এক প্রজননে বাড়ে ১৬ হাজার, একদিনে খায় ২৫০০ মানুষের সমান! এদেশে এত পঙ্গপাল কেন এবছর

এদের আমদানি হয়েছে সৌদি আরব থেকে। পঙ্গপালরা সাধারণত সৌদি আরবে মরুভূমিতে বাস করে৷ মৌসুমি বায়ু চলাচল শুরু হলে এরা ভারতের উদ্দেশে রওনা হয়৷ পঞ্জাব, হরিয়ানা, রাজস্থান ও গুজরাতে নিয়ম করেই প্রতি বছর আসে৷ কখনও কখনও বছরে একাধিক বারও পঙ্গপালের হানা ঘটে৷ কিন্তু এবার তা মাত্রা ছাড়িয়েছে।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    দ্য ওয়াল ব্যুরো: “এবার পঙ্গপাল এসে বড়ো ক্ষতি করেছে। ক্ষিতিবাবুর ক্ষেতে একটি ঘাস নেই। অক্ষয়বাবুর বাগানে কপির পাতাগুলো খেয়ে সাঙ্গ ক’রে দিয়েছে। পঙ্গপাল না তাড়াতে পারলে এবার কাজে ভঙ্গ দিতে হবে।” — সেই কবে লিখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। সহজপাঠের পাতায় এখনও সে কথা পড়তে পারা যায়। কিন্তু পঙ্গপালের হানা যে সত্যিই কতটা ক্ষতি করছে, তা বলছেন রাজস্থান, গুজরাত, মহারাষ্ট্র, মধ্যপ্রদেশ, পঞ্জাব ও উত্তরপ্রদেশের কৃষকরা। পঙ্গপালের দাপটে কার্যত ক্ষিতিবাবুর মতোই দশা তাঁদের।

    কৃষিজমিতে পঙ্গপালের হানা খুব নতুন বিষয় নয়। প্রতিবছরই মূলত শীতের আগে এ দেশের নানা প্রান্তের কৃষিভূমিতে ছেয়ে যায় পঙ্গপালের দল। খাবার সংগ্রহ করে ও প্রজনন ঘটায় তারা৷ কিন্তু এ বছরে শীত পেরিয়ে, বসন্ত পেরিয়ে গ্রীষ্ম পড়ে যাওয়ার পরেও ফের পঙ্গপাল হানা দিয়েছে নানা জায়গায়। শুধু হানা দেওয়া নয়, এই মুহর্তে দেশের ৫টি রাজ্য পঙ্গপালের আক্রমণে কার্যত বিপর্যস্ত৷ রেড অ্যালার্ট জারি করা হয়েছে এলাকাগুলিতে৷ সাফ হয়ে যাচ্ছে মাইলের পর মাইল ফসল।

    জানা গেছে, পঙ্গপালদের এই ঝাঁকগুলির এক একটিতে প্রায় ৮০ লক্ষটি করে পতঙ্গ আছে। এদের আমদানি হয়েছে সৌদি আরব থেকে। পঙ্গপালরা সাধারণত সৌদি আরবে মরুভূমিতে বাস করে৷ মৌসুমি বায়ু চলাচল শুরু হলে এরা ভারতের উদ্দেশে রওনা হয়৷ পঞ্জাব, হরিয়ানা, রাজস্থান ও গুজরাতে নিয়ম করেই প্রতি বছর আসে৷ কখনও কখনও বছরে একাধিক বারও পঙ্গপালের হানা ঘটে৷ কিন্তু এবার তা মাত্রা ছাড়িয়েছে।

    বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পঙ্গপালরা নিজেদের শরীরের ওজনের সমান খাবার প্রতিদিন খায়৷ ফলে পঙ্গপালের একটি গোটা দল এক দিনে যতটা খাবার খায়, তা প্রায় আড়াই হাজার মানুষের খাবার৷ ফ্রান্সের মতো মাপের একটি দেশকে একদিনে অর্ধেক খেয়ে ফেলার ক্ষমতা রাখে এরা। মাত্র তিনটি প্রজননে এদের সংখ্যা লাফিয়ে লাফিয়ে ১৬ হাজার করে বেড়ে যায়৷ স্যাঁতস্যাঁতে জমিতেই এরা প্রজনন ঘটায়৷ তাই পঙ্গপালদের লক্ষ্য থাকে সবুজ ফসল ভরা জমিই৷ আ সেই জমির সবুজ ফসল খেয়ে শেষ করে ফেলতে এদের বেশি সময়ও লাগে না৷

    বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই বছর ভারতে পঙ্গপালের হানা এতটা বেড়ে যাওয়ার পেছনে বিশেষ কারণ আছে। ২০১৮ সালে সৌদি আরবে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়েছিল হঠাৎ করে। দু’টি সাইক্লোনও হয়েছিল। মরুভূমির দেশে যা বিরল। এর ফলে মরুভূমিতে দু’টি ছোট হ্রদেরও জন্ম হয়েছে৷ এই ঘটনা সে বছর জলবায়ুর পরিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়৷ তার পর থেকে আরব সাগরে প্রতি বছরই ২-৩টি করে ঘূর্ণিঝড় তৈরি হচ্ছে৷ আগে যেখানে ৫ বছরেও একটি হত কিনা সন্দেহ৷

    এই পরিস্থিতিতে বদলে গেছে পঙ্গপালদের গতিবিধিও। সাইক্লোনের তীব্র হাওয়ায় তাদের পথ ভুল হয়ে যায় সাময়িক ভাবে৷ ইয়েমেনের দিকে যেতে শুরু করে পঙ্গপালের দল৷ তার পরে আফ্রিকায় ঢোকে৷ সেখানে প্রায় দুর্ভিক্ষের পরিস্থিতি তৈরি হয় গত বছর৷ বিশেষ করে পূর্ব ও উত্তর আফ্রিকার দেশগুলি খুবই ক্ষতিগ্রস্ত হয়৷
    এর পরে পঙ্গপালগুলি লোহিত সাগর পেরিয়ে ইরান ও পাকিস্তান ঢোকে৷

    গত বছরই পাকিস্তানে পঙ্গপাল হানার সময়ে পাকিস্তানের কৃষিমন্ত্রী নায়লা ইনাভাত বলেছিলেন, “ওরা অনেক দূর থেকে উড়ে এসেছে। কেমন হয় যদি পঙ্গপালের বিরিয়ানি বানানো যায়! পোকাতে তো অনেক পুষ্টিগুণ আছে। তাহলে আর চিন্তা কী! বিরিয়ানি বানাও আর খাও।” তিনি তখন মজা করে একথা বললেও, কয়েক দিন পরেই এই মজা রীতিমতো কান্নায় পরিণত হয়। দেশের ৪০ শতাংশ শস্য নষ্ট করে দিয়েছিল পঙ্গপাল।

    এর পরে তারা পাড়ি দেয় ভারতে৷ বর্ষার পরে পরেই ঢুকে সবুজ জমিতে শুরু করে দাপট দেখানো। গত বছর নভেম্বর পর্যন্ত রাজস্থানে ছিল পঙ্গপালরা৷ পঞ্জাবেও চালিয়েছিল হাঙ্গামা। আলু, গম, জিরা, তুলো এবং সর্ষেখেতেও প্রভাব পড়ে। এর পরে ফিরতে শুরু করে তারা।

    কিন্তু এ বছর আবার জানুয়ারি মাসে ইরান-পাক সীমান্তবর্তী এলাকায় প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়৷ আর পঙ্গপালরাও আবার এদেশের দিকে আসতে থাকে তখনই। জলবায়ুর পরিবর্তনেই ফের দিকভুল বলে অনুমান। ফলে গরমের সময়েই তারা ভারতে চলে এসেছে৷

    আবহাওয়া অফিসও বলেছে, অন্যবারের চেয়ে এবছর ১ মার্চ থেকে ১১ মে পর্যন্ত ভারত ২৫ শতাংশ বেশি বৃষ্টি পেয়েছে৷ রাজস্থানেও তাপপ্রবাহ খুব একটা তৈরি হয়নি৷ পঙ্গপাল উৎপাতের এটা একটা বিশাল বড় কারণ। পঙ্গপালের বিশেষত্ব হচ্ছে তাদের যদি একবারে খতম না করা যায়, তা হলে তারা এত দ্রুত বংশবৃদ্ধি করে যে তাদের প্রতিরোধ করা মুশকিল হয়ে পড়ে। এমনিতেই রাজস্থান খরাপ্রবণ রাজ্য। কম বৃষ্টিপাতের কারণে জমি অত্যন্ত রুক্ষ, ফলে চাষবাস করাও কষ্টসাপেক্ষ। তার মধ্যে যদি এভাবে ফসল নষ্ট হয়ে যায়, তবে তা কৃষকদের জন্য খুবই সমস্যার বিষয়।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More