‘এই নাও আমার যৌতুক, এক বুক রক্তের প্রতিজ্ঞা’

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    নাটক: চর্যাপদের কবি
    নাট্যদল: বরানগর ভূমিসুত থিয়েটার
    পরিচালক: স্বপ্নদীপ সেনগুপ্ত

    ভাষাকে কেন্দ্র করে শাসক ও শাষিতের দ্বন্দ্ব দীর্ঘদিনের। এই সংঘাত যতটা সাংস্কৃতিক তার থেকেও বেশি রাজনৈতিক। ভাষা প্রতিষ্ঠার অর্থ রাজনৈতিক ভাবে সেই ভাষাগোষ্ঠীর মানুষের প্রতিষ্ঠাকে স্বীকার করে নেওয়া। ফলে শাষিত জনগোষ্ঠীর ভাষা কোনওভাবেই শাষককেরা প্রতিষ্ঠিত হতে দিতে চায় না বরং সে ভাষাকে ছোটলোকের ভাষা বা দুর্বল ভাষা হিসেবে চিহ্নিত করে বাতিল করে দেওয়ার প্রচেষ্টা চালায়। এই অবদমন প্রক্রিয়াটি দেশি বিদেশি সমস্ত শাসকরাই চালিয়ে এসেছে, চালিয়ে যাচ্ছে নিরবিচ্ছিন্ন ভাবে। এভাবেই পৃথিবীর বুক থেকে হারিয়ে গেছে, হারিয়ে যাচ্ছে বহু বহু ভাষা। এই প্রেক্ষাপটেই ‘বরানগর ভূমিসুত থিয়েটার’–এর সাম্প্রতিক প্রযোজনা ‘চর্যাপদের কবি’।

    অষ্টম থেকে দশম শতাব্দীতে এই বঙ্গভূমে শাসকশ্রেণীর ব্যবহৃত সংস্কৃত ভাষার সঙ্গে সাধারণ জনগোষ্ঠীর ভাষা– যা বাংলার আদিরূপ– সংঘর্ষের এক টুকরো কাহিনী ‘চর্যাপদের কবি’। গণকবি কাহ্নপা মাতৃভাষায় লিখিত কাব্য পাঠ করতে চায় রাজদরবারে। রাজা অনুমতি দেন। কিন্তু রাজদরবারে ‘ছোটলোকের’ ভাষায় কাব্যপাঠ হলে দরবারের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হবে এই যুক্তিতে মন্ত্রীসহ অন্যান্য সভাসদ সেই অনুমতি বাতিল করে। ব্যক্তিত্বহীন রাজার পক্ষে নিজের আদেশ পুনর্বহাল করা সম্ভব ছিল না। শুধু রাজাদেশ বাতিলই নয়, কাহ্নপার এই ‘উচ্চাশা’র জন্য তাকে চরম লাঞ্ছনা করে রাজগৃহ থেকে বিতাড়িত করা হয়। কাহ্নপার অপমানে স্ব–জনগোষ্ঠীর জাত্যাভিমান আহত হয়। রাজদরবারে একটি ভাষাকে ব্রাত্য করার অর্থ সেই ভাষা ব্যবহারকারীদের ব্রাত্য করে রাখা, এই সরল সত্যটি বুঝতে পারায় প্রতিবাদ সংগঠিত হতে থাকে। শাসকদের অত্যাচারও অতিক্রম করতে থাকে সভ্যতা ও ন্যায়–নীতির সীমানা। নাটক এগোতে থাকে চূড়ান্ত পরিণতির দিকে।

    সেলিনা হোসেনের মূল কাহিনী অবলম্বনে নাট্যকার জুলফিকার জিন্না’র নাট্যরূপের সঙ্গে সঙ্গতি রেখেই অভিনয়ের প্রকৃতি স্বাভাবিক ভাবেই কিছুটা চড়া পর্দায় বেঁধেছেন পরিচালক স্বপ্নদীপ সেনগুপ্ত। কেন্দ্রীয় চরিত্র কাহ্নপার ভূমিকায় গম্ভীরা ভট্টাচার্যের অভিনয় প্রশংসনীয়। কবি হিসেবে রাজস্বীকৃতির আকাঙ্খা এবং একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের পক্ষ নিয়ে প্রচারে অসম্মতি, কাব্যভাষা ও বিষয়ে জনমানসকে ছুঁয়ে থাকার প্রয়াস, মাতৃভাষা প্রতিষ্ঠায় সঘন আবেগ, প্রেমিকা মল্লারী ওরফে ডোম্বি (উজ্জয়নী চট্টোপাধ্যায়) ও স্ত্রী শবরী’র (অনন্যা পাল ভট্টাচার্য) প্রতি সাবলীল আনুগত্য– চরিত্রের এই বিভিন্ন স্তর উন্মোচন কোথাও মুহূর্তের জন্য কোনও অস্বাভাবিকতা তৈরি করে না। আদিবাসী দেশাখ ও মন্ত্রী’র ভূমিকায় যথাক্রমে কাজল শম্ভু ও সমীর বিশ্বাস যথাযথ। চমৎকার অভিনয় করেছেন উজ্জয়নী চট্টোপাধ্যায় কিন্তু চূড়ান্ত নাটকীয় ও আবেগঘন মুহূর্তে কয়েকজায়গায় সংলাপ যেন কিছুটা অস্পষ্ট হয়ে পড়ে।

    ‘এলিট’ বা শাসক গোষ্ঠীর বিপ্রতীপে সাধারণ মানুষের সরল স্বাভাবিক যাপনচিত্রের বহমানতা অভিনেতা–অভিনেত্রীদের শরীরী অভিনয়ের মধ্যে দিয়ে ফুটিয়ে তোলা নিঃসন্দেহে পরিচালকের অন্যতম কৃতিত্ব। এ বিষয়ে সমস্ত অভিনেতা–অভিনেত্রীরা যথেষ্ট দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। অসাধারণ মঞ্চ ভাবনা (দেবব্রত মাইতি), চমৎকার কোরিওগ্রাফি এবং সুপরিকল্পিত আলো (সৈকত মান্না) এই নাটকের অন্যতম সম্পদ।

    শাসক–শাসিতের দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করে গত শতকের শেষ চার–পাঁচ দশক বহু প্রযোজনা হয়েছে। বিশেষ করে প্রাকৃতজন ও শাসকদের সংঘাত নিয়ে বাংলাভাষায় নির্মিত হয়েছে একাধিক স্মরণীয় উপন্যাস। কিন্তু কোনও কোনও সময়ে ইতিহাস দারুণভাবে সমসাময়িক হয়ে ওঠে। সাম্প্রতিক অতীতে ভাষাকে কেন্দ্র করে প্রতিবেশী রাষ্ট্রের রাজনৈতিক পালাবদলই শুধু নয় বর্তমানে আমাদের দেশেও নতুন করে শুরু হয়েছে ভাষাবিতর্ক। এমন সময়ে বরানগর ভূমিসুত থিয়েটার নিবেদিত ‘চর্যাপদের কবি’ অতীত উদ্ধার হয়েও প্রবল ভাবে সমসাময়িক। এমন একটি প্রযোজনা উপহার দেওয়ার জন্য পরিচালক সহ গোটা নাট্যদলই ধন্যবাদার্হ।

    (শিরোনাম ঋণ: নির্মলেন্দু গুণ)

    মগ্ন মিত্র

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More