বুধবার, অক্টোবর ১৬

সহজ পাঠের সহজ গল্প নয়! মানস মুকুলের ছবিতে এ বার স্বাধীনতা সংগ্রাম, অন্য রকম চরিত্রে কামব্যাক করছেন মিঠুন

চৈতালী চক্রবর্তী

দীর্ঘদিনের অনুপস্থিতি। বাংলা ছবির দর্শক তাঁদের জাত অভিনেতাকে চোখে হারিয়েছেন বহুদিন। শূন্য সে খাতায় ফের একবার ফুটে উঠতে চলেছে বহু কাঙ্খিত সেই নাম। মিঠুন চক্রবর্তী। রূপোলি পর্দায় বস্তুত বাংলা ছবির হাত ধরেই ফের কামব্যাক করছেন ‘ডিস্কো ডান্সার।’ আর মিঠুনের ফেরার পথের দোসর হচ্ছেন চলচ্চিত্র পরিচালক মানস মুকুল পাল। স্বাধীনতা সংগ্রামী দীনেশ গুপ্তর বায়োপিক নিয়ে পরিচালক মানসের নতুন ছবিতে জমিয়ে অভিনয় করতে দেখা যাবে মিঠুনকে।

সহজ পাঠের সহজ গল্প নয়, বরং সংগ্রাম আর সাহসের ভাষা এ বার পর্দায় ফুটিয়ে তুলতে চলেছেন পরিচালক মানস। এক মধ্যবিত্ত পরিবারের সাধারণ, মেধাবী ছেলের বিপ্লবী হয়ে ওঠার গল্প এই ছবির ক্যারিসমা। ১৯৩০ সালে বিনয়, বাদল, দীনেশের রাইটার্স অভিযানই এই ছবির প্লট। স্বাধীনতা আন্দোলনের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়কে এ বার পর্দায় বাস্তব রূপ দিতে চলেছেন মানস। বইয়ের পাতায় যা ধরা দেয় না, এক তরুণ বিপ্লবীর জীবনের সেই গোপন রহস্যকেই দর্শকের সামনে হাজির করবেন অভিনব দক্ষতায়।

পরিচালকের কথায়, “অনেক স্বাধীনতা সংগ্রামীই তাঁদের অসামান্য অবদান রেখে গেছেন। তার কতটুকুই বা আমরা জানি। এমন অনেক বিপ্লবী ছিলেন যাঁদের সম্বন্ধে আমাদের জ্ঞানের পরিসীমা সীমিত। দীনেশ গুপ্ত তাঁদেরই মধ্যে একজন। তাঁর জীবনের গল্পকেই তাই বেছে নিয়েছি আমি।” ছবির নাম এখনও ঠিক করেননি বলে জানিয়েছেন মানস। ঠিক কোন চরিত্রে অভিনয় করছেন মিঠুন সেটাও স্পষ্ট করেনন পরিচালক। তবে বলেছেন, দীনেশ গুপ্তর জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে ছিলেন এমন একজন যাঁর কথা ইতিহাস জানে না। সেই চরিত্রেই সম্ভবত দেখা যেতে পারে মিঠুনকে।

শারীরিক অসুস্থতা ও নানা কারণে সিনেমা জগত থেকে একপ্রকার স্বেচ্ছাবসর নিয়েছিলেন মিঠুন। দীনেশ গুপ্তের এই বায়োপিক তাঁর মনে ধরেছে বলে জানিয়েছেন পরিচালক। নতুন রূপে, নতুন রকমের চরিত্রে মিঠুনকে ফের একবার বাঙালি দর্শক সাদরে গ্রহণ করবেন বলেই আশা রাখছেন মানস।

বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের গল্প ‘তালনবমী’ অবলম্বনে মানস মুকুল পালের ‘সহজ পাঠের গপ্পো’ সাড়া ফেলছিল দর্শকদের মধ্যে। জীবনের কঠিন মারপ্যাঁচ পেরিয়ে সহজ, সুন্দর, মুক্ত মনের এই গল্প এক অন্য আবেদন তৈরি করেছিল। সবুজে ঘেরা গ্রামবাংলার আলপথে কত যে রহস্য ছড়িয়ে আছে, গাছে গাছে, পাখিদের ডানায় বেঁচে থাকার যে স্বপ্ন সহজ-সাধারণ মানুষগুলো রোজ দেখে চলেন তারই একটা ছবি এঁকেছিলেন মানস। জটিল, বঞ্চনার আবরণে হাঁসফাঁস করা নাগরিক সভ্যতার বাইরেও যে একটা সহজিয়া জীবন রয়েছে, ‘ছোটু’ ও ‘গোপাল’ (নুর ইসলাম, সামিউল আলম) দুই ভাইয়ের চোখ দিয়ে পরিচালক মানস তারই পাঠ পড়িয়েছিলেন দর্শককে।

তবে ‘সহজ পাঠের গপ্পো’ ছিল প্রকৃতির ক্যানভাসে আঁকা কবিতার মতো, যার মধ্যে বাস্তব রয়েছে আর স্বপ্নে হারিয়ে যাওয়ার হাতছানিও রয়েছে। কিন্তু এ বারের চমকটা অন্য। পরিচালকের কথায়, এ বারের ছবি হলো রূঢ় বাস্তব। জীবন-মৃত্যুর সীমানায় দাঁড়িয়ে এক তরুণের লড়াই করার গল্প। আসন্ন মৃত্যুকে দেখেও দেশের জন্য বলিদান দেওয়ার এই যে প্রয়াস, সাহস তাকেই কুর্নিশ জানিয়েছেন মানস।

“উনিশ-কুড়ি বছরে আমরা কী ছিলাম, আর এই তরুণেরা কী ছিলেন সেটাই দেখাতে চেয়েছি আমি। এই যে অফুরান প্রাণশক্তির উৎস কী? কোন দর্শনে, ভাবনায় উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন এই বিপ্লবীরা। একটা মেধাবী ছেলে হঠাৎই বিপ্লবী হযে উঠতে পারে না, যে অনুপ্রেরণা, শক্তি লাগে সেটা কোথা থেকে এল আর কী ভাবেই বা এল সেটাই আমার ছবির মূল লক্ষ্য,” মানসের কথায়, এই মানুষগুলোর কথা ভুলতে বসেছে দেশ। বিনয়-বাদল-দীনেশ-এর নাম একসঙ্গে নিলে তবেই চিনতে পারে বর্তমান প্রজন্ম। দীনেশ গুপ্ত আসলে কে ছিলেন, কী ছিল তাঁর বাস্তব পরিচয় সেটা অনেকটাই থেকে গেছে আঁধারে।

রাজনীতির কচকচানিতে না গিয়েও একটা ছবিকে কতটা বাস্তব রূপে ফুটিয়ে তোলা যায় তা আগেই দেখিয়ে দিয়েছেন মানস মুকুল। তাঁর এ বারের ছবিও দর্শক মনে একটা ধাক্কা দেওয়ার অপেক্ষায়। পরিচালকের কথায়, বর্তমান সমাজ মেরুদণ্ডহীন হয়ে রয়েছে। আত্মকেন্দ্রিক হয়ে বাঁচতে শিখে গেছে তরুণ প্রজন্ম। এমনই একটা সময়ে এই ছবি কিছুটা হলেও ভাবতে শেখাবে। সংসারের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য, মায়ের কোল ছেড়ে আত্মবলিদান দিতে পিছপা হয়নি যে মানুষগুলো তাঁদের উত্তরসুরি হয়ে আধুনিক সমাজ কি ফের একবার জেগে উঠবে না? প্রত্যাশা ছাড়ছেন না পরিচালক মানস মুকুল পাল।

Comments are closed.