মঙ্গলবার, নভেম্বর ১২

ফিরে আসা স্বপ্নের আখ্যান

নাটক: কিউমুলোনিম্বাস
পরিচালক: দেবাশিস ঘোষ দস্তিদার
নাট্যদল: হাতেখড়ি  

গত শতাব্দীর সাতের দশককে মুক্তির দশকে পরিণত করার দুঃসাহসিক প্রস্তাবনা আজ ইতিহাস। এক অদ্ভুত বিক্ষত সময়ের মধ্যে দিয়ে চলা বর্তমান প্রজন্মের কাছে সেই ‘বসন্তের বজ্রনির্ঘোষ’ অজানাই শুধু নয়, হয়তো সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক। আদর্শের জন্য আত্মত্যাগ, নিজের নিতান্ত বেঁচে থাকার বাইরেও প্রসারিত সীমান্তকে দেখার মনন মেধা বোধের আশ্চর্যজনক অনুপস্থিতি পঞ্চাশ বছরের সময়কালকে এমনভাবে দ্বিখণ্ডিত করেছে যে মনে হওয়া স্বাভাবিক ‘সত্তরের দশককে মুক্তির দশক’ করার অভিলাস ছিল যেন বা কিছু গ্রহান্তরের জীবের। তবু যেহেতু কিছু স্বপ্নের জন্মকালেই অমৃত পানের অনিবার্যতা ঘটে তাই সেই নাছোড় স্বপ্নেরা মার খেতে খেতেও বেঁচে থাকে দীর্ঘ সময়। তাই ‘উদ্ভট রোমান্টিকতা’, ‘আদ্যন্ত হঠকারিতা’, ‘বেপথু সংগ্রাম’ ইত্যাকার বিভিন্ন অভিধায় লাঞ্ছিত হয়েও সে স্বপ্ন জেগে ওঠে কারও কারও চোখে, কেউ কেউ এখনও অপেক্ষা করে এক প্রবল বর্ষণের জন্য, যে বর্ষাস্নানে আবার সজীব হয়ে উঠবে মুক্তির আকাঙ্ক্ষা, ইতিহাস পুনরাবৃত্ত হবে নতুন ভাবে, নতুন স্তরে।

‘হাতেখড়ি’ প্রযোজনা ‘কিউমুলোনিম্বাস’ সেই স্বপ্ন পুনরুজ্জীবনের নাটক। গত শতকের সাতের দশকে নকশালবাড়ি আন্দোলনের যে প্রবাহ কাঁপন ধরিয়েছিল স্থিতাবস্থার রক্ষকদের বুকে, যে উচ্ছ্বাসে ভেঙে পড়েছিল চিন্তার বিবিধ অচলায়তন, সেই বেপরোয়া সময়ে যৌবন পেরিয়ে আসা তুষার আজ প্রায় বৃদ্ধ। জীবনের উপান্তে দাঁড়িয়ে এই বদলে যাওয়া সময়ের ক্ষত প্রতিদিন বেআব্রু হতে থাকে তার চোখের সামনে। অদ্ভুত ভোগ, দ্বিচারিতায় ক্ষিপ্ত হলেও সে স্বপ্ন হারায় না। দিন বদলের উদ্দাম স্বপ্ন তাড়া করে বেড়ায় তুষারকে কারণ সে জানে মেঘ জমছে, ঘন মেঘ –– বৃষ্টি অনিবার্য। তার এই স্বপ্ন ছুঁয়ে যায় তারই পুত্রবধূ দিয়া–কে, যে তার গত প্রজন্মের এক বৃদ্ধের সঙ্গে অপেক্ষা করে এক অন্য বসন্তের, যখন সমস্ত মানুষ মুক্তি পাবে অর্থনৈতিক ও নৈতিক দারিদ্র্য থেকে, সমস্ত মানুষ বিবেচিত হবে মানুষ হিসেবে।

নাটকের প্রোটাগনিস্ট তুষার চরিত্রে বিশ্বজিৎ দাস ও সঞ্জীব বন্দ্যোপাধ্যায় আগাগোড়া চরিত্রের প্রতি বিশ্বস্ত থেকেছেন, প্রত্যাশিত ভাবেই চমৎকার অভিনয় করেছেন দিয়া’র ভূমিকায় বিন্দিয়া ঘোষ। নাট্যকার হিমাদ্রি শেখর দে অভিনয় করেছেন তুষারের ছেলে রঞ্জনের ভূমিকায়। অভিনয় তাঁর কলমের মতো শক্তিশালী না হলেও বেশ কয়েকটি মুহূর্ত রচনায় তিনি সহ অভিনেত্রীকে যথেষ্ট সহায়তা করেছেন। ছোট্ট অবসরে চমৎকার অভিনয় করছেন ডাক্তারের ভূমিকায় রণজিৎ চক্রবর্তী। কিঞ্চিৎ অতি নাটকীয় হলেও সোমা নাহা ও শ্রীকান্ত সাহার অভিনয় উল্লেখযোগ্য। সৌমেন চক্রবর্তীর আলো যথাযথ। সঙ্গীত নির্মাণে (অভিষেক ও আরব) হয়তো কল্পনাকে আর একটু প্রসারিত করার সুযোগ ছিল। নাটকটিকে সার্বিক ভাবে যথেষ্ট দক্ষতার সঙ্গে বয়ন করেছেন পরিচালক দেবাশিস ঘোষ দস্তিদার। কিছুটা সন্ত্রস্ত সময় এমন একটি নাটক উপস্থাপনা করার স্পর্ধা দেখানোর জন্য তাঁকে এবং প্রযোজক দলকে কুর্নিশ জানাতেই হয়।

এই নাটকের আলোচনা অসমাপ্ত রয়ে যাবে নাটকের অন্যতম সম্পদের বিষয়ে উল্লেখ না করলে।   একটিও শব্দ উচ্চারণ না করে মঞ্চ কী ভাবে সোচ্চার হয়ে উঠতে পারে সেটি এই নাটকে দেখিয়ে  দিয়েছেন শিল্পী হিরণ মিত্র। কোনও প্রশংসাই শিল্পীর জন্য যথেষ্ট নয়।

মগ্ন মিত্র

Comments are closed.