Latest News

‘এযুগের উত্তম’ হয়েও শিকার হন বৈষম্যের, জীবনের দৌড়েও অকালেই থেমে যান কুণাল মিত্র

শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়

সুদর্শন চেহারা, মাথায় থাক দেওয়া চুলের একটি ছেলে টেলিভিশনে সবার মন জয়ে করে নিয়েছিল নব্বই দশকে। যিনি আবার খ্যাতনামা পরিচালক আচার্য দেবকী কুমার বসুর নাতি হতেন সম্পর্কে, যা অনেকেই জানেন না। আসল নাম ছিল বাসব মিত্র। তিনি আমাদের সবার প্রিয় অভিনেতা কুণাল মিত্র।

কুণালের জন্ম ১৯৬৫ সালের ৩০ এপ্রিল। দেবকী কুমার বসুর বাড়িতে নিত্য যাতায়াত ছিল কুণালের ছোটবেলা থেকে। দেবকী বসুকে কুণাল ছোটবেলায় দেখেওছিলেন।কুণাল একসময় চাকরি করতেন রেলওয়ে বিভাগে। ‘বহুরূপী’ নাট‍্যদলেও জড়িত ছিলেন বহুদিন।

দেবকী বসুর পুত্র পরিচালক দেবকুমার বসুর হাত ধরেই কুণাল মিত্রর সিনেমায় অভিষেক। দেবকুমার বসু পরিচালিত ‘অনুভব’ ছবিতে একটি বিশেষ চরিত্রে প্রথম অভিনয় করেন কুণাল। কিন্তু চলচ্চিত্র আসার সময়ে তাঁর নাম বাসব থেকে কুণাল করা হয়।এরপর ‘এবার জমবে মজা’ কমেডি সিরিয়াল দিয়ে টেলিভিশনে সুযোগ পান কুণাল। কুণালের বিপরীতে ছিলেন গার্গী নন্দী নামে এক অভিনেত্রী। তৎকালীন আলফা টিভি বাংলা চ্যানেলে হত ধারাবাহিকটি। অল্পদিনের স্লটেই ছিল এটি। তাতেই জনপ্রিয় হন কুণাল। এর পর আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি। প্রথম সিরিয়াল মাঝারি হিট হলেও পরপর সিরিয়ালের নায়ক হয়ে উঠতে থাকেন তিনি। যীশু দাশগুপ্তর ‘কুয়াশা যখন’ সিরিয়ালে ইন্দ্রাণী হালদারের বয়ফ্রেন্ডের চরিত্রে কুণাল সবার চোখে পড়েন। রণজয় ছিল তাঁর অভিনীত চরিত্রের নাম।সেসময় প্রসেনজিৎ-ঋতুপর্ণা জুটির দাপটে ইন্দ্রাণী হালদার সেভাবে জুটি পাচ্ছিলেন না। তাই নায়িকাকেন্দ্রিক ছবি করতেন। কুণাল-ইন্দ্রাণী জুটি টিভিতে জমজমাট হয়ে উঠল। ইন্দ্রাণী-কুণালকে নিয়ে বড় পর্দায় ‘সম্প্রদান’ ছবি করলেন বাপ্পাদিত্য বন্দ্যোপাধ্যায়। বাপ্পাদিত্যর প্রথম ছবি, যা সেই সময় ছিল বেশ অন্যরকম। তবে কুণাল-ইন্দ্রাণী জুটি সিরিয়াস টেলিফিল্ম ও সিরিয়ালই বেশি করতেন। তাঁদের জুটিকে বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করার কথা খুব একটা কেউ ভাবেননি।

ইন্দ্রাণীর পাশাপাশি বিগ স্টার দেবশ্রী রায়ের স্বামীর ভূমিকাও পেলেন কুণাল, বাণী বসুর বিখ্যাত কাহিনি অবলম্বনে ‘গার্ন্ধবী’ ছবিতে। তাছাড়া ‘দ্রৌপদী’ সিরিয়ালেও রূপা গঙ্গোপাধ্যায়ের বিপরীতে অর্জুন রূপে অভিনয় করেন তিনি।

গান্ধর্বী ছবিতে দেবশ্রীর সঙ্গে।

নাইন্টিজে কুণাল ছোট পর্দাতেই সমসাময়িক ফিল্মের হিরোদের থেকে বেশি জনপ্রিয়তা পেয়েছিলেন। টেলিভিশন জগতের সেই সুবর্ণ যুগে নতুন ভাবনার নানারকম কাজও হত। সে সময় সব ভালো ভালো টেলিছবি হত টিভিতে, সেখানেও নায়ক কুণালই।

সংশয় ছবির শ্যুটে ঋতুপর্ণার সঙ্গে।

কিন্তু ফিল্মে তেমন হল না। সুযোগ পেয়েও যেন তা কাজে লাগল না। প্রাথমিক পর্যায়ে তাঁর সঙ্গে কথা এগোত ফিল্ম ডিরেক্টর, প্রোডিউসারদের। কিন্তু ফাইনালি দেখতেন তাঁর জায়গায় চুক্তিপত্রে হিরো হিসেবে অন্য কোন বড় নাম সই করেছেন।একনায়কতন্ত্র চলা টলিউডে নেপোটিজমের শিকার হয়েছিলেন কুণাল। নামী মুখ নায়কদের ছবিতে অকিঞ্চিতকর ভূমিকায় কাজ করতে হত কুণালকে। একটু খেয়াল করলেই প্রমাণ মিলবে, সে যুগে প্রভাত রায়ের বিখ্যাত ছবি ‘খেলাঘর’-এ কুণাল, শাশ্বতরা কতটা অকিঞ্চিতকর চরিত্রে কাজ করেছেন।

এরপর কুণালের জীবনে এল বড় ব্রেক, তরুণ মজুমদারের ছবিতে নায়ক হওয়ার সুযোগ। ‘আলো’, সুপার ডুপার হিট ছবি। নায়িকা ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত।

এছাড়াও কুণাল কাজ করেছেন নামী পরিচালকদের সঙ্গেও। অপর্ণা সেনের ‘যুগান্ত’তে ভাইয়ার চরিত্র, শ্যাম বেনেগালের ‘নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বোস’-এ কুণাল হন ‘অশোক বোস’। রাজা সেন পরিচালিত ‘কৃষ্ণকান্তের উইল’ ছবিতে কুণাল ছিলেন ‘হরলাল’ চরিত্রে। দীনেন গুপ্ত পরিচালিত ছবি ‘প্রিয়জন’-এ কুণাল ছিলেন লাবণী সরকারের বিপরীতে।

একসময় খ্যাতির চূড়ায় পৌছলেন কুণাল। নিজে ছিলেন উত্তম ভক্ত। কুণালের পরের দিকের অভিনয়ে অনেকটাই উত্তমকুমারের ছায়া ছিল। সেসময় ইটিভি বাংলা খ্যাত উত্তম কুমারের ছবি নিয়ে ‘অতি উত্তম’ সিরিজে মৌচাক-সহ আরও কতগুলি উত্তম রিমেক টেলিছবিতে মহানায়কের রোল করলেন কুণাল। অনেকে তাঁকে এযুগের উত্তম কুমারও বলত।কিন্তু কিছুটা অসংলগ্ন জীবন, বেশি খাওয়া-দাওয়া, অনিয়মিত যাপন– এসব মিলিয়ে ওজন বাড়িয়ে ফেলছিলেন কুণাল। এক সময়ে মদ্যপান করে করে রোম্যান্টিক চেহারাটাই শেষ হয়ে গেল তাঁর।

একসময় বিশাল চেহারায় ভিলেনের রোলও করতে শুরু করলেন, কিংবা কমেডি ভিলেন রোল। অনেকটা উৎপল দত্ত গোছের। যেমন ‘রাজা গজা’ সিরিয়ালের জনার্দন জানা। ‘কৃষ্ণকান্তের উইল’ থেকে শেষ ছবি ‘শুকনো লঙ্কা’তেও ভিলেন অভিনয়ে ছাপ রাখেন তিনি।

২০০৯ সালে ‘উৎসবের রাত্রি’ নামে একটি টেলিসিরিয়ালে কুণালের অভিনয় চলছিল টালিগঞ্জের একটি স্টুডিওতে। হঠাৎই বুকে ব্যথা হয় সিরিয়ালের লিড অভিনেতা কুণাল মিত্রের। কিছু বুঝে ওঠার আগেই সেটের মধ্যেই হার্ট অ্যাটাক হয় কুণালের। ঠিক যেন তাঁর গুরু উত্তম কুমারের মতোই! যদিও উত্তম কুমারের ‘ওগো বধূ সুন্দরী’ ছবির সেটে হার্ট অ্যাটাক হওয়ার পরে মৃত্যু হয় পরের দিন, বেলভিউ হাসপাতালে। তার আগে উত্তম একটি পার্টিতেও গেছিলেন। কিন্তু কুণালের সব শেষ স্টুডিওতেই।

অভিনেত্রী অঞ্জনা বসু কুণালের মৃত্যুর সাক্ষী। তাঁর সামনেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন কুণাল। একইসঙ্গে ‘বৌ কথা কউ’ সিরিয়ালেও কাজ করছিলেন তিনি। সেসময় অনিকেত চট্টোপাধ্যায়ের ‘ছয়ে ছুটি’ ছবিতেও কাজ করছিলেন কুণাল। ‘ছয়ে ছুটি’ কুণাল মিত্র অভিনীত শেষ ছবি। কিছু শ্যুট ও ডাবিং শেষ করে যেতে পারেননি।মৃত্যুর সময়ে কুণালের বয়স ছিল মাত্র ৪৪। স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল বাংলা সংস্কৃতি মহল।

জানা যায়, আগের দিন অভিনেতা সুমন ব্যানার্জির বিয়েতে অনেক ভোজ খেয়ে রাত করে বাড়ি ফিরে আবার সকালে স্টুডিওতে যান কুণাল। এই অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন, কাজের চাপ– সব মিলিয়ে এত অল্প বয়সে অভিনেতা চলে গেলেন, ২০০৯ সালের ২১ জানুয়ারি। রইলেন তাঁর স্ত্রী ও দুই ছেলে।

তাঁর মৃত্যুর পরে টালিগঞ্জের শিল্পী ও মিডিয়ার ক্রিকেট ম্যাচ হয়, সেই ট্রফির নাম তাঁর স্মরণে ‘কুণাল মিত্র মেমোরিয়াল ট্রফি’ রাখা হয় ! টলিউড আজও মেনে নিতে পারেনি আমুদে, সুপুরুষ সবার প্রিয় অভিনেতার অকাল প্রয়াণ।

তবে কুণাল মিত্রর মৃত্যু বড় শিক্ষা দিয়ে গিয়েছিল যে জীবন কতটা সন্তর্পণে চালানো উচিত। সেলিব্রিটি তকমায় ভেসে গিয়ে অনিয়ন্ত্রিত জীবন যাপনের ফল কী হতে পারে, তা যেন চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় তাঁর মৃত্যু। নেপোটিজমকে ডজ করে কেরিয়ারে বেশ কয়েক গোল দিতে পারলেও, জীবনের ফুটবল ম্যাচটা যেন ঠিক করে খেলতে পারেননি কুণাল।

You might also like