Latest News

‘বেলাশেষে’র থেকেও ‘বেলাশুরু’ পরিণত, সৌমিত্র-স্বাতীলেখার অভিনয় গায়ে কাঁটা দেওয়ার মতো

শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়

ফিল্ম সমালোচনা- ‘বেলাশুরু’ (Belasuru)

পরিচালনা- শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, নন্দিতা রায়

অভিনয়- সৌমিত্র-স্বাতীলেখা-ঋতুপর্ণা-অপরাজিতা

রেটিং- ৮.৫/১০

তাঁরা ঘরে, বাইরে কোথাও আজ আর নেই। তাঁদের ‘ঘরে বাইরে’ থাকার কথাও ছিল না। অথচ তাঁরা মৃত্যুর পরেও জুটি হিসেবে ইতিহাস গড়লেন। সত্যজিৎ রায়ের ‘ঘরে বাইরে’র বিমলা স্বাতীলেখা সেনগুপ্ত। অথচ স্বাতীলেখার আগে ‘ঘরে বাইরে’র বিমলার রোলে সত্যজিৎ ভেবেছিলেন সুচিত্রা-মাধবী-অপর্ণা-শর্মিলা সবাইকে। শেষমেষ নাটকের মেয়ে স্বাতীলেখাই হলেন সন্দীপের মক্ষীরানি বিমলা। সেই শুরু সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়-স্বাতীলেখা সেনগুপ্তর জুটি (Belasuru)। কিন্তু দীর্ঘ দশক তাঁরা আর জুটি বাঁধেননি। এ যুগে এসে রবীন্দ্রনাথের বৈপ্লবিক প্রেমকে শিবপ্রসাদ-নন্দিতা গড়লেন মধ্যবিত্ত প্রবীণ দম্পতির সুখ-দুঃখের আদুরে সোহাগে। যার প্রথম পর্ব আমরা দেখেছিলাম ‘বেলাশেষে’তে। আর দ্বিতীয় পর্ব ‘বেলাশুরু’। কিন্তু দুটি ছবি দুটির অংশ নয়। ‘বেলাশুরু’ (Belasuru) নতুন দর্শকদেরও ভাল লাগবে যারা ‘বেলাশেষে’ দেখেননি। আর যারা ‘বেলাশেষে’ দেখেছেন তাঁদের আরও পরিণত সুরে মন ছুঁয়ে যাবে ‘বেলাশুরু’।

belasuru

‘বেলাশুরু’ (Belasuru) ছবির গল্প সত্য ঘটনা অবলম্বনে তৈরি। ঘোরতর অ্যালঝাইমার্সে আক্রান্ত স্ত্রী গীতা নন্দীর স্মৃতি ফেরাতে ফের তাঁদের বিয়ের অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন পবিত্র চিত্ত নন্দী।

তখন বরের বয়স আশি-অতিক্রান্ত, কনের বয়সও সাতের ঘরে। কারণ গীতা দেবীর মনের সিন্দুকে একমাত্র বিয়ের ঘটনাগুলিই অক্ষত রয়ে গিয়েছিল। স্মৃতিভ্রংশতায় সব ভুলে গেলেও বিয়ের আলো ও আনন্দ ভোলেননি গীতা। এরকমই এক সত্যি ঘটনা নিয়ে ‘বেলাশুরু’ (Belasuru) ছবি তৈরি করলেন শিবপ্রসাদ-নন্দিতা পরিচালকদ্বয়। কিন্তু ‘বেলাশেষে’র সাত বছর পরে যখন ‘বেলাশুরু’ মুক্তি পেল, তখন বাস্তব আর রুপোলি পর্দার দু’জোড়া বর-কনের কেউই আর নেই। করোনার দাপটে দুই জোড়া দম্পতি সংসারের মায়া কাটিয়ে পরলোকে। তবু এমন এক অভিনব সংসার জীবন ঐতিহাসিক হয়ে রইল ‘বেলাশুরু’ দিয়ে রুপোলি পর্দায়।

belasuru

আরও পড়ুন: আজ বিকেলে অপরাজিত দেখতে যাবেন সূর্য-বিমানরা, সিপিএমে চলচ্চিত্র উত্‍সব

‘বেলাশেষে’র সিক্যুয়েল ‘বেলাশুরু’ (Belasuru) নয়। কিন্তু বিশ্বনাথ-আরতির পরবর্তী জীবন পবিত্র চিত্ত-গীতার বেলা-অবেলায় মিলিয়ে দেওয়াই যায়। কারণ বর্তমানে এমন স্মৃতিভ্রংশতার শিকার আমাদের সকলের পরিবারে অনেক প্রিয় মানুষই। যাঁরা না বলে হঠাৎ বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়েন। এমন রোগের না আছে কোনও চিকিৎসা না আছে কোনও সুফল। পরিবারের লোকরা এমন মানুষদের কী ফেলে দেবেন উদাসীনতা আর বিরক্তির অজুহাতে? নাকি তাঁদের নিরলস যত্নে সেবায় বাঁচিয়ে রাখবেন এক অনির্দিষ্ট ভুলে যাওয়া পথে? দ্বিতীয় পথই বেছে নিয়েছেন স্মৃতিভ্রংশতা রোগে আক্রান্ত আরতি দেবীর জন্য তাঁর স্বামী আর ছেলেমেয়ে-জামাই-বৌমারা। যেখানে গল্পের শেষে এক নতুন দিনের আলোর খোঁজে নতুন বেলা শুরুর গান রচিত হয় অনেক ভোলার মাঝেও (Belasuru)। অসুস্থ আরতিকে নিরলস সেবা করে যান বিশ্বনাথ। স্ত্রী কখন গিলে খাবেন ভাতের দলা তাও তিনি জানেন। যে ভরসা বড় মেয়ে খাওয়াতে গেলে বিশ্বনাথ করতে পারেন না। এমন বোঝাপড়া দেখে বলতেই হয় দীর্ঘ দাম্পত্যে দুঃখ কষ্টের মধ্যেও চেনা-অচেনার মাঝে বেঁচে থাকে মধুরতা।

belasuru

ইতিহাস গড়লেন সৌমিত্র-স্বাতীলেখা (Belasuru)

অভিনেতার মৃত্যুর পরেও সমারোহে তাঁর চলচ্চিত্র রিলিজ এবং সেই শেষ ছবিতে তাঁর অবিস্মরণীয় অভিনয়ে ছবি সুপারহিট- বাংলা ছবির ইতিহাসে এমন ঘটেছিল দু’বার। উত্তমকুমার আর মহুয়া রায়চৌধুরীর বেলায়। তৃতীয় বার ঘটালেন সৌমিত্র-স্বাতীলেখা। ‘বেলাশুরু’তে (Belasuru) সৌমিত্র বুঝিয়ে দিলেন তাঁর অনুপস্থিতিতেও তাঁর অভিনয় কত সজীব। যা পাল্লা দিতে পারে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে। আর স্বাতীলেখার অভিনয়ে সত্যি গায়ে কাঁটা দেয়। কী ভয়ংকর সুন্দর মন কেমন করা অভিনয়! স্মৃতিভ্রংশতা রোগে আক্রান্ত হয়ে যখন স্বাতীলেখা আরতি আয়নায় নিজেকে নিজেই দেখে চিনতে পারছেন না, নিজের জরতী রূপ দেখে শিউরে উঠছেন কারণ তাঁর স্মৃতি পড়ে আছে প্রথম যৌবনে, তখন মনে এসে ধাক্কা লাগে দর্শকের। সৌমিত্র-স্বাতীলেখা দুজনে যে কী ভীষণ ঐতিহাসিক অভিনয় করে গেলেন, এ অভিনয় বাংলা ছবির সম্পদ হয়ে থাকল। নাটক সম্রাজ্ঞী স্বাতীলেখা সত্যজিতের বিমলা রূপে আইকনিক হলেও এই ‘বেলাশুরু’র আরতি তাঁর শ্রেষ্ঠ অভিনয় হয়ে থাকল।

‘দেখো তো চিনতে পারো কিনা’ খেলাতে স্বাতীলেখা স্বামী-রূপী সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের হাসি চিনতে পারেন না। কিন্তু এক বাক্যে চিনে ফেলেন উত্তমকুমারের হাসি। সে হাসি তো তাঁর ছেলেবেলার স্মৃতি। তখন সৌমিত্রর মুখ দেখার মতো। সৌমিত্রর শেষ ছবিতেও শিবপ্রসাদ-নন্দিতা উস্কে দিলেন বাঙালির চিরকালীন উত্তম-সৌমিত্র দ্বৈরথ।

belasuru

ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত ও সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের যুগলবন্দী দৃশ্যটি মন ছুঁয়ে যাবেই। যেখানে মেজো মেয়েকে অজান্তেই বাবা বিয়ে দিয়েছিলেন একটি সমপ্রেমী ছেলের সঙ্গে। যে ছেলের প্রেমিকও ছিল এককালে। বাবা জানার পর বলছেন এক্ষুনি ডিভোর্স দাও। মেয়ে আশ্বস্ত করে বলছে বাবাকে যা ভুল হবার হয়ে গেছে। শরীর, কামনা, সন্তান চাহিদার বাইরেও দাম্পত্যে যেটা থেকে যায়, সেটা বন্ধুত্ব। তাহলে তুমি অ্যালঝাইমার্স রোগী মাকে ডিভোর্স দিচ্ছ না কেন? আমি কোনওদিন অ্যালঝাইমার্সে আক্রান্ত হলে ঐ সমকামী স্বামীই দেখবে কারণ সে আমার বন্ধু। কোথাও হয়তো আপোষ করা তবু যেন সব ভাঙার মাঝেও তো ভরসার জয়গান। ‘বেলাশেষে’র পরেও ‘বেলাশুরুর গান থাকে। মেজো জামাইয়ের চরিত্রে সুজয়প্রসাদ যেটুকু সুযোগ পেয়েছেন ভালই করেছেন। তাঁর অনুচ্চার কথা যেন ঋতুপর্ণা বলে দিয়েছেন।

belasuru

খরাজ মুখোপাধ্যায় আর অপরাজিতা আঢ্য এই ছবিতে জমিয়ে দিয়েছেন আগের ছবির মতোই। বিশেষ করে শাশুড়ি যখন বারবার বড় জামাইকে মেথর, চাকর, মাছওলা ভাবতে থাকেন তখন সেসব দৃশ্য দুর্দান্ত মজার এত বিষাদের সুরের মাঝেও। খরাজ এ ছবির কমেডি রিলিফ। তবে ‘বেলাশেষে’র স্টাইলে চাকরের সঙ্গে তিন জামাইয়ের মদ খাওয়ার রগড় এবার অত জমল কই?

শঙ্কর চক্রবর্তী যথাযথ। ইন্দ্রাণী দত্তকে আগের ছবির থেকেও এ ছবিতে বেশী স্বপ্নসুন্দরী লেগেছে। মনামী ঘোষ আর অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায়ের জুটি এ ছবিতে আরও পরিণত, তাঁদের অভিনয় বড্ড প্রাণবন্ত। যদিও জয় গোস্বামীর বহুল ব্যবহৃত কবিতা রোমান্টিক দৃশ্যে ক্লিশে লেগেছে।

সঙ্গীতে অনুপম রায়ের সঙ্গীত পরিচালনায় সেরা লাগল কবীর সুমন ও শ্রেয়া ঘোষালের গান। ছবি জোড়া বিষাদ সুরকে এক লহমায় আনন্দে ভরেছে ইমন-খ্যাঁদার ‘টাপা টিনি’ (Belasuru)। ঋতুপর্ণা-মনামী-অপরাজিতা-ইন্দ্রাণী নাচের তালে বেশ রঙিন।

belasuru

আর ছবিতে আছে এক চমক অতীন্দ্রদা। কে এই অতীন্দ্রদা? সব ভোলার মাঝেও আরতি যার কথা ভুলতে পারেননি! সে কী আরতির জীবনের প্রথম পুরুষ? বিশ্বনাথের সঙ্গে তাঁর দেখা হবার আগে? এ দোলাচল বিশ্বনাথের মনেও হয় সন্তানদের মনেও হয়। তাই সমগ্র পরিবার যায় ফরিদপুর আরতিকে নিয়ে অতীন্দ্রদাকে খুঁজতে। খুঁজেও পাওয়া যায়। এই অতীন্দ্রর ভূমিকায় রয়েছে চমক। সেই আমেজ ছবি দেখেই জানুন। যেন রিল লাইফ আর রিয়েল লাইফ মিলেমিশে একাকার হয়ে যায় স্বাতীলেখার জীবনে। ধন্যবাদ শিবপ্রসাদ-নন্দিতা আরও এক নতুন ইতিহাস বাংলা ছবিতে আপনারাই ঘটালেন।

আরও পড়ুন: বেশিক্ষণ বাসে, গাড়িতে চড়লেই বমি পায়, মাথা ঘোরে? চিন্তা নেই উপায় আছে

‘বেলাশুরু’র গল্প ‘বেলাশেষে’র থেকেও পরিণত। সে গল্প সমকাম-বিষমকাম পার করে বন্ধুত্বে উত্তরণ ঘটায়। তাই এই গল্প হয়তো আমজনতাকে স্পর্শ করবে না। ‘বেলাশেষে’ ছিল অনেক সহজ ছবি কিন্তু ‘বেলাশুরু’ সব বয়স, সব শ্রেনির কাছে কিছুটা হলেও কঠিন।

belasuru

পরিশেষে বলি, ‘বেলাশেষে’তে বাবা-মায়ের বেডরুমে সন্তানদের নজরদারি বহু দর্শকই মেনে নিতে পারেননি। কিন্তু এবার ‘বেলাশুরু’ র কাহিনি তাঁদেরও মন ছুঁয়ে যাবে। প্রেমিক-প্রেমিকা মানে শুধু গোলাপ ফুল, ভ্যালেন্টাইনস ডে আর সোনার আংটি নয়। যখন প্রবীণ স্ত্রী স্বামীকেই বলেন “আমার বর তো আপনি নন! আমার বরকে খুঁজে এনে দেবেন?” বৃদ্ধ স্বামীটি শেষবেলাতেও স্ত্রীকে ভরসা দেন। রোজকার হাজারো হাঁটুর ব্যথা, ফ্রোজেন শোল্ডার, প্রেসার-সুগার চেপে বৃদ্ধ স্বামী স্মৃতিভ্রংশ স্ত্রীকে নিরলস সেবা করে যান (Belasuru)।

এঁরা কি পরস্পরের ভ্যালেন্টাইন নন? লাভ সাইন বেলুন, তুলতুলে ভল্লুক, ডায়মন্ড রিং গিফটের চেয়েও এই সেবার ভালবাসা চোখে জল আনে, হৃদয় স্পর্শ করে (Belasuru)।

“একটা সময়ের পরে শরীর থাকে না, আকর্ষণ থাকে না, থেকে যায় বন্ধুত্ব!”

ছবির শেষ দৃশ্য উত্তর চায় ‘বেলা কি শেষ? নাকি বেলা শুরু?’

You might also like