মঙ্গলবার, এপ্রিল ২৩

ক্যানসার আটকাতে বদল আনুন লাইফস্টাইলে, চেক আপ করান নিয়মিত

ক্যানসার শব্দটা শুনলে এই ২০১৯-এও আমরা চমকে উঠি। বহু ক্ষেত্রে সাফল্য এসেছে তবু আতঙ্ক কাটেনি। মারণরোগ মানুষের শরীরের যে কোনও জায়গায় বাসা বাঁধে। বলা হয় যখন ধরা পড়ে তখন  অনেক দেরি হয়ে গেছে। সত্যি কি এই রোগের উপসর্গ আগে থেকে বোঝা সম্ভব, কথা বললাম বিশিষ্ট অঙ্কোলজিস্ট ডঃ গৌতম মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে। কী বললেন তিনি দ্য ওয়ালকে?

দ্য ওয়াল: ক্যানসার আসলে কী?

ডঃ গৌতম মুখোপাধ্যায়: আমাদের শরীরের কোষগুলো নির্দিষ্টভাবে বিভাজিত হয়। কিন্তু যখনই এই বিভাজনে অনিয়ম আসে অর্থাৎ অনিয়মিত কোষ বিভাজন হলেই টিউমার ফর্ম করে। এই টিউমার শরীরের যে কোনও জায়গায় হতে পারে। সেটা সঠিক সময়ে আইডেন্টিফাই করতে পারলে ঝুঁকি কমে যায়। তাই ক্যানসারের ক্ষেত্রে সময়টা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

দ্য ওয়াল: টিউমারই কি তাহলে ক্যানসারের সূচনা?

ডঃ গৌতম মুখোপাধ্যায়: টিউমার দুরকমের হয়। ম্যালিগন্যান্ট টিউমার হলে তা থেকে ক্যানসার ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু বিনাইন টিউমার হলে তা থেকে ক্যানসারের কোনও সম্ভাবনা থাকে না। শরীরের বাকি অংশে যে ভাবে কোষবিভাজনে ক্যানসার হয়, সেভাবেই রক্তেও কোষ দ্রুত অনিয়মিত বিভাজন হলে তা থেকেই ক্যানসার হয়। কাজেই শরীরের যেকোনও জায়গায় মাংসপিণ্ড বা টিউমার দেখা গেলে তা ডাক্তারকে দেখিয়ে নেওয়াই ভালো। শুরুতেই ডিটেকশন জরুরি।

দ্য ওয়াল: কেন হয় এই মারণরোগ?

ডঃ গৌতম মুখোপাধ্যায়: মূলত দুটি কারণ, বংশগতভাবে এই রোগ হতে পারে। অর্থাৎ পরিবারে কারো ছিল সেক্ষেত্রে এই রোগ হওয়ার প্রবণতা প্রবল থাকে। এছাড়াও হতে পারে লাইফস্টাইলের কারণে। রাত জাগা, ফাস্টফুড খাওয়া, সময়মতো ঠিক করে না খাওয়া ইত্যাদি যেকোনও কারণেই ম্যলিগন্যন্ট টিউমার হতে পারে। তা থেকেই দ্রুত ছড়াতে পারে ক্যানসার।

দ্য ওয়াল:ক্যানসারের উপসর্গগুলো কী কী?

ডঃ গৌতম মুখোপাধ্যায়: ক্যানসার মানে একটা ঘা, যখনই সেই ঘা সারে না এবং সেখান থেকে রক্ত পড়তে থাকে, শুকোয় না জায়গাটা তা থেকে ক্যানসার হতে পারে ধরে নিয়ে শুরুতেই ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলা উচিত। খিদে কমে যাওয়া, শরীরের ওজন হঠাৎ কমতে থাকলে.শরীরের কোথাও মাংসপিণ্ড দেখা গেলে তাতে ব্যথা থাকতেও পারে, আবার ব্যথা নাও হতে পারে, পেটে চিনচিনে ব্যথা, ডায়েরিয়া, কনস্টিপেশন, হিমোগ্লেবিন কমতে থাকা ইত্যাদি যেকোনও উপসর্গই ক্যানসারের লক্ষণ হতে পারে। সাবধান হতে হবে। ব্রেন টিউমার বা ক্যানসার হলে রোগী বারবার অজ্ঞান হয়ে যাবে, স্কিনের ক্যানসার হলে প্রাথমিকভাবে মেলানোমা দেখা যাবে, স্কিনে কালো কালো ছোট ছোট গুটি দেখা যাবে। এরকম কিছু দেখলে অবশ্যই ডাক্তার দেখান। রক্তের কোনও সমস্যা হলে সহজেই কালশিটে পড়ে যাবে, সেটা সারতে সময় লাগবে। লাং ক্যানসারের ক্ষেত্রে সাধারণত দূষণ বা টোবাকো থেকে হয়। কেউ সরাসরি স্মোকিংএ অভ্যস্ত না হলেও প্যাসিভ স্মোকিং হলে অনেক সময়েই লাং ক্যানসার হতে পারে। জেনিটাল কোনও অরগ্যানে অর্থাৎ ইউটেরাস বা সার্ভাইক্যাল ক্যনসারের উপসর্গে ব্লিডিং শুরু হয় কিন্তু থামতে চায় না। এছাড়াও পোস্ট মেনোপজ ব্লিডিং যদি মাঝ  মাঝে হয় বা ইন্টারকোর্সের সময় ব্লিডিং হলে যাকে বলি  পোস্ট কয়টাল ব্লিডিং এগুলো মানেই ক্যানসারের উপসর্গ। কাজেই এই উপসর্গগুলো দেখলে দেরি করা একেবারেই উচিত নয়।

দ্য ওয়াল: কোনওভাবে আটকানো সম্ভব? 

ডঃ গৌতম মুখোপাধ্যায়: প্রথমেই উপসর্গগুলো দেখে বুঝে নিতে হবে সমস্যা কোথায়। অন্তত একবার চেকআপ করুন বছরে। আর বংশে কারো ক্যানসার থাকলে অবশ্যই বছরে দুবার ডাক্তারের কাছে যান। শরীরের পুরো চেক আপ করান। কখন এই মারণরোগ বাসা বাঁধবে আমাদের কারো জানা থাকে না। তাই ফুড হ্যাবিট থেকে লাইফস্টাইল সবই নিয়ণ্ত্রণে রাখতে হবে।

দ্য ওয়াল:  ফুড হ্যাবিট এবং লাইফস্টাইল কতটা প্রভাব ফেলে, কী ভাবে ফেলে?

ডঃ গৌতম মুখোপাধ্যায়: অবশ্যই ফুড হ্যাবিট খুব গুরুত্বপূর্ণ। যারা খুব বেশি স্মোকডফুড খান, তাঁদের খাদ্যনালী, স্টম্যাকের  ক্যানসারের সম্ভাবনা খুব বেশি থাকে। অতিরিক্ত চর্বিজাতীয় খাবারে ব্রেস্ট ক্যানসার, ইউটেরাস ক্যানসার, ওভারিয়ান ক্যানসারের সম্ভাবনা থাকে অনেকটাই‌। নিয়মিত রেডমিট খেলে পুরুষদের ক্ষেত্রে হতে পারে প্রস্টেট ক্যানসার বা লাং ক্যান্সারও এমনকী, রেক্টাম ও কোলন ক্যানসারের প্রবণতাও বাড়ে সেক্ষেত্রে। যে কোনো নেশা থেকে দূরে থাকাটাই ভালো। আজকাল স্ট্রেসের কারণে অনেকেই মদ্যপানে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছেন, কিন্তু সেটা ঠিক নয় একেবারেই। ফাস্টফুড যে কোনো টোব্যাকো প্রডাক্ট বা মদ্যপান ছেড়ে বাড়ির রান্না ফলমূল শাকসব্জি খান বেশি করে। ক্যানসারকে দূরে রাখুন সহজে।

দ্য ওয়াল: আগেকার তুলনায় কতটা বেড়েছে এখন ক্যানসার? একসময়ে কি এটা মহামারীর আকার নেবে?

ডঃ গৌতম মুখোপাধ্যায়: হ্যাঁ এটা শুনতে খারাপ লাগলেও হু-এর মতো সংস্থার রিপোর্ট বলছে ২০২২-৩০ এর মধ্যে সব ঘরে একজন করে ক্যানসার আক্রান্ত থাকবেই। আগেকার দিনের তুলনায় এখন গড় আয়ু বেড়েছে তাই ক্যানসারের প্রৱণতাও বেড়েছে। সমীক্ষা বলছে প্রতি বছর এদেশে ১২ থেকে সাড়ে ১২ লাখ মানুষ ক্যানসারে আক্রান্ত হন। সবমিলিয়ে দেশে ৩০-৪০ লাখ পেশেন্ট আছে এখন। রাজ্যের হিসেবে পশ্চিমবাংলায় প্রতি বছর ৮০-৮৫ হাজার নতুন পেশেন্ট হয়, এই মূহুর্তে রাজ্যে ক্যানসার আক্রান্তের সংখ্যা ৩-৪ লাখ। কাজেই সচেতন না হলে সমস্যা এবং এই সংখ্যা বাড়তে থাকবে।

কী বলছেন ডাক্তারবাবু ,শুনুন

দ্য ওয়াল: অনেক সময়ে বিভিন্ন টোটকার কথা বলা হয়, বিবিধ ফলমূলের কথা বলা হয় যা ক্যানসার প্রতিরোধে সাহায্য করে , কতটা ঠিক? যারা কখনোও কোনও নেশা করেননি তাদেরও কি হতে পারে ক্যানসার? এই রোগের সেল কি জন্মসূত্রে শরীরে থাকতে পারে?

ডঃ গৌতম মুখোপাধ্যায়: না কোনও টোটকা সে ভাবে বিজ্ঞানভিত্তিক নয়। পান খাওয়া, তামাকজাত যেকোনও জিনিস খাওয়ার অভ্যাস, অ্যালকোহল খাওয়ার অভ্যাস ইত্যাদি সহজেই এই রোগ বাধাতে পারে, তাই এগুলো থেকে অবশ্যই দূরে থাকতে হবে। যারা নিজেরা কখনোও নেশা করেননি, অথচ প্যাসিভ স্মোকিং করেছেন বা শিল্পনগরীর মতো এলাকায় বাস করেন তাদের সহজেই হতে পারে এই রোগ। আমাদের শরীরে ক্যানসারের সেল যে‌মন থাকে, তেমনি তার প্রতিরোধের সেলও থাকে তাই ব্যালান্সের সমস্যা হলেই ক্যানসার হয়। প্রতিরোধের সেল সংখ্যায় কমে গেলে আর তুলনায় ক্যানসারের সেল বেশি হয়ে গেলে রোগ আটকানো যায় না সহজে। এখনো কোনও সঠিক সমাধান যে বেড়িয়েছে তা নয়, তবে রিসার্চ চলছে। Early detection খুবই জরুরি।

দ্য ওয়াল: কেমোথেরাপি আর রেডিয়েশনের তফাত কী ? কখন কোনটা দেওয়া হয়? সাইডএফেক্ট কী কী হতে পারে?

ডঃ গৌতম মুখোপাধ্যায়: কেমো দেওয়া হয় সারা শরীরে, ইঞ্জেকশনের মাধ্যমে দেওয়া হলে শিরা দিয়ে সেই ওষুধের প্রভাব সারা শরীরেই পড়ে। আর রেডিয়েশনের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট জায়গাটা রে দিয়ে পুড়িয়ে আক্রান্ত সেলগুলোকে নষ্ট করা হয়। প্রভার দুক্ষেত্রেই শর্টটার্ম এবং লংটার্ম থাকে। কোথাও চুল পড়ে যাওয়া, হাত পা ঝিনঝিন করা যেমন থাকে, কোথাও আবার হাত পা এর নখ কালো হয়ে যাওয়া, বমিভাব, ওজন কমে যাওয়া, পেট খারাপ হওয়া, কনস্টিপেশন ইত্যাদি থাকে। রেডিয়েশনের ক্ষেত্রে চুল পড়ে যায় না, তবে স্কিন কালো হয়ে যায়। ওরাল কেমো দেওয়া হয় শরীরের অবস্থা দেখে। সাধারণত লাং, ওরাল, কোলন ক্যান্সারের ক্ষেত্রে অনেকসময়েই ওরাল কেমো দেওয়া হয়। সিম্পটমগুলো মাথায় রেখে এভিডেন্স দেখে ফর্ম্যাট অনুযায়ীই কেমো বা রেডিয়েশন দেওয়া হয়।

দ্য ওয়াল: শিশুদের ক্ষেত্রে কতটা সচেতন হতে হবে?

ডঃ গৌতম মুখোপাধ্যায়: আসলে ওরা ওদের পেট ব্যথা বা অন্য সমস্য মুখে বলতে পারে না ঠিক করে, তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায় ব্লাড ক্যানসারে আক্রান্ত হয় তারা। তাই ফ্যাকাশে বা হঠাৎ ফর্সা হতে থাকে । আসলে হিমোগ্লোবিন কমতে থাকে ওদের। তাদের ওজন কমে যেতে পারে, অল্প চোট আঘাতেই কালশিটে পড়ে যেতে পারে। তাছাড়াও অন্যান্য ক্যানসার হতে পারে, সেক্ষেত্রে নজরে রাখতে হবে তাদের।

অতএব সচেতনতাই প্রথম জরুরি এক্ষেত্রে। যেস ব উপসর্গের কথা বললেন ডঃ মুখোপাধ্যায় তাতে বোঝাই যাচ্ছে যে সেগুলো মাথায় রেখে এগোতে পারলে প্রাথমিক স্টেজেই ক্যানসার ধরা পড়তে পারে। আর চিকিৎসার মাধ্যমে তা সারিয়ে ফেলাও যায়। কাজেই আতঙ্ক কাটিয়ে ক্যানসার জয় করতে শুধুমাত্র নিজের এবং প্রিয়জনদের প্রতি খেয়াল রাখুন আর বছরে এক থেকে দুবার ডাক্তারের কাছে চেক আপ করিয়ে নিন, সুস্থ থাকুন।

সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন মধুরিমা রায়।

Shares

Comments are closed.