রবিবার, সেপ্টেম্বর ১৫

কেমন করে শেখাতে হবে, প্রতি দিন শেখেন তাঁরা! শুধু ছাত্র নয়, শিক্ষকও তৈরি করছে স্টেম স্কুল

তিয়াষ মুখোপাধ্যায়

নতুন চ্যাপ্টার পড়াতে হলে বই নিয়ে ক্লাসরুমে যাওয়া যাবে না! এমন নির্দেশ শুনে একটু যেন থমকে ছিলেন তিনি। এত দিনের শিক্ষকতার অভিজ্ঞতায় এমনটা শোনেননি কখনও। এমনকী শিক্ষকতার যে প্রশিক্ষণ, সেখানেও কখনও এমনটা শেখেননি তিনি। তা হলে কেমন হবে সে পড়ানো! এই সব ভাবতে ভাবতে একটু দুরুদুরু বুকেই ক্লাসরুমে ঢুকেছিলেন তিনি। সেখানেও আর এক কাণ্ড। শিক্ষিকার জন্য আলাদা কোনও ডায়াস বা চেয়ার নেই। ছাত্রছাত্রীদের বসার জায়গাও একই রকম ভাবে সার বেঁধে সাজানো নেই। সবাই নিজেদের মতো ছোট ছোট গ্রুপে ভাগ হয়ে বসেছে। একেবারেই নিস্তব্ধতা নেই। আর পড়ানোও অন্য রকম। পড়ুয়াদের মধ্যেই দিতে হবে ছোট ছোট বিষয়। পাঠ্য থেকে। তারা নিজেদের মধ্যে কথা বলতে বলতেই উঠে আসবে এক একটা আলোচনা।

এ অভিজ্ঞতা কারও একার নয়। ব্যারাকপুরের স্টেম ওয়ার্ল্ড স্কুলের সমস্ত শিক্ষিকারই কমবেশি এমনই অভিজ্ঞতা সেখানে। কিন্তু কয়েক দিন যেতে যেতেই তাঁরা আবিষ্কার করেছিলেন, শিক্ষকতার এক অন্য মাত্রা। নয়া পদ্ধতি। অভিনব পন্থা। সৌজন্যে, স্কুলের অধ্যক্ষা শাঁওলি মুখোপাধ্যায়। যিনি দীর্ঘ দিনের অভিজ্ঞতায়, গবেষণায়, দেশ-বিদেশের শিক্ষা কনফারেন্সের মাধ্যমে আহরণ করেছেন ছাত্রছাত্রীদের কাছে শিক্ষাকে পৌঁছে দেওয়ার নতুন থেকে নতুনতর পদ্ধতি। সে ভাবেই তিনি তৈরি করছেন তাঁর স্কুলের শিক্ষিকাদেরও। তাই এ কথা বলাই যায়, যে শুধু পড়ুয়ারাই নয়, স্টেম ওয়ার্ল্ড স্কুলে ভাল শিক্ষিকা হয়ে ওঠার পাঠ শিখছেন একদল নতুন ঝকঝকে তরুণীও।

যেমন শ্রীশিক্ষায়তন আর কেভি স্কুলে শিক্ষকতা করে আসা শ্রেয়সী দত্ত। বলছিলেন, এত দিনের অভিজ্ঞতায় শিখেছিলেন, ছাত্রছাত্রীদের সব কিছু ভাল করে পড়িয়ে, শিখিয়ে, তৈরি করাই তাঁর কাজ। প্রথাগত পদ্ধতিতে শুরু করেছিলেন পড়ানো। কিন্তু কয়েক বছর পরে স্টেমে পড়াতে এসে দেখলেন, শুধু শেখানোই নয়, বাচ্চাদের থেকে প্রতি মুহূর্তে শেখাও এক জন শিক্ষিকার জন্য খুব জরুরি।

আরও পড়ুন: শিক্ষার মান, নিরাপত্তা আর যত্নে স্বাতন্ত্র্যের ছাপ রাখে ব্যারাকপুরের স্টেম ওয়ার্ল্ড স্কুল

 

বিউটি দে-ও বললেন একই কথা। “আমরা অনেক কিছু শিখছি রোজ। প্রিপ্রাইমারির একেবারে খুদে ছেলেমেয়েদেরও চুপ করে বসিয়ে না রেখে যদি কথা বলতে দেওয়া হয়, প্রশ্ন করতে দেওয়া হয়, তা হলে সেখান থেকেও উঠে আসে শেখার মতো অনেক কিছু। এটা এখানে না এলে জানা হতো না। জানা হতো না, পড়াশোনার একটি উপকরণ বই হলেও, একমাত্র বই দিয়েই পড়াশোনা হয় না।”

সোনালিকা সরকার আবার বলছিলেন স্লো-লার্নার বা হাইপার অ্যাকটিভ খুদে ছেলেমেয়েদের কথা। “আমাদের বিএড-এ শেখানো হয়েছিল, কোনও পড়ুয়া যদি পিছিয়ে থাকে অন্যদের তুলনায়, তাকে আলাদা করে গুরুত্ব দিতে। কিন্তু কার্যক্ষেত্রে প্রায়ই এমন হয় না। যে পিছিয়ে যায়, সে পিছিয়েই যায়। স্টেমে এসে শিখলাম, এরকম কোনও বাচ্চা থাকলে তাকে নিয়ে রীতিমতো আলোচনায় বসেন শিক্ষিকারা। তাঁর শিক্ষার পথ কী করে আরও একটু সুগম করা যায়, তা নিয়ে নতুন করে ভাবা হয়।”

সীমা ঠাকুর, দেবশ্রী ধররা বলছিলেন, তাঁরা এই স্কুলে এসে শিখেছেন, আদতেই কী ভাবে ভাল মানুষ করে তোলা যায় বাচ্চাদের। শুধু পড়াশোনা করে ভাল ছাত্র নয়, প্রত্যেকে কী করে সুনাগরিক হয়ে উঠতে পারে, সেই দায়িত্বও নিতে হবে শিক্ষিকাদের। সীমা বলছিলেন, প্রতিটা বাচ্চার কাছে ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ ভাবে উপস্থাপনা করা হয় প্রকৃতিকে। শেখানো হয়, প্রকৃতি ভাল থাকলে ভাল থাকবে তুমিও। শেখানো হয়, কী ভাবে বর্জ্য পদার্থ ফের রিসাইকেল করলে দূষণ কম করা যায় প্রকৃতির।

দেবশ্রী বললেন, “শুধু প্রকৃতি নয়, পাশাপাশি মানুষ। প্রতিটি মানুষকে আলাদা করে সম্মান করার পাঠ দেওয়া হয় হাতে ধরে। গ্রুপ ডি স্টাফ থেকে শুরু করে গেটকিপার পর্যন্ত, প্রতিটি অশিক্ষক কর্মচারীর যে ধন্যবাদ প্রাপ্য, সেটা স্কুলেই শেখে বাচ্চারা। যে কোনও সময় তাঁদের মুখোমুখি হলে গুড মর্নিং বা আফটারনুন উইশ করে। বছরের নির্দিষ্ট দিনে কার্ড দিয়ে থ্যাঙ্কসগিভিং পালন করে বাচ্চারা। এই যে মানুষ হওয়ার পাঠ বাচ্চাদের জীবনে পড়াশোনার পাশাপাশি সমান জরুরি, তা এই স্কুলে না এলে শেখা হতো না আমাদেরও।”

শিক্ষিকা ম্যানিলা মজুমদার তাঁর অভিজ্ঞতা থেকে বলছিলেন, “এই স্কুলের যেটা সব চেয়ে মজা, এখানে ‘ব্যাকবেঞ্চার’ বলে কেউ নেই। কারণ এখানে সামনে থেকে বেছনে বেঞ্চ সাজানোই হয় না। সকলে ছোট ছোট গ্রুপে আলোচনা করার সুযোগ পায়। যে ছাত্র বা ছাত্রী কমজোরি, আমরা অবজার্ভ করি তাকে আলাদা করে। তার পরে তাকে এমন কোনও গ্রুপে যোগ দেওয়ানো হয়, যেখানে তার পিছিয়ে পড়াটা সমস্যা হয় না। মিলেমিশে সবার সবটা শেখা হয়।”

শিক্ষিকা আহেন্দ্রিলা ঘোষাল জানালেন, তাঁরা স্কুলে পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি মোরাল ভ্যালুর উপর কোনও না কোনও গল্প পড়ান রোজ। সেই গল্পগুলি থেকেই প্রতি মাসে একটা নির্দিষ্ট চিন্তা বা থটের জন্ম হয় বাচ্চাদের মধ্যে। তারা নিজেদের মতো ভাবে, সেই ভাবনার উপরে ছবি আঁকে, মডেল বানায়।

এই প্রসঙ্গে শিক্ষিকা সিমি চাকলাদার শেয়ার করলেন তাঁর একটি অভিজ্ঞতা। জীবনের সেরা মানুষকে নিয়ে কোনও ছবি আঁকার কথা বলা হয়েছিল বাচ্চাদের। সেই প্রোজেক্টে একটি বাচ্চা, যে লেখায় বা পড়ায় ততটাও তুখোড় নয়, সে ছোট্ট একটি পাতায় এমন একটি ছবি ফুটিয়ে তুলেছিল, তা দেখে অবাক হয়েছিলেন তিনি এবং অন্য শিক্ষিকারাও। সে এঁকেছিল, বাড়িতে চোর এসেছে, এবং তার বাবা সেই চোরকে ধরে শায়েস্তা করছে। এই কাজটা করার জন্য বাবা তার চোখে হিরো, সেরা মানুষ।

আরও পড়ুন: পড়াশোনার ইঁদুরদৌড় শুধু নয়, খোলা মাঠের ঘোড়দৌড়েও মেতে উঠছে স্টেম স্কুলের খুদেরা

শিক্ষিকা জয়িতা ঘোষাল একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বললেন, যা তিনি এই স্কুলেই শিখেছেন। জয়িতা জানালেন, এখন বেশির ভাগ বাচ্চাই খুব ছোটবেলা থেকেই মোবাইল ব্যবহারে পারদর্শী। পারদর্শী ইন্টারনেটের নানা রকম প্রয়োগেও। বেশির ভাগ বাবা-মায়েরই অভিযোগ, বাচ্চা মোবাইলে গেম খেলছে বা ভিডিও দেখছে। বাচ্চাদের এই মোবাইল-প্রীতিকেই কাজে লাগানোর কথা ভেবেছেন তাঁরা। এমন কিছু প্রোজেক্ট দেওয়া হচ্ছে, যার জন্য তাঁদের ইন্টারনেটের সাহায্য নিতে হচ্ছে। তাই মোবাইলের নেশা ভাল কাজে লাগছে বাচ্চাদের।

রুমকী দাস বলছিলেন, “পড়াশোনার বই থাকলেও মানুষ হওযার বা সামাজিক দায়িত্ব পালন করতে শেখার বই হয় না। তাই সে বিষয়ে বিভিন্ন নাটক করানো হয় বাচ্চাদের দিয়ে। পড়ুয়াদের মধ্যে চারটি আলাদা রঙের গ্রুপ রয়েছে, তারা নিজেদের মধ্যে কমপিটিশন করে, কে কত ভাল ভাবে মোরাল ভ্যালু বিষয়ক নাটক উপস্থাপিত করতে পারে। সেই সঙ্গে শেখানো হয় সকলের মাঝে কথা বলা। কাটানো হয় জড়তা।”

পড়ানোর পদ্ধতিটা যে ঠিক কতটা আলাদা, তা ভাল করে বুঝিয়ে বলছিলেন শিক্ষিকা সুনন্দা বন্দ্যোপাধ্যায়। জানালেন, বোর্ডে লেখা হল, সেটা বাচ্চারা টুকল, মুখস্থ করল, পরীক্ষার খাতায় লিখল– এমনটা আর বাচ্চাদের জন্য কার্যকরী নয়। তিনি ইংরেজি পড়ান। বলছিলেন, “ধরুন মার্চেন্ট অব ভেনিস পড়াচ্ছি। ক্লাসেরই কোনও একটা ছেলে এক সপ্তাহের জন্য অ্যান্টোনিওর চরিত্রটি হয়ে গেল। তাকে সবাই অ্যান্টোনিও বলেই ডাকবে একটা সপ্তাহ ধরে। একই ভাবে একটি মেয়ে হল পর্শিয়া। ক্লাসে পড়ানোর সময়ে এক একটা চ্যাপ্টারে ওরা ওদের ভূমিকার সংলাপগুলো বলল। এক ধাক্কায় গোটা চ্যাপ্টারটা কয়েক গুণ বেশি ইন্টারেস্টিং হয়ে ওঠে গোটা ক্লাসের কাছে। এভাবেও যে পড়ানো যায়, তা এখানে না এলে শেখা হতো না আমাদের।”

ব্যারাকপুরের এই স্টেম ওয়ার্ল্ড স্কুলে আপাতত নবম শ্রেণি অবধি রয়েছে। মধ্যবিত্তের নাগালে এই স্কুলটি আইসিএসই কারিকুলাম ফলো করে। সিলেবাসও সেই অনুযায়ীই ঠিক করা আছে। কিন্তু তফাত রাখা হয়েছে, শেখানোর পদ্ধতিতে, পড়ানোর প্রক্রিয়ায়। বই নির্ভর চ্যাপ্টার পড়ে, তা মুখস্থ করে, পরীক্ষার খাতায় লিখে আসায় বিশ্বাস করে না স্টেম। এমনটাই জানালেন সেই স্কুলের প্রিন্সিপ্যাল, ডক্টর শাঁওলি মুখোপাধ্যায়। শুধু এক জন শিক্ষিকা নয়, তাঁকে আক্ষরিক অর্থেই এক জন শিক্ষাকর্মী বলা যেতে পারে। যিনি প্রায় ২০ বছর ধরে লাগাতার পরিশ্রম ও গবেষণা করে চলেছেন, ছোটদের পড়ানো ও শেখানোর পদ্ধতি কী করে আরও বেশি গ্রহণযোগ্য করা যেতে পারে। পড়াশোনার নামে আকণ্ঠ চাপে ডুবে থাকা শিশুদের কী করে মুক্তি দেওয়া যেতে পারে। কী করে আরও বেশি আনন্দের ও গ্রহণযোগ্য হতে পারে শিক্ষা।

শিক্ষিকা সুস্মিতা চক্রবর্তী জানালেন, এই স্কুলে এসে দেখা একটি অভিনব বিষয়ের কথা। প্রতিটা ক্লাসরুমেই রয়েছে ছোট্ট এক টুকরো লাইব্রেরি। কোনও বাচ্চার যদি লেখা বা পড়া তাড়াতাড়ি হয়ে যায়, তখনও হয়তো অন্য বাচ্চারা কাজ করছে, সে ক্ষেত্রে তাড়াতাড়াি কাজ শেষ করা বাচ্চাটি ক্লাসেরই কোণায় বসে লাইব্রেরি থেকে বই পড়ে। ফলে তার জন্য কোনও অসুবিধা হয় না ক্লাসে। নিজেদের জন্মদিনে বাচ্চারাই নিজেদের ক্লাসের জন্য বইগুলি ডোনেট করে।

বাংলার শিক্ষিকা সুস্মিতা সেনগুপ্ত জানালেন, ইংরেজি প্রথম ভাষা হওয়ার কারণে, বাংলার প্রতি অনেকেরই একটু অনীহা থেকে যায়। এটা নিয়ে হা-হুতাশ না করে, বরং পড়ানোর ধরনটি সময়ের সঙ্গে বদলানো যে জরুরি, তা তিনি এই স্কুলে এসেই শিখেছেন। তাই বাচ্চাদের গতানুগতিক পদ্ধতিতে বাংলা না পড়িয়ে, নানা রকম নতুন নতুন বিষয় নিয়ে তাদের সঙ্গে আলোচনা করে, সমসাময়িক ঘটনাবলি নিয়ে বাচ্চাদের মধ্যে তর্ক-বিতর্ক তৈরি করে, বাংলা ভাষার গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানোর চেষ্টা করছেন তিনি। বাচ্চাদের কাছে ভাষাটি বা যে কোনও বিষয় গ্রহণযোগ্য হলে, তা আপনাআপনিই ভাল শিখবে তারা।

শিক্ষিকাদের সঙ্গে কথা বলে মনে হচ্ছিল, স্টেম ওয়ার্ল্ড স্কুলে যেন তাঁরা নিজেরা একটা টিম ওয়ার্ক করছেন। সেই টিম শুধু পড়ায় না, প্রিন্সিপ্যালের নেতৃত্বে রোজ পড়ানোর ও শেখানোর নতুন নতুন উপায় খুঁজে বার করেন। ইনোভেশন তৈরি করেন। এবং এ জন্য তাঁরা প্রত্যেকে স্কুল আওয়ারের পরেও অতিরিক্ত সময় দেন এই কাজে।

প্রিন্সিপ্যাল শাঁওলি মুখোপাধ্যায়।

শিক্ষিকারা এখানে ক্লাসে ঢোকেন, নতুন কিছু শব্দ মাথায় নিয়ে, হাতে বই নিয়ে নয়। “কোনও নতুন চ্যাপটার পড়ানোর হলে, সেই চ্যাপটারের বিশেষ কয়েকটা কী-ওয়ার্ড খুঁজে নিয়ে, সেই শব্দগুলো পড়ুয়াদের মধ্যে ফেলা হয়। তাই নিয়ে কথা হয়, আলোচনা চলে, প্রয়োজনে বিতর্কও। আর এই বিনিময়ের মধ্যে দিয়েই শেখা হয় গোটা চ্যাপটার। বইযে যতটা লেখা আছে, তার বাইরেও শেখা হয়ে যায় অনেক কিছু। অনেক সময়ে ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে থেকে এমন প্রশ্নও উঠে আসে, যা ভাবিয়ে তোলে শিক্ষিকাদেরও! সেই কৌতূহল নিরসন করতে গিয়ে হয়তো আরও একটু বেশি শেখা হয়ে যায় সকলেরই।”– বলছিলেন প্রিন্সিপ্যাল শাঁওলিদেবী। জানালেন, অনেক সময়ে এমনও হয়, কোনও কবিতা পড়ানোর পরে শিক্ষিকা বাচ্চাদের বলেন, এই কবিতার উপরে একটা ছবি আঁকতে! পড়াশোনা করতে করতেই বাচ্চাদের কল্পনাপ্রবণ মনকে এভাবেই কাজে লাগানো হয় এখানে।

শিক্ষিকা এষা ধর জানালেন, এই স্কুলের কোনও শিক্ষিকা লাল কালি ব্যবহার করেন না। লাল কালি দিয়ে দাগিয়ে ভুল বার করার পদ্ধতিই নেই স্টেমে। আছে শুধু শেখানো। নতুন ভাবে। পড়াশোনার ফাঁকেই বাচ্চারা শেখে পথ নিরাপত্তার পাঠ। শেখে দূষণের বিরুদ্ধে লড়াই। তারা পৌঁছে যায় বৃদ্ধাশ্রমে, কখনও হয়তো কোনও অচেনা ঠাম্মাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদে। তারা গাছ লাগায়, নিজে হাতে পরিষ্কার করে স্কুল চত্বর।

ছোটবেলা থেকেই প্রতিটি শিশুর সৃজনশীল মনের যেন পূর্ণ বিকাশ ঘটে, সে দিকে বিশেষ নজর রয়েছে স্কুল কর্তৃপক্ষের। নিচু ক্লাসের ক্লাসরুমগুলিতে ঢুকলেই অবশ্য তা বোঝা যায়। দেওয়াল জুড়ে এঁকেছে খুদেরা, রং করেছে ইচ্ছেমতো। সারা ঘরে সাজিয়ে রেখেছে কচি হাতের নানা রকম কাজ। স্কুল কর্তৃপক্ষ মনে করেন, স্কুলের কাজ শুধু পড়াশোনা শেখানো নয়, এক জন খুদেকে ভাল মানুষ হওয়ার পথে এগিয়ে দেওয়াও। আর এই ভাল মানুষ হওয়ার জন্য সৃজনশীলতা অত্যন্ত জরুরি।

সেই সঙ্গে জরুরি, খেলাধুলোও। তাই পড়াশোনার পাশাপাশিই নিয়ম করে ক্যারম, টিটি, দাবা খেলে একটু উঁচু ক্লাসের পড়ুয়ারা। এ তো গেল ইনডোর গেমস। আউটডোরে রয়েছে ফুটবল, বাস্কেটবল, হর্স রাইডিং। এবং এই খেলাগুলো রীতিমতো রুটিনবদ্ধ ভাবেই রয়েছে স্কুলটাইমে। ফলে নিয়ম মেনে পড়ার মতোই নিয়ম মেনে খেলাধুলোও করে এই স্কুলের পড়ুয়ারা। স্কুলের বাইরে আলাদা করে খেলার বা এক্সট্রা কারিকুলারের সময় না মিললেও তার অভাব থাকে না সে ভাবে।

স্কুলের পিটি এবং যোব্যায়ামের শিক্ষক প্রদ্যুৎবরণ দাস জানালেন, প্রতিটা বাচ্চা যাতে শরীরের ভেতর থেকে শক্তিশালী হয়ে ওঠে, সে জন্য তিনি সব সময় চেষ্টা করেন। সপ্তাহের দু’টি গেম ক্লাসের প্রতিটিতে তিনি নিজে নতুন নতুন খেলা নিয়ে আসেন বাচ্চাদের মধ্যে, যার মাধ্যমে শারীরিক কসরতের সঙ্গে সঙ্গে মানসিক স্থিতিও বাড়ে তাদের। খেলাচ্ছলে ডিসিপ্লিন শেখে তারা।

এককালীন ২৭ হাজার টাকা দিয়ে ভর্তি হওয়ার পরে প্রতি তিন মাসে লাগে পাঁচ হাজার টাকা করে। এ ছাড়া প্রতি মাসের টিউশন ফিজ় ২০০০ টাকা করে। এর বাইরে আছে স্কুলবাসের ফিজ়, যা দূরত্ব অনুযায়ী নির্ধারিত। সব মিলিয়ে মাসে হাজার চার-পাঁচ টাকায় পড়াশোনা করা যাবে এই বিশ্বমানের স্কুলে।

আরও পড়ুন…

মানুষ হওয়ার আনন্দপাঠ! শিশুর হাতে পেনসিলের বদলে চারাগাছ, ক্লাসরুমে বইয়ের বদলে তর্ক!

Comments are closed.