বৃহস্পতিবার, মার্চ ২১

জলে-ফলে ত্বক রাখুন নিখুঁত, ধরে রাখুন বয়স

ত্বকের যত্ন নিতে আমরা কত কী না করি, তবু কত নাছোড় দাগ থেকেই যায়। কিন্তু প্রথম থেকে একটু যত্ন নিলে বোধহয় এই সমস্যাগুলো থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। ত্বকের রুক্ষতা, শুষ্কতা, সাদা-কালো দাগ মেচেতা ব্রণ ফুসকুড়ি সমস্যার লিস্ট কিন্তু কম বড় নয়। দ্য ওয়াল সে সব সমস্যা নিয়েই কথা বলেছে ত্বক বিশেষজ্ঞ ডঃ সঞ্জয় ঘোষের সঙ্গে। ত্বকের বিভিন্ন সমস্যার সমাধানে কী বলছেন তিনি জানুন।

দ্য ওয়াল: ত্বকের যত্ন কী ভাবে নেওয়া যায়? শিশু অবস্থা থেকেই কী এই যত্ন নেওয়া শুরু করতে হবে?
ডঃ সঞ্জয় ঘোষ: ছোটবেলায় বেবি সানস্ক্রিন লোশন ব্যবহার করলে ভালো হয়। আজকাল আর তেল মাখিয়ে রোদে ফেলে রাখার প্রয়োজন নেই। ভিটামিন ডি -এর জন্য এমনি হাঁটাচলাতেই গায়ে যে রোদ্দুর লাগে তাতেই হয়ে যায়। বরং রোদে ফেলে রাখলে গা পুড়ে যায়। আসলে আল্ট্রা ভায়োলেট রে থেকে যে কোনও রকমের স্কিনের সমস্যা হতে পারে তাই ছোট থেকেই সানস্ক্রিন লোশন লাগানো উচিত।

দ্য ওয়াল: ত্বকে সাদা দাগ হলেই কী শ্বেতী? কী কী কারণে হতে পারে এ জাতীয় দাগ? যাতে না হয় তার জন্য কী করা উচিত? 
ডঃ সঞ্জয় ঘোষ: দুধ সাদা দাগ হলে শ্বেতী, তাছাড়া নয়। সাধারণত কসমেটিক্স থেকে হয় শ্বেতী। হেয়ার ডাই থেকে বা কেমিক্যাল থেকে, পারফিউম, কাজল, লিপস্টিক, লিপলাইনার, ওয়েট টিস্যু, বিন্দির আঠা, মাউথ পেস্ট, প্লাস্টিকের চটি যে কোনও কিছুই শ্বেতীর কারণ হতে পারে। একে ডাক্তারি পরিভাষায় বলা হয় কেমিক্যাল লিউকোডার্মা। আমাদের মেলানোসাইট অর্থাৎ বর্ণ তৈরীর যে কোষ তা নষ্ট হয়ে যায় কসমেটিক্সে। এছাড়া শিশুদের ক্ষেত্রে দুপুরের রোদে ইউ ভি রে খুব খারাপ প্রভাব ফেলে। এসবই শ্বেতীর কারণ হতে পারে। তাই প্রথমেই রোদে বেরোলে ছাতা সানস্ক্রিন ব্যবহার শুরু করুন আর বাজে কোয়ালিটির কসমেটিক্স ব্যবহার বন্ধ করুন। আগেকার দিনে শ্বেতী সারানো যায় না বলে যে মিথ ছিল, তা এখন আর নেই।এখন চিকিৎসায় প্রায় সবটাই সারানো সম্ভব।
এ ছাড়া ফর্সা বা চাপা গায়ের রঙেও মুখে কিছু সাদা সাদা দাগ দেখা যায়, যেগুলো বছরের নির্দিষ্ট সময়ে থাকে পরে চলে যায়। মূলত শীতকালে এর প্রভাব কমে যায়। কারণ এগুলো প্রচণ্ড গরমে ব্যাকটেরিয়া থেকে হয়। তেলতেলে চামড়ায় ঘাম ধুলো লেগে। মোবাইল ফোন, এলইডি আলো, ল্যাপটপের আলো ইত্যাদি থেকে যে রে বেরিয়ে আসে, সেগুলোও ত্বকের উপর প্রভাব ফেলে। তাই এ জাতীয় দাগ দেখলে ডাক্তারের পরামর্শ নিন। আর অবশ্যই রাস্তায় হোক বা বাড়িতে কম্পিউটরের সামনে কাজ, ইউভি থেকে প্রোটেক্ট করার ক্রিম লাগিয়ে রাখুন মুখে।

দ্য ওয়াল: ব্রণর সমস্যার কারণ কী কী? সমাধানের পথ কোথায়?
ডঃ সঞ্জয় ঘোষ: অয়েলি স্কিন বা তেলতেলে চামড়া হলে বলিরেখা পড়ার সম্ভাবনা কম। কিন্তু ব্রণর সমস্যায় নাজেহাল বতে পারেন আপনি। সঙ্গে যদি চকোলেট, বিভিন্ন ফ্যাটযুক্ত খাবার, মিষ্টি প্রিয় হয় তা হলে ব্রণ আপনার পিছু ছাড়বে না। বয়ঃসন্ধিকালে হরমোনের প্রভাবে ব্রণ হলেও আজকাল ২৫, ৩০ বা ৪০-এ অনেকের হচ্ছে ব্রণ। যাকে ডাক্তারি পরিভাষায় বলা হচ্ছে অ্যাডাল্ট অ্যাকনে। এরও মূল কারণ কসমেটিক্স। যা মুখের স্কিনের পোরস্ গুলোকে ব্লক করে দেয়। তাতে অয়েলি স্কিনে অয়েল জমে গিয়ে হয় সমস্যা। কোনও ব্রণই খুঁটে ফেললে চলবে না। আর স্টেরয়েড জাতীয় ওষুধ মোটেও খাবেন না ব্রণ সামলাতে। তাতে হিতে বিপরীত হতে পারে। শুরু থেকে চিকিৎসা করান ব্রণর। নইলে রস গড়াতে পারে আপনার ব্রণ থেকেও। পরবর্তীকালে সেখানে গর্ত গর্ত দাগও হতে পারে, তখন দেখতে খারাপ লাগবে।

দ্য ওয়াল: মেচেতা কাকে বলে? কেন হয়? প্রতিকারের উপায় কী?
ডঃ সঞ্জয় ঘোষ: গালের দুপাশে চামড়ায় কালো দাগ হলে তাকে মেচেতা বলে। আল্ট্রা ভায়োলেট রে, মাইক্রোওয়েভে রান্না বা অন্য কোনও কুকিং ইকুইপমেন্ট থেকে এই সমস্যা আসে। ২৫ বা ৩০ এর পরে এই সমস্যা দেখা যায়। অনেক সময়ে প্রেগনেন্সির পরেও এই সমস্যা হয় মহিলাদের। শুরুতেই ডাক্তারের কাছে গেলে সমস্যা সহজে সারানো যায়।

দ্য ওয়াল: ত্বকের সিস্ট কী?  সেটার প্রতিকার কী
ডঃ সঞ্জয় ঘোষ
: মিলিয়া নামের সিস্ট ছোট ছোট ব্রণর মতো হয়, এছাড়া আকারে একটু বড় সিস্টও হয়। কিছু সিস্ট আসলে ব্যাকটেরিয়াল ইনফেকশন। শুরুতে এলে ওষুধে সারিয়ে দেওয়া যায়, তবে অনেকদিন হয়ে গেলে একটি পদ্ধতির মাধ্যমে তুলে ফেলা হয় সেগুলো। এগুলো ছোঁয়াচে, তাই কখনোই নিজের জিনিস ছাড়া ব্যবহার করবেন না। অন্তত মেক আপ কিট তো নয়ই। আর এগুলো নিজে থেকে হয় না। কারো না কারো থেকে আসে। পার্লারে যাওয়া বা মাসাজ নেওয়া বা সকলের মেক আপ কিট ব্যবহার, এগুলো বন্ধ রাখুন সিস্ট হলে।

দ্য ওয়াল: মোল বা তিল আর আঁচিলের সমস্যা কী ভাবে প্রতিকার করা যায়?

ডঃ সঞ্জয় ঘোষ: তিল জন্মগত ব্যাপার, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেকের তিলের সাইজ বাড়তে থাকে। এটা ক্ষতিকর নয় কোনোভাবেই। তবে তিল থেকে রক্ত পড়লে বা ব্যথা হলে সেটা ক্যানসার অবধি যেতে পারে। সেদিকে খেয়াল রেখে ডাক্তারের পরামর্শ নিন। এই তিল থেকে ক্যানসার অবধি যাওয়াকে সাধারণত মেলানোমা বলে। যা এদেশে তেমন না হলেও বিদেশে খুব হয়। কারণ তাদের দেহের মেলানিন আমাদের চেয়ে কম থাকে।
আর আঁচিল অবশ্যই ভাবনার বিষয়। এটা ছোঁয়াচেও। তাই হয়ও মেক আপ কিট বা পার্লার থেকে। অনেক সময়ে আঁচিল রেডিও সার্জারির মাধ্যমে উড়িয়ে দেওয়া যায় নয়তো ইলেকট্রো কাটরি করে পরিষ্কার করে ফেলা সম্ভব।

ডাক্তার ঘোষ কী বললেন সার্বিকভাবে ত্বক ভালো রাখতে, পরামর্শ শুনুন আর পেয়ে যান ঝকঝকে ত্বক।

দ্য ওয়াল: ড্রাই এক্সিমা কী? কী করতে হবে এই সমস্যা হলে?
ডঃ সঞ্জয় ঘোষ
: আসলে আমাদের চামড়ার অনেকগুলো স্তর। সেগুলো ভিতরে ভিতরে ইরিটেটেড থাকার অবস্থাকেই এক্সিমা বলা হয়। এক্সিমা ৮০ শতাংশ হয় কনটাক্ট থেকে। ডিটারজেন্ট, কসমেটিক্স, গয়না, মোজা, মোবাইল থেকে হতে পারে। আর ২০ শতাংশ বংশগত বা অ্যাটোপিক এক্সিমা। প্যাচ টেস্টের মাধ্যমে কনট্যাক্ট এক্সিমার কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হন ডাক্তাররা। দ্বিতীয় ক্ষেত্রে রক্তে আইজিই-র পরিমাণ বেশী থাকলে এই উপসর্গ আসে। এক্ষেত্রে হাঁপানির সম্ভাবনাও থাকে। অ্যাটোপিক এক্সিমা পুরোটা সারিয়ে তোলা মুশকিল। এই দুক্ষেত্রেই ড্রাই এক্সিমা হতে পারে। অর্থাৎ রোগটা ক্রনিক আকার ধারণ করলে তাকে বলা হয় ড্রাই এক্সিমা। তখন চুলকুনি এবং রস পড়া ইত্যাদি উপসর্গ বেড়ে যায়। আজকাল ওষুধের মাধ্যমে সারিয়ে ফেলা যায়।

দ্য ওয়াল:
 ফুড হ্যাবিট স্কিনকে কতটা প্রভাবিত করে?
ডঃ সঞ্জয় ঘোষ: আমরা ত্বকের যত্ন শুধু উপর থেকে নিলে মুশকিল। তাই তেল ঝাল মশলা কম খেয়ে বেশি করে জল ও ফল খান। বিটা ক্যারোটিন জাতীয় ফল– পেঁপে, গাজর এগুলো বেশি খান। এগুলো অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের কাজ করে, বলিরেখা কম পড়ে। স্নান করার পর ভেজা গায়ে তেল মাখুন। স্কিনের আর্দ্রতা বজায় থাকবে। তবে দুধ পছন্দ করলে ওটা বুঝে খান কারণ দুধে ব্রণর সমস্যা বাড়তে পারে অনেকের।

দ্য ওয়াল: ঘরোয়া উপায়ে স্কিন কেয়ারে দুধ ময়দা লেবু মধু টম্যাটো অ্যালোভেরা কতটা কাজে আসে?
ডঃ সঞ্জয় ঘোষ:
এসবই খাবার জিনিস। এগুলো খেলে লিভার থেকে সারা শরীরে যতটা যাওয়া দরকার যাক। অযথা এগুলোর স্কিনে ব্যবহারের দরকার নেই। রান্নায় এই উপকরণগুলোতে তাপ লাগে। তাতে থাকা ব্যাকটেরিয়া মরে যায়। কিন্তু সরাসরি স্কিনে লাগালে তা হয় না। আর অ্যালোভেরা সরাসরি গাছ থেকে কেটে লাগানোর চেয়ে মেডিকেটেড অ্যালোভেরা লাগানোই ভালো।

অতএব জলে-ফলে রাখুন নিজেকে তরতাজা। স্কিন থাকুক উজ্জ্বল ও ব্যাকটেরিয়া মুক্ত। ব্যবহার করুন ইউ ভি প্রোটেকশনযুক্ত সানস্ক্রিন লোশন। ত্বকের যত্ন নিন।

সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন মধুরিমা রায়

 

 

Shares

Comments are closed.