বৃহস্পতিবার, এপ্রিল ২৫

লিভারকে ফ্যাটমুক্ত রাখতে ঘাম ঝরান নিয়মিত, নিদান দিলেন ডাক্তারবাবু

রোজ তাড়াহুড়ো করে সকালে বেরোচ্ছেন, ক্যাবে বা বাসে করে অফিস পৌঁছচ্ছেন আর চেয়ার টেবিল কম্পিউটারে ডুবে যাচ্ছেন। মাঝে ফোনে অর্ডার করছেন খাবারের। এভাবেই কেটে যাচ্ছে দিনের পর দিন। কিন্তু এত অস্থিরতার মাঝে আপনার ভুঁড়ি বেড়ে চলেছে নিজের ছন্দে। সঙ্গে বাড়ছে মধ্যপ্রদেশের ভিতরের নানা উপসর্গ। যার অন্যতম একটি উপসর্গ হল ফ্যাটি লিভার! কী সমস্যা হতে পারে তাতে, কী করবেন আপনি? জেনে নিন বিশিষ্ট লিভার স্পেশ্যালিস্ট ডঃ অভিজিৎ চৌধুরী এ বিষয়ে কী বলছেন।

দ্য ওয়াল: ফ্যাটি লিভার কী? কেন হয়?
ডঃ চৌধুরী: শরীরে ফ্যাট বা স্নেহ পদার্থ তৈরিই হয় লিভারে। শরীরে তৈরি হওয়া ফ্যাট কোষে কোষে গিয়ে এনার্জি দেয়। ফ্যাট জমানো থাকে অ্যাডিপোস টিস্যু হিসেবে। আমাদের দৈনন্দিন পরিশ্রম যদি যথেষ্ট না হয়, তা হলে ফ্যাট জমতে থাকে। অর্থনীতির ডেবিট ক্রেডিট ব্যালেন্স শিটের মতো। তাই যে ফ্যাটগুলো জমছে, সেগুলোর খরচ না করলে লিভারে আরও বেশি ফ্যাট জমবেই। মোটা লোকজনের এই সমস্যা অনেকটাই বেশি। আসলে ফ্যাটি লিভার সুখের অসুখ। পরিশ্রম কম করলে আর খাবার বেশি খেলে এই অসুখ করবেই। একে একবিংশ শতাব্দীর অসুখ বলা যায়। আগে লোকজন অনেক বেশি কায়িক শ্রম করতেন। তাই এই রোগ মানুষকে কাবু করতে পারত না। এখন সে দিকে দ্রুত নজর দিতে হবে।

দ্য ওয়াল: উপসর্গগুলো কী কী?
ডঃ চৌধুরী: লিভারের অসুখ মানেই ফ্যাটি অ্যাসিড এমন নয়, তবে ফ্যাটি অ্যাসিড মানেই সেটা অবশ্যই লিভারের অসুখ। সাধারণ অবস্থার থেকে লিভারে ফ্যাট বেশি জমলেই তা ফ্যাটি অ্যাসিড হতে পারে। পেটের উপর দিকে ডানদিকে হাল্কা ব্যথা করতে শুরু করে, তবে বেশি ব্যথা করে না। অবসাদ বাড়তে থাকে। পরিশ্রমের ইচ্ছে চলে যায়। আসলে পরিশ্রম কম করতে থাকলে এক দিকে ফ্যাটি অ্যাসিড বাড়তে থাকে, আবার সাইক্লিক অর্ডারে ফ্যাটি অ্যাসিড বাড়লে কাজ করার ইচ্ছে কমে যায়। এক বার এই জালে পড়লে সমস্যা কমার চান্স খুব কমে যায়। তবে একে বাড়তে দিলেও মুশকিল, কারণ এর থেকেই ধীরে ধীরে ‘সিরোসিস অফ লিভার’ হয়। আর তা থেকে পরবর্তী কালে হতে পারে ক্যানসারও!

দ্য ওয়াল: প্রতিরোধের ব্যবস্থা করা সম্ভব?
ডঃ চৌধুরী: প্রতিরোধ করতে প্রচুর পরিশ্রম করতে হবে। কায়িক শ্রম বাড়িয়ে দিন। শুধু বসে বসে চেয়ার টেবিলে কম্পিউটারে নিজেকে ব্যস্ত রাখা চলবে না। কী কী খাচ্ছেন , নজর দিন সে দিকেও। রোজ ঘাম ঝরান। ফ্যাট কমাতে যা যা করণীয় সব করে ফেলুন। হঠাৎ জিম বা ক্র্যাশ ডায়েট করে কমাতে যাবেন না। এতে ক’দিন রোগা থাকলেও আবারও বেশি খেতে ইচ্ছে করবে। তাতে লাভ হবে না কিছুই। তাই নিজের লাইফস্টাইল বদলে ফেলুন।

দ্য ওয়াল: প্রতিকার কোন পথে?
ডঃ চৌধুরী: এখনও এর কোনও ওষুধ আবিষ্কার হয়নি। আসলে উন্নত দেশের অসুখ এটা। ধীরে-ধীরে উন্নয়নশীল দেশেও আসছে এই রোগ। তাই সমস্যার সেই অর্থে প্রতিকার নেই এখনও। প্রথম ছ’মাসে ৭ শতাংশ ওজন কমান, পরের ছ’মাসে আরও ৭ শতাংশ। নিয়মিত এই অভ্যাসে থাকতে হবে আপনাকে। সুস্থ থাকুন, ফ্যাটি অ্যাসিড থেকে বাঁচুন। আসলে ফ্যাটি অ্যাসিড কমাতে আপনাকে ওয়ান ডে বা টি টোয়েন্টিতে নয়, ভরসা রাখতে হবে টেস্ট ম্যাচেই। নিয়মিত ওজনকে নিজের বশে রাখুন।

ফ্যাটি অ্যাসিড নিয়ে কী বললেন ডাক্তারবাবু…

দ্য ওয়াল: শিশুদের হতে পারে কি? কেন হয় তাদের? বড় এবং ছোটদের এই অসুখের আলাদা আলাদা কারণ আছে কি?
ডঃ চৌধুরী: আজকাল শিশুদেরও হয়। আগামী দিনের শিশুরা এই অসুখে অনেক বেশি ভুগবেন। মা-বাবারা শুধু বলেন তাঁদের বাচ্চা কিছু খায় না, তাই তাঁদের খুব চিন্তা। আসলে শিশুরা আজকাল ব্যাগের ভারেই কুঁজো হয়ে যাচ্ছে। তারা মাঠে যায় না, খেলতে পারে না, বিকেল দেখে না। ফলে কায়িক শ্রম নেই। ফ্যাট জমছে লিভারে। ‘অ্যাডলোসেন্স ওবেসিটি’ এবং ‘চাইল্ডহুড ওবেসিটি’ এখন খুবই হচ্ছে। পেটমোটা না হলেই সে বাচ্চা সুস্থ নয়, এটা মাথা থেকে বার করে দিন। তাকে কম কার্বোহাইড্রেট খাওয়ান। ছুটতে দিন বেশি।
বড়, ছোট দু’ক্ষেত্রেই একই উপসর্গ কাজ করে। তাই আলাদা কিছু নয়।

দ্য ওয়াল: অনেকে বলেন মদ খাওয়া এর অন্যতম কারণ, কতটা সত্যি?
ডঃ চৌধুরী: ‘অ্যালকোহলিক ফ্যাটি অ্যাসিড’ একেবারেই আলাদা। তবে অবশ্যই এটাও চরম ক্ষতিকর। মদ খাওয়া এমনিই খুব খারাপ। কেউ সাফাই দিয়ে বলেন, অকেশনালি ড্রিঙ্ক করেন। যাঁরা রেগুলার ড্রিঙ্ক করেন অবশ্যই তাঁদের ক্ষতির সম্ভাবনা বেশি, তবে যারা অকেশনাল ড্রিঙ্কার তাঁদেরও সমস্যা হতে পারে। ফ্যাটি লিভারের একমাত্র কারণ অ্যালকোহল নয় অবশ্যই, তবে এ ক্ষেত্রে এটা মারাত্মক কারণ। ফ্যাটি লিভারে মদ্যপান মরার উপর খাঁড়ার ঘা বলা যায়। তাই এড়িয়ে চলাই ভালো।

দ্য ওয়াল: ফ্যাটি লিভারে কী কী খাওয়া বন্ধ করা উচিত?
ডঃ চৌধুরী: কোনও রকম সফ্টড্রিঙ্ক খাবেন না। এগুলো থেকে সুক্রোজ তৈরী হয়। যা লিভারের জন্য ক্ষতিকর। এ ছাড়াও মাখন, মার্জারিন, চিজ় জাতীয় সব কিছুই এড়িয়ে চলুন। কার্বোবাইড্রেট প্লেটে কম রাখুন। বিশেষত রিফাইনড কার্বোহাইড্রেট নৈব নৈব চ। এমন যে কোনও খাবার যা ফ্যাট তৈরি করতে পারে, তা খাবেন না। কারণ সেগুলো আপনাকেই পরিশ্রম করে ঘাম ঝরিয়ে আয়ত্তে আনতে হবে।

দ্য ওয়াল: কী কী খেতে পারেন এক জন ফ্যাটি লিভার পেশেন্ট?
ডঃ চৌধুরী: প্রচুর শাকসব্জি, রুটি, দই খান। ফল খান। ফল থেকে আপনি অ্যান্টি অক্সিড্যান্ট পাবেন। যা আপনার শরীরের জন্য উপকারি। আর এমন কিছু খাবেন না, যাতে পেট ভারী লাগে বা কাজে অনীহা আসে। তাই হাল্কা খাবার খান। আর ছুটে ছুটে ঘাম ঝরান।

দ্য ওয়াল: লাইফস্টাইল কতটা প্রভাব ফেলতে পারে এ ক্ষেত্রে?
ডঃ চৌধুরী: অবশ্যই প্রভাব ফেলবে। দৌড়তে দৌড়তে নিজের দিকেও খেয়াল দিন। কায়িক শ্রম করুন রোজ। শুধু অফিস আর বাড়ি করবেন না। শুধু টেবিলে মুখ গুঁজে কাজ করবেন না। খাবার বাড়ি থেকে নিয়ে যান অফিসে। বাইরের খাবার এড়িয়ে চলুন। ঘাম ঝরান, সুস্থ থাকুন। আপনার পরিশ্রমের তুলনায় খাওয়া বেশি হলেই , ফ্যাট জমতে থাকবে আর ডায়বেটিস, ওবেসিটি, ফ্যাটি অ্যাসিডের মতো সমস্যা বাড়বে।

দ্য ওয়াল: এই রোগ কি কোনও ভাবে বংশগত ভাবে আসতে পারে কোনও শিশুর দেহে?
ডঃ চৌধুরী: না সেই অর্থে প্রত্যক্ষ ভাবে এই রোগকে বংশগত বলা যায় না। তবে, যে পরিবারে খাওয়ার অভ্যাস সব সময়েই বেশি, বা খাবারে তেল মাখন বেশি ব্যবহার করা হয়, শাকসব্জি কম খাওয়া হয়, সেখানে বাচ্চারও সেই অভ্যাস হবে। ফলে পরোক্ষ ভাবে অবশ্যই বংশগত এই রোগ।

দ্য ওয়াল: ছোট থেকে সে ক্ষেত্রে কী ভাবে শিশুর যত্ন নেবে তার বাবা মা?
ডঃ চৌধুরী: খেলতে পাঠান, ব্যাগ হাল্কা করুন। খাবার দিন অল্প, কায়িক শ্রম বেশি করুক। ফ্যাট জাতীয় খাবার এড়িয়ে চলুন। সফ্টড্রিঙ্ক দেবেন না। বদলে বাড়িতে লেবু-জল করে দিন। ফাস্টফুড দেবেন না। টিফিনে বাড়ির খাবার দিন।

দ্য ওয়াল: যাদের মধ্যপ্রদেশ স্ফীত তাদেরই কি ফ্যাটিলিভার হয়?
ডঃ চৌধুরী: হ্যাঁ। কান টানলে মাথা আসার মতো ‘ওবেসিটি’ এলেই ফ্যাটি লিভারের সমস্যা আসে। তাই চেষ্টা করুন নিয়মিত ব্যায়ামের মধ্যে থেকে, কম খেয়ে বা সঠিক খাবার খেয়ে ভুঁড়ি কমিয়ে নিজেকে ফিট রাখতে। ফ্যাটি লিভারের মতো বাজে অসুখ থেকে দূরে থাকুন।

সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন মধুরিমা রায়।

Shares

Comments are closed.