা প্রধান কারণ বটেই। এছাড়াও আমার মতে ব্রাত্য বসু নিজেই একজন প্রতিষ্ঠান। নাটক নির্দেশক থেকে শুরু করে নাটক মঞ্চস্থ এবং ওঁর লেখনি পড়ে অভিনয় দেখে আমাদের প্রজন্ম বড় হয়েছে । এই মাধ্যমে কাজ করতে আসা আমার প্রধান অনুপ্রেরণা অবশ্যই ব্রাত্য বসু। কবির চেহারার সঙ্গে ব্রাত্য বসুর শুধু মিল থাকলে হত না । সেই সঙ্গে প্রথম থেকেই আমি চেয়েছিলাম ব্রাত্য বসুর জীবনবোধ শিল্পবোধ এবং কাব্যবোধের ছায়া এই চরিত্রের মধ্যে যেন প্রভাব বিস্তার করে।যদি তা চরিত্রের গহীন হৃদয়ে প্রবেশ করতে পারে তবেই সেই চরিত্র পর্দায় যথাযথভাবে পরিস্ফুটিত হবে। আমার মনে হয়েছে এটা শুধুমাত্র ব্রাত্য বসুর পক্ষেই সম্ভব। ব্রাত্য বসুর যে শিক্ষা ,কাব্যের যে রসবোধ এবং সেই সঙ্গে তাঁর অভিনয়ের মুনশিয়ানা সব মিলিয়ে ওঁনাকে এই চরিত্রে নির্বাচন করা। তবে অল্প বয়সী জীবনানন্দ দাশের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়।

এই ছবি করতে গিয়ে কতদিন ধরে রিসার্চের মধ্যে দিয়ে আপনি গেছিলেন? মাল্যবান ছাড়াও আর কোন কোন বই আপনাকে ছবিটি করতে প্রলুব্ধ করে?

সায়ন্তন: মাল্যবান ছাড়াও সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়ের জীবনানন্দকে নিয়ে যাবতীয় লেখা ,জীবনানন্দ দাসের কবিতার কথা, জীবনানন্দের সমগ্র গদ্য সাহিত্য এবং সমস্ত ছোট গল্প। এছাড়াও অজস্র বই রয়েছে। এই রিসার্চ করতে আমার এক বছর সময় লেগেছিল।

Image - 'জীবনানন্দ' হয়ে ফিরছেন ব্রাত্য, সমাজের উপেক্ষা, সম্পর্কের টানাপড়েন, কবির জীবনকথা বললেন সায়ন্তন

কলকাতা ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল ছাড়া আর কোন কোন ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে ছবিটি প্রদর্শিত হয়েছে?

সায়ন্তন: কলকাতা ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের পাশাপাশি আমরা বিশিষ্ট জনদের জন্য আলাদাভাবে স্পেশাল স্ক্রিনিংয়ের আয়োজন করেছিলাম। এই ছবিটি দেখে বিদ্বজনেরা ভূয়শী প্রশংসা করেছেন।তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কবি জয় গোস্বামী, চিত্রশিল্পী যোগেন চৌধুরী, পরিচালক সুমন মুখোপাধ্যায়, সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়, অভীক মজুমদার, অনিরুদ্ধ ধর প্রমুখ। তাঁরা প্রত্যেকেই ছবিটি দেখে রীতিমত উচ্ছ্বসিত। সেই সঙ্গে তাঁরা ব্রাত্য বসু ,রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়, জয়া আহসানের অভিনয়ের সুখ্যাতি করেছেন। অস্ট্রেলিয়া, লন্ডন ছাড়াও অন্যান্য নামিদামি ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে ছবিটাকে এখন পাঠানো হচ্ছে। ২০১৭ তে ছবির চিত্রনাট্য, সংলাপ লিখতে শুরু করি । ২০১৮ শুরু হলেও ২০১৯ ছবি শেষ হয়। দু’বছর কোভিড কারণে ছবিটি মুক্তি পেতে পারেনি । খুব শিগগির এই ছবি প্যারিসে স্পেশাল স্ক্রিনিং হবে।

যেই সময়ের এই ছবি ঠিক সেই সময়ের অন্যান্য কবিদের কথা ছবিতে কী উল্লেখ্য রয়েছে ?

সায়ন্তন : অবশ্যই আছে ।তাঁরা হলেন বুদ্ধদেব বসু (কৌশিক সেন), প্রেমেন্দ্র মিত্র (বিপ্লব বন্দ্যোপাধ্যায়), সমর সেন (সুদীপ্ত চট্টোপাধ্যায়), সঞ্জয় ভট্টাচার্য (অরিন্দম বসু), সুধীন্দ্রনাথ দত্ত( পদ্মনাভ দাসগুপ্ত), অচিন্ত্য কুমার সেনগুপ্ত( অনুপ ঘোষাল)। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র রয়েছে সজনীকান্ত দাসের । তিনি এখানে অ্যান্টাগনিস্ট। যিনি শনিবারের চিঠিতে ক্রমাগত কবিকে বিদ্রুপ এবং অপমান করেন। এই চরিত্রে অভিনয় করেছেন দেব শংকর হালদার। আমার ধারণা উনি জীবনের শ্রেষ্ঠ অভিনয় করেছেন। যেটা ওঁনার জীবনে মাইলফলক হতে চলেছে। জীবনানন্দ দাসের বাবার চরিত্রে অভিনয় করেছেন শান্তিলাল মুখোপাধ্যায় ও মায়ের ভূমিকায় দেখা যাবে শ্রীলা মজুমদারকে। লাবণ্যপ্রভা দাশের কাকা চরিত্রে অভিনয় করেছেন মেঘনাদ ভট্টাচার্য্য ।এছাড়াও থিয়েটার জগতে অনেক প্রবীণ ও নবীন শিল্পীরা ছবিতে অভিনয় করেছেন।

জীবনানন্দ দাসের মৃত্যু পর্যন্ত কি ছবিতে রয়েছে?

সায়ন্তন: হ্যাঁ। জীবনানন্দ দাসের মৃত্যু নিয়ে একটা কুহক তো রয়েছেই। কেউ বলেন দুর্ঘটনা, আবার কেউ মনে করেন আত্মহনন বা আত্মহত্যা । বাংলাদেশের সাহিত্যিক শাহাদুজজামানের ‘একজন কমলালেবু ‘ উপন্যাস
পড়ে কবির মৃত্যু সম্পর্কে অনেক কিছু জানা যায়। ওঁনার মৃত্যু একটা বড় ফ্যাক্টর। যা ছবিতে অন্যরকম ভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। ওঁনার মতো একজন কবিকে সমাজ রাষ্ট্র এবং পরিবার সবাই মিলে গলা টিপে মেরে ফেলেছে। আমি মৃত্যু বলব না এটা মার্ডার বলব। ওঁনাকে যেন আস্তে আস্তে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। শারীরিকভাবে কবিকে কেউ খুন করেননি । কিন্তু সেই সময়ে তাঁবেদার শিল্পীগোষ্ঠী, কবি গোষ্ঠী , সমালোচক গোষ্ঠী কবির শিল্প এবং কাব্য বোধকে বুঝতে না পেরে ক্রমাগত তাঁকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে। তিনি দুর্বোধ্য, তিনি অলীক ইত্যাদি নানা ব্যঙ্গ বিদ্রুপ কবি কে দিনের পর দিন শুনতে হয়েছে। সহ্যের বাঁধ ভাঙার পর কবি নিজেকে যেন শেষ করে দিয়েছেন। আমার এই ছবিতে যা প্রকটভাবে রয়েছে। আমি ছবিতে ট্রামকে সেভাবে ব্যবহার করিনি। ট্রামের চাকায় উনি পিষ্ট হয়ে মারা যান। আমি ট্রামকে একটা রূপক, একটা প্রতীক হিসেবে নিয়ে এসেছি। এখানে ট্রাম যেন রাষ্ট্র এবং সমাজ। ট্রাম যেন জীবনানন্দের মতো একজন মহৎ কবির বুকের ওপর দিয়ে চলে যাচ্ছে। আমি মনে করি জীবনানন্দের মৃত্যু যেন সামগ্রিক হত্যা।

ছবির ক্যানভাস সাদা ও রঙের সংমিশ্রণ?

সায়ন্তন: সম্পূর্ণ ছবি সাদাকালোতে রয়েছে। তবে কবির নিজস্ব কিছু দৃশ্য কল্প ও চিত্র কল্প এবং বর্তমান সময়কে তুলে ধরতে রঙের ছোঁয়া রয়েছে।

ছবিতে কী ধরনের গান ব্যবহৃত হয়েছে ?

সায়ন্তন : ছবিতে প্রকটভাবে কোনও গান নেই ।তবে আবহ সঙ্গীতের দায়িত্বে রয়েছেন সঙ্গীতশিল্পী সাত্যকি বন্দোপাধ্যায়। ছবিতে ওঁর গলায় বেশকিছু জীবনানন্দ দাসের কবিতার আবৃত্তি রয়েছে। অল্পবিস্তর গানও আছে। জীবনানন্দের ‘হায়চিল’ কবিতার লাইন,’ হায়চিল , সোনালী ডানার চিল, এই ভিজে মেঘের দুপুরে/
তুমি আর কেঁদোনাকো উড়ে উড়ে ধানসিঁড়ি নদীটির পাশে’.. এই কবিতার লাইনগুলোকে মিউজিক্যালি ট্রিট করা হয়েছে। ছবির সম্পাদক প্রদীপ্ত ভট্টাচার্য। যিনি নিজে একজন জনপ্রিয় চিত্রপরিচালক। বহু জাতীয় পুরস্কারে সম্মানিত ছবির সাউন্ড ডিজাইনার সুকান্ত মজুমদার। ওঁনার হাতের জাদুতে ছবির শব্দ এক অন্য মাত্রা পেয়েছে । ছবির সিনেমাটোগ্রাফার অভিজিৎ নন্দী।

You might also like