Latest News

পেশায় উকিল, নেশায় অভিনেতা! জটায়ু ছাড়াও সন্তোষ দত্তর অভিনয়ে অমর অবলাকান্ত থেকে গোপাল ভাঁড়

শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়

রাজ্যের সবাই যুদ্ধ ভুলে হাঁড়ি হাঁড়ি মিষ্টি নিয়ে দৌড়চ্ছে… আর তারই মধ্যে একজন সীমাহীন আনন্দে দু’হাত তুলে মুক্তির আনন্দ উদযাপন করছে…’ছুটি, ছুটি’!

কিন্তু সত্যিটা হল, কিছু মানুষকে কোনও দিন ‘ছুটি’ দেওয়া যায় না মন থেকে। যেমন জটায়ু। সন্তোষ দত্ত (Actor Santosh Dutta)। আদি নিবাস ঢাকা, কলকাতায় ১৯২৫ সালের ২ ডিসেম্বরে জন্ম। থাকতেন আমহার্স্ট স্ট্রিটের কাছে। দোতলা পৈতৃক বাড়িটি পরিচিত ছিল ‘সুরধ্বনি কুটির’ নামে। পাড়ার মানুষ আজও স্মরণ করেন তাঁর জন্মদিন।

সন্তোষ দত্ত ছিলেন পেশায় আইনজীবী এবং নেশায় অভিনেতা! যাঁকে কমেডি করতে কোনও দিন চটুল, লঘু সংলাপ ব্যবহার করতে হয়নি। তাঁকে বলা যায় লাফিং বোমা। কিন্তু সে বোমার অন্দরে শুধুই নির্মল হাস্যরস।

সন্তোষ দত্তর সংলাপ তাই আজও এই প্রজন্মের কাছেও সমান জনপ্রিয়। ”রাজকন্যা কি কম পড়িয়াছে?”, “Highly Suspicious !”, ”গবেষক গবচন্দ্র জ্ঞানোতীর্থ জ্ঞানোরত্ন জ্ঞান বুদ্ধি জ্ঞান চূড়ামণি” বা ”এক মিনিট।“ মনে রাখবে নাই বা কেন এ প্রজন্ম, তাঁর প্রতিটি চরিত্রই তো লেজেন্ডারি।

সত্যজিৎ রায়ের ‘পরশ পাথর’, ‘তিন কন্যা’, ‘সোনার কেল্লা’, ‘জয় বাবা ফেলুনাথ’, ‘গু-গা-বা-বা’, ‘হীরক রাজার দেশে’– এই সিনেমাগুলো নিয়েই সকলে আলোচনা করেন সন্তোষ দত্তর কথা বলতে গিয়ে। কিন্তু তিনি সত্যজিৎ রায় বাদেও তাঁর অভিনয় প্রতিভার সাক্ষর রেখেছেন অন্য পরিচালকদের ছবিতে, যে চরিত্রগুলি নিয়ে কিন্তু কেউ আলোচনা করে না কখনও। তিনি বরং বেশিই করেছেন এসব ছবি, যেগুলি আজও জনপ্রিয়, কিন্তু চর্চায় না থাকায় ছবিগুলোও হারিয়ে যেতে বসেছে।

পূর্ণেন্দু পত্রীর ‘মালঞ্চ’, অমল শূরের ‘গোপাল ভাঁড়’, পীযূষ বসুর ‘সিস্টার’, ‘ব্রজবুলি’, তরুণ মজুমদারের ‘গণদেবতা’, দীনেন গুপ্তর ‘মর্জিনা আবদাল্লা’, সলিল দত্তের ‘ওগো বধূ সুন্দরী’, পার্থপ্রতিম চৌধুরীর ‘যদুবংশ’, ‘পূজারিণী’, উমানাথ ভট্টাচার্যের ‘চারমূর্তি’, ‘নবীন মাস্টার’, ‘শ্রীমান পৃথ্বীরাজ’, ‘ঘটকালি’, ‘শোরগোল’, ‘হুলস্থুলু’, ‘খেলার পুতুল’ বা ‘সুবর্ণলতা’র মতো বহু ছবিতে সন্তোষ দত্ত তাঁর অভিনয়ের রত্নসম্ভার দেখিয়ে গেছেন!

প্রথম জীবনে ব্যাঙ্কের চাকরিও করেছেন প্রায় ১৪ বছর ধরে, উড়িষ্যায় বদলির আদেশ এলে চাকরিও ছাড়েন হঠাৎ করে। ওকালতি নিয়ে পড়াশোনা ছিল, তাই হয়তো চলে এলেন আইনজীবীর পেশায়। পাশাপাশি চালিয়ে গেলেন নাটক, অভিনয়ের কাজ।

তখনকার ‘রূপকার’ নাট্যগোষ্ঠীর কর্ণধার ছিলেন সবিতাব্রত দত্ত, তাঁরই ‘চলচ্চিত্রচঞ্চরী’তে ‘ভবদুলাল’ রূপে আবির্ভূত হন সন্তোষ দত্ত। আর সেই নাটক দেখেই তাঁকে পছন্দ করেন সত্যজিৎ রায়। সত্যজিতের সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে অনেক শ্যুটিং ডেট পড়ত সন্তোষ দত্তর কোর্টের মামলার দিনে। সত্যজিতের ছবির শ্যুটিংয়ের ডেট ক্যানসেল সহজ ছিল না। তার ওপর সোনার কেল্লার রাজস্থানে আউটডোর থেকে হীরক রাজার দেশের পুরুলিয়া। এদিকে আদালতের ডেট মুলতুবি করাও খুব সাধারণ ছিল না তখন। কিন্তু সন্তোষ দত্তকে সকলে এত ভালবাসতেন যে বাদী ও বিবাদী পক্ষের উকিলরাও অ্যাডজাস্ট করে নিতেন ডেট।


১৯৭৮ সাল পর্যন্ত তিনি কোর্টে যাতায়াত করতেন বাসে-ট্রামে। পরে কেনেন নেভি ব্লু রঙের একটি আ্যামবাসাডার, ‘জটায়ুর গাড়ি’ নামে পরিচিত WBF 688 নম্বর ছিল তাঁর !

সন্তোষ দত্ত মানেই লালমোহন বাবু থেকে অবলাকান্ত। ”শুধু তুমি নয় অবলাকান্ত, অনেকেরই বলার সময় খেয়াল থাকে না।” কিশোর কুমারের অমর গান, ভাষাবিদ গগন সেন রূপে উত্তম কুমার ও সন্তোষ দত্তর অমর বন্ধুত্বের জুটি। এই গানেই সুমিত্রা মুখার্জীকে দেখে সন্তোষ দত্তর ”ম্যা ম্যা ম্যাডাম!” বলা কিংবা সাবিত্রী ও মৌসুমী চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে বাঁদর নিয়ে খেলা আর আশাজির “তুই যত ফুল দিস না কেনে।”

সন্তোষ ছিলেন ফুটবলের ভক্ত। পাঁড় মোহনবাগানী। ফুটবল আর নাটক দেখা, এই ছিল তাঁর নেশা। খুব ছোট বয়সেই কলেজে পড়তে পড়তেই বিয়ে হয়ে যায় তাঁর। স্ত্রী বালিকা বধূ, মাত্র এগারো বছর বয়স। সন্তোষ দত্ত উনিশ। বউয়ের বাবা টাকা দিতেন মেয়েকে হাতখরচের, সেই টাকা নিয়েই সন্তোষ নাটক দেখতে চলে যেতেন। নাটক তাঁর সিনেমার চেয়েও বেশি প্রিয় ছিল। তাই সবিতাব্রত দত্ত, নির্মল কুমারদের নিয়ে নাট্যসংস্থা করেন ‘আনন্দম’। পরে এই নাট্যদলের নাম হয় ‘রূপকার’।

‘রূপকার’-এ তাঁর অভিনয় দেখেই সত্যজিৎ রায় তাকে ‘পরশ পাথর’ ছবির জন্য সিলেক্ট করেন। সেখান থেকেই ইতিহাস তৈরি করে জটায়ু চরিত্র, যার কোনও বিকল্প হয়না। রবি ঘোষ, অনুপ কুমার, বিভু ভট্টাচার্যরা পরে জটায়ু করলেও তাঁরা কেউই সন্তোষ দত্তর মতো হয়ে উঠতে পারেননি। আসলে এক একটা চরিত্র এক এক অভিনেতার সিগনেচার মার্ক। তাকে উত্তরণ করা কঠিন শুধু নয়, অসম্ভবও হয় অন্যদের পক্ষে।

নাটকই সন্তোষ দত্তর জীবনের শেষ কাজ হয়েছিল। সে সময় সন্তোষ দত্ত রবি ঘোষের ‘শ্রীমতী ভয়ংঙ্করী’ নাটক করতেন বিজন থিয়েটারে। বেশ কিছুদিন শো করার সময়ে ক্লান্তি বোধ করতেন অসুস্থতার কারনে। প্রচণ্ড কাশির দমকে ডায়ালগ বলতে পারতেন না মঞ্চে জোরে। শেষমেশ ধরা পড়েছিল ফুসফুসে ক্যানসার। ঠাকুরপুকুর ক্যানসার হাসপাতালে চিকিৎসা করিয়ে রেডিয়েশন নিয়েও কাজ থামাননি। পেশা ও নেশা দুটোই চালিয়ে গেছেন।

কিন্তু যা হওয়ার তাই হল, চলে যেতে হল লালমোহন জটায়ুকে। ১৯৮৮ সালের ৫ই মার্চ যেন “গিলি গিলি গে” বলে ভ্যানিশ হয়ে গেলেন জটায়ু।

আজও লালমোহন বাবু বা অবলাকান্তদের সারল্য খুঁজে পেতেই তাঁরই লুকে তৈরি হয় ওয়েব সিরিজের চরিত্র। কিন্তু সন্তোষ দত্তর ঐ সারল্যর যে নকলনবিশ হয় না। ওই স্বতন্ত্র সারল্যই জটায়ুকে অমর করে রেখেছে। তবে লালমোহন বাবুতেই কিন্তু তিনি আটকে থাকেননি। যে চরিত্রই করেছেন, যেন সেই চরিত্রই হয়ে উঠেছেন।

চেয়েছিলেন বডিবিল্ডার হতে, হয়ে গেলেন কমেডিয়ান! রবি ঘোষের জীবন যেন উপন্যাস

You might also like