রূপকথার আড়ম্বরহীন নিটোল বয়ন

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    নাটক: ব্রাহ্মণ ও ব্রাহ্মণী
    নাট্যদল: থিয়েলাইট
    পরিচালনা: অতনু সরকার
    সে এক সময় ছিল, এমনকী খোদ কলকাতাতেও সন্ধেবেলায় পড়াশুনোর পাট মিটে গেলে বাড়ির বয়োজেষ্ঠা পিতামহীর কাছে নাতি–নাতনিরা বসত গল্প শুনতে। প্রবীণারাও কেমন যেন স্বভাবতই ছিলেন চমৎকার কথক। সম্পূর্ণ অবাস্তব জগতকে ধরাছোঁয়ার মধ্যে এনে দিতেন অনায়াসে। বাঘের সঙ্গে শেয়ালের কথোপকথন অথবা রাক্ষসীর রানি সেজে হাতিশালের হাতি আর ঘোড়াশালের ঘোড়া টপাটপ খেয়ে ফেলা কোনওটাই অস্বাভাবিক ঘটনা বলে মনেই হত না অ–যান্ত্রিক শৈশবে। চারপাশ এমন আলোকিত ছিল না, বাড়িতে পথেঘাটে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা অন্ধকারের মধ্যে শৈশবকল্পনা অনেক প্রসারিত হতে পারত, সেই আলো–আঁধারিতে কাহিনীর চরিত্রদের অস্তিত্ব টের

    পাওয়া তো ছিল প্রায় নিত্য নৈমিত্তিক ঘটনা। তারপর হলুদ ৬০ বা ১০০ ওয়াটের বাল্ব নির্বাসিত হয়ে এল সাদা নিয়ন আলো। বড় স্পষ্ট হতে থাকল চতুর্দিক। শুরু হল কল্পনার সংকোচন। জীবন সাদামাটা হওয়ার সেই শুরু। বিশ্বায়ন, টেলিভিশনের আড়াইশো চ্যানেল আর মুঠোর মধ্যে অন্তর্জালের তাণ্ডবের মধ্যে বেড়ে ওঠা প্রজন্ম জানতেই পারে না লালবিহারী দে, উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী, দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার তাদের জন্য কোন সম্পদ রেখে গেছেন। হলিউডে সিনেমা হল না ফলে নীলকমল–লালকমল থেকে ঘ্যাঁঘাসুর সহ অসংখ্য বর্ণময় চরিত্র শিশুমনের পঙতিতে বসার যোগ্যতা হারালো।

    এমনই এক বর্ণহীন সময়ে ঠাকুমার ঝুলিকে মঞ্চে নিয়ে এল থিয়েলাইট। কোনও  গভীরতর দার্শনিক ভাষ্য অথবা সামাজিক–রাজনৈতিক বার্তা দেওয়ার চেষ্টা না করে দলের সদস্যরা সরল ভাবে দর্শকদের সামনে উপস্থিত করেছেন মূর্খ ব্রাহ্মণ ও তাঁর ব্রাহ্মণী’র গল্প। কাহিনীর ব্রাহ্মণ নানা মজার ঘটনার মধ্যে দিয়ে কাকতালীয় ভাবে হয়ে ওঠে ‘সত্যদ্রষ্টা’। এমনকী কপালজোরে জুটে যায় রাজার সভাকবির পদটিও। অভাবের সংসারে আসে সচ্ছলতার জোয়ার। কিন্তু ব্রাহ্মণ মূর্খ হলেও বোকা ছিল না। এই সাফল্যের ভিত যে অত্যন্ত নড়বড়ে সেটি বুঝতে ব্রাহ্মণের দেরি হয় না। ফলে মূর্খব্রাহ্মণ, পণ্ডিতব্রাহ্মণ হওয়ার উদ্দেশে গুরুগৃহে উপস্থিত হয়।

    আলো বা রেকর্ডিং করা আবহের কায়দাকানুন এড়িয়ে মঞ্চের ওপর একটি মাত্র রস্টাম রেখে সম্পূর্ণ বাহুল্যবর্জিত জমাট প্রযোজনা ”ব্রাহ্মণ ও ব্রাহ্মণী”। এই বাহুল্যহীনতাই নাটকটির সম্পদ। কোনও আরোপিত মায়াবী পরিবেশ রচনা না করে সাদামাটা ভাবে গল্প বলার মধ্যে রয়েছে হারিয়ে যাওয়া প্রবীণাদের কথক কুশলতার ছাপ। এই সারল্যের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে থার্ড থিয়েটার ও লোকায়ত আঙ্গিকের মিশেলে থিয়েলাইটের অভিনেতা অভিনেত্রীরা প্রত্যেকেই সাবলীল অভিনয় করেছেন। ব্রাহ্মণের চরিত্রে অতনু সরকার ও কথকের ভূমিকায় দেবরাজ গাঙ্গুলির অভিনয় আলাদা করে উল্লেখের দাবি রাখে। পরিচালক অতনু সরকারের বুদ্ধিদীপ্ত নির্মাণ ও শ্যামসন মাথুর চক্রবর্তীর চমৎকার নাট্যরূপ ও সঙ্গীত রচনা  নাটকটিকে অত্যন্ত প্রাণবন্ত করে তুলছে। সারল্যও যে অলঙ্কার হতে পারে সেটা অনুভব করার জন্যই একবার দেখে নেওয়া যায় থিয়েলাইটের এই ‘শর্ট প্লে’টি।

    মগ্ন মিত্র

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More