Latest News

হাঁদা-ভোঁদার টাইটেল ট্র্যাক গেয়েছিলেন অরিন্দম, মজার সেই সিরিয়ালের অল্প গল্প

শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়

হাঁদা ভোঁদা, বাঁটুল দি গ্রেট, নন্টে ফন্টেরা আজ অভিভাবক-হারা। বাংলা কমিকসের দুনিয়ায় ইন্দ্রপতন। হাঁদা ভোঁদা, বাঁটুল দি গ্রেট, নন্টে ফন্টের স্রষ্টা ৯৭ পার করা লেজেন্ডারি শিল্পী-সাহিত্যিক নারায়ণ দেবনাথ প্রয়াত হলেন আজ। সকাল থেকেই মুখভার গোটা বাংলার। বাঙালিদের ছোটবেলাটা আজ যেন হারিয়ে গেল। তাঁর সৃষ্ট কার্টুন চরিত্রগুলো আমাদের হৃদয়ে সারাজীবন খোদাই হয়ে থাকবে।বিদেশি কার্টুনের রমরমা বাজারেও হাঁদা-ভোঁদারা দাপটের সঙ্গে সামলেছে বাঙালির মনের রাজপাট। যে চরিত্রদুটির উন্মাদনা এতটুকু কমেনি আজকের প্রজন্মের কাছেও। এ যুগের ছোটরাও অ্যানিমেশনে ‘হাঁদা-ভোঁদা’ দেখতেই অভ্যস্ত। সোশ্যাল মাধ্যমেও সবার মনে ‘হাঁদা-ভোঁদা’র কার্টুন আজও নস্ট্যালজিক। কিন্তু ‘হাঁদা-ভোঁদা’ শুধুমাত্র কার্টুনেই সীমাবদ্ধ নয়।‘হাঁদা-ভোঁদা’ সিরিয়াল হয়েছিল কলকাতা দূরদর্শনে। নব্বই দশকের শেষের দিকে প্রতি রোববার দুপুর দেড়টায় সম্প্রচারিত হত এই ‘হাঁদা-ভোঁদা সিরিয়াল। আজ বড্ড বেশি মনে পড়ছে সেই ধারাবাহিকের কথা। কালের গর্ভে পুরনো জিনিস হারিয়ে যেতে বসার যুগেও দর্শকদের মনে রয়ে যায় এমন কিছু নস্ট্যালজিক কাজ। এই ধারাবাহিকের বাজেট খুব বেশি ছিলনা, কিন্তু সারল্যে ভরা গল্প বলার কায়দায় মন জয় করে নিয়েছিল সিরিয়ালটি।

রঙিন ধারাবাহিকে জীবন্ত হয়ে উঠত কার্টুন চরিত্রগুলি। মূল চরিত্রে দুজন কিশোর অভিনেতা খুব ভালো অভিনয় করেছিলেন। তাঁদের দেখতেও ছিল অবিকল নারায়ণ দেবনাথের সৃষ্ট চরিত্রের মতো। বিশেষত, খুব রোগা চেহারার হাঁদার চুলের স্টাইল এবং ভোঁদার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য অবিকল মিলে গেছিল সাহিত্যের চরিত্রের সঙ্গে। হাঁদা-ভোঁদা ও তাঁদের পিসেমশাইয়ের কাণ্ডকারখানা বা স্কুলে গিয়ে হাঁদা-ভোঁদার দুষ্টুমি ভীষণভাবে জনপ্রিয় হয়েছিল।

পিসেমশাই পর্ব। ছবি – সোহম মণ্ডল

হাঁদা চরিত্রের ছেলেটি পরে ‘পুলিশ ফাইল’ সিরিয়ালে অভিনয় করেছিলেন। আজ হয়ত দুজন কিশোর অভিনেতা অন্য জগতে ব্যস্ত।

নাইন্টিজ টিনএজাররা আজ নিশ্চয়ই মনে করতে পারবেন সেই নস্ট্যালজিক রোববারের দুপুরগুলো। রবি ঘোষ ও বিভু ভট্টাচার্য অভিনীত ‘গোপাল ভাঁড়’ সিরিয়াল শেষ হবার পর ঐ স্লটেই শুরু হয় ‘হাঁদা-ভোঁদা’ সিরিয়াল। কার্টুন চরিত্র যখন অভিনেতারা অভিনয় করেন সেটা আরও বাস্তব লাগে। কোনও স্বরচিত চিত্রনাট্য ঢুকিয়ে নারায়ণ দেবনাথের সৃষ্টিকে অবমাননা করা হয়নি এই ধারাবাহিকে। যা বর্তমান যুগে হামেশাই হয়।‘হাঁদা-ভোঁদা’ ধারাবাহিকের শীর্ষসঙ্গীত সেইসময় ভীষণভাবে জনপ্রিয় হয়েছিল। গেয়েছিলেন বিখ্যাত অভিনেতা-গায়ক অরিন্দম গঙ্গোপাধ্যায়। অরিন্দম মানেই ‘হংসরাজ’। আরও এক কালজয়ী ছোটদের ছবি। তাই তিনি যে নারায়ণ দেবনাথের চরিত্র দুটিকে ফুটিয়ে তুলতে পারবেন তাঁর জাদুকণ্ঠে সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। রবিবার দুপুর দেড়টা বাজলেই সব বাড়ি থেকে শোনা যেত এই হাঁদা-ভোঁদার টাইটেল গান।আজ নারায়ণ দেবনাথের প্রয়াণে ‘হাঁদা-ভোঁদা’ সিরিয়াল নিয়ে ভীষণ নস্ট্যালজিক হয়ে পড়লেন অরিন্দম গঙ্গোপাধ্যায়। ‘দ্য ওয়াল’কে অরিন্দম গঙ্গোপাধ্যায় প্রথম জানালেন এই সিরিয়ালের গান রেকর্ডিং-এর কাহিনি।

অরিন্দম এক্সক্লুসিভলি জানালেন
“শঙ্খ বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন ‘হাঁদা-ভোঁদা’ সিরিয়ালের মিউজিক ডিরেক্টর। একসময় আমার আর অভিনেতা শঙ্কর চক্রবর্তীর ভীষণ ভালো বন্ধু ছিলেন শঙ্খ। ভীষণ ভালো সুর করতেন। এখন শঙ্খ মুম্বইতে খুব ভালো কাজ করছেন। ‘হাঁদা-ভোঁদা’ সিরিয়ালের টাইটেল সং গাইতে শঙ্খই আমাকে নির্বাচন করেন। শঙ্খ আমার গানের ভীষণ ফ্যান ছিলেন। হাঁদা-ভোঁদার সুরটাও শঙ্খ খুব ভালো করেছিলেন।
গানটা ছিল আমার কণ্ঠে। আজও মনে পড়ে গানের কথাগুলো,
হাঁদা আর ভোঁদা দুই মজার চরিত্র
তাই এদের ঘিরে ঘটনা বিচিত্র।
বিচিত্র ঘটনার ঘনঘটা দেখবেন
যদি তবে টিভি খুলে হাঁদা ভোঁদা দেখবেন।
শুকতারা ছেলেবেলা স্মৃতি সব মলিন
হাঁদা ভোঁদা সাদা কালো, বাঁটুল রঙিন।
হাঁদা-ভোঁদা সাধাসিধা
ফিচলেমিতে বেগর বাই।
হাঁদার কম্ম ছিল ভোঁদার পেছনে লাগা
ভোঁদাটা ছিল যে ভোঁদাই।
সোজা মানুষের জয়
তাই ভোঁদা জিতে যায়,
হাঁদা হয় বেকুব আকাট
হাঁদার হাঁদামো আর ভোঁদার ভোঁদামো মিলে
গল্পটা হল জমজমাট।”

গানের সুর কথা দুটোই শঙ্খ বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছিলেন। সিরিয়ালের পরিচালক কে ছিলেন আজ আর মনে পড়ছেনা। আসলে গান তো আগেই রেকর্ড হয়ে যেত। গানটার রেকর্ডিং হয়েছিল আমার শ্বশুরমশাই জোছন দস্তিদারের ‘সোনেক্স’ স্টুডিওতে।
ভীষণভাবে জনপ্রিয় হয়েছিল গানটা। ছোটদের খুব ভাল লেগেছিল। টিনএজার ছেলেমেয়েদের মুখেমুখে ফিরত গানটা। এমন দুটো কার্টুন চরিত্র নিয়ে গান সেভাবে আগে হয়নি বাংলা ইন্ডাস্ট্রিতে। গানটা ভাল হয়েছে সেই ফিডব্যাক পেতাম। সিরিয়ালটাও ভালো চলেছিল কলকাতা দূরদর্শনে।
আজও এত বছর পর মানুষ মনে রেখেছেন আমার গানটা, সেটাই বড় প্রাপ্তি।

পরবর্তীকালে শঙ্খর সংগীত পরিচালনায় ‘ময়ূরাক্ষী’ সিরিয়ালেও গান গেয়েছিলাম। এটাও কলকাতা দূরদর্শনে হত। ভীষণ জনপ্রিয় সিরিয়াল। ”

‘হাঁদা-ভোঁদা’ ধারাবাহিক একদিন করেই হত সপ্তাহে তাই দেখার জন্য দর্শকরা, বিশেষ করে ছোটরা অপেক্ষা করে থাকত। মেগা করবার জন্য সাহিত্যকে বিকৃত করা হয়নি। কয়েক মাস মাত্র চলেছিল সিরিয়ালটি। পরবর্তীকালে কয়েকবার পুনঃসম্প্রচারও করে দূরদর্শন। অল্প দিনের স্লটেই ছিল বলে হয়তো মানুষের মনে আজও ‘হাঁদা-ভোঁদা’ সিরিয়াল রয়ে গেছে। পরবর্তীকালে ‘নন্টে-ফন্টে’ সিরিয়াল হবার কথা হয়। আনা হয় ‘কাঞ্চন-কেল্টু’ নামক দুটি চরিত্র, সিরিয়ালে কিন্তু ছাপ ফেলতে পারেনি।

 

বিশেষ কৃতজ্ঞতা – স্বর্ণালী নাগ, অভিষেক ভট্টাচার্য ও সোহম মণ্ডল

You might also like