মঙ্গলবার, অক্টোবর ২২

সিজ়ন চেঞ্জের সময়ে বাচ্চার পেট ঠিক আছে তো? যত্ন নিন ওর

তাপমাত্রার ছোটাছুটিতে দরদর করে ঘামছিলাম আমরা সকলেই।  এবার ঝিরঝির করেই চলে এল বর্ষা।  এ সময়ে আপনার বাচ্চাটির পেট ঠিক রাখতে কী করবেন, আর কী করবেন না জেনে নিন সে কথাই।  বিশিষ্ট শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ ডঃ চান্দ্রেয়ী সেনগুপ্তর সঙ্গে কথা বলল ‘দ্য ওয়াল’।

দ্য ওয়াল: শিশুদের পেট খারাপ বা আমাশয় হয় অনেক সময়, এক্ষেত্রে কী কী সমস্যা হতে পারে এবং তার জন্য কী কী ব্যবস্থা নেওয়া উচিত?

ডঃ সেনগুপ্ত:
 বেশিরভাগ ক্ষেত্রে শিশুদের পেটখারাপ বা আমাশয়, যেটাকে ডাক্তারি ভাষায় বলে গ্যাস্ট্রোএন্টেরাইটিস, ভাইরাসজনিত।  যেমন রোটা ভাইরাস, এডিনো ভাইরাস, নোরো ভাইরাস ইত্যাদি।  সংক্রমণের মেয়াদ তিন থেকে পাঁচ দিন হলে, কোনও ওষুধের প্রয়োজন নেই।  তবে যদি ব্যাকটেরিয়া বা প্যারাসাইট রোগের কারণ হয়, তাহলে সঠিক ওষুধ ছাড়া সারানো যায় না।  তখন ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া অবশ্যই দরকার।  পেটখারাপের প্রধান লক্ষণ হল বমি ও ডায়েরিয়া, সাথে পেটে ব্যথা হতে পারে।  বমি ও ডায়েরিয়ার জন্য শরীর থেকে বেশি পরিমাণে জল বেরিয়ে যায় এবং ডিহাইড্রেশান দেখা দেয়।  আরও একটি সমস্যা দেখা দেয় – ইলেকট্রোলাইটের ভারসাম্যহীনতা।  এই দুটি বিষয়ে সচেতন না হলে, পরিণতি মারাত্মক হতে পারে।  এই অবস্থায়, শিশুকে ক্রমাগত জল খাওয়ানো দরকার।  বমি হওয়া সত্ত্বেও, কয়েক ঢোঁক করে জল বারবার খাইয়ে যেতে হবে।  দেখা গেছে যে, সাদা জলের চেয়ে, এক গ্লাস জলের মধ্যে এক চিমটে নুন ও একচিমটে চিনি মিশিয়ে সেই জল খাওয়ানো বেশি কার্যকারী।  বমি বন্ধ হলে ধীরে ধীরে অন্যান্য খাবার খাওয়ানো শুরু করা যেতে পারে।  তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা মনে রাখা প্রয়োজন।  আমাদের অন্ত্রে ল্যাক্টোবেসিল নামে উপকারি ব্যাকটেরিয়া থাকে, যা আমাদের খাবার হজম এবং ভিটামিন তৈরি  করতে সাহায্য করে।

যে কোনও ধরনের গ্যাস্ট্রোএন্টেরাইটিসের পরে সেটি ধ্বংস হয়ে যায়।  ফলে হজম শক্তি, বিশেষ করে দুধ এবং দুধ থেকে তৈরি খাবার হজমের ক্ষেত্রে সমস্যা হয়।  একে বলা হয় ট্রান্সিয়েন্ট ল্যাক্টোস ইন্টলারেন্স।  এই সময় কদিন দুধ ও দুধ থেকে তৈরি খাবার বাদ দেওয়া উচিত, একমাত্র দই ছাড়া।  কারন, দইয়ে বেশি পরিমাণে ল্যাক্টোবেসিল থাকে এবং দিনে বারদুয়েক দই খাওয়ালে, আবার অন্ত্রে সেগুলো ফেরানো যায় ও অন্ত্রের স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে আসে।

দ্য ওয়াল: শুধুমাত্র স্তন্যপান করছে যে শিশুরা, তাদের পেট খারাপ হলে কী ব্যবস্থা নিতে হবে?

ডঃ সেনগুপ্ত:
 প্রথমত দেখতে হবে যে শিশুর সত্যিই পেট খারাপ হয়েছে কি না।  কারন স্তন্যপানরত শিশুদের পেট খারাপ হওয়াটা বিরল।  বুকের দুধ খাওয়া শিশুরা দিনে ৫ থেকে ৬ বার মলত্যাগ করতে পারে যা সম্পূর্ণ স্বাভাবিক।  সেই মলের কন্সিস্টেন্সি এবং রং নানাবিধ হতে পারে।  পেটখারাপের চিন্তা তখনই আসবে যখন সেটি শ্লেষ্মা ও দুর্গন্ধযুক্ত হবে। এসব ক্ষেত্রেও শিশুর স্তন্যপান বজায় রাখতে হবে।  কারন বুকের দুধে জল এবং অন্যান্য জরুরী ইলেক্ট্রোলাইট সঠিক পরিমাণে রয়েছে, যা শিশুর পক্ষে প্রয়োজনীয়।  মায়ের স্বাস্থ্যবিধি সম্বন্ধে সচেতন হতে হবে।  শিশু যদি নিস্তেজ হয়ে পরে তাহলে অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে।

দ্য ওয়াল: কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা হয় অনেক সময়, এর সমাধান কী?

ডঃ সেনগুপ্ত:
 বাচ্চাদের এই সমস্যাটি হামেশাই ঘটে থাকে।  সেটি বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মূলত খাদ্যাভ্যাস জনিত।  খাবারের তালিকায় শাক-সবজি এবং টাটকা ফল ও ফলের রস রাখা অত্যন্ত জরুরী।  এছাড়া বাচ্চাকে প্রচুর পরিমাণে জল খাওয়াতে হবে।  এই সমস্যায় একটি ঘরোয়া পদ্ধতি খুব কার্যকারী হয়।  হাফ গ্লাস জলে ১-২ বড় চামচ কমলালেবুর রস মিশিয়ে বাচ্চাকে সকালবেলা খালিপেটে খাওয়াতে হবে।  তাহলে কোষ্ঠকাঠিন্য দূর হয়ে যাবে।

দ্য ওয়াল: শিশুরা অনেকসময় খেতে চায় না, ঘ্যানঘ্যান করে।  কী করা উচিত তখন?

ডঃ সেনগুপ্ত:
 বিশ্বের প্রত্যেক পেডিয়াট্রিশিয়ানদের কাছেই মায়েদের এই প্রশ্ন থাকে – ‘আমার বাচ্চাটা না কিছু খায় না, কী করব? ’ বাচ্চার পুষ্টি হচ্ছে কি না তা বোঝা যায় বাচ্চার শারীরিক ওজন।দিয়ে।  ওজন যদি বয়স অনুযায়ী হয়, তাহলে দুশ্চিন্তার কোন কারন নেই।  মায়েদের সেটি বুঝিয়ে তাদের চিন্তামুক্ত করা উচিত।  জন্ম থেকে ৬ মাস বয়স অবধি, যখন শিশুরা প্রধানত দুধের উপরে থাকে, তখন তাদের পর্যাপ্ত পরিমাণে খাওয়ানো হচ্ছে কি না, তা বোঝা সহজ।

প্রতি ২৪ ঘণ্টায়, শিশুর শারীরিক ওজনের প্রতি কিলো পিছু ১২০মিলি দুধ বরাদ্দ করা যেতে পারে। এই হিসেব অনুযায়ী, একজন ৬ মাসের বাচ্চা যার ওজন ধরুন ৮ কিলো, তার ২৪ ঘণ্টায় প্রয়োজন ৮x১২০= ৯৬০ মিলি দুধ; অর্থাৎ একেকবারে  ১৯০ মিলি দুধ, দিনে পাঁচবার দেওয়া যেতে পারে।  তবে এরকম হিসেব বোতলের দুধ যারা খায়, তাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।

শিশুদের জন্ডিস প্রসঙ্গে কী বলছেন ডঃ সেনগুপ্ত
জানুন

দ্য ওয়াল: ওদের পেট ভর্তি আছে কি না সেটা বোঝার কোন সহজ উপায় আছে কি?

ডঃ সেনগুপ্ত:
 কথা বলতে না পারলেও, আপনার সন্তান আপনাকে নানারকম অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে তার চাহিদা আপনাকে সম্পূর্ণ ভাবে বুঝিয়ে দেবে।  যেমন, খিদে পেলে অনেক শিশু তার হাতের মুঠি মুখের মধ্যে ঢুকিয়ে চুষতে থাকবে, অথবা পেট ভরে গেলে খাবারের থেকে ভীষণ ভাবে মুখ ঘুরিয়ে নেবে।  মাকে সেই সঙ্কেতগুলি বুঝতে হবে।  এটি মোটেই কঠিন কাজ নয় এবং সব মায়েরাই এগুলো খুব সহজেই বুঝতে পারে এবং সস্নেহে সারাও দেন।  এটিকে বলে রেস্পন্সিভ ফিডিং।  খাওয়ার ব্যাপারটা বাচ্চার পক্ষে একটি আনন্দের অভিজ্ঞতা হওয়া ভীষণ জরুরি।  এর উপর শিশুর ভবিষ্যতের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ অনেকটাই নির্ভর করে।

দ্য ওয়াল: পেটে ব্যথা আর পেট খারাপের সমস্যা কি একই সাথে যুক্ত? না একটা হলে আরেকটা নাও হতে পারে? পেটে গ্যাস থেকে কি ব্যথা হতে পারে?

ডঃ সেনগুপ্ত:
 প্রথমে বুঝতে হবে পেট খারাপ বলতে মায়েরা কী বোঝাতে চাইছেন।  তরল মল কিন্তু সবসময় পেট খারাপের কারণ নয়।  অনেক সময় ফুড ইন্টলারেন্স তরল মলের কাণ হতে পারে।  এসব ক্ষেত্রে পেটে ব্যথা হতেও পারে আবার নাও হতে পারে।  তবে বাচ্চা অনেক সময় পেটে অস্বস্তির কারনে অস্থির হয়ে উঠতে পারে।  ইনফেকশনের কারণে পেট খারাপ হলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বাচ্চার জ্বর হয় এবং তার সাথে পেটে ব্যথা।

পেটে গ্যাস হলে প্রাথমিকভাবে অস্বস্তি হয়।  গ্যাস বের করার ব্যবস্থা না করলে এই অস্বস্তি ক্রমে ব্যথায় পরিণত হতে পারে।  শিশুর ৬ মাস বয়স অবধি, দুধ খাওয়ানোর পর থেকে ঢেঁকুর না তোলালে, পেটে গ্যাস থেকে যাওয়ার সম্ভবনা থাকে।  এর চেয়ে বড় বয়েসের শিশুদের অন্ত্রে গ্যাস জমার প্রবণতা বেশি।  সে ক্ষেত্রে খেয়াল রাখতে হবে শিশু সঠিক ভাবে মলত্যাগ করছে কি না।  অনেক সময় গ্লিসারিন সাপোজ়িটার মলদ্বার দিয়ে ভিতরে ঢুকিয়ে দিলে ভালো ফল পাওয়া যায়।  ওষুধ দেওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই বাচ্চা বায়ু এবং মলত্যাগ করবে এবং অস্বস্তি মিটে যাবে।

দ্য ওয়াল: যারা একটু বড়, প্লে-গ্রুপে যাচ্ছে, টুকটাক খাবার খাচ্ছে, তাদের ঠিক কী কী খাবার মা বাবারা দিতে পারেন এই সময়ে?

ডঃ সেনগুপ্ত: অনেক সময়ে মায়েরা মনে করেন, যে বাচ্চার খাবার পরিবারের প্রাপ্তবয়স্কদের খাবারের থেকে আলাদা তৈরি করতে হবে, তেল-ঝাল-মশলা বাদ দিয়ে।  এটার দরকার নেই।  আমাদের বাঙ্গালি পরিবারের আটপৌরে রান্না (ডাল, ভাত, মাছের হাল্কা ঝোল) আপনি অবশ্যই বাচ্চাকে খাওয়াতে পারেন, আপনার বাচ্চা এই সব খাবার আনন্দে খাবে।  দই, দইয়ের ঘোল, শসা, তরমুজ, মরশুমের ফল এবং ফলের রস এইসব খাওয়াতে পারেন।
এক্ষেত্রে বলা যায়, ১ বছর বয়সের পর, বাচ্চার দুধের পরিমাণ ধীরে ধীরে কমিয়ে আনা উচিত।  নইলে সে খাবার খেতে চাইবে না কারন দুধে পেট ভরে থাকবে এবং এটি বাচ্চার পক্ষে তা ক্ষতিকারক।  ২ বছর বয়স থেকে শুধু দুধে বাচ্চার পুষ্টি পূরণ হয় না।  সঠিক পুষ্টির জন্য বাচ্চার অন্য খাবার খাওয়াও প্রয়োজন।

সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন মধুরিমা রায়

Comments are closed.