মানুষ হওয়ার আনন্দপাঠ! শিশুর হাতে পেনসিলের বদলে চারাগাছ, ক্লাসরুমে বইয়ের বদলে তর্ক!

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    তিয়াষ মুখোপাধ্যায়

    আমার বাচ্চা এ থেকে জ়েড অবধি লিখতে পারে!
    আমার বাচ্চা গড়গড়িয়ে গোটা ছড়ার বই পড়ে ফেলতে পারে!
    আমার বাচ্চার কিন্তু ১২ ঘরের নামতা মুখস্থ!

    স্কুলে ভর্তি করতে আসার সময়ে সন্তানের এই সমস্ত প্রতিভা সাজিয়ে গুছিয়ে নিয়ে আসেন মা-বাবা। কিন্তু এই স্কুলে এসে তাঁরা শোনেন, পাঁচ বছর বয়স পর্যন্ত কোনও বই-ই পড়ানো হবে না বাচ্চাকে। ভর্তির পরে দেড় বছর সে ধরবে না কোনও পেনসিলও! এমনকী ক্লাস টু পর্যন্ত কোনও হোমওয়ার্কই করতে দেওয়া হবে না তাদের।

    এ কেমন কথা, ভাবতে বসেন মা-বাবা। পাশের বাড়ির বাচ্চাটা তো তা হলে অনেক এগিয়ে যাবে তাঁদের সন্তানের থেকে! তার পরেও দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাটিয়ে যাঁরা ভর্তি করেন এই স্কুলে, তাঁরা একটা সময়ের পরে প্রত্যেকেই বলেছেন, এই স্কুলে তাঁর সন্তান শুধু লেখাপড়াই শেখেনি, মানুষের মতো মানুষ হয়েছে!

    ব্যারাকপুরের স্টেম ওয়ার্ল্ড স্কুল। শহর থেকে একটু দূরে, মধ্যবিত্তের নাগালে এই স্কুলটি আপাতত নবম শ্রণি অবধি রয়েছে। আইসিএসই কারিকুলাম ফলো করে তারা। সিলেবাসও সেই অনুযায়ীই ঠিক করা আছে। কিন্তু তফাত রাখা হয়েছে, শেখানোর পদ্ধতিতে, পড়ানোর প্রক্রিয়ায়। বই নির্ভর চ্যাপ্টার পড়ে, তা মুখস্থ করে, পরীক্ষার খাতায় লিখে আসায় বিশ্বাস করে না স্টেম। এমনটাই জানালেন সেই স্কুলের প্রিন্সিপ্যাল, ডক্টর শাঁওলি মুখোপাধ্যায়। শুধু এক জন শিক্ষিকা নয়, তাঁকে আক্ষরিক অর্থেই এক জন শিক্ষাকর্মী বলা যেতে পারে। যিনি প্রায় ২০ বছর ধরে লাগাতার পরিশ্রম ও গবেষণা করে চলেছেন, ছোটদের পড়ানো ও শেখানোর পদ্ধতি কী করে আরও বেশি গ্রহণযোগ্য করা যেতে পারে। পড়াশোনার নামে আকণ্ঠ চাপে ডুবে থাকা শিশুদের কী করে মুক্তি দেওয়া যেতে পারে। কী করে আরও বেশি আনন্দের ও গ্রহণযোগ্য হতে পারে শিক্ষা।

    এই ভাবনা থেকেই, শাঁওলিদেবীর হাত ধরে এই স্কুলে শুরু হয়েছে নিজস্ব স্টেম কারিকুলাম। যেখানে পড়ার চাপ, পরীক্ষার ভয় মোটেই তাড়া করে না খুদেদের। বরং সমস্ত জিনিস হাতেকলমে শেখার আনন্দই সেখানে শেষ কথা। তা সে সিলেবাসের বিষয় হোক, বা তার বাইরের। হ্যাঁ, পাঠ্যের বাইরেও আরও নানা বিষয়ে বেশি করে গুরুত্ব দেওয়া হয় এই স্কুলে। কারণ স্টেম মনে করে, স্কুল এমন একটা জায়গা, যেখানে পড়াশোনা ছাড়াও, সামাজিক দায়বদ্ধতার পাঠ শেখা জরুরি। যেটা শেখার জন্য কোনও বই পড়তে হয় না, কিন্তু সুন্দর অভিভাবকত্ব পেতে হয়। সেটাই দিচ্ছেন শাঁওলিদেবী।

    ক্লাস সিক্সের এক খুদে ছাত্রীর বাবা বলছেন, “সত্যি বলতে কি, খানিক চিন্তায় ছিলাম। আত্মীয়স্বজনরাও শুনে বলত, সে কী! ও এখনও এটা শেখেনি, ওটা শেখেনি! কিন্তু যত দিন যাচ্ছে তত বুঝতে পারছি, ওর মতো করে অনেকেই শেখে না। ও যা শিখছে, আমরা হয়তো মা-বাবা হিসেবেও এত ভাল শেখাতে পারতাম না।”

    তিনি জানালেন, প্রতি শুক্রবার স্কুলে কোনও না কোনও অ্যাকটিভিটি করানো হয়। সেটা হতে পারে গাছ লাগানো, হতে পারে চার্চে গিয়ে কেক বানিয়ে, গরিব বাচ্চাদের সেই কেক খাওয়ানো। অথবা রাস্তায় নেমে, সিগন্যাল তৈরি করে, পথ-নিরাপত্তার প্রাথমিক পাঠও নেয় তারা। শুধু তা-ই নয়। ক্লাস সিক্স থেকে নাইনের প্রতিটা বাচ্চাকে প্রতি বছর দায়িত্ব দেওয়া হয়, নিজের এলাকার, আশপাশের কোনও গরিব বা দুঃস্থ শিশুকে খুঁজে তাকে এক মাস করে পড়ানোর। অর্থাৎ স্টেমের ছাত্রছাত্রীদের হাত ধরে প্রতি বছরে ২০০টি করে দুঃস্থ বাচ্চা শিক্ষার আলো দেখছে।

    “আমরা এমন একটা সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি, যেখানে পড়ুয়াদের ডিগ্রির পাহাড় রোজ উঁচু হতে থাকলেও, মানবিক মূল্যবোধগুলো ক্রমে হারিয়ে যাচ্ছে। মনুষ্যত্বের ক্ষয় হচ্ছে রোজ একটু করে। সেই জায়গা থেকেই আমার চেষ্টা, বাচ্চাদের জন্য ছোটবেলা থেকেই একটা মূল্যবোধ তৈরি করা। ছোটছোট রোজকার রুটিনের মধ্যে দিয়ে ওরা শিখুক সামাজিক ও মানবিক পাঠ,”– বললেন শাঁওলিদেবী। জানালেন, এই চেষ্টা থেকেই প্রত্যেক দিন ছুটির পরে ১৫ মিনিট সময় নিজের স্কুল পরিষ্কার করে বাচ্চারা। যত্ন করে গাছের। দীপাবলিতে নিজেরাই ঠিক করে বাজির বদলে প্রদীপ আর লণ্ঠন বানিয়ে উদযাপন করবে আলোর উৎসব। স্টেম স্কুলের বাচ্চাদের নিয়মিত নিয়ে যাওয়া হয় বৃদ্ধাশ্রম ও অনাথ আশ্রমগুলিতে। আর পাঁচটা বাচ্চার চেয়ে জীবনকে আরও একটু বেশি কাছ থেকে দেখে তারা।

    তবে এই ভাবে শেখানোর পিছনে সমস্ত শিক্ষিকারই যে অসীম ভূমিকা, তা অনস্বীকার্য। শিক্ষিকারা এখানে ক্লাসে ঢোকেন, নতুন কিছু শব্দ মাথায় নিয়ে, হাতে বই নিয়ে নয়। “কোনও নতুন চ্যাপটার পড়ানোর হলে, সেই চ্যাপটারের বিশেষ কয়েকটা কী-ওয়ার্ড খুঁজে নিয়ে, সেই শব্দগুলো পড়ুয়াদের মধ্যে ফেলা হয়। তাই নিয়ে কথা হয়, আলোচনা চলে, প্রয়োজনে বিতর্কও। আর এই বিনিময়ের মধ্যে দিয়েই শেখা হয় গোটা চ্যাপটার। বইযে যতটা লেখা আছে, তার বাইরেও শেখা হয়ে যায় অনেক কিছু। অনেক সময়ে ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে থেকে এমন প্রশ্নও উঠে আসে, যা ভাবিয়ে তোলে শিক্ষিকাদেরও! সেই কৌতূহল নিরসন করতে গিয়ে হয়তো আরও একটু বেশি শেখা হয়ে যায় সকলেরই।”– বলছিলেন প্রিন্সিপ্যাল শাঁওলিদেবী। জানালেন, অনেক সময়ে এমনও হয়, কোনও কবিতা পড়ানোর পরে শিক্ষিকা বাচ্চাদের বলেন, এই কবিতার উপরে একটা ছবি আঁকতে! পড়াশোনা করতে করতেই বাচ্চাদের কল্পনাপ্রবণ মনকে এভাবেই কাজে লাগানো হয় এখানে।

    ক্লাসরুমের ভিতরে সার দিয়ে সাজানো থাকে না টেবিল, নির্দিষ্ট দিকে ফিক্সড থাকে না শিক্ষিকার আসন। বরং ছোট-ছোট গ্রুপে বসে আলোচনার মাধ্যমে শেখে তারা। শিক্ষিকা বিচরণ করেন সারা ক্লাসরুমেই। এবং ক্লাসে শিক্ষিকা কম কথা বলেন, বেশি বলে পড়ুয়ারাই। তাদেরই আলোচনায়, প্রশ্নে, বিতর্কে শেখা হয় গোটা চ্যাপটার। এর পরে প্রথাগত উপায়ে প্রশ্ন দিয়ে উত্তর লিখতে বলা হয় না তাদের। বরং বলা হয়, চ্যাপ্টারটা খুঁজে কয়েকটি প্রশ্ন তৈরি করে আনতে বাড়ি থেকে, যেগুলোর উত্তর একসঙ্গে খোঁজা হবে ক্লাসে। “এখানে হোমওয়ার্কের কনসেপ্টটাই উল্টো। প্রশ্ন তৈরি হবে বাড়িতে, উত্তর লেখা হবে ক্লাসে। আর কোনও নতুন চ্যাপটার শিখে তা থেকে প্রশ্ন তৈরি করতে গেলে, বাচ্চাকে সেই চ্যাপটার পড়তেই হবে। তবে সেই পড়া হবে আনন্দের, কৌতূহলের। তাই শেখাও হবে অনেক সহজ।”– বললেন শাঁওলিদেবী।

    ছোটদের শাসন করার দিকটিও অন্য ভাবে সামলান স্টেমের দিদিমণিরা। গোটা স্কুলের কেউ লাল কালির পেন ব্যবহার করেন না। একটা বিশেষ রঙের ব্যবহারের মাধ্যমে বাচ্চার মেধা জাজ করায় বিশ্বাস করেন না তাঁরা। যেমন তাঁরা বিশ্বাস করেন না, নিস্তব্ধ ক্লাসরুমই ভাল ক্লাসরুম। বরং বাচ্চারা হাসবে, খেলবে, কথা বলবে, হয়তো খানিক দুষ্টুমিও করবে। সেটাই স্বাভাবিক। শাস্তির ভয় দেখিয়ে চুপ করিয়ে রাখায় তাঁরা বিশ্বাসী নন। কেউ কোনও অন্যায় করলে, তাকে ডেকে বোঝানো হয়। লেখানো হয় সেই বিষয়ে। তাকে নিজেকে বুঝতে দেওয়া হয় অন্যায়। কখনওই গার্জেন কল করা হয় না। কোনও কারণে অভিভাবককে ডাকা হলেও, তা সমস্যা সমাধানের জন্য ডাকা হয়, অভিযোগ করার জন্য নয়। প্রিন্সিপ্যাল বললেন, “এমনটা করে কখনওই ব্যর্থ হইনি আমরা। কোনও বাচ্চাই এক অন্যায় দু’বার করেনি আজ অবধি। বরং অনুতপ্তই হয়েছে, স্বীকার করেছে দোষ।”

    স্টেম স্কুল বিশ্বাস করে, শিক্ষাব্যবস্থার প্রথম এবং প্রধান গলদ হল, শিক্ষার বিষয়বস্তুতে নয়, শিক্ষার পদ্ধতিতে। পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনলেই পরিবর্তন আসবে গোটা ব্যবস্থায়। আমরা যেটা শেখাতে চাই সেটাই বাচ্চাদের শেখাতে হবে– এই মানসিকতার বদল দরকার। বরং বোঝা জরুরি, বাচ্চা কী শিখতে চাই। শুধুমাত্র কিছু ইনপুট বাচ্চার মধ্যে ভরে দিয়ে তা আউটপুটের আকারে পরীক্ষার খাতায় পাওয়ার নাম শিক্ষা নয়। বরং শিক্ষা তখনই কমপ্লিট হয়, যখন বাচ্চা কিছু শিখতে গিয়ে নিজে থেকে ইনপুট দিতে শেখে। তখনই সম্পূর্ণ হয় তার শেখা।

    প্রিন্সিপ্যাল শাঁওলি মুখোপাধ্যায় যখন এই কথাগুলো ব্যাখ্যা করছিলেন, স্পষ্ট আত্মবিশ্বাস ধরা পড়ছিল তাঁর চোখেমুখে। তিনি মন থেকে বিশ্বাস করেন, বদল আসা সম্ভব। আর তা কাউকে না কাউকে আনতেই হবে। তাঁর বিশ্বাস, এই ভাবে শিখলে যে কোনও পড়ুয়ার এক্সপ্রেশন এবং কমিউনিকেশন অনেক ভাল হতে বাধ্য। যার প্রভাব পরবর্তী কালে, জীবনের প্রতিটা ধাপে পড়বে। তাই শিক্ষক, অভিভাবক সকলেরই আশা, এই স্কুল থেকে পড়াশোনা করা ছেলেমেয়েরা বোর্ডের পরীক্ষাতেও তুখোড় ফল করবে।

    তবে এক দিনে, খুব সহজে হয়ে যায়নি সব কিছু। কেরিয়ারের শুরুতে গতে বাঁধা নিয়মে শিক্ষকতা করতে করতেই শাঁওলিদেবী তাগিদ অনুভব করেছিলেন এই ব্যবস্থায় বদল আনার। চেয়েছিলেন, নতুন কিছু করতে। সারা বিশ্বের কোন দেশে কেমন করে পড়াশোনা হচ্ছে, সে বিষয়ে রীতিমতো গবেষণা করছেন শাঁউলিদেবী। অ্যাটেন্ড করছেন অসংখ্য কনফারেন্স। বক্তৃতা রাখছেন, শুনছেন। তাঁর নিরলস পরিশ্রম তাঁকে এনে দিয়েছে ‘ন্যাশনাল কোয়ালিটি এক্সেলেন্স অ্যাওয়ার্ড’, ‘ন্যাশনাল এডুকেশন লিডারশিপ অ্যাওয়ার্ড’-এর মতো একাধিক সম্মান। তাঁর স্বপ্নের প্রতিষ্ঠান স্টেম ওয়ার্ল্ড স্কুল ভূষিত হয়েছে সারা বাংলার দ্বিতীয় সেরা আন্তর্জাতিক স্কুল হিসেবে। পরপর দু’বছর পেয়েছে ‘ব্রেনফিড স্কুল এক্সেলেন্স অ্যাওয়ার্ড’।

    শাঁওলিদেবী স্বপ্ন দেখেন, বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থায় এক দিন আমূল পরিবর্তন আসবে। গতে বাঁধা ছক চুরমার হয়ে যাবে। দূর হয়ে যাবে পড়ার চাপ বা পরীক্ষার ভয়ের মতো শব্দেরা। অনেক বেশি আনন্দ করে, উৎসাহ নিয়ে, খোলামনে পড়াশোনাকে ভালবাসবে শিশুরা।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More