গায়ের জোর দেখাবেন না, আলোচনায় বসুন

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    গায়ে জোর থাকার একটা মুশকিল হল কেবলই তা অন্যের ওপরে ফলাতে ইচ্ছা করে। তার পরিণাম কী হবে, অনেক সময়েই খেয়াল থাকে না। আপাতত আমাদের রাজ্যে তথা সারা দেশে নাগরিকত্ব সংশোধন আইন নিয়ে গায়ের জোর দেখাতে নেমেছে সরকার ও বিরোধী, উভয়পক্ষই। বিজেপি ভাবছে গায়ের জোরে নতুন আইন কার্যকর করবে। অন্যদিকে বিরোধীরাও রে রে করে নেমেছেন রাস্তায়। তাঁরা যে করে হোক সরকারের প্রচেষ্টা বানচাল করতে চান।

    দু’পক্ষ যেভাবে ক্ষমতা দেখাতে নেমেছে, তার পরিণাম মোটেই ভালো হচ্ছে না। গত কয়েকদিন ধরে রোজ বাস পুড়ছে, ট্রেন পুড়ছে, রাস্তা আটকে যাচ্ছে, স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা বন্ধ হচ্ছে, পালটা নামিয়ে আনা হয়েছে পুলিশি দমনপীড়ন। সবচেয়ে বেশি ভুগছেন সাধারণ মানুষ। যাঁরা জীবিকার সন্ধানে প্রতিদিন দূরের কোনও শহরে পাড়ি দেন, তাঁরাই বিপদে পড়ছেন সবচেয়ে বেশি।

    সরকার ও আন্দোলনকারী দু’পক্ষের কাছে প্রথমত একটাই অনুরোধ, আপনারা সংযত হোন।

    এর পরে যে কথাটি বলার, তা হল, সরকারের শক্তি বিরোধীদের থেকে নিঃসন্দেহে বেশি। সুতরাং সংযম দেখানোর দায়ও তারই বেশি। কিন্তু নরেন্দ্র মোদী সেপথে হাঁটছেন বলে মনে হয় না। তিনি ঠিক কী করতে চাইছেন, স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে না। একবার বলছেন, পোশাক দেখলেই বোঝা যায়, কারা হিংসা ছড়াচ্ছে। তারপর ২৪ ঘণ্টা কাটতে না কাটতেই সবাইকে আশ্বস্ত করে বলছেন, নাগরিকত্ব আইনে কারও ক্ষতি হবে না।

    এই কথাটি বিজেপির অন্যান্য নেতারা আগেও বলেছেন, কারও ক্ষতি হবে না। কিন্তু তাতে আরও বেড়েছে সন্দেহ। মানুষ ভাবছে, সরকার যখন এত করে বলছে কারও ক্ষতি হবে না তখন নতুন আইনে ক্ষতিকারক কিছু আছেই।

    কেন্দ্রীয় সরকার বলছে, বিরোধীরা মানুষকে ভুল বুঝিয়েছে। যদি তাই হয়, তাঁরা আগেভাগে পালটা প্রচারে নামেননি কেন? মনে হয়, তাঁরা ভেবেছিলেন, বিরোধীরা যেহেতু ভোটে কোণঠাসা হয়ে পড়েছে, তাদের প্রচারে কেউ কান দেবে না।

    বিজেপির এই অবস্থা দেখে অনেকের মনে পড়বে বামফ্রন্টের শেষ পাঁচ বছরের কথা। ২০০৬ সালের ভোটে বিপুলভাবে জিতে আসার পরে সিপিএম ভেবেছিল, কাউকে তোয়াক্কা করার দরকার নেই। আমরা যা চাইব তাই পাব। একটা ধমক দেব আর চাষি অমনি তিনফসলি জমি ছেড়ে সুড়সুড় করে পালাবে। তারপর সেই জমিতে ফলবে ন্যানো গাড়ি। এর পরিণাম কী হয়েছিল সকলেরই জানা।

    বিজেপি লোকসভা ভোটে একাই সরকার গড়ার মতো গরিষ্ঠতা পেয়েছে সত্য কিন্তু তার মানে এই নয় যে, বিরোধীরা নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছে। গণতন্ত্রে সবার কথা শুনতে হয়। নাগরিকত্ব আইন নিয়ে যদি বহু মানুষের মনে যদি ভুল ধারণাই বাসা বেঁধে থাকে, তাকে উপেক্ষা করা উচিত নয়। তার পরিণাম হতে পারে ভয়ংকর। বরং মানুষের কথা ধৈর্য ধরে শোনা উচিত।

    একটি মহল থেকে বলা হচ্ছে, আইন যখন হয়ে গিয়েছে, তখন তা মানতেই হবে। তাঁরা আলোচনার দরজা বন্ধ করে দিতে চাইছেন। এক্ষেত্রে যে কথাটি বলার, তা হল, আইন তো ভগবান বানিয়ে দেননি। মানুষই বানিয়েছে। তাতে ভুলভ্রান্তি থাকতেই পারে। আন্দোলনের চাপে এমন অনেক আইন তৈরি হয় আবার নাকচও হয়ে যায়। আমরা জানি, জমি আন্দোলনের জেরে সরকার আদ্যিকালের জমি অধিগ্রহণ আইন বদলাতে বাধ্য হয়েছে। সুতরাং নাগরিকত্ব আইনও যে বদলাবে না, এমন কোনও কথা আছে কি?

    নাগরিকত্ব আইন নিয়ে যদি কোনও ভুল বোঝাবুঝি থাকে, তা নিয়ে আলাপ, আলোচনা ও বিতর্ক হওয়া চাই। এক্ষেত্রে সরকারকেই অগ্রণী হয়ে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে বসতে হবে। বিরোধীদেরও গোঁ ধরে থাকলে চলবে না। পুলিশ বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারে ঢুকে ছাত্রছাত্রীদের মারধর করবে, তা একেবারেই কাঙ্ক্ষিত নয়। আবার আন্দোলনের নামে ট্রেন দাঁড় করিয়ে যাত্রীদের দিকে ইটপাথর ছোঁড়া হবে, তাই বা কেমন করে মেনে নেওয়া যায়। আসলে সরকারপক্ষ ও আন্দোলনকারী, দু’পক্ষকেই বুঝতে হবে, গায়ের জোর দেখিয়ে কোনও সমস্যা মেটে না। বরং বাড়ে। দীর্ঘস্থায়ী শত্রুতা সৃষ্টি হয়। বরং সদিচ্ছা নিয়ে আলোচনার টেবিলে বসাই ভাল।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More