শুক্রবার, নভেম্বর ১৫

সত্যের মুখোমুখি হওয়ার ‘ভয়’

নাটক: ভয়
রচনা: ব্রাত্য বসু
পরিচালনা: অতনু সরকার
নাট্যদল: থিয়েলাইট

এক দম্পতি সারান্দার জঙ্গলের ধারে এক ট্যুরিস্ট লজে গিয়ে ওঠে সন্ধ্যার কিছু আগে। পৌঁছনোর কিছু পর থেকেই মেয়েটির চোখে পড়তে থাকে অস্বাভাবিক কিছু ছায়ামূর্তির চলাফেরা। ইতিমধ্যে গাড়ির ড্রাইভারের কাছ থেকে সেই নির্জন লজ সম্পর্কে চলতি জনশ্রুতিটি তারাও জেনে ফেলে। লজটি ভৌতিক উপদ্রবের কারণে কুখ্যাত। রাতে খেয়ে ঘরে ঢোকার পর থেকেই ছায়াময়রা স্পষ্ট হতে শুরু করে। সরাসরি মুখোমুখি হয় দম্পতির। ভয় ছড়িয়ে পড়তে থাকে দর্শকদের মধ্যে।

বর্তমানের যৌক্তিকতা, ঔচিত্যবোধ নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করে অতীত। রাজনৈতিক ভণ্ডামি থেকে ব্যক্তির আত্মপরিচয়ের সংকটের বিস্তৃত পরিসরে নাট্যকার ব্রাত্য বসু’র ভাষ্য সজীব হয়ে ওঠে। জীবনের, সমাজের সমস্ত linearity-র ধারণা ভাঙতে থাকে, মধ্যবিত্তের অজস্র আড়াল তৈরি করা আপাত নিরুপদ্রব অস্তিত্ব খাদের ধারে এনে দাঁড় করিয়ে দেন নাট্যকারl

অত্যন্ত জটিল বুনটের মধ্যে দিয়ে গড়ে উঠেছে ‘থিয়েলাইট’ নাট্যদলের প্রযোজনা ‘ভয়’ নাটকটি। নাটকটি মঞ্চে উপস্থাপন করাটাই ছিল সম্ভবত পরিচালক অতনু সরকারের কাছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। একযুগ আগেই অন্য একটি নাট্যদল নাটকটি মঞ্চস্থ করলেও সমস্ত পরিচালকই যেহেতু নাটক গড়ে তোলেন তাঁর নিজস্ব বোধের প্রেক্ষিতে এবং মূল রচনার প্রতি বিশ্বস্ত থেকেও নির্মাণ করেন নিজস্ব বয়ান, অতনুকেও সম্পূর্ণ নিজের মতো করেই বয়ন করতে হয়েছে পূর্ব মঞ্চস্থ নাটকটি।    দু’ঘণ্টার মধ্যে বিগত প্রায় চার দশকের রাজনৈতিক ও ব্যক্তি সংকটের নির্যাসটুকু দর্শকদের সামনে তুলে ধরা খুব সহজ কাজ ছিল না কারণ এই নাটকটি মঞ্চস্থ করার সবথেকে বড় প্রতিবন্ধকতা নাটকটির জটিল গঠন। ভৌতিক থ্রিলারের অবয়বে যেভাবে মূল কাহিনী রাষ্ট্র, দল ও ব্যক্তির আন্তঃসম্পর্কের বিভিন্ন স্তর উন্মোচন করতে থাকে, যে কোনও মুহূর্তে নাটকের বিষয়টি দর্শকদের বোধগম্যতাকে অতিক্রম করে যাওয়ার সম্ভাবনা থেকেই যায়। এই সংকট থেকে নাটকটিকে রক্ষা করার জন্য পরিচালকের বিশেষ মুনশিয়ানার প্রয়োজন। এই জটিল নিরীক্ষায় পরিচালক সসম্মানে উত্তীর্ণ হয়েছেন নিঃসন্দেহে।

 

নাটকের চরিত্র মূলত চারটি। দম্পতি শুভঙ্কর ও সীমা এবং অতীত থেকে ফিরে আসা এক নারী ও পুরুষ। এছাড়া রয়েছেন লজের ম্যানেজার। চমৎকার নিয়ন্ত্রিত অভিনয় করেছেন সীমার চরিত্রে শম্পা দাস সরকার ও ‘অতীত পুরুষ’ অশোক মজুমদার। লজের ম্যানেজারের ভূমিকায় পুলক রায় যথাযথ। শুভঙ্কর ও ‘অতীত নারী’র ভূমিকায় যথাক্রমে সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় এবং রাজেশ্বরী নন্দী চরিত্রের প্রতি অনুগত থেকেছেন।

গোটা প্রযোজনায় ভয়ের পরিবেশটি বজায় থাকে আলোর (সুদীপ সান্যাল) সঠিক ব্যবহারে। আবহের (স্যামসন মাথুর চক্রবর্তী) চলন গতানুগতিক হলেও পরিস্থিতির সঙ্গে মানানসই। পৃথ্বীশ রানার মঞ্চ ভাবনায় রয়েছে স্পেস ব্যবহারের সু–পরিকল্পনা। সব মিলিয়ে থিয়েলাইট প্রযোজিত ‘ভয়’ এই সময়ের একটি ব্যতিক্রমী উপস্থাপনা।

মগ্ন মিত্র

Comments are closed.