মঙ্গলবার, সেপ্টেম্বর ১৭

ব্রেন টিউমারে আক্রান্ত আমি, ডাক্তাররা বলেছেন ১০ বছর বাঁচবো! ‘সুপার ৩০’ রিলিজের আগেই জীবনের কঠিন সত্যি জানালেন গণিতজ্ঞ আনন্দ কুমার

দ্য ওয়াল ব্যুরো: তিনি গণিতজ্ঞ। ক্যালকুলেটরের তুলনায় অনেক স্পিডে মাথা চলে তাঁর। নিমেষে সমাধান করে ফেলেন ভীষণ কঠিন সব অঙ্ক। এতেই তাঁর মজা। অঙ্ক কষেই জীবনকে উপভোগ করেন বিহারের আনন্দ কুমার।

এ বার তাঁর জীবনের গল্পই আসছে সেলুলয়েডে। মোটা মাইনের চাকরি করতে না গিয়ে, মেধাবী গরীব ছাত্রছাত্রীদের পড়ানো শুরু করেছিলেন তিনি। লক্ষ্য একটাই। সকলেই যেন মেধার জোরে পড়ার সুযোগ পায়। আইআইটিতে চান্স পায়। জীবনে সফল হতে পারে। সমাজের তৈরি আর্থিক বৈষম্য যেন কারও পড়াশোনার অধিকার কেড়ে না নেয়। নিজের যোগ্যতায় যেন সকলে জীবনে সফল হয়, অর্থের জোরে নয়। এই ছিল আনন্দ কুমারের জীবনের মূল মন্ত্র।

গণিতের প্রতি আনন্দের ভালোবাসা, নিষ্ঠা এবং এক দায়িত্ববান শিক্ষকের গল্পই এ বার বড় পর্দায় দেখবেন সিনেমা প্রেমী দর্শকরা। সৌজন্যে হৃত্বিক রোশন। আনন্দের চরিত্রেই অভিনয় করেছেন তিনি। আগামি ১২ জুলাই মুক্তি পাবে আনন্দ কুমারের বায়োপিক ‘সুপার ৩০’। কিন্তু তাঁর ক’দিন আগেই নিজের ব্যাপারে এক কঠোর সত্যি সকলকে জানিয়েছেন আনন্দ। জানিয়েছেন, ব্রেন টিউমারে (acoustic neuroma) আক্রান্ত তিনি। 

এএনআই-কে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে আনন্দ বলেছেন, নিজের বায়োপিক রিলিজ হওয়ার ব্যাপারে খুবই তাড়ায় ছিলেন তিনি। এমনকী ছবির গল্পকারও চেয়েছিলেন যাতে আনন্দ খুব তাড়াতাড়িই সম্মতি দিয়ে দেন। আনন্দের কথায়, “জীবন-মৃত্যুর কোনও নিশ্চয়তা নেই। তাই বেঁচে থাকতে থাকতে আমার বায়োপিকটা দেখতে চেয়েছিলাম।” আনন্দ বলেন, “টাকার জন্য কারও পড়াশোনা হবে না, কেরিয়ার থেমে যাবে, এটা ভাবতেই পারি না আমি। চাই ও না এসব ভাবতে। শুধু কাজ করতে চাই ওদের জন্য। জীবনের শেষদিন পর্যন্ত। এখন সুস্থ আছি। সেই সময় আমার বায়োপিক রিলিজ হচ্ছে। আশাবাদী জীবনে যা কাজ করব, সেটা ঠিকভাবে আমার দেশের মানুষের কাছে পৌঁছে দেবেন বাকিরা।”

তবে এখন এতটা মনের জোর পেলেও একটা সময় বড্ড ভেঙে পড়েছিলেন আনন্দ। সময়টা ২০১৪ সাল। ধীরে ধীরে হারিয়ে ফেলছিলেন কানে শোনার ক্ষমতা। ডান দিকের কানে প্রায় শুনতেই পেতেন না। চিকিৎসা করিয়েছিলেন পাটনার বহু জায়গায়। শেষ পর্যন্ত অসংখ্য পরীক্ষার পর রিপোর্টে জানতে পারেন তাঁর ডান দিকের কানের ৮০-৯০ শতাংশ শোনার ক্ষমতা নষ্ট হয়ে গিয়েছে। এ সময় আনন্দের পাশে ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন তাঁর ভাই। আনন্দ বলেন, “দিল্লির রাম মনোহর লোহিয়া হাসপাতালে ভর্তি হই। সেখানে বিভিন্ন পরীক্ষার পর চিকিৎসকরা জানান কানে কোনও সমস্যা নেই আমার। বরং কান থেকে যে স্নায়ু মস্তিষ্কে গিয়েছে, সেখানে একটি টিউমার হয়েছে। দশ বছর বেঁচে থাকব আমি।” এখানেই শেষ নয়। চিকিৎসকরা জানিয়ে দেন কোনওরকম কাটাছেঁড়া করাও বিপজ্জনক। অপারেশন সফল না হলে বদলে যেতে পারে মুখের আকৃতি। এমনকী চিরতরে শ্রবণশক্তি হারাতে পারেন আনন্দ। হতে পারে আরও জটিল কোনও বিপদ। বর্তমানে মুম্বইয়ের হিন্দুজা হাসপাতালের বিখ্যাত নিউরোসার্জেন ডাক্তার বিকে মিশ্রার তত্ত্বাবধানে রয়েছেন আনন্দ কুমার।

রুঢ় বাস্তবের সঙ্গে পরিচয় হওয়ার পরেই আর দেরি করতে চাননি আনন্দ। চেয়েছিলেন সুস্থ থাকতে থাকতেই যেন তাঁর কাজের কথা লোকে জানতে পারে। দুস্থ-মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের জন্য সমাজের বাকিরাও এগিয়ে আসেন। নিজে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে ডাক পেয়েও পড়তে যেতে পারেননি। বাবার আচমকা মৃত্যুর পর পাঁপড় বেচে সংসার চালাতেন দুই ভাই। সেই পরিবারের পক্ষে বিদেশ যাওয়ার জন্য বিমান ভাড়া জোগাড় করা কেবল অসম্ভব নয়, বোধহয় খানিক বিলাসিতাও ছিল। সেই সময়েই আনন্দকে তাঁর ভাই বলেছিলেন, “তুমি শিক্ষক হতে চাও যখন, নিজের আশেপাশের বাচ্চাদেরকেই পড়ানো শুরু করো। ওদের জন্য কিছু করো। যাতে ওদের স্বপ্নগুলো ভেঙে না যায়।” ভাইয়ের সেদিনের কথাগুলোই ছিল আনন্দ কুমারের জীবনের টার্নিং পয়েন্ট। সেই জন্যই তো ডাকাতি, মাফিয়ারাজ, কয়লা সন্ত্রাস, খুনখারাপি——এই সব কিছুর বাইরেও বিশ্বের  দরবারে বিহারের এক অন্য পরিচিতি রয়েছে। বিহারকে এখন মানুষ চেনেন আনন্দ কুমারের ভিটেমাটি হিসেবে। এক লড়াকু গণিতজ্ঞের জন্মভূমি হিসেবে।

Comments are closed.