ফুটবলের দেবীপক্ষে অসভ্যতার অবসান চাই

0

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

শোভন চক্রবর্তী: সন্ধে সন্ধে অফিস থেকে ফিরেছেন দিলীপকাকু। নৈহাটি স্টেশনে নেমেই ‘মা তারা চিকেন সেন্টার’-এর মালিক দেবুকে বললেন, ‘তাগড়া দেখে একটা কাটতো দেবু।’ মাংস নিয়ে সরকারি কর্মচারী দিলীপ মুখুজ্জে বাড়ি গেলেন। প্ল্যান ছিল জমিয়ে ঠ্যাং চিবিয়ে আর্জেন্টিনা-ক্রোয়েশিয়া ম্যাচ দেখবেন। হলোও তাই। দিলীপকাকুর স্ত্রী মালতী কাকিমা জুত করে রাঁধলেন চিকেন কষা। খেলা শেষের পর মালতী কাকিমা সব রাগ উগড়ে দিলেন স্বামীর উপর। কাকিমার বিদ্রোহী ঘোষণা, ‘যদ্দিন না মেসি গোল করছে, তদ্দিন চিকেন কষা বন্ধ।’

মেডিক্যাল রিপ্রেসেন্টেটিভ বাপিদা। একটা সময় পাড়ায় মিনি বারে ফুটবল খেলায় তাঁর বেশ নাম-ডাক ছিল। তাই তাঁর ভিতরে অজান্তেই লালিত-পালিত  হয়েছে একটা গুলিট গুলিট ব্যাপার। তাই তিনি সব পারেন। সেরকমই ধারণা তাঁর। সাত সকালে পাড়ার মোড়ের মুদি দোকানে হাফ ডজন ডিম কিনতে এসেছেন। গায়ে গামছা আর পরনে লুঙ্গি। বাপিদা এখন মুসায় মজেছেন। হাতে ডিমের ঠোঙা নিয়ে, লুঙ্গি পরেই বাপিদা দেখাতে শুরু করলেন আইসল্যান্ডের বিরুদ্ধে চলতি বলে নাইজিরিয়ার আহমেদ মুসা কেমন করে ভলি মেরেছিল। জনগণ না আটকালে কেলেঙ্কারি বাঁধতো আর কী!

ক্লাস থ্রি তে পড়ে বুবলাই। এই বয়সে হাতে পয়সা পাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। তা হলে কী করা যায়! পাকড়াও করেছে সত্তরোর্ধ ঠাকুমাকে। চুপি-চুপি চেয়ে নিয়েছে দশটাকা। সঙ্গে মৃদু হুমকি, ‘ঠাম, তুমি কিন্তু বাবা-মা কে বলবে না।’ স্কুলের বাইরে একটা দোকানো ঝোলানো নেইমারের পোস্টার কেনার জন্য তাঁকে কার্যত বলশেভিক বিপ্লব করে টাকা আদায় করতে হয়েছে।

অনুপমার মায়ের এ বার বিশেষ চাপ নেই। তাঁর টিমই তো নেই এ বার। অনুপমার বাবা একবার গল্প করতে করতে বলেছিলেন, ‘আমি তো ৮২ সালে কলেজে পড়ার সময় ইনসিকিউরিটি কমপ্লেক্সে ভুগতাম। এই না তোদের কাকিমা আমার সঙ্গে সম্পর্ক চুকিয়ে পাওলো রোসির কাছে চলে যায়।’

এইসব লক্ষ-অযুত ছবি মজুত আছে বলেই তো এখনও ফুটবল একটা সভ্যতা। আর ফুটবল সভ্যতা বলেই তো, গাজা স্ট্রিপে যুদ্ধে পা হারানো লোকগুলো হাতে ক্র্যাচ নিয়ে বল পায়ে দেয়। ফুটবল সভ্যতা না হলে সেনেগাল কিংবা জাপান থেকে মস্কোতে যাওয়া লোক গ্যালারি পরিস্কার করে। ফুটবল সভ্যতা না হলে বর্ণবিদ্বেষের কালো হাত ভেঙে দিয়ে পোলান্ডের শ্বেতাঙ্গ খেলোয়াড় হাত বাড়িয়ে দেন মাটিতে পড়ে থাকা সেনেগালের খেলোয়াড়কে টেনে তোলার জন্য।

কিন্তু ওরা কারা?

এই সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে সব কিছুরই গতি উসেইন বোল্টের মতো। ভাল-খারাপ যাই হোক ছড়িয়ে পড়ে বিদ্যুতের গতিতে। ব্রাজিলের সংসদের বাজেট অধিবেশনে সাংসদের ব্রেস্টফিডিং-এর ছবি হইহই ফেলে দিয়েছিল দুনিয়া জুড়ে। সংস্কার ভাঙা সে ছবি যেমন প্রশংসা কুড়িয়েছিল তেমন অসভ্যতাও কম হয়নি। কেউ আটকাতে পারেনি। কথা বলার অধিকার, মত প্রকাশের স্বাধীনতার নামে যা ইচ্ছা তাই চলতে পারে? এই বিশ্বকাপও সেখান থেকে বাদ গেল না। রাজ্য, দেশের সীমানা পেরিয়ে অসভ্যতার আন্তর্জাতিকতা চলছে।

মেসির ছবির উপর জুতো দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকার ছবি ভাইরাল। তার বদলা নিতে কেউ ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোর ঠোঁটে এডিটিং অ্যাপ দিয়ে এঁকে দিচ্ছেন লিপস্টিক, কানে ঝুলিয়ে দিচ্ছেন ঝুমকো দুল। কেউ আবার নেইমারকে পরিয়ে দিচ্ছেন শাড়ী। চরম লিঙ্গ বৈষম্য থেকে জন্ম নেওয়া মানসিক বিকৃতি হুহু করে ছড়িয়ে পড়ছে। এবং একটা বড় অংশের লোক ডাস্টবিনের কালচারে মজা পাচ্ছেন। প্রশ্ন হচ্ছে ওরা কারা? তাপস পাল বা অনিল বসুদের খেউড়ে ভরা বক্তৃতায় যারা হাততালি দেয় সেই অংশের হুলিগান মননের লোকজন এ বার খেলার দুনিয়ায়। বিকৃতি যাদের ভিত্তি।

এই সময়ে আমরা-ওরা’র মাঝে লাইন টানাটা বোধহয় জরুরি হয়ে পড়ছে। আমরা মানে দিলীপকাকু, মালতী কাকিমা, অনুপমার মা, বাপিদা, গাজা স্ট্রিপে পা হারানো মানুষদের ফুটবল, ব্রাজিলের সংসদে ব্রেস্ট ফিডিং। আর ওরা মানে ওরা। শব্দের পাল্টা শব্দ হোক। ছবির পাল্টা ছবি হোক। খারাপের পাল্টা ভাল হোক। খেউড়ের পাল্টা যুক্তি হোক। ফুটবলের দেবীপক্ষে অসভ্যতার অবসান হোক। সভ্যতাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য। ফুটবলকে জিতিয়ে দেওয়ার জন্য।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Leave A Reply

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More