শুক্রবার, ডিসেম্বর ৬
TheWall
TheWall

মিশন মঙ্গল– মিশন শিক্ষামূলক বিনোদন

মঙ্গলগ্রহ অভিযানে আমাদের ইসরো (ইন্ডিয়ান স্পেস রিসার্চ অর্গানইজেশন)–র অভাবনীয় সাফল্য আধুনিক বিজ্ঞানের এক রূপকথাতুল্য। যেখানে আমেরিকার নাসার বাজেট ছিল ৬০০০ কোটি টাকা, সেখানে ইসরোর সম্বল বলতে ৪০০ কোটি টাকা মাত্র। মঙ্গল অভিযান সফল হওয়ার আগে আমেরিকা এবং রাশিয়া যথাক্রমে চার এবং আটবার ব্যর্থ হয়েছিল। সেখানে প্রথমবারেই সাফল্য পেয়েছে ভারত।

খুদকুঁড়ো নিয়েই প্রায় অসম্ভবকে সম্ভব করার মানসিকতা আর বিশ্বের বিজ্ঞান দরবারে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করার তাগিদের যুগলবন্দিতে সম্ভব হয়েছিল মিশন মঙ্গল। মিশন মঙ্গল–এর সমগ্র কর্মকাণ্ডের মধ্যে অন্তঃসলিলা ফল্গুর মতো বহমান যে স্পিরিট সেটাকেই বার্তা হিসেবে দর্শকের দরবারে পৌঁছে দিতে চেয়েছেন পরিচালক জগন শক্তি। কোনওভাবেই এটা মঙ্গল অভিযানের ডকুফিচার ফিল্ম নয়।

অভিযানের গল্প এখানে ফিল্মের অবয়ব রচনায় সহায়ক মাত্র। যার ওপরে সযত্নে এবং যথেষ্ট মুন্সিয়ানার সঙ্গে দেওয়া হয়েছে অভিন্ন লক্ষে পৌঁছনর জন্য এক দলবদ্ধ প্রয়াসের ফিল্মি প্রলেপ। ভারতের মহাকাশ বিজ্ঞানীরা তাঁদের প্রথম প্রয়াসেই সফল হন মঙ্গলের কক্ষপথে একটি উপগ্রহকে নানান উৎকণ্ঠার স্তর পেরিয়ে পৌঁছে দিতে। এই বাস্তব সত্যকে ‘হোম সায়েন্স’ এবং স্পেস সায়েন্স’–এর মিশেলে পরিবেশন করেছেন পরিচালক। তাঁর সাধুবাদ প্রাপ্য এজন্য যে, এটা করতে গিয়ে তিনি কোনও কিছুকে চাপিয়ে দিচ্ছেন বলে মনে হয়নি। বরং আমাদের রোজকার ঘরোয়া জীবনের নিতান্ত খুঁটিনাটি ঘটনা যে অনেক বড় আবিষ্কারের উৎস হতে পারে সেটাকে বিশ্বাসযোগ্যভাবে তুলে ধরতে পেরেছেন। সাধারণ মানুষের কাছে স্বল্পজ্ঞাত বিজ্ঞানের জটিল সমস্যাগুলোর সমাধানকে মিলিয়ে দিয়েছেন সংসারের বহুল পরিচিত সমস্যার সমাধানের সঙ্গে। যেমন তারা স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের সময় রকেটে ব্যবহৃত জ্বালানীর পরিমাণ কীভাবে কমানো যায় সেই হার্ডলের সমাধান করে সিন্ধে (সিনেমায় বিদ্যা বালান)–র রান্নাঘরে পুরি ভাজার সময় রান্নার গ্যাস কমে আসার আসন্ন মুশকিল আসান করে। এরকম বিভিন্ন ঘটনার মধ্যে রয়েছে চিত্রনাট্যকার–পরিচালকের আপন স্বাক্ষর। সৃজনশীলতার অনন্য বয়ন।

রাকেশ ধাওয়ান (অক্ষয়কুমার) এবং সহযোগী তারা সিন্ধে– দুজনেই ইসরোর গবেষক–বিজ্ঞানী। একটি রকেট লঞ্চিংয়ে তাঁদের ব্যর্থতা দিয়ে শুরু হয় সিনেমা। এই ঘটনায় তারা নিজেকে দোষী ভাবলেও রাকেশ ভাবলেশহীন। সহজাত উইট এবং টেনশনহীন থাকতে পারার ক্ষমতা রাকেশকে অন্যদের থেকে বরাবরই আলাদা করে চিহ্নিত করে। এরপর রাকেশকে মার্স মিশন–এর প্রজেক্ট হেড করা হয়। আপাতদৃষ্টিতে এই ইমপসিবল মিশনকে পসিবল করতে যা যা সম্ভাব্য প্রয়াস দরকার সেসব করা সত্ত্বেও প্রশাসনিক এবং দলের অন্যান্যদের যথার্থ কার্যকরী না হতে পারাটা লক্ষে পৌঁছনোর পথে প্রতিনিয়ত বাধার বাম্পার তোলে। কিন্তু মনের জোর, অন্যদের মোটিভেট করার নানান চেষ্টা, বড় কিছু করতে গেলে সকল নঞর্থক ভাবনাকে দূরে সরিয়ে রেখে কীভাবে ইতিবাচক ফ্যাক্টরগুলোকে নিজের এবং অন্যের মধ্যে ইনজেক্ট করতে হয় ও সর্বোপরি সফল হতে গেলে প্রয়োজন নিশ্চিত আত্মবিশ্বাস– এইসবের মিথস্ক্রয়াটি পর্দায় চমৎকার ফুটিয়ে তোলেন পরিচালক।

ভিলেনের ভূমিকায় দিলীপ তাহিল (যিনি প্রতিনিয়ত বাগড়া দেন রাকেশের কাজে)–এর উপস্থিতি ধার বাড়িয়েছে অক্ষয়কুমারের। অন্ধকার থাকলে যেমন আলোর গুরুত্ব বেড়ে যায় আর কি! অক্ষয়কুমার এবং বিদ্যা বালান–এর অভিনয় তুল্যমূল্য। দু’জনের টক্কর দেখার মতন। যা আসলে ঋদ্ধ করেছে সিনেমাটিকে। হোম সায়েন্স এবং স্পেস সায়েন্স– এই দুইয়ের সমন্বয় তৈরিতে যথার্থ ভূমিকা নিয়েছেন বিদ্যা।

১০/১২ মিনিটের ব্যবধানে তারার ঘর–গেরস্থালির দিকে ক্যামেরা তাক করা হলেও রাকেশের কোনও ব্যাক স্টোরি না থাকাটা একটু হলেও হোঁচট খাওয়ার মতন দর্শকের দিক থেকে। অন্যান্য অভিনেতা–অভিনেত্রীর মধ্যে কৃত্তিকা (তাপসী পান্নু), ‘কুণ্ডলী’ বিশ্বাসী পরমেশ্বর নাইডু (সারমান যোশী), কিরতি কুলহারি, সোনাক্ষী সিনহা–র অভিনয়ও তারিফযোগ্য। অক্ষয়কুমার এই সিনেমায় কেবল দুর্ধর্ষ অভিনয়ই করেননি সেই সঙ্গে তার অভিনয় এক অদৃশ্য সুতোয় গেঁথেছে অন্যদের অভিনয়কেও। এটিকে তাই অক্ষয়কুমার–বিদ্যার সিনেমা বললেও মোটেই অত্যুক্তি হয় না।

তাপসী পান্নু’র ড্রাইভিং স্কিল, বিদ্যার স্বামী সঞ্জয় কাপুরের নাচ দেখে অনেকটা রিলিফ পেতে পারে এখনকার স্ট্রেসফুল লাইফ। ইসরোর প্রধানের ভূমিকায় বিক্রম গোখলের অভিনয়ও অত্যন্ত যথাযথ। ‘দিল মে মার্স’ গানটি ভরপুর প্রাণশক্তিতে।

প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত টানটান এক ছবি যেখানে একক অভিনয়ের পাশাপাশি দলগত অভিনয়ও একটা বড় সম্পদ। ভরপুর শিক্ষামূলক বিনোদন। পয়সা উসুল এবং অবশ্যই আবার দেখার মতোন।

গৌতম কুমার দে

Comments are closed.