পড়ে গিয়েও উঠে দাঁড়ানোর কাহিনী ‘যোদ্ধা’

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    অ্যাসিড ছুঁড়ে শরীরকে ক্ষত বিক্ষত করে দেওয়া হয়েছিল এই সমাজেরই কয়েকজন নারীকে। বিভিন্ন সময়ে সাংবাদ মাধ্যমে তোলপাড় করা সেই চরিত্রগুলি এখন কেমন আছেন? তাঁরা অন্তরালে হারিয়ে গেলেন না তো? এই প্রশ্ন বা কৌতূহল এখনও অনেকের মনেই ঘোরাফেরা করে।

    না, তাঁরা কেউই হারিয়ে যাননি। সঞ্চয়িতা যাদব, সাহানারা খাতুন, ঝুমা সাঁতরা, কাকলি দাস, পম্পা দাস এখনও সাহস ও মনোবলে অটুট। সামাজিক অন্যায়ের বিরুদ্ধে তাদের সোচ্চার কণ্ঠ দমিয়ে দিতে পারেনি দুষ্কৃতকারীদের ছোড়া ওই অ্যাসিডেও। তিলে তিলে আবারও গড়ে তুলেছেন নিজেদের। বিভিন্ন সময়ে দোষীদের শাস্তি দিতে তাদের দেখা মিলেছে এই সমাজের বৃহত্তর অংশে। তাদের লড়াই এই সমাজকে আঙুল তুলে অনেক কিছুই দেখিয়েছে, শিখিয়েছেও।

    সম্প্রতি রবীন্দ্রসদনে ‘যোদ্ধা’ শীর্ষক একটি নৃত্যনাট্যের এঁদেরই কুর্নিশ জানাল ‘মুদ্রা’ নৃত্য সংস্থা। নৃত্যনাট্যটির বিষয়ই ছিল এদেরই মর্মান্তিক কাহিনী। মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা কষে জীবন-যুদ্ধে জিতে যাওয়ার কাহিনী। ঠাসা প্রেক্ষাগৃহে দর্শকরা বিস্ময়ে বাকরুদ্ধ হয়ে গেলেন যখন চোখের সামনেই দেখতে পেলেন মঞ্চে হাজির সঞ্চয়িতা, সাহানারা। ওরাও নৃত্যশিল্পীদের সঙ্গে হাতে হাত মিলিয়ে সমান তালে মঞ্চ দাপালেন বিদ্রোহের আগুন জ্বেলে। সেইসব বাস্তব চরিত্র অথচ আরও কত জোরালো ও প্রতিবাদী।

    ‘যোদ্ধা’ নৃত্যনাট্যটি রচনা করেছেন কৌশিক চৌধুরী। যিনি প্রাধান্য দিয়েছেন ধর্ষণ, অ্যাসিড বা যৌনপল্লীতে নারী পাচারের কিছু বাস্তব ঘটনাকে। যেখানে কোনও ‘কাল্পনিক’ ভাবনা ছিল না। শুরু থেকেই এই নৃত্যনাট্যটি অন্য মাত্রা পেয়েছে কারণ যে চরিত্রগুলির ঘটনা নিয়ে এই কাহিনী লেখা হয়েছে, তাঁরাই এই নৃত্যনাট্যে সশরীরে অংশ নিয়েছেন। ‘যোদ্ধা’  তাই শুরু থেকেই শেষ হওয়া অবধি দর্শকদের পৌঁছে দিতে পেরেছিল চূড়ান্ত ক্লাইম্যাক্সে। সম্ভবত এরকম উদ্যোগ কলকাতায় বেশ নতুনই বলা যায়। নৃত্য নির্দেশনায় ছিলেন অসিত ভট্টাচার্য ও মহুয়া চক্রবর্তী।

    এই নৃত্যনাট্যের আরও একটি বড় চমক ছিল মুনমুনের অংশগ্রহণ। মুনমুনকে মনে পড়ে? দীর্ঘদিন জেলবন্দি থাকা ও পরবর্তীতে আদালতের নির্দেশে বেকসুর খালাস হওয়া অপরাজিতা ওরফে মুনমুনও এই নৃত্যনাট্যে তাঁর উপস্থাপনার পেশাদারিত্বে দর্শকদের হাততালি ও বাহবা কুড়িয়ে নিয়েছেন।

    নৃত্যনাট্যের শুরুতেই ছোট্ট শিশু মানসীকে পাচারকারীদের হাত থেকে উদ্ধার করতে গিয়ে এক নৃত্যশিল্পী তাঁর স্বামীকে হারালেন। নির্মমভাবে খুন হতে হল দুষ্কৃতীদের হাতে। সেই ছোট্ট শিশুটি একদিন নৃত্য ও নীতি শিক্ষায় পরিপূর্ণ হয়ে নিজেকে প্রমাণ করেছিল এক স্বয়ংসম্পূর্ণা নারী হয়েই। সেই সময়ই মানসীর সঙ্গে পরিচয় হয় এন.জি.ও-র সঙ্গে যুক্ত এক যুবকের সঙ্গে। কিন্তু ঘটনা মোড় নিল অন্য এক ঘটনায়। দেখা গেল সেই সংস্থার আড়ালে চলছে নানা অসামাজিক কাজ। মেয়ে পাচারের কাজ। মানসী চুপ করে দমে যাওয়ার মেয়ে নয়। ঝাঁপিয়ে পড়ল সেইসব অসহায় মেয়েদের উদ্ধারের কাজে। কিন্তু পরিণাম বড় ভয়ানক হয়ে দাঁড়াল। আচমকা মানসীর উপরে অ্যাসিড হামলা চালানো হল। ছারখার হয়ে গেল মানসীর সব কিছুই। জীবন ও যৌবন যেন নিমেষে ঝলসে গেল। তবুও হেরে যাননি মানসী। লড়াই চালিয়ে গেলেন প্রতিনিয়ত সেই অন্যায়ের বিরুদ্ধেই। হামলাকারীদের শাস্তি হল দৃষ্টান্তমূলক। কিন্তু অনেক কিছু হারালেও জয়ী হলেন জীবন ও যৌবন হারানো সেই যোদ্ধা।

    মানসীর ভূমিকায় এই নৃত্যনাট্যে অসাধারণ এবং সর্বশ্রেষ্ঠ অভিনয় করেছেন অদ্রিজা ভট্টাচার্য। মানসীর সেই মুহূর্তের অভিব্যক্তির প্রতিটি মুহূর্তই ধরা পড়েছে অদ্রিজার অভিনয়ে। তাঁর অভিনয় প্রমাণ করেছে নারীই পারে তাঁর অন্তঃস্থলের সুপ্ত শক্তি জাগিয়ে অপমানের সব বদলা নিতে। নৃত্যনাট্যে কোনও নির্দিষ্ট ঘরানা অনুসরণ করা হয়নি। বরং সঠিকভাবে দেখা গেছে ধ্রুপদী নৃত্যের তাল, লয়, মুদ্রা ও ছন্দের ব্যবহার। তবে বর্ণময় হয়েছে কত্থক আঙ্গিকের চক্করওয়ালা, টুকড়া, তোড়া, পরান কখনও বা ভরতনাট্যম ও কুচি আঙ্গিকের ঝলক।

    অ্যাসিড হামলায় ঝুমা সাঁতরা দৃষ্টিশক্তি হারালেও মঞ্চে এসে নিজের শারীরিক অক্ষমতাকে আড়াল করেছেন যে ভাবে তাতে তাঁর আত্মবিশ্বাস তারিফ না করে পারা যায় না। এক ঝাঁক দক্ষ নৃত্যশিল্পীদের সঙ্গে ঝুমা, কাকলি, পম্পাদের পারফরম্যান্স-এ ফুটে উঠেছে প্রকৃত ‘যোদ্ধা’র আবেগ। যা মনকে বড় নাড়া দেয়।

    সবশেষে দর্শকরা সজল চোখে উঠে দাঁড়িয়ে কুর্নিশ জানালেন সেইসব যোদ্ধাদের। আশা করলেন, যেন তাঁরা এভাবেই সমাজে প্রতিবাদীরূপে বারবার উঠে আসতে পারেন।

    বিপ্লবকুমার ঘোষ

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More