শুক্রবার, ডিসেম্বর ৬
TheWall
TheWall

হাতিদের ‘মা’ ব্রিগেট কোরনেটজকি

গৌতম কুমার দে

একজন স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাতা, পরিবেশবিদ, সঙ্গীতবেত্তা, হস্তীবিশারদ, লেখক। যাঁর তৈরি ‘হোয়্যার দ্য এলিফেন্ট স্লিপস’ দেখার পর ভারত ভ্রমণের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন আরেক সুপরিচিত বন ও বন্যপ্রাণকর্মী ইনগ্রিড নিউকিরক্। পেটা (পিপল ফর দ্য এথিক্যাল ট্রিটমেন্ট অব অ্যানিমেলস) ইন্ডিয়ার প্রতিষ্ঠাতা। ইনি ব্রিগেট আট্টার কোরনেটজকি।

ব্রিগেটের জন্ম জার্মানিতে ১৯৫৯ সালে। কর্মসূত্রে সুইৎজারল্যান্ডে রয়েছেন ১৯৯৭ সাল থেকে। তাঁর তৈরি পূর্বোক্ত ছবিটি এসআরএফটিআই–তে ভারতের পঞ্চম আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান চলচ্চিত্র উৎসবের প্রথম দিনে নন কমপিটিটিভ ফিল্ম বিভাগে দেখানো হয়েছে। পাশাপাশি পরিবেশ এবং বন্যপ্রাণী বিষয়ক চলচ্চিত্র নির্মাণের দিকটির উপরে নিয়েছেন মাস্টার ক্লাস।

যিনি অক্লেশে বলতে পারেন, হাতিদের (বিশেষত পোষ্য) উপর মানুষ যে ধরনের মানসিক ও দৈহিক নির্যাতন চালায় তাতে তিনি হাতি হলে সবকটা অত্যাচারীকে পায়ের তলায় পিষে মারতেন। এমন সংবেদনশীল বর্ণময় মানুষটির সঙ্গে কিছুক্ষণ। যাকে ঠিক সাক্ষাৎকার বলা যাবে না বরং নির্ধারিত করা যায় মুক্ত আলোচনা হিসেবে।

শুনেছি আপনি মানুষ ও হাতির মধ্যে যে সংঘর্ষ লেগে রয়েছে আমাদের দেশে তাই নিয়ে কাজ করছেন…

হ্যাঁ, ঠিকই শুনেছেন। এলিফ্যান্টস ওয়েলফেয়ার প্রকল্পে চলছে কাজটি। মূলত আসাম কেন্দ্রিক হলেও এর আওতায় রয়েছে তামিলনাড়ু, পশ্চিমবঙ্গের হাতিরাও।

এর পেছনে প্রেরণা কী?

পারসোনাল প্যাশন, পারসোনাল প্যাশন আর পারসোনাল প্যাশন।

ছবির নামের উৎস কী?

বললে বিশ্বাস করবেন না, শ্যুটিং শুরু করার আগেই একটা বিশেষ মুহূর্ত ঠিক করে দেয় আসন্ন ছবিটির নাম কী হবে। বলতে পারেন একদল হাতিই এটা করিয়ে নেয় আমাকে দিয়ে। আমি তখন শ্যুটিঙের কাজে রাজস্থানে গেছি। সময়টা বিকেলের শেষ। হাইওয়ে দিয়ে চলেছি। ঠিক সেই সময় দেখি হাতিদের সিল্যুয়েট। সঙ্গে সঙ্গে আমি আমার গাড়ির ড্রাইভারকে বলি নিঃশব্দ শিকারির মতো অনুসরণ করতে।

ছবিটি তৈরির সময় কোনও প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হয়েছেন?

এমনিতে আমাকে স্বাগত জানানো হলেও আখ খেতে বাধ্য করার জন্য মাহুতের হাতে হাতিরা যেভাবে অত্যাচারিত হয়ে থাকে এবং তার ফলস্বরূপ হাতিদের প্রতিক্রিয়ার বাস্তব দৃশ্যের ছবি আমাকে তুলতে দেওয়া হয়নি।

ব্যাপারটা কোর্ট পর্যন্ত গড়িয়েছিল। আপনিই বিষয়টা কোর্টের নজরে এনেছিলেন সেসময়। তারপর কী হল?

রাজস্থান সরকারকে কারণ দর্শাতে বলা হয়েছিল। সরকারের তরফে উত্তরও একটা দেওয়া হয়েছিল পরে। তবে এটুকুই যথেষ্ট নয়। সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে যাতে এধরনের নিরীহ প্রাণীদের উপর অন্যায় অত্যাচার বন্ধ হয় স্থায়ীভাবে। ভুলে গেলে চলবে না, এই হাতিরা মোটেই মরূভূমির বাসিন্দা নয়। সুতরাং, এ ধরনের রুখু–সুখু পরিবেশে তাদের জোর করে থাকতে বাধ্য করাটা মোটেই ভালোমানুষসুলভ কাজ হতে পারে না। এই পরিবেশে মাত্রাতিরিক্ত ভার বহন হাতিদের পক্ষে ভয়ানক কষ্টকর।

প্রসঙ্গত আমের ফোর্টে হাতিদের কার্যত বন্দিদশায় কাটাতে হয়…

শুধু কি তাই, সবসময় ওদের ঘিরে ট্যুরিস্টদের জটলা। এই ট্যুরিস্টদের নিয়ে সমস্যাটা হল এরা অশিক্ষিত। এদের ব্যবহারের মধ্যে সেটা প্রকাশ পায় প্রতিনিয়ত। এরা জানে না, এরা কী এবং কত বড় অন্যায় করছে হাতিদের প্রতি (এ পর্যন্ত বলে ক্ষমা চেয়ে নিলেন ট্যুরিস্টদের সম্পর্কে রূঢ় শব্দ প্রয়োগের জন্য। অবশ্য সেই সঙ্গে এটাও জানাতে ভুললেন না, এ ছাড়া অন্য কোনও উপযুক্ত শব্দ জানা নেই তাঁর স্বল্পজ্ঞানে)। ওদের জানা জরুরি, এই হাতিদের তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে বন্দি করে রাখা হয়েছে। যাদের থাকার কথা ছিল বনে, স্বাধীন ভাবে।

এলিফ্যান্ট ট্যুরিজম ভারতে অত্যন্ত জনপ্রিয়। এ সম্পর্কে আপনার মত?

এটা অবিলম্বে বন্ধ হওয়া দরকার।

রাজস্থানের হাতি গ্রামের কথায় ফিরে আসি। এই অসুস্থ হাতিদের নিয়ে সরকার কিছু করেছে কী?

ছ’টি হাতি গুরুতর অসুস্থ ছিল। তাদেরকে অবিলম্বে সরকারি তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা শুরু করাতে বলেছিলাম, এটা আড়াই বছরেরও আগের কথা। হাতিদের জন্য আলাদা চিকিৎসালয় গড়ে তোলার প্রস্তাবও দিয়েছিলাম। সেসব প্রস্তাব কিছু কিছু বাস্তবায়িত হলেও প্রয়োজনের তুলনায় যথেষ্ট নয়। এখনও রাজস্থানে হাতি চিকিৎসকের অভাব সেই তিমিরেই রয়ে গেছে।

হাতিদের জীবনের প্রিয় মুহূর্ত?

বাচ্চা হাতির সবটুকুই খুব প্রিয়। আর বড়দের ক্ষেত্রে স্নানের সময়টা।

ছবিটি তৈরি করতে কত দিন লেগেছে?

পাঁচ বছর। একই প্রাণীকে বিভিন্ন ঋতুতে পর্যবেক্ষণ করতে হয়। তারপর ছবির চাহিদা অনুযায়ী বিষয়সংশ্লিষ্ট লোকসংস্কৃতি, ছড়ার মিশেল দিতে হয়। এসব করতেই পাঁচটা বছর কোথা দিয়ে যে কেটে গিয়েছিল বুঝতেই পারিনি।

(প্রসঙ্গত প্রথম অবস্থায় ব্রিগেটের ফিল্মটি ছিল সাড়ে ন’ঘণ্টার। পরে সময়সীমা কমিয়ে করা হয় আড়াই ঘণ্টা। সর্বশেষ পরিণতি চল্লিশ মিনিট যে অবস্থায় এখন দেখছি আমরা)

ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন।

খালি আমি ভালো থাকব। হাতিরা?

হ্যাঁ, এই হলেন ব্রিগেট। যিনি নিজেকে মনে করেন এক পশু। যে ফিরে ফিরে যায় পশুদের কাছে। এই মানুষটাই আবার কিনা, মাস্টার ক্লাসের মাঝপথে সকলকে স্তব্ধ করে উপস্থিত সকলের মধ্যে বিলিয়ে দেন সযত্নে চয়িত নিজের বাগানের ফুলের চারা।

Comments are closed.