উত্তরপাড়া লোক-সংস্কৃতি উৎসব ’১৯

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    ১৩ এবং ১৪ জুলাই, অস্বস্তিকর বৃষ্টিহীন সপ্তাহান্তের শনি রবির সন্ধ্যায়, গঙ্গার ধারে ভদ্রকালী হাইস্কুল সংলগ্ন অডিটরিয়াম শম্ভু মিত্র মঞ্চে বসেছিল দ্বিতীয় বর্ষের লোকসংস্কৃতি উৎসবের আসর। আয়োজক ভদ্রকালী এ্যাথলেটিক ক্লাব।

    উত্তরপাড়ার নাগরিক যেখানে সপ্তাহব্যাপী নাট্যোৎসব, রাতজাগা শাস্ত্রীয় সংগীতের আসরে অভ্যস্ত সেখানে লোক-সংস্কৃতি উৎসব – বাউল ফকিরি গানের আসর, ভিন রাজ্যের লোক নৃত্য – বেশ অন্যরকম। দর্শক আসন ভর্তি করাটাই যথেষ্ট দুঃসাধ্য। যদিও পরপর দুবছরের পরিশ্রমে সেই প্রচেষ্টায় নিঃসন্দেহে সফল উদ্যোক্তা সংগঠন।

    প্রথম দিন, অর্থাৎ ১৩ই জুলাই, শনিবার ইম্ফলের থাংটা ফেডারেশন অফ ইন্ডিয়া-র ছয়জন সদস্য প্রদর্শন করলো তাদের অতি প্রাচীন মার্শাল আর্ট কৌশলের, যা একপ্রকার লোক নৃত্য ও রণকৌশলের সমাহার। প্রায় ২০০০ খ্রিষ্টপুর্ব থেকে চলে আসা আত্মরক্ষার কৌশল থাংটা, যা মণিপুরের মেইতেই উপজাতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল তা আজ গোটা দেশের কাছে ক্রমশ পরিচিত হচ্ছে। ‘থাং’ অর্থাৎ তলোয়ার আর ‘টা’ অর্থাৎ বর্শা। তলোয়ার আর বর্শা নিয়ে নৃত্যের তালে তালে যুদ্ধ করা। এক অসাধারণ শিহরন জাগানো অভিজ্ঞতা। ঘণ্টা দেড়েক উপস্থিত দর্শক চোখের পলক ফেলার সুযোগ পায়নি।

    অনুষ্ঠানের উদ্বোধন হয়েছিল অর্ণব ভট্টাচার্যের পরিচালনায় অক্টেভ মিউজিক্যাল একাডেমির যন্ত্রানুষঙ্গে লোকসংগীতের সুর দিয়ে। বিদেশি সুরযন্ত্রে বাংলার লোকসংগীতের সুর পরিবেশন অনুষ্ঠানের পর মঞ্চে আসেন সাধক মনসুর ফকির আর উত্তরপাড়ার লোকসংগীত শিল্পী জয় ঠাকুর ও সম্প্রদায়।

     

    শ্রদ্ধেয় গায়ক শ্রী প্রতুল মুখোপাধ্যায় একবার এক অনুষ্ঠানে বলেছিলেন -“শাস্ত্রীয় সংগীতের যদি ‘ঘরানা’ হয় তো লোক সংগীতের হয় ‘বাহিরানা’।” এই প্রজন্মের লোক  গায়ক জয় ঠাকুরের উদাত্ত গায়কী সেই বাহিরানায় ভাসিয়ে নিয়ে যায় দর্শক শ্রোতাদের। আর ফকির সাহেবের কথা যতই বলা হোক না কেন, কম বলা হয়। সত্তরোর্দ্ধ বয়সে তাঁর গান তাঁর শরীরের মতই শালপ্রাংশু, ঋজু, বলিষ্ঠ। তাঁর কণ্ঠ তাঁর হাওয়ায় ওড়া নরম সাদা দাড়ির মতই – কোনও এক অজানা লোকে নিয়ে যেতে চায়। ওনার তুলনা উনি নিজেই। বিষ্ণুপ্রিয়ার বিরহ কীর্তন, রাধা কৃষ্ণের লীলা কীর্তন বা ফকিরি গানে মানব জীবনের গূঢ় তত্ত্ব বর্ণনায়, তার-সপ্তকেও তাঁর কন্ঠের অনায়াস কোমল বিচরণ শ্রোতাদের আবিষ্ট করে রাখে। সঙ্গে ছিল জয় ঠাকুর ও সম্প্রদায়ের বিনম্র সঙ্গত।

    দ্বিতীয় দিন অর্থাৎ ১৪ জুলাই, রবিবার প্রথমে ছিল উত্তরপাড়ার শ্রদ্ধেয় সংগীত গুরু শ্রী রেবতীনাথ দত্ত এবং রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভাগীয় প্রধান প্রখ্যাত সংগীত শিল্পী ইন্দ্রাণী ঘোষ–এর পরিচালনায় ক্লাব সদস্য সদস্যাদের প্রয়াস রবীন্দ্রনাথের গানে লোকসংগীতের প্রভাব। একেবারেই শুদ্ধ ও সাত্ত্বিক উপস্থাপনা।

    আর ছিল এই প্রজন্মের দুই নিমগ্ন লোকসংগীত শিল্পী ঋষি আর তীর্থ। এই প্রথম ওরা এক সঙ্গে এক মঞ্চে। গানভাসি দুই পাখির গানের উড়ানে কখন যে শ্রোতাদের   আকাশের সীমান্তে পৌঁছে দেয় খেয়ালই থাকে না। একে একে সারি জারি ভাটিয়ালি ভাওয়াইয়া গম্ভীরা ঝুমুর এর উড়ান এক সময় থামে বিহুর তালে। ইতিমধ্যে লোক সংগীতের আপন নিয়মে মঞ্চ আর দর্শক আসন মিলেমিশে এক হয়ে যায় বাংলা ঢোল আর মাদলের তালে, আড় বাঁশি আর দোতারার সুরে। লোকসংগীতের আসর সার্থক রূপ পায়। গানের মাধ্যমে মানুষজনকে কী ভাবে আপন করে নিতে হয় তা ঋষি আর তীর্থ জানে। তাই লোকসংগীত গায়ক হিসাবে তাদের এত জনপ্রিয়তা। তাদের নিয়ে দর্শক–শ্রোতাদের এত উন্মাদনা। সমগ্র অনুষ্ঠানটি সুযোগ্য সঞ্চালক পিয়াস প্রতিম-এর সঞ্চালনায় আরও আকর্ষনীয় হয়ে ওঠে।

    দুদিনের অনুষ্ঠানে বিশেষ উল্লেখযোগ্য অতিথি হিসাবে উপস্থিত ছিলেন ভারত সরকারের পূর্বাঞ্চল সংস্কৃতি কেন্দ্রের প্রোগ্রাম কো-অর্ডিনেটর শ্রী অভিজিৎ চ্যাটার্জী, লায়ন্স ক্লাবের জেলা কো-অর্ডিনেটর লায়ন পার্থ চ্যাটার্জী, উত্তরপাড়ার বিধায়ক শ্রী প্রবীর ঘোষাল এবং পৌরপ্রধান শ্রী দিলীপ যাদব। এনারা প্রত্যেকেই ভদ্রকালী এ্যাথলেটিক ক্লাবের লোকসংস্কৃতি নিয়ে উদ্যোগের ভূয়সী প্রশংসা করেন এবং আগামী দিনে পাশে থাকার এবং সবরকম সহযোগিতার আশ্বাস দেন।

    শুভাশিস দে

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More