শুক্রবার, ডিসেম্বর ৬
TheWall
TheWall

দেওয়াল ভাঙুক, বিশ্বাস নয়

বিশ্বের অনেক ঐতিহাসিক ও যুগান্তকারী ঘটনাই দ্রুত গতিতে ঘটেছে। বার্লিন ওয়ালের পতনও তেমনই একটি ঘটনা। বার্লিন প্রাচীরের পতন বিশ্বের রাজনৈতিক, কূটনৈতিক ও মানবিক মানচিত্রে এক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ভিত্তি স্থাপন করেছিল। এর পরেই সোভিয়েত নেতৃত্বাধীন কমিউনিস্ট জমানার পতন ও ঠান্ডা যুদ্ধের পরিসমাপ্তি হয়।

১৯৮৯ সালের ৯ নভেম্বর লক্ষাধিক মানুষের স্বতস্ফূর্ত আবেগ, ক্ষোভ, ক্রোধের কাছে দাঁড়াতে পারেনি কোনও শক্তি। সেই আবেগের, সেই স্বাধীনতার ত্রিশ বছর পূর্ণ হলো। জার্মান চ্যান্সেলার এঞ্জেলা মের্কেল সেই উপলক্ষ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন। মের্কেল বলেছেন, কোনও প্রাচীরই এত উঁচু নয় যা মানুষের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করবে আর স্বাধীনতাকে খর্ব করতে পারবে। সেই প্রাচীর কখনওই এত উঁচু নয়, যাকে ভেঙে ফেলা সম্ভব হবে না। গণতন্ত্রকে যেন কেউ পাওনা বলে ধরে না নেয়।

মের্কেল মনে করিয়ে দিয়েছেন ইউরোপ যে মূল্যবোধের উপর গড়ে উঠেছে তা হলো স্বাধীনতা, গণতন্ত্র, সাম্য, আইনের শাসন ও মানবাধিকার। এগুলোর কোনওটা ভুলে গেলে বা কোনওটা বিপন্ন হলে ফের বিপন্ন হবে মানবজাতি।

১৯৪৯ সালে জার্মানি দুই ভাগে ভাগ হয়ে যাওয়ার বছর তিনেক পরে ১৯৫২ সালে পূর্ব জার্মানি ও পশ্চিম জার্মানির সঙ্গে সীমান্তটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। তবে পূর্ব ও পশ্চিম বার্লিনের মধ্যের সীমান্তটি খোলা ছিল। নিরাপত্তার অভাব ও স্বাচ্ছন্দ্যের অভাব থেকে বাঁচতে শ’য়ে শ’য়ে বাসিন্দা নানা ভাবে পশ্চিম জার্মানিতে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতে থাকেন। এরপর ১৯৬১ সালের ১৩ অগস্ট কার্যত রাতারাতি বার্লিনের পূর্ব ও পশ্চিম দিকের মধ্যে প্রাচীর গড়ে তোলে কমিউনিস্ট জার্মানি। রাতারাতি একটা কুৎসিত, ধূসর প্রাচীর খাড়া করে দেওয়া হয় বার্লিন শহরের মাঝ বরাবর।

অনেক পরে ১৯৮৭ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রেগান বার্লিন সফরে যান এবং তিনি সোভিয়েত রাশিয়ার নেতা মিখাইল গর্বাচেভকে বার্লিন প্রাচীর ভেঙে ফেলার জন্য অনুরোধ জানান। এর বছর দুই পরে, ১৯৮৯ সালের ৪ নভেম্বর পূর্ব জার্মানির হাজার হাজার মানুষ এক বিক্ষোভ সমাবেশে আলেকজান্ডারপ্লাটজ়ে জমায়েত হন। প্রবল চাপে পড়ে তার দু-একদিনের মধ্যেই পূর্ব জার্মানির সরকার ইস্তফা দেয়।

এর পর ৯ নভেম্বর আসে সেই ঐতিহাসিক দিন। পূর্ব জার্মানির হাজারে হাজারে মানুষ বার্লিন সীমান্তে জড়ো হয়ে সীমান্ত খুলে দিতে বলেন। তাঁরা প্রাচীরের উপর চড়ে, হাতুড়ি, কুড়ুল, লাঠিসোটা দিয়ে ঘা মারতে থাকেন দেওয়ালে। ভেঙে পড়তে থাকে ঠান্ডা ও কঠিন সেই দেওয়াল। সীমান্তের প্রহরায় যাঁরা ছিলেন, তাঁরা নিজেরাই সরে যান। ভেঙে যায় বঞ্চনা আর বিভেদের প্রাচীর। অতঃপর বছর খানেকের মধ্যে ১৯৯০ সালের ৩ অক্টোবর পূর্ব ও পশ্চিম জার্মানি আবার এক হয়ে যায়।
মানুষের যে কোনও রকম পুঞ্জীভূত ক্ষোভ ও বাঁধ ভেঙে যাওয়া ক্রোধের পিছনে সর্বদাই কাজ করে তার স্বাধীনতা ও নিরাপত্তার অভাব এবং অর্থসঙ্কট। বার্লিন প্রাচীর ও তার পরে কমিউনিস্ট ব্লকের পতনের পিছনেও সেটিই ছিল মূল কারণ। আশির দশকে সোভিয়েত রাশিয়ায় প্রবল অর্থসঙ্কট শুরু হয়। ১৯৮৫ সালে গর্বাচেভ পেরেস্ত্রোইকা ও গ্লাসনস্ত নামে দুই কিসিমের সংস্কারের হাওয়া তুললেও তা সে ভাবে ফলপ্রসূ হয়নি। এরপর ১৯৮৬ সালে ইউক্রেনের চের্নোবিলে পারমাণবিক চুল্লিতে ভয়ঙ্কর বিস্ফোরণের পর কমিউনিস্ট ব্লক কার্যত ধসে যায়। তার পরে সাধারণ মানুষের আবেগ ও ক্ষোভের উদ্গীরণকে ঠেকিয়ে রাখতে পারেনি কোনও লৌহ প্রশাসন বা ইজ়ম।

বার্লিন দেওয়াল ভেঙে ফেলার ত্রিশ বছর পরে আবার দেখা যাচ্ছে ইউরোপের অতি দক্ষিণপন্থীরা মাথা চাড়া দিচ্ছে। ইউরোপীয় পার্লামেন্টে আইডেন্টিটি অ্যান্ড ডেমোক্র্যাসি নামে একটি গ্রুপ তৈরি করেছেন ৭৩ জন অতি দক্ষিণপন্থী সদস্য। অতি দক্ষিণপন্থীদের এই সব বিভিন্ন পার্টি ইতালি, ফ্রান্স, বেলজিয়াম, জার্মানি, অস্ট্রিয়া, ডেনমার্ক ইত্যাদি দেশে সক্রিয়। চরমপন্থীরা সব দেশের পক্ষেই বিপজ্জনক। বিশেষ করে ইন্টারনেট ও প্রযুক্তিনির্ভর এই বিশ্বে।

ইতিহাসে একটা জিনিস বার বার দেখা গেছে, ধর্ম, জাতপাত, কট্টর আদর্শবাদ -এ সব থেকেই সংঘাত হয়। মানুষই তৈরি করে বিভেদ ও ঘৃণার প্রাচীর। আর সেই মানুষই কখনও প্রাচীর ভেঙে ফেলে স্বাধীনতা ও অধিকার ছিনিয়ে নেয়। গণতন্ত্রে কিন্তু কোনও চরমপন্থারই জায়গা নেই। তাই মের্কেলের কথাটিই আবার মনে করতে হয়, গণতন্ত্রকে প্রাপ্য বলে যেন কেউ ধরে না নেয়।

Comments are closed.