বাস্তবতার নেপথ্যের বাস্তব

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    সদ্য গান শেষ করল প্রথম রাউন্ডের শেষ প্রতিযোগী। টিভিতে ফেটে পড়ছে হাততালি। সাইকাডেলিক আলো ঘুরছে সারা মঞ্চ জুড়ে। ক্যামেরায় প্রতিযোগীর মুখের ক্লোজআপ। পেছনে শো’র সিগনেচার টিউন। সঞ্চালকের উচ্ছ্বাস। ক্যামেরা সঞ্চালকের মুখ ছুঁয়ে পৌঁছে গেল বিচারকদের দিকে যারা প্রত্যেকেই সেলিব্রেটি। আবহ বদলায়, বদলায় আলো। বিচারকেরা একে একে বলছেন গানের ত্রুটি–বিচ্যুতি। প্রতিযোগীর মুখের অভিব্যক্তি বদলাচ্ছে মন্তব্যের সঙ্গে সঙ্গে। টিভি’র পর্দায় চোখ আটকে গোগ্রাসে গেলা দর্শকের পাল ভাবনায় উথালপাথাল। কে যাবে দ্বিতীয় রাউন্ডে। তাহলে কী…

    চেনা দৃ্শ্য চেনা মুখ। কিন্তু ঠিক কী ঘটে চলে আলোকিত মঞ্চের পেছনে, ক্যামেরার আড়ালে? জানা যায় না। যেমন অজ্ঞাত থেকে যায় বাস্তব বলে আমাদের কাছে যা উপস্থাপিত হচ্ছে তা বাস্তব না বাস্তবতার ভ্রম। রিয়েলিটি শো’র নেপথ্যের সেই বাস্তবতা নিয়েই চিৎপুর রংতামাশা’র নাটক ‘ধা নি সা’।

    এই নাটক আমাদের জানায়, রিয়েলিটি শো’র সঞ্চালক বা বিচারক কোনও স্বতঃস্ফুর্ত সংলাপ বলেন না, বলেন পরিচালক নির্ধারিত ‘স্ক্রিপ্টেড ডায়লগ’। অভিনয় দক্ষতায় তাঁরা সেই বাচনভঙ্গির মধ্যে নির্মাণ করেন বাস্তবতার মায়া। আলো আর শব্দের মিশেলে সেই মায়া সঞ্চারিত হয় রিয়েলিটি শো’র ‘ক্রেতা’ বা দর্শকদের মধ্যে। বাস্তব আর অবাস্তবতার সীমারেখা ঝাপসা হতে থাকে, চেতনা আচ্ছন্ন হয়ে যায়। আর সেই মুহূর্তেই সম্মোহিত দর্শকদের বিচারক্ষমতার ওপর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ফেলেন নেপথ্যের সেই ব্যক্তি যার কাছে মঞ্চে ও মঞ্চের বাইরে থাকা সকলে, এমনকী অনুষ্ঠানের ক্রেতারাও শুধুমাত্র পণ্য। যার কাছে সঙ্গীত বা কোনও চারুশিল্পেরই কোনও মূল্য নেই যতক্ষণ না সেটি টাকা আনতে সক্ষম।

    মঞ্চে বা পর্দায় বাস্তবতা দেখানো যথেষ্ট আয়াসসাধ্য কাজ। অতি চেনা দৃ্শ্যের পুনর্নির্মাণ যে কোনও মুহূর্তে অতিনাটকীয় বা অক্ষম অনুকরণে পরিণত হতে পারে। এই কঠিন কাজটি যথেষ্ট দক্ষতার সঙ্গে সামলেছেন পরিচালক সুবীর দেবনাথ। অবশ্যই কাহিনী ও তার (শতরূপা সরকার) নাট্যরূপ (সোহম বন্দ্যোপাধ্যায়) এবং সম্পাদনা (স্বজন সৃজন মুখোপাধ্যায়) এ বিষয়ে সাহায্য করেছে পরিচালককে। কিন্তু সমস্ত সম্পদ হাতে থাকা সত্ত্বেও বয়ন বা মাউন্টিং–এর অভাবে গোটা উপস্থাপনা ক্লিশে হয়ে যেতে পারত। পরিচালকের মুন্সিয়ানা সেই বয়নকর্মেই।

    দু–একজনের অভিনয়ে আড়ষ্টতা থাকলেও অধিকাংশ অভিনেতাই যথেষ্ট পরিণতির ছাপ রেখেছেন। বিশেষ করে উল্লেখযোগ্য সঞ্চালক (দেবনাথ চট্টোপাধ্যায়), অভিনেত্রী অহনা (লাবণী সরকার), বিচারক স্বরভানু (কৃষ্ণেন্দু ভট্টাচার্য), পরিচালক (সৌমদেব ভট্টাচার্য)–এর অভিনয়। প্রতিযোগিতায় গানের সমালোচনা শুনে ছোট্ট মেয়ে রশিদা’র (প্রিয়াংশী ঘোষ) অভিব্যক্তি আলাদা করে উল্লেখ করতেই হবে। কিন্তু যার অভিনয়ের কথা না বললে অসম্পূর্ণ থেকে যাবে এই আলোচনা তিনি কাজল শম্ভু। স্বল্প পরিসরে প্রযোজকের চরিত্রটি যে দক্ষতার সঙ্গে তিনি উপস্থাপিত করলেন তা মুগ্ধ করে দেওয়ার মতো। চমৎকৃত করেছে প্রতিযোগী আশাবরী’র ভুমিকায় প্রতিভা দত্ত’র কণ্ঠ। তবে অস্বস্তির কথাটিও এই অবসরে জানিয়ে রাখা ভালো। এপার বাংলার মতোই বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বাচনভঙ্গি বিভিন্ন। কিন্তু যে ভাষায় (সাধারণত যাকে ঢাকাইয়া বাঙাল ভাষা বলা হয়) ছোট্ট রশিদা কথা বলল সে ভাষা এখন বাংলাদেশের শহুরে মধ্যবিত্তের মধ্যে সাধারণত ব্যবহৃত হয় না। বাংলাদেশ অতএব বাঙাল– এই বহু ব্যবহৃত প্রয়োগটি কি এড়ানো যেত না?

    রিয়েলিটি শোয়ের আলো–আবহ ও নাটকের আলো–আবহের মধ্যের পার্থক্য বোঝানোটি ছিল এই নাটকের অন্যতম দুরূহ একটি কাজ। আবহের ক্ষেত্রে দু–একবার এই বিভাজনরেখাটি অস্পষ্ট হলেও সাধারণ ভাবে এই দুটি কাজই সুচারু ভাবে সম্পন্ন করেছেন অনিন্দ্য নন্দী (আবহ) ও সৌমেন চক্রবর্তী (আলো)। সবমিলিয়ে ‘ধা নি সা’ একটি উন্মোচনের নাটক যা দেখা দরকার নিছক নাটক দেখার জন্য নয় মেধার দখল অন্যের হাতে চলে যাওয়া প্রতিহত করার জন্য।

    মগ্ন মিত্র

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More